চন্দ্রকেতুগড়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চন্দ্রকেতুগড়
চন্দ্রকেতুগড় ভারত-এ অবস্থিত
চন্দ্রকেতুগড়
ভারতে অবস্থান
অবস্থান বেড়াচাঁপা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারত
স্থানাঙ্ক ২২°২৫′উত্তর ৮৮°২৫′পূর্ব / ২২.৪১° উত্তর ৮৮.৪১° পূর্ব / 22.41; 88.41
ধরন নগর-বসতি
ইতিহাস
প্রতিষ্ঠিত আনুমানিক ৪০০ - ৮০০ খ্রিষ্ট পূর্বে
পরিত্যক্ত ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ
ব্যবস্থাপনা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া
Chandraketugarh. Sunga 2nd-1st century BCE
SungaFecondity2.jpg
SungaWithChild.jpg

চন্দ্রকেতুগড় বাংলার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নস্থলপশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলায় এবং কলকাতা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তরপূর্ব দিকে একদা ভাগীরথী নদীর অন্যতম প্রবাহ বিদ্যাধরী নদীর কূল ঘেঁষে এর অবস্থান। প্রত্নস্থলটিতে একাধিকবার উৎখনন পরিচালিত হয়েছে। উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব প্রমাণ করে। এখানকার নিদর্শনাবলির প্রধান অংশ কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামপ্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু নিদর্শন শহর এবং শহরের বাইরে ব্যক্তিগত সংগ্রহেও রয়েছে।

প্রত্নস্থলটিতে বর্তমানে দেবালয়, হাদীপুর, বেড়াচাঁপা, শানপুকুর, ঝিক্‌রাইটাখোলা গ্রামের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। যাহোক, একথাটি বেশ জোর দিয়েই বলা যায় যে, এখানকার অবকাঠামোগত স্তরগুলির কালানুক্রমিক সম্পর্ক সঠিক ও সন্তোষজনকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। মাটির তৈরি বিশালদুর্গ প্রাচীর প্রত্নস্থলটির মূল কেন্দ্র ঘিরে আছে; আকৃতিতে আয়তাকার এবং মোটামুটিভাবে এক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। মাটির তৈরি এ দুর্গপ্রাচীরের অভ্যন্তরেই চন্দ্রকেতুগড়, খনা-মিহিরের ঢিবি, ইটাখোলা এবং নুনগোলা ইত্যাদি স্থানে খননের মাধ্যমে পাঁচটি পৃথক সাংস্কৃতিক স্তর বা পর্বের সন্ধান পাওয়া গেছে।

স্থানটির সঙ্গে রাজা চন্দ্ৰকেতুর একাধিক কিংবদন্তী জড়িত আছে (দ্রষ্টব্য: পীর গোরাচাঁদ)।

স্তর বিন্যাস[সম্পাদনা]

প্রাথমিক স্তর[সম্পাদনা]

প্রথম পর্বটি প্রাক্‌-‘উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র’ (Pre-NBPW) পর্যায়ের স্তরকে নির্দেশ করে।

দ্বিতীয় স্তর[সম্পাদনা]

৪০০ থেকে ১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কাল ঘোষণা করে দ্বিতীয় স্তর। এই স্তরের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নিদর্শনাবলির মধ্যে লম্বা গলার লাল মৃৎপাত্র; কানাবিহীন বড় গোলাকার পেয়ালা ও বাটিকা; কালো, সোনালি এবং বেগুনী রং-এর উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র; ধূসর রং-এর সাধারণ মৃৎপাত্রের টুকরা; তামার তৈরি চোখে সুরমা লাগাবার দণ্ড (Antimony rod); ও হাতির দাঁতের সামগ্রীর খণ্ড; ছাপাঙ্কিত তাম্র মুদ্রা; লিপিবিহীন ছাঁচে ঢালা তাম্র মুদ্রা; এবং বেশ কিছু পোড়ামাটির সামগ্রী যার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পুঁতি, নামাঙ্কিত সীলসীলমোহর রয়েছে।

তৃতীয় স্তর[সম্পাদনা]

তৃতীয় স্তরটি কুষাণ যুগের সমসাময়িক এবং স্তরটি আপাতদৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ। এ স্তর হতে রোমক ‘রুলেটেড’ (নকশা করা) পাত্রের অংশ বিশেষ; কালো অথবা অনুজ্জল লাল (mat-red) রং-এর ‘অ্যামফোরা’ (amphorae) বা গ্রিস দেশীয় মৃৎপাত্রের বেশ কিছু ভাঙ্গা অংশ; ছাপাঙ্কিত নকশাযুক্ত মনোরম লোহিত মৃন্ময়; ধূসর মৃৎপাত্র; এবং নিখুঁতভাবে ছাঁচে তৈরি পোড়ামাটির ক্ষুদ্র মূর্তি পাওয়া গেছে। এ পর্বকে খ্রিষ্টীয় প্রথম তিন শতাব্দীর মধ্যে ধরা হয়।

চতুর্থ স্তর[সম্পাদনা]

চতুর্থ স্তরটিকে গুপ্ত এবং গুপ্তোত্তর যুগের বলে চিহ্নিত করা হয়। এ স্তরের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে সীলসীলমোহর; পোড়া মাটির সামগ্রী; ছাপাঙ্কিত নকশাযুক্ত ও ছাঁচে নির্মিত মৃৎপাত্র। এ স্তরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হচ্ছে ১৪ ফুটের বেশি উচুঁ ‘সর্বত-ভদ্র’ রীতির ইট নির্মিত বিশাল একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। কোন বিশেষ দেব-দেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায় ধর্মীয় এমন কোন নমুনা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে, গুপ্ত স্তর থেকে সূর্য্য দেবতার প্রতিকৃতি একটি বেলে পাথর ফলকের নিম্নাংশে পাওয়া গেছে। পঞ্চম স্তরের প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ খুবই কম, এগুলি সম্ভবত পাল পর্যায়ের বলে ধরে নেওয়া হয়।

নিদর্শন[সম্পাদনা]

প্রাপ্ত শিল্প নিদর্শনের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট যে, মৌর্য থেকে গুপ্ত যুগ পর্যন্ত এ প্রত্নস্থলের প্রধান শিল্প মাধ্যম ছিল ছাঁচ নির্মিত পোড়ামাটির সামগ্রী। সার্বিক বিবেচনায় এ শিল্পটি শিল্পরীতিতে ৩৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে গাঙ্গেয় ভারতের শিল্পকলার নিদর্শনাবলির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে হয়। এগুলির বিস্ময়কর বিষয় বৈচিত্র্য অত্র অঞ্চলের শিল্পরীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করেছে। এখানে ধর্মীয় ও আচার সংক্রান্ত নিদর্শনাবলি যা পাওয়া গেছে তার মধ্যে আদিম ধরিত্রি-দেবী, যক্ষ, যক্ষিণী, নাগ, পুরুষ বা নারী মূর্তি, বুদ্ধমূর্তিরখ ফলক, কখনও পশুচালিত যানে দণ্ডায়মান এবং পাখাযুক্ত দেব-দেবী রয়েছে। আবার ধর্মের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই এমন বস্তু: খেলনা, পশুপাখিও পাওয়া গেছে। পোড়ামাটির সামগ্রীতে বিশেষ করে পোশাক অথবা শারিরীক সাধারণ বৈশিষ্ট্য খ্রিষ্টীয় প্রথম তিন শতাব্দীর গ্রেকো-রোমান যোগাযোগের গভীর প্রভাব দেখা যায়। প্রেমবিলাসী কামার্ত যুগলের কিংবা ‘মৈথুন’ ভঙ্গিতে চন্দ্রকেতুগড় প্রত্নস্থল থেকে অগণিত পোড়া মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। অলঙ্কারযুক্ত পুরুষ ও নারী মূর্তিসমূহ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে স্বর্ণকারের শিল্পের অনুকরণ করা হতো।

১৯১১ সালে এখান থেকে একটি কালো ক্লেরাইট পাথরের স্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়; এতে অশোকস্তম্ভের মতো সুন্দর পালিশ ছিল। এসময় একটি রুপোর ও একটি তামার পাত্ৰের টুকরো এবং একটি ছোট হলুদ বর্ণের পাথরে নির্মিত শীলমোহর ( খ্রিস্টপূর্ব ২য় বা ৩য় শতকের উত্তরভারতীয় লিপিতে 'মা' বর্ণটি খোদিত ছিল) পাওয়া যায়। এছাড়া একটি টেরাকোটা মৃৎখণ্ডে একত্রবদ্ধ শস্যগুচ্ছ এবং আরেকটি মৃৎখণ্ডে নারীর নূপুরযুক্ত পায়ের নকশা ছিল। এছাড়াও মাটির দুটি শঙ্কু (স্পিন্ডল হোর্ল)আবিষ্কৃত হয়েছিল। স্থানীয় লোকেরা পুকুরখনন গৃহনির্মাণ ইত্যাদির সময় লাঞ্ছনমুদ্রা পোড়ামাটির মূর্তি, ভাঁড় ও নানারকম পুরাবস্তু বিভিন্ন সময় পেয়েছেন।

১৯৫৬-৫৯ সালে উৎখননে খনামিহিরের ঢিবি নামক স্থানে প্রায় ৬৩ ফুট*৬৩ ফুট একটি বিশাল উত্তরমুখী মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়; মন্দির-সংলগ্ন উত্তরদিকে ৪৫ ফুট*৪৫ ফুট একটি মণ্ডপ এবং কাছে আরেকটি ছোট মন্দিরও পাওয়া গিয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই মন্দির সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম মন্দিরের নিদর্শন

বেড়াচাঁপা থেকে আধমাইল দূরে হাড়োয়া যাওয়ার পথে একটি ধানক্ষেত খুঁড়ে ৫-৮ ইঞ্চি ব্যাসের এবং ২ ফুট ৭ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের পোড়ামাটির যুক্তনলবিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী পাওয়া গিয়েছে। মাটির উপর থেকে ১৩ ফুট নিচে এবং জলস্তর থেকে প্রায় ১ ফুট নিচে এই নালার চিহ্ন পাওয়া গেছে।[১]

বর্তমানে প্রত্নস্থলটি সুনিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু, দেবগঙ্গা-দেগঙ্গা, দেবালয় ও অন্যান্য স্থানীয় নাম এবং এই অঞ্চলের জাতিবিন্যাস (প্রধানত প্রাগার্য নিষাদ-জাতিভুক্ত) লক্ষ্য করলে এমন বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, চন্দ্রকেতুগড়ই সম্ভবত ‘পেরিপ্লাস’ এবং টলেমী সূত্রে উল্লিখিত প্রাচীন ‘গাঙ্গে’ বা গঙ্গারিডাই। মনে করা হয়, দক্ষিণের সাগরদ্বীপ সুন্দরবন থেকে উত্তরের সমগ্ৰ চব্বিশ পরগনা এলাকা জুড়ে গঙ্গার প্রবাহপথে এই প্রাচীন গঙ্গারিডিরাজ্য বিস্তৃত ছিল।[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ঘোষ, বিনয়, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি", তৃতীয় খন্ড, প্রথম সংস্করণ, প্রকাশ ভবন, পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬০
  • Chandraketugarh : A Treasure House of Bengal Terracottas - Enamul Haque. Dhaka, The International Centre for Study of Bengal Art, 2001, 416 p., 678 illustrations including 400 in colour, figures, plates, maps, ISBN 984-8140-02-6. [১]
  • Chandraketugarh : A Lost Civilization - Gourishankar De and Shubhradip De. Kolkata, Sagnik Books, 2004, 109 p., 34 photos, [২]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]