হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
Hussain M. Ershad-2.jpg
বাংলাদেশের দশম রাষ্ট্রপতি
কাজের মেয়াদ
১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ – ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০
প্রধানমন্ত্রীআতাউর রহমান খান
মিজানুর রহমান চৌধুরী
মওদুদ আহমেদ
কাজী জাফর আহমেদ
পূর্বসূরীআহসান উদ্দিন চৌধুরী
উত্তরসূরীশাহাবুদ্দিন আহমেদ
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা
কাজের মেয়াদ
৯ জানুয়ারি, ২০১৯ – বর্তমান
পূর্বসূরীরওশন এরশাদ
সেনাবাহিনী প্রধান
কাজের মেয়াদ
২৯ ডিসেম্বর, ১৯৭৮ – ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৫[১]
রাষ্ট্রপতিজেনারেল জিয়াউর রহমান
পূর্বসূরীজেনারেল জিয়াউর রহমান
উত্তরসূরীজেনারেল আতিকুর রহমান
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম (1930-02-01) ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ (বয়স ৮৯)
দিনহাটা, ব্রিটিশ ভারত
(বর্তমানে ভারত)
রাজনৈতিক দলজাতীয় পার্টি
দাম্পত্য সঙ্গী
সামরিক পরিষেবা
আনুগত্যপাকিস্তান
বাংলাদেশ
সার্ভিস/শাখাপাকিস্তান সেনাবাহিনী
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
কার্যকাল পাকিস্তান ১৯৫২–১৯৭১
 বাংলাদেশ ১৯৭৩–১৯৮৫
পদলেফট্যানেন্ট জেনারেল

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ (ফেব্রুয়ারি ১, ১৯৩০) বাংলাদেশের সাবেক সেনা প্রধান, এককালীন প্রধান সামরিক প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি। তিনি জাতীয় পার্টি নামক রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বর্তমানে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) উপদলের নেতা। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন হতে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।তিনি বর্তমানে ১১তম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।[২]

১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচিত সরকারের অধীনে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন কালে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সামরিক শাসন জারীর মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুন:প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ঘোষণা করে তিনি ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সংসদীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন। এই নির্বাচনে তিনি স্বপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ভোটপ্রার্থী হিসাবে অংশ গ্রহণ করেন এবং পরে ৫ (পাঁচ) বৎসরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে গণবিক্ষোভের চাপে এবং সেনাবাহিনীর সমর্থনের অভাবে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

প্রাথমিক জীবন ও সামরিক পেশাজীবন[সম্পাদনা]

ফেব্রুয়ারি ১, ১৯৩০ তারিখে তিনি রংপুর জেলায় দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন।[৩] তিনি রংপুর জেলায় শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।[৪]

১৯৫২ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬০ - ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেন্দ্রে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি কোয়েটার স্টাফ কলেজ থেকে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের মেজর ছিলেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯ - ১৯৭০ সালে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক ও ১৯৭১ - ১৯৭২ সালে ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুর ছিলেন। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তান চলে যান[৫]। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন তিনিও প্রত্যাবর্তন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সময় আগ্রা ক্যান্টনমেন্টে স্টাফ কোর্সে অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এরশাদ[সম্পাদনা]

পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালের ২৪ অগাস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান ও উপসেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৫ অগাস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ বাংলাদেশের দিল্লি মিশনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বার্তা পাঠান।[৬]

সামরিক অভ্যু্ত্থান ও রাষ্ট্রপতিত্ব[সম্পাদনা]

৩০ মে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর, এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ঐ দিন তিনি দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এফ.এম আহসানুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে নিজের অধিকারে নেন। এরশাদ দেশে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগজামায়াত এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই নির্বাচন বয়কট করে। সাধারণ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি ৭ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে এই সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সকল দল বয়কট করে। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে সকল বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ১৯৮৬[সম্পাদনা]

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন , ১৯৮৬ (অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ ১৫ অক্টোবর,১৯৮৬) জয়লাভ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এ নির্বাচনে ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বাছাই –এ কোন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাদ না পড়ায় বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ জন। ৪জন প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ১২ জন ছিল।

১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১২জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেনঃ ১। জনাব অলিউল ইসলাম চৌধুরী (সুক্কু মিয়া) ২। আলহাজ্ব মাওলানা খায়রুল ইসলাম যশোরী ৩। আলহাজ্ব মেজর (অব) আফসার উদ্দিন ৪। জনাব মুহাম্মদ আনছার আলী ৫। জনাব মওলানা মোহাম্মদুল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর) ৬। জনাব মোহাম্মদ খলিলুর রহমান মজুমদার ৭। জনাব মোঃ আব্দুস সামাদ ৮। জনাব মোঃ জহির খান ৯। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) সৈয়দ ফারুক রহমান ১০। সৈয়দ মুনিরুল হুদা চৌধুরী ১১। স্কোঃ লিঃ (অবঃ) মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী ১২। জনাব হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ

[৭]

৯১-পরবর্তী রাজনৈতিক পেশাজীবন[সম্পাদনা]

ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না-আসা পর্যন্ত কারারূদ্ধ থাকেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। বি.এন.পি সরকার তার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে। তার মধ্যে কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ছয় বছর আবরুদ্ধ থাকার পর ৯ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি ২০০০ সালে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে মূল ধারার তিনি চেয়ারম্যান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে তার সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন।

গ্রেফতার[সম্পাদনা]

এরশাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর অবিরাম আন্দোলন চলতে থাকে এবং প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদ গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।[৮] ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। বিএনপি সরকার তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে এবং কোনো কোনোটিতে দোষী প্রমাণিত হয়ে তিনি কারাদন্ডে দন্ডিত হন। ১৯৯৬-এর সাধারণ নির্বাচনেও এরশাদ সংসদে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ছয় বছর জেলে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। তবে আদালতের রায়ে দন্ডিত হওয়ার কারণে সংসদে তাঁর আসন বাতিল হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি ১৯৭১-২০১১-মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান"। ২৬ জুন ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬  অজানা প্যারামিটার |2= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য); অজানা প্যারামিটার |4= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  2. http://www.dpp.gov.bd/upload_file/gazettes/29856_92319.pdf
  3. "বঙ্গভবনের ওয়েবসাইট"। ২১ জুন ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসেম্বর ২০১৩ 
  4. "Ershad, Lt. General Hussein M - Banglapedia"en.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৪-২৬ 
  5. আমার দেখা তিনটি সেনা অভ্যুত্থান বইয়ের লেখক তার বইতে কথাটি উদ্ধৃত করেন
  6. Ahmed, Fakhruddin (১৯৯৪)। Critical times, memoirs of a South Asian diplomat (1st সংস্করণ)। University Press, Dhaka। আইএসবিএন 9840512293 
  7. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৪ অক্টোবর ২০০৯ 
  8. "বাংলাপিডিয়া" 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

পূর্বসূরী:
আফম আহসানউদ্দিন চৌধুরী
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি
ডিসেম্বর, ১৯৮৩ - ডিসেম্বর ৬, ১৯৯০
উত্তরসূরী:
শাহাবুদ্দিন আহমেদ