পুণ্ড্রবর্ধন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Ancient Political Divisions.jpg

পুণ্ড্রবর্ধন ছিল প্রাচীন যুগের উত্তর বঙ্গের একটি এলাকা যাতে পুণ্ড্ররা বাস করত। পুণ্ড্ররা ছিল অনার্য একটি সম্প্রদায়।[১][২][৩]

নামকরণ[সম্পাদনা]

পুণ্ড্র নামের উত্পত্তি সম্পর্কে বেশকিছু মতবাদ আছে। একটি মতবাদ অনুসারে, পাণ্ডু নামের একটি রোগ থেকে পুণ্ড্র নামের উত্পত্তি। পুণ্ড্রকেস্ট্রার (পুণ্ড্রভূমি) অধিকাংশ ব্যক্তিই এ রোগে ভুগত। পুণ্ড্র আখের একটি প্রজাতি। আর যেখানে আখের অত্যাধিক ফলন হত তা পুণ্ডদেশ বা পুণ্ডভূমি নামে পরিচিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম-৮ম শতকের দিকে প্রাপ্ত বেদবাক্য অনুযায়ী পুণ্ড্র ছিল একটি অনার্য গোষ্ঠী যারা সাদানিরা নদীর পূর্বদিকে বাস করত। ১ম খ্রিস্টাব্দের মহাভারতও এই তথ্যটি সমর্থন করে। অশোকদানায় এটি প্রথমবার পুণ্ড্রবর্ধন নামে উল্লেখিত হয়। পুণ্ড্রদের আবাসস্থলই পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে খ্যাত হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্ট্রপূর্ব ‍দ্বিতীয় শতাব্দীর মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপিতি উল্লিখিত ‘পুদনগল’ (পূণ্ড্রনগর) ও বগুড়ার মহাস্থারে যে অভিন্ন এবং পূণ্ড্রনগর যে পুণ্ড্রদের আবাসস্থল পূণ্ড্রবর্ধণের কেন্দ্র সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশনেই।

পুণ্ড্রের জনগণ[সম্পাদনা]

পরবর্তী বেদবাক্য মতে পুণ্ড্র ছিল একটি জনগোষ্ঠী। মহাভারতের দিগ্বিজয় শাখায় তাদের আবাস হিসেবে মঙ্গিরের পূর্বদিকে এবং কোসির তীর শাসনকারী যুবরাজের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। গুপ্ত আমলের এপিগ্রাফ এবং প্রাচীন চীনা লেখকরা পুণ্ড্রবর্ধনকে উত্তরবঙ্গে পুণ্ড্রদের স্থান হিসেবে উল্লেখ করে।

রূপকথা[সম্পাদনা]

কিছু নির্দিষ্ট কিংবদন্তী অনুযায়ী প্রাচীনকালের রাজকীয় আর্য ও অনার্য শ্রেণীর মিশ্রণ ঘটে। একটি মত অনুযায়ী অশুর রাজা বালির রাণীর গর্ভে ঋষি দীর্ঘতমর পাঁচ সন্তান অঙ্গা, ভঙ্গা, সুমহা, পুণ্ড্র ও কালিঙ্গা জন্মলাভ করে। তারা তাদের নামে পাঁচটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

উত্তর ভারতে আর্য-ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার অনেক পরে বাংলায় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলায় বসবাসকারী অনার্য ব্যক্তিরা অনেক ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য তারা আর্য সংস্কৃতির প্রভাবকে প্রতিহত করে। মৌর্যরাই প্রাচীন ভারতে সর্বপ্রথম বড় ধরণের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সমর্থ হয় যার প্রাণকেন্দ্র ছিল বর্তমান পাটনার অন্তর্ভূক্ত পাটালিপুত্রা। পুণ্ড্রনগর থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি না থাকায় মৌর্যদের পুণ্ড্রবর্ধন অধিকার করার সম্ভাবনা আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫ সালের দিকে মৌর্যদের শাসনামল শেষ হয়ে যাবার পরে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে বেশকিছু ক্ষুদ্র সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ৪র্থ খ্রিস্টাব্দে গুপ্তদের পূণর্জাগরণের পরে। গুপ্ত আমলের ধাতব পাত্রে তাদের সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রান্তের পুণ্ড্রবর্ধন ভূক্তির কথা উল্লেখ আছে, যেখানে ভূক্তি বলতে সাম্রাজ্যের একটি বিভাগের কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের মুখে পড়ে এবং তাদের অধিকৃত অঞ্চলসমূহ সম্ভবত ৫৬৭-৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিব্বতী রাজা সাম্বাতসনের অধিকারে চলে যায়। বাংলা পূর্বে সমতট ও পশ্চিমে গৌড় নামক দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। কিছু নির্দিষ্ট প্রাচীন নথিতে পুণ্ড্রবর্ধনকে গৌড়ের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে বলা হয়েছে। ৭ম খ্রিস্টাব্দে এটি শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।

পতন[সম্পাদনা]

চীনা পাদ্রী, যুয়ানজাং (হিউয়েন সাং) ৬৩৯-৪৫ সালে পুণ্ড্রবর্ধন এলাকায় ভ্রমণ করেন। তিনি কাজানগালা থেকে কামাপুরা হয়ে পুণ্ড্রবর্ধনে যান। তবে তার ভ্রমণ নির্দেশিকাতে তিনি সে সময়ে পুণ্ড্রবর্ধনে কোন রাজা ছিল বলে উল্লেখ করেননি।

জুয়ানজাং পুণ্ড্রবর্ধন সম্পর্কে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি দেন:

"এখানে ২০টি বৌদ্ধ মঠ এবং ৩০০০ এরও বেশি ব্রেথ্রেন ছিল যারা “সুবৃহত্‌ ও ক্ষুদ্র যানবাহনগুলো”কে অনুসরণ করত; দেব-মন্দিরগুলোর সংখ্যা ১০০ ছিল এবং বিভিন্ন শ্রেণীর অনুসারীরা অস্থির থাকত, দিগম্বর নির্গ্রন্থের সংখ্যা ছিল অসংখ্য।"

নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, ৭ম-৮ম শতকে পুণ্ড্রবর্ধন তার প্রাচুর্য হারিয়ে ফেলেছিল। মহাস্থানগড়ের নৃতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে জানা যায়, পাল আমলের সময় ১২শ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দূর্গের ব্যবহার করা হয়েছিল, তবে এটি তেমন কোন শক্তি কেন্দ্র ছিল না। এটি চন্দ্রবংশের রাজাদের ও ভোজ ভার্মার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে তারা হয়ত এটিকে শাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে তখন আর এর তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না। এটি ক্রমশ তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং পারিপ্বার্শিক এলাকার একটি অংশে পরিণত হয়। পুণ্ড্রবর্ধননগর বা পুণ্ড্রবর্ধনপুর এর পরিচয় হারিয়ে মহাস্থান নামে সূচীত হতে থাকে।

ইসলামের প্রসার[সম্পাদনা]

মহাস্থানে রাজকীয় বংশের দরবেশ শাহ সুলতান বাল্কি মহিশাওয়ারের মাজার অবস্থিত। তিনি মহাস্থান এলাকায় অ-মুসলিম ব্যক্তিদের কাছে ইসলামের প্রচারের জন্য আসেন। তিনি এলাকার অধিবাসীদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন এবং এবং এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

সীমানা[সম্পাদনা]

বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা ও বাংলাদেশ ও ভারতের দিনাজপুর পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভূক্ত ছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hossain, Md. Mosharraf, Mahasthan: Anecdote to History, 2006, pp. 69-73, Dibyaprakash, 38/2 ka Bangla Bazar, Dhaka, ISBN 984-483-245-4
  2. Ghosh, Suchandra। "Pundravardhana"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত 2007-11-10 
  3. Majumdar, Dr. R.C., History of Ancient Bengal, First published 1971, Reprint 2005, p. 10, Tulshi Prakashani, Kolkata, ISBN 81-89118-01-3.