বিষয়বস্তুতে চলুন

বরেন্দ্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বরেন্দ্র বা বরিন্দ বাংলার একটি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অঞ্চল,[] যা প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্র এবং গৌড় রাজ্যের অংশ ছিলো, বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী, রংপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ বিভাগের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। আজও বাংলাদেশের বগুড়া, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, নওগাঁ এবং পাবনা, উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বিশেষ লাল রঙের ভূমি প্রকৃতির ও তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্যে দেশীয়ভাবে বিভিন্ন নামে ডাকা হয় (যেমন খিয়াড়)। আর এসব এলাকা আজও বাংলার বরেন্দ্রভূমির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বহন করে।

আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে, বরিন্দের সীমানা পশ্চিমে গঙ্গামহানন্দা, পূর্বে করতোয়া, দক্ষিণে পদ্মা আর উত্তরে কুচবিহার এবং তেরাই-এ মাঝে ছিল।

বরেন্দ্রর এক কৈবর্ত রাজার মুদ্রা, 640–730 খ্রিস্টাব্দ

পৌরাণিক বিবরণ

[সম্পাদনা]

দৈত্যরাজ বলির পত্নী সুদেষ্ণার গর্ভে দীর্ঘতমা মুনির ঔরসে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, ওড্র এবং পুন্ড্র নামে পাঁচটি ক্ষেত্রজ পুত্র জন্মায়। তারা প্রত্যেকে স্বনামখ্যাত এক একটি রাজ্য স্থাপন করেন।
মালদহ জেলার অন্তর্গত পান্ডুয়া নগরের চার পাশের স্থান পুন্ড্রের অধিকারভুক্ত ছিল। তার নাম থেকেই একে পৌন্ড্র এবং এর রাজধানীকে পৌন্ড্রপট্টন বলা হত। কালক্রমে বরেন্দ্র নামের একজন ক্ষত্রিয় পৌন্ড্র রাজ্য জয় করে এই রাজ্যের নাম বরেন্দ্রভূমি রাখেন।[] যদিও বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের মতানুসারে পুন্ড্রের আসল অবস্থান ছিল অধুনা বাংলাদেশের বগুড়া জেলার অন্তর্গত মহাস্থানগড় নগরে। [][][]

ঐতিহাসিক বিবরণ

[সম্পাদনা]

কালক্রমে এই ভূমি মগধ সাম্রাজ্যের অধীনে ক্ষত্রিয়শূন্য হয়। বৌদ্ধদের প্রাধান্যের সময় পালবংশীয় রাজারা মগধরাজ্যের অধীনে এখানে রাজত্ব করতেন। সেই সময়ে পৌন্ড্রপট্টনের নাম পান্ডুয়া, গৌরবনগরের নাম গৌড় এবং বাকি বরেন্দ্রভূমির নাম বরিন্দ হয়েছিল।

মদনপাল এই বংশের শেষ রাজা।তার পত্নী মন্ত্রীর সহযোগে বিষপ্রয়োগে স্বামী-হত্যা করেছিলেন। কিন্তু সেনাপতি শূরসেন নামক বৈদ্য সেই দুষ্টা রাণী সহ মন্ত্রীকে বন্দী করে অগ্নিতে দগ্ধ করেন এবং মৃত রাজার কোন সন্তান না থাকায় নিজেই রাজা হন।

তখন থেকে গৌড়ে বৈদ্যরাজ্য (সেন) স্থাপিত হল; কিন্তু বাকি বরিন্দ ভূমির উত্তর ও পূর্বপ্রান্তে তখনও পালবংশীয় কোন কোন রাজার আধিপত্য ছিল। বৈদ্যরাজগণ ক্রমে ক্রমে পালরাজ্য ধ্বংস করে সমস্ত বরেন্দ্র অধিকার করেছিলেন।[]

১৭৬৫ সালে পরবর্তীতে দিওয়ানী প্রাপ্ত ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক বিভাজিত হয়ে ‘রাজশাহী বিভাগ’ হলে সে সময় সমগ্র বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত আটটি জেলা এই রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেগুলি হল ১। দার্জিলিং ২।জলপাইগুড়ি ৩। মালদহ ৪। দিনাজপুর ৫। রংপুর ৬। বগুড়া ৭। পাবনা এবং ৮। বৃহত্তর রাজশাহী জেলা সমূহ (রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ)।

বরেন্দ্র অঞ্চলের স্থাপত্য

[সম্পাদনা]

তৃতীয়-চতুর্থ শতক থেকে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন কাব্য ও প্রশস্তিতে সর্বত্রই নগরে নগরে শ্রেণীবদ্ধ প্রাসাদ শ্রেণির কথা পাওয়া যায়। এখানে অসংখ্য ইমারতের ধ্বংসাবশেষ, লিপিমালা, সাহিত্য ও প্রচুর মূর্তিতে উৎকীর্ণ ধর্মীয় স্থাপত্য শিল্পের তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়: স্তূপ, বিহার এবং মন্দির।

বৌদ্ধ স্তূপ

[সম্পাদনা]

বৌদ্ধ স্থাপত্যে স্তূপের গুরুত্ব সর্বাধিক।বৈদিক যুগে দেহস্থির ওপর শ্মশ্মানে মাটির স্তূপ তৈরি করা হত এবং সেনরাও পরবর্তীতে স্তূপ নির্মাণ করতেন। তবে স্থাপত্যের রূপ দিয়েছেন বৌদ্ধধর্মাম্বলম্বীরা।

স্তূপ চার প্রকার।

  • শারীর ধাতু স্তূপ, অর্থাৎ এগুলোতে বুদ্ধদেবের অথবা তার অনুচর ও শিষ্যদের দেহাবশেষ সযত্নে রক্ষিত ও পূজিত হত।
  • পারিভোগিক ধাতু স্তূপ, অর্থাৎ এগুলোতে বুদ্ধদেব কর্তৃক ব্যবহৃত দ্রব্যাদির রক্ষিত ও পূজিত হত।
  • নির্দেশিক স্তূপ, অর্থাৎ বুদ্ধদেবের জীবনের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত কোনও স্থান বা ঘটনাকে চিহ্নিত করে সে সব স্তূপ নির্মাণ হত।
  • নিবেদন স্তূপ, অর্থাৎ বৌদ্ধ তীর্থ স্থানগুলিতে পূজা দিতে এসে নৈবেদ্য বা নিবেদন স্বরূপ যে সব ছোট বড় স্তূপ তারা তৈরি করতেন।

পরবর্তীতে স্তূপমাত্রই বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের প্রতীক হয়ে যায়।

একটি স্তূপের তিনটি অংশ। যথা: ১.মেধ (ভিত্তিবেদী), ২.অস্থি (গম্বুজাকৃতি মধ্যভাগ) এবং ৩. ছত্রাবলী (অলঙ্কৃত শীর্ষভাগ)।

প্রাথমিক পর্যায়ে স্তূপটির গোলাকার একটি ভিত্তির ওপরে অর্ধগোলাকৃতির অংশ ছাড়া কিছুই ছিলো না। অন্যটির ঠিক ওপরেই থাকত চতুষ্কোণ যাকে হার্মিয়া বলা হয়। এই হার্মিকার ওপরেই সংরক্ষিত করা হত অস্থিধাতু অথবা পারিভোগিক নিদর্শন। কালক্রমে স্তূপের এই তিনটি অংশকে চিহ্নিত করে ইমারতটিকে সুউচ্চ, লম্বিত ও বৃহদায়তন করা হয়। সপ্তম-অষ্টম শতকে গোলাকার ভিত্তিবেদী আরও উচু ও লম্বা বেদিতে রূপান্তর করলেও মধ্যযুগে অর্ধ গোলাকার গম্বুজ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। এসব স্তূপের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিরূপের কিছু নিদর্শন বরেন্দ্র জাদুঘরের অভ্যন্তরে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত আছে।[]

বাংলাদেশে নানাস্থানে ব্রোঞ্জের অথবা পাথরের ছোট ছোট নিবেদন স্তূপ পাওয়া গেছে।ঢাকা জেলার আমরাক গ্রামে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জের ছোট ছোট স্তূপ ৭ম/৮ম শতকের যা সবথেকে প্রাচীনতম নিদর্শন।এছাড়া দিনাজপুরের যোগীগোপায় প্রাপ্ত আরেকটি পাথরের ক্ষুদ্রাকার নিবেদন স্তূপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[] হিউয়েন সাঙ এর ভ্রমণ বৃত্তান্তে আছে যে, তিনি বাংলার তামরলিপি,সমতট, ভাসুবিহার ও রাঙামাটি(মুর্শিদাবাদ)-তে সম্রাট অশোকের তৈরি চারটি বিশাল স্তূপ লক্ষ্য করেছিলেন। []

বরেন্দ্রভূমির কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত সহস্রাধিক বৎসরের প্রাচীন পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ও সংঘারাম বাংলদেশের প্রাক-মুসলিম যুগের অত্যাশ্চর্য স্থাপত্য। এটির মূল নাল ছিলো, সোমপুর বিহার ও মন্দির।[১০]পাল সম্রাট ধর্মপাল deb(৭৮১-৮২১ খ্রিস্টাব্দ) অষ্টম শতকে এটি নির্মাণ করেন। তিনি বিস্তীর্ণ সমাজে ৫০টির বেশি বৌদ্ধবিহার, মন্দির ও স্তূপ নির্মাণ করেন।

সর্বতোভদ্র নামে এক শ্রেণির মন্দির আছে যেটি চতুষ্কোণ ও চতুর্দিকে চারটি গর্ভগৃহ থাকত।এতে প্রবেশের জন্যে চারটি তোরণ থাকত। এ ধরনেটি মন্দির পঞ্চতল বিশিষ্ট প্রত্যেক তলে ১৬টি কোণ থাকত। প্রত্যেক তল ঘিরে প্রদক্ষিণ পথ ও সমগ্র মন্দিরটি ছোট ছোট বহু শিখর ও চূড়ায় সুশোভিত থাকত। পাহাড়পুরের ক্রুশাকৃতি বিশাল কেন্দ্রীয় মন্দিরটি সর্বতোভদ্র মন্দিরের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। [১১]

মন্দির

[সম্পাদনা]
  • গন্ধেশ্বরী মন্দির: এটি বিহার অঙ্গনের বাহিরে দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় একটি ভিত্তিভূমি, যা সোমপুর বিহারের পরবর্তী অবনতির যুগে নির্মাণ করা হয়। মন্দিরের বাহিরের দিকে ছোট কক্ষ ছিলো যা পূজার স্থান ছিলো।
  • সত্যপীরের ভিটা : পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার পূর্ব প্রাচীর থেকে প্রায় ৪০০ গজ পূর্বে এই মন্দির অবস্থিত। মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত অষ্টভূজা দেবী মূর্তিগুলো বৌদ্ধদেবী তারার বলে শনাক্ত করা হয়েছে। মন্দির অঙ্গনে ১৩২টি নিবেদন স্তূপ আছে, যেটির আকার কোনোটা বর্গাকার, আয়তাকার আবার কোনটি গোলাকার। নিবেদনের স্তূপগুলি বাঁধানো স্মারক কুঠুরি থেকে কয়েক হাজার ছোট ছোট মাটির নিবেদন স্তূপ পাওয়া গেছে যেখানে ‘যে ধর্ম মহাশ্রমণ’ ইত্যাদি বৌদ্ধ মহাজন মন্ত্রযুক্ত দুটি সিলমোহর পরস্পরের মুখোমুখি সংযুক্ত করা রাখা হত। [১২]

হিন্দু মন্দির

মসজিদ

[সম্পাদনা]

বরেন্দ্র অঞ্চলের বিদ্যমান স্থাপত্যের অধিকাংশই মসজিদ। এই মসজিদকে কালক্রমে সুলতানি আমল ও মোগল আমলে নির্মিত এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। আবার সুলতানি আমলকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে যা দিল্লির সুলতানের অধীনস্ত প্রাদেশিক কাল এবং দ্বিতীয়ভাগ স্বাধীন সুলতানি আমল। সুলতান ইলিয়াস শাহ যিনি ইলিয়াসশাহি বংশের প্রথম নৃপতি তিনিই শাহি বা স্বাধীন বাংলার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। [১৩]

সুলতানি আমলের মসজিদ

[সম্পাদনা]

সুলতানি আমলে নির্মিত বরেন্দ্র অঞ্চলের মসজিদ সমূহের অধিকাংশই গৌড়-লক্ষ্মণাবতী এবং হযরত পান্ডুয়া বা পাণ্ডুয়া ফিরোজবাদের দৃষ্ট। এতে দিনাজপুরের সূরা, বগুড়ার মহাস্থান এবং শেরপুর, পাবনার শাহজাদপুর এবং বাঘাতে একটি উদাহরণ বিদ্যমান।

রাজনৈতিক ও সমাজিক ব্যক্তিত্ব

[সম্পাদনা]

ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

বরেন্দ্র বিদ্রোহ

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. History of Ancient Bengal, Ramesh Chandra Majumdar, 1971
  2. দুর্গাচন্দ্র সান্যাল, মডেল পাবলিসিং হাউস, ISBN 81-7616-067-9বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস। পৃ. ৮।{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: একাধিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক) উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: সাংখ্যিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক)
  3. Hossain, Md. Mosharraf, Mahasthan: Anecdote to History, 2006, Preface, Dibyaprakash, 38/2 ka Bangla Bazar, Dhaka, ISBN 984 483
  4. Brochure: Mahasthan – the earliest city-site of Bangladesh, published by the Department of Archaeology, Ministry of Cultural Affairs, Government of the People’s Republic of Bangladesh, 2003
  5. Majumdar, Dr. R.C., History of Ancient Bengal, First published 1971, Reprint 2005, p. 10, Tulshi Prakashani, Kolkata, আইএসবিএন ৮১-৮৯১১৮-০১-৩.
  6. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; a নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  7. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৩৯০,২য় প্যারা. ISBN 984 461 306 5
  8. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, ৩৯০ পৃষ্ঠা, ৩য় প্যারা, ISBN 984 461 306 5
  9. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, ৩৯১ পৃষ্ঠা, ১ম প্যারা, ISBN 984 461 306 5
  10. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, ৩৯১ পৃষ্ঠা, ISBN 984 461 306 5
  11. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, ৩৯১ পৃষ্ঠা, ISBN 984 461 306 5
  12. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪০০,২য় প্যারা. ISBN 984 461 306 5
  13. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪২১,২য় প্যারা. ISBN 984 461 306 5

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]