হুসাইন আহমদ মাদানি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি
Hussain Ahmad Madani 3.jpg
মাওলানা, শাইখুল ইসলাম, শাইখুল আরব ওয়াল আজম
৫ম সদরুল মুদাররিস, দারুল উলুম দেওবন্দ
কাজের মেয়াদ
১৯২৭ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫৬
পূর্বসূরীআনোয়ার শাহ কাশ্মিরি
উত্তরসূরী
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম(১৮৭৯-১০-০৬)৬ অক্টোবর ১৮৭৯
মৃত্যু৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭(1957-12-05) (বয়স ৭৮)
সন্তান
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদারুল উলুম দেওবন্দ
ওয়েবসাইটmadani.org
ব্যক্তিগত
ধর্মইসলাম,সুন্নি
ব্যবহারশাস্ত্রহানাফি
ধর্মীয় মতবিশ্বাসমাতুরিদি[১]
আন্দোলনদেওবন্দিচিশতিয়া তরিকা
প্রধান আগ্রহহাদিস, তাফসির, ফিকহ
উল্লেখযোগ্য ধারণাসম্মিলিত জাতীয়তাবাদ
উল্লেখযোগ্য কাজ
ঊর্ধ্বতন পদ

হুসাইন আহমদ মাদানি (উর্দু: حسین احمد مدنی‎‎; ৬ অক্টোবর ১৮৭৯ — ৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি পণ্ডিত ও ওলি, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা।[২] মুহাদ্দিস হিসেবে তিনি সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন।[৩] তিনি একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক, দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি আওলাদে রাসূল তথা মুহাম্মদের ৩৬ তম বংশধর ছিলেন। তিনি মাহমুদ হাসান দেওবন্দির শিষ্য এবং দেওবন্দ আন্দোলনের একজন আকাবির বা অনুসরণীয় বড় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের ৫ম সদরুল মুদাররিস বা প্রধান অধ্যাপক এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ৩য় সভাপতি ছিলেন। তিনি অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। ইসলাম শাস্ত্রে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও অবদানের জন্য তাকে শায়খুল ইসলাম উপাধি দ্বারা সম্বোধন করা হয়। ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত করে।[৪][৫][৬][৭][৮][৯]

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

জন্ম ও বংশ[সম্পাদনা]

মাদানি ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দ/১৯ শাওয়াল ১২৯৬ হিজরীতে ভারতের উত্তরপ্রদেশের অন্তর্গত উন্নাও জেলার বাঙ্গারমৌ নামক মৌজায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ হাবিবুল্লাহ ও মাতার নাম নুরুন্নিসা।[১০] উভয়ই তৎকালীন প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব শাহ ফজলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদীর মুরিদ ছিলেন।[১১] তার পিতা আরবি ভাষার পণ্ডিত না হলেও উর্দু, ফার্সিহিন্দির পণ্ডিত ছিলেন, স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, সুফি প্রকৃতির হওয়ায় তিনি “মৌলভি” নামে পরিচিত ছিলেন। অন্যান্য পুত্রের নামের ধারা অনুসারে তার নাম রাখা হয় হুসাইন আহমদ। জন্ম সাল স্মরণ রাখার জন্য আরবি বর্ণমালার সংখ্যামান অনুযায়ী তার অপর নাম রাখা হয়েছিল “চেরাগ মুহাম্মদ”।[ক][১২] তিনি সাধারণত নিজ নাম হিসেবে হুসাইন আহমদ ব্যবহার করতেন। কখনো কখনো চেরাগ মুহাম্মদ ব্যবহারেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।[১৩]

বংশগতভাবে তিনি ছিলেন নাজীবুত তারফায়ন অর্থাৎ পিতা ও মাতা উভয়ই দিক থেকে তিনি মুহাম্মদের বংশধর।[১৪] উভয়ের পঞ্চম পূর্বপুরুষ শাহ মুদনে গিয়ে তাদের বংশধারা মিলিত হয়।[১৫] হুসাইন ইবনে আলী তার ৩৩ তম পূর্বপুরুষ ছিলেন। তার ২৭ তম পূর্বপুরুষ ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মদ মাদানি।[খ] ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে তিনি মদিনা থেকে তিরমিজে আসেন। তারই প্রপৌত্র সৈয়দ আহমদ তুখনা পিতার মৃত্যুর পর তিরমিজ থেকে লাহোরে চলে আসেন এবং তার মাধ্যমেই ভারতবর্ষে হুসাইন ইবনে আলীর বংশধারা বিস্তার লাভ করে।[১৬]

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

১৮৮৩ সালে ৪ বছর বয়সে বাড়ির মক্তবে মায়ের কাছে তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। বছরখানেক পর তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয় যেখানে তার পিতা শিক্ষকতা করতেন। ১৮৯২ পর্যন্ত স্কুলে লেখাপড়া করার পর তাকে দারুল উলুম দেওবন্দ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৮৯৮ সালে দারুল উলুম দেওবন্দে তার অধ্যয়ন সমাপ্ত হয়। তখন তার বয়স হয়েছিল ১৯ বছর। বাড়ির মক্তবে ও স্কুলে ৮ বছর আর দেওবন্দ মাদ্রাসায় ৭ বছর মোট ১৫ বছর ছিল তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ব্যাপ্তি। তবে ১৯০৮ সালে মদিনা থেকে ফিরে এক বছর মাহমুদ হাসান দেওবন্দির নিকট পুনরায় হাদিস অধ্যয়ন করেন। সে হিসেবে তার অধ্যয়নকাল ১৬ বছর।[১৭]

মায়ের কাছে তিনি কুরআনের প্রথম ৫ পারা পড়েন। তারপর পিতার উপর তার শিক্ষার দায়িত্ব অর্পিত হয়। তার পিতা এলাহদাদপুরের নিকটস্থ একটি স্কুলে চাকরি করতেন। তিনি পিতার কাছে সকালে ধর্মীয় শিক্ষা এবং ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। তৎকালে স্কুলের সর্বোচ্চ শ্রেণীকে প্রথম শ্রেণী এবং সর্বনিম্ন শ্রেণীকে অষ্টম শ্রেণী বলা হত। মাদানি অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন এবং মাতৃভাষা উর্দু, ইতিহাস, ভূগোল, বীজগণিত, পাটিগণিত ইত্যাদি শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। কিন্তু স্কুল শিক্ষা তার পছন্দ না হওয়ায় স্কুলের শিক্ষাজীবন সমাপ্তির এক বছর পূর্বে তাকে দারুল উলুম দেওবন্দে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।[১৮]

১৮৯২ সালে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন।[১৯] তখন দেওবন্দ মাদ্রাসার সদরুল মুদাররিস (প্রধান শিক্ষক) ছিলেন মাহমুদ হাসান দেওবন্দি, মুহতামিম সৈয়দ মুহাম্মদ আবেদ ও পৃষ্ঠপোষক রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি। প্রধানত মাহমুদ হাসান দেওবন্দি তার শিক্ষার কাজে তত্ত্বাবধান করতেন। তার বড় ভাই ছিদ্দিক আহমদ মাহমুদ হাসান দেওবন্দির খাদেম হওয়ার সুবাদে প্রথমদিন থেকেই তিনি দেওবন্দির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। মিজান[গ]গুলিস্তা[ঘ] থেকে তার অধ্যয়ন শুরু হয়। পাঠ উদ্বোধনের জন্য তাকে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে নেওয়া হলে সেখানে খলিল আহমদ সাহারানপুরি উপস্থিত ছিলেন এবং দেওবন্দির অনুরোধে সাহারানপুরি তার পাঠ উদ্বোধন করেন।[২০]

দেওবন্দে তার অধ্যয়নকাল ছিল সাড়ে ছয় থেকে সাত বছর। এই সময়ে তিনি দারসে নিজামির অন্তর্ভুক্ত ১৭টি বিষয়ের ৬৭টি কিতাব অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। ১১ জন শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৪টি কিতাব পড়েছেন। তন্মধ্যে ১০টি শ্রেণিকক্ষে এবং ১৪টি ব্যক্তিগতভাবে। মাহমুদ হাসান দেওবন্দির এই অতিরিক্ত যত্নের কারণে মাদানি দেওবন্দের শিক্ষাকোর্স স্বল্প সময়ে সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।[২১][ঙ]

তিনি যে বছর দেওবন্দে ভর্তি হন সেটি ছিল দেওবন্দের ২৭তম শিক্ষাবর্ষ। তখন পর্যন্ত সেখানে মাতবাখ বিভাগ (খাবারঘর) চালু করা সম্ভব হয়নি। ছাত্রদের খাওয়া-দাওয়া কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় ভিত্তিতে হত। সে অনুসারে মাদানির আহারের ব্যবস্থা হয় মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবির পুত্র হাফেজ মুহাম্মদ আহমদের গৃহে।[২২]

শিক্ষা জীবনের প্রথম দিকে মানতেক (যুক্তিবিদ্যা) ও ফলসাফা (গ্রীক দর্শন) অধ্যয়নের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে তিনি আরবি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন এবং মাকামাতে হারীরী, দিওয়ানে মুতান্নবি, সাবআ মুআল্লাকা সহ প্রভৃতি গ্রন্থ আয়ত্ত করেন। হাদিসের অধ্যয়ন শুরু হলে তিনি হাদিস নিয়েই আগ্রহী হয়ে পড়েন।[২৩]

দেওবন্দ মাদ্রাসায় সদরা কিতাবের পরীক্ষায় পরীক্ষক আব্দুল আলী তাকে মোট নাম্বার ৫০ এর মধ্যে ৭৫ নাম্বার প্রদান করেন, যা ছিল দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাসে বিরল।[২৪] শিক্ষাজীবনে উবাইদুল্লাহ সিন্ধি, ফখরুদ্দীন আহমদ মুরাদাবাদী, মানাজির আহসান গিলানি তার সহপাঠী ছিলেন।[২৫]

১৯৯৮ সালে তার শিক্ষাকোর্স সমাপ্ত হয়। ১৯১০ সালে দস্তারবন্দী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দস্তারে ফজিলত তথা পাগড়ী লাভ করেন। প্রথমে পাগড়ী দেওয়া হয় আনোয়ার শাহ কাশ্মিরিকে। তারপর পান মাদানি। সবাইকে একটি করে পাগড়ী দেওয়া হলেও মাদানিকে তিনটি পাগড়ী দেওয়া হয়।[২৬]

মদিনা গমন[সম্পাদনা]

শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর পিতামাতার সাথে তিনি মদিনা চলে যান। তখন তার বয়স ১৯। পরিবারের মধ্যে শুধুমাত্র তার পিতা হিজরতের নিয়ত করেছিলেন। মাদানিও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি আরও একবছর দেওবন্দ মাদ্রাসায় হাদিস অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিতার অনড় সিদ্ধান্তের কারণে নিজ ইচ্ছা ত্যাগ করেন।[২৭]

তিনি ১৯১৬ পর্যন্ত মদিনায় ছিলেন। মাঝখানে তিনবার ভারতে এসেছিলেন।[২৮] ১৯০০ সালে তার পীর রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির তলবের কারণে প্রথমবার ভারতে আসেন এবং দুই বছর গাঙ্গুহির সান্নিধ্যে থাকার পর ১৯০২ সালে মদিনায় চলে যান। ১৯০৮ সালে তার স্ত্রী বিয়োগের কারণে দ্বিতীয়বার ভারতে আসেন এবং তিন বছর ভারতে অবস্থান করেন। তন্মধ্যে প্রথম বছর মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেন এবং তার তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় বিবাহের কাজ সমাপ্ত করেন। দ্বিতীয় বছর দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক নিযুক্ত হন। তৃতীয় বছর দস্তারবন্দী সম্মেলনের কার্যক্রম শেষ করে ১৯১১ সালে মদিনা চলে যান। ১৯১২ সালে তৃতীয়বারের মতো ভারতে এসেছিলেন এবং চার মাস অবস্থান করেছিলেন।[২৯]

পিতার নেতৃত্বে পরিবারের ১২ সদস্যকে নিয়ে মাদানি ১৮৯৯ সালে মদিনায় পৌঁছেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি মসজিদে নববীতে অবৈতনিক শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে পাশাপাশি তিনি এবং তার ভাইয়েরা মিলে মদিনার বাবুর রহমত ও বাবুস সালামের মধ্যবর্তী স্থানে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবসা শুরু করেন।[৩০] শিক্ষকতার অবসরের তিনি নিজ দোকানে সময় দিতেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা দিয়ে বড় পরিবারের ভরণপোষণ না হওয়ায় পাশাপাশি খেজুরের ব্যবসা শুরু করেন। তাতেও সফল না হওয়ায় তিনি মদিনার সরকারি গ্রন্থাগার কুতুবখানা মাহমুদিয়া ও কুতুবখানা শায়খুল ইসলামে পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কপি নকলের কাজ শুরু করেন।[৩১]

১৯০২ সালে তিনি মদিনায় মুহাম্মদ খাজা কর্তৃক নবপ্রতিষ্ঠিত শামসিয়্যাবাগ মাদ্রাসায় মাসিক ২৫ টাকা বেতনে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। কপি নকল বাদ দিয়ে মাদ্রাসার চাকরি ও মসজিদে নববীতে বিনা বেতনে শিক্ষাদান চালিয়ে যান। মসজিদে নববীতে শিক্ষাদানের কয়েক মাসের মধ্যে চারদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু শিক্ষার্থী জড়ো হয়। এই অবস্থা দেখে মুহাম্মদ খাজা শিক্ষার্থীদের মসজিদে নববীর পরিবর্তে তৎপ্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় শিক্ষাদানের নির্দেশ দেন। মসজিদে নববীর বরকত লাভের আশায় এবং শিক্ষার্থীদের অসম্মতির কারণে মাদানি ওই নির্দেশ পালন করতে পারেন নি। খাজা তাতে অসন্তুষ্ট হলে তিনি মাদ্রাসার চাকরি ছেড়ে দেন এবং মসজিদে নববীতে বিনা বেতনে শিক্ষকতা চালিয়ে যান।[৩২] মদিনার তার এক ছাত্র আব্দুল হক মাদানি বলেন,

“সম্মানিত উস্তাদের আত্মমর্যাদাবােধ এত বেশি ছিল যে, আমার পিতা দীর্ঘ ৬ মাস পর্যন্ত মােটা অঙ্ক বেতনের আশ্বাস দিয়েও তাকে আমাদের বাসায় টিউশনির জন্য সম্মত করতে পারেনি। তিনি প্রতিবারই আমার পিতাকে উত্তর দেন যে, আব্দুল হককে মসজিদে পাঠিয়ে দিন। এখানে আমি বিনা বেতনেই পড়িয়ে দিব। অথচ সে কালে তাঁর পরিবারে অভাব-অনটন এত ছিল যে, বহু দিন তাঁকে না খেয়ে রােযা রাখতে আমি দেখেছি। তিনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন, আব্দুল হক! আমার পরিবারের অবস্থা তুমি কারাে কাছে ব্যক্ত করাে না।”

— [৩৩]

পরবর্তীতে ভোপালের নবাব সুলতান জাহান বেগম মদিনার কিছু সংখ্যক আলেমদের জন্য মাসিক বৃত্তি মঞ্জুর করেন। তন্মধ্যে মাদানি ও তার অপর দুই ভাই মাসিক ১০ টাকা করে মোট ৩০ টাকা ভাতা পেতেন। বণ্টনের দায়িত্ব ছিল মদিনার শেখ হাসান আব্দুল জাওওয়াদের উপর। জাওওয়াদ উর্দু না জানায় মাদানির উপর তার সহযোগিতার দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং এজন্য তিনি অতিরিক্ত ১৫ টাকা বেতন পেতেন। মসজিদে নববীতে শুক্রবার ও মঙ্গলবার ছুটি থাকত, এই ছুটির দিনে তিনি জাওওয়াদের কাজে সহযোগিতা করতেন। একবার বাহাওয়ালপুরের নবাব মদিনায় জিয়ারতে আসলে মাদানির জন্য বার্ষিক ১২০ টাকা ভাতা মঞ্জুর করে যান। ফলে মাদানি পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসে এবং সকলেই শিক্ষাদান ও ধর্মপালনে পূর্ণ মনোনিবেশের সুযোগ পান। মদিনাবাসীদের প্রতি ভিনদেশীয় মুসলিম সরকারগুলোর এ ধরনের ভাতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুকাল পর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বিদ্রোহী গভর্নর শরিফ হুসাইনের হাতে মদিনার কর্তৃত্ব চলে গেলে সর্বপ্রকারের ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।[৩৪]

মদিনায় আসার প্রথম বছর মাদানি-পরিবার হরমে নববীর অন্তর্গত বাবুন নিসার নিকটে একটি কাঁচা বাড়ি ভাড়া নেন। বাড়িটি ছোট হওয়ায় পরবর্তী বছর হাররাতুল আগাদাত মহল্লার একটি বড় বাড়িতে বার্ষিক ১২০ টাকা ভাড়ায় চলে যান।[৩৫] পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে এই ভাড়া দিতে অক্ষম হওয়ায় তারা নগরের বাইরে অবস্থিত শহরতলিতে চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে আলবাব আলমজীদীর নিকটে নির্মাণ অসম্পূর্ণ একটি বাড়িতে চলে যান। অর্থাভাবে বাড়িটির নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল এবং পুনরায় নির্মাণ কাজ আরম্ভ না হওয়া পর্যন্ত তারা এই বাড়িতে থাকার সুযোগ পান যার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মুহাম্মদ খাজা।[৩৬] এ সময় শহরের বাইরে মদিনার অদূরে একটি পরিত্যক্ত জমি বিক্রি করা হবে বলে জানা যায় যেটি ইসলামের নবীর হুজুরার খাস খাদেমদের জন্য ওয়াকফকৃত সম্পত্তি। এ ধরনের সম্পত্তি পরিত্যক্ত হলে স্থানীয় কাজীর অনুমোদনক্রমে লিজ নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মাদানির পিতা সেখানে প্রয়োজনানুসারে কিছু জায়গা লিজ নিয়ে রেখেছিলেন। শিক্ষকতা সংক্রান্ত কারণে মুহাম্মদ খাজা মাদানির উপর অসন্তুষ্ট হলে তাদের বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেন। এ কারণে তারা লিজ নেওয়া জায়গায় একটি মাটির বাড়ি বানানোর কাজ শুরু করে দেন। প্রায় ২২ দিন পর তাদের বাড়ি নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই তারা খাজার বাড়ি ছেড়ে দেন।

আস্তে আস্তে বাড়িটি পাকা হয়ে যায়। পরবর্তীতে সন্তানদের কেউ বাড়ি বিক্রি করে যাতে মদিনা ত্যাগ করতে না পারে সে উদ্দেশ্যে মাদানির পিতা বাড়িটি সন্তানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। এই বাড়িকে কেন্দ্র করে ৩০ সহস্রাধিক লোকের বসতি গড়ে ওঠে। শরিফ হুসাইনের বিদ্রোহের পর (১৯১৬) অরাজকতা শুরু হলে অনেকে নগরের ভিতরে চলে আসেন। সেসময় মাদানিও নিজ পরিবার নিয়ে বাবুন নিসার একটি ভাড়া বাড়িতে চলে যান।[৩৭]

তাসাউফ[সম্পাদনা]

১৯৯৮ সালে দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষা সম্পন্ন করেই তিনি তাসাউফের প্রতি মনোযোগী হন। শা'বান মাসে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে তিনি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির নিকট বায়আত গ্রহণ করেন। গাঙ্গুহি সাধারণত যাচাই ব্যতীত কাউকে মুরিদ না করলেও মাদানিকে মুরিদ হিসেবে গ্রহণ করেন কিন্তু তাকে কোন সবক দেন নি। তিনি মাদানিকে মক্কায় পৌঁছে ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কির কাছে প্রথম সবক নেওয়ার নির্দেশ দেন।[৩৮] সেমতে আড়াই মাস পরে জ্বিলকদের শেষদিকে মক্কায় পৌঁছে তিনি মুহাজিরে মক্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। মুহাজিরে মক্কি তাকে কয়েক দিন পর্যন্ত তাসাউফের শিক্ষা দেন। বিদায় বেলায় মুহাজিরে মক্কি তাকে পিঠের উপর হাত বুলিয়ে বললেন, “যাও, আমি তােমাকে মহান আল্লাহর হাতে সােপর্দ করছি।” মাদানি কথাটি শুনে কোন উত্তর করেন নি। মক্কি বললেন, “বলাে, আমি কবুল করলাম।” তখন মাদানি বললেন, “আমি কবুল করলাম।”[৩৯]

৬ মাসের মাথায় মুহাজিরে মক্কি মৃত্যুবরণ করলে পরবর্তীতে মদিনা থেকে গাঙ্গুহির কাছে পত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা অব্যাহত রাখেন। ১৯০০ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তিনি ভারতে আসার নির্দেশ পান। সে মোতাবেক পরবর্তী বছর তিনি ভারতে গাঙ্গুহির সান্নিধ্যে চলে আসেন। গাঙ্গুহির সান্নিধ্যে আড়াই মাস ব্যাপৃত থাকার পর খেলাফত প্রাপ্ত হন। তখন তার বয়স হয়েছিল ২২।[৪০][৪১]

তার বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে ফজলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদীর কাছে বায়আত করাবেন।[৪২] কিন্তু ইতিপূর্বে মুরাদাবাদীর মৃত্যু হওয়ায় মাদানি তার প্রিয় শিক্ষক মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে বায়আত হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন।[৪৩] দেওবন্দিকে এটি অভিহিত করা হলে তিনি মাদানিকে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির কাছে পাঠিয়ে দেন। গাঙ্গুহি মাহমুদ হাসান দেওবন্দিরও পীর ছিলেন।

মসজিদে নববীতে শিক্ষকতা[সম্পাদনা]

মাদানি আজীবন শিক্ষকতা করেছেন। তার শিক্ষকতার সূচনা হয় মসজিদে নববীতে।[২] দেওবন্দ থেকে বিদায়ের মুহূর্তে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি তাকে শিক্ষকতা অব্যাহত রাখার উপদেশ দেন। মদিনায় ১৮ বছর অবস্থানকালের মধ্যে মাদানি তিনবার ভারতে এসেছিলেন। সে হিসেবে মদিনায় তার শিক্ষকতাকাল ১৩ বছর ৯ মাস।

১৮৯৯ সালের মহররম মাসে কয়েকজন ভারতীয় ও আরাবিয় ছাত্র নিয়ে আরবি ব্যকরণ ও অন্যান্য প্রাথমিক পর্যায়ের কিতাব পড়ানো আরম্ভ করেন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে দোকান পরিচালনা ও কপি নকলের কাজ করার কারণে শিক্ষকতায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করে ১৯০২ সালে দ্বিতীয় বারের মতো মসজিদে নববীতে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। এ সময়ে মদিনায় শামসিয়্যাবাদ ওরফে তূতিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক পদে চাকরি নেওয়ার পর অবসর সময়ে নিজের পূর্বেকার অবৈতনিক শিক্ষকতাও চালু করেন। পরবর্তীতে তাকে শুধু মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার আদেশ দেওয়া হলে তার পক্ষে এই আদেশ মানা সম্ভব হয়নি। অবশেষে মাদ্রাসার চাকরি ছেড়ে দিয়ে মসজিদে নববীতে অবৈতনিক শিক্ষকতার কাজে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।[৪৪]

মদিনায় মালিকিশাফিঈ ফিকহের প্রচলন ছিল। আর ভারতে হানাফি ফিকহের প্রচলন ছিল। মাদানি ভারতে লেখাপড়া করার কারণে মালিকি ও শাফেঈ ফিকহের কিছু কিতাব তার অপঠিত ছিল। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি এগুলো আয়ত্তের পিছনে সময় দিতেন। তাতে তাসাউফের সবকগুলো তার পক্ষে আদায় করা সম্ভব হতো না। বিষয়টি গাঙ্গুহিকে চিঠি মারফত জানালে উত্তরে তিনি উৎসাহ দিয়ে লিখেন, “খুব মনোযোগের সহিত অধ্যাপনা অব্যাহত রাখ, তাতেই সওয়াব পাওয়া যাবে।”[৪৫]

দ্বিতীয়বারের মতো মসজিদে নববীতে শিক্ষকতা শুরু করার পর তার সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময়ে কিছু লোক তার বিরোধিতা শুরু করেন। তৎকালে ওয়াহাবি মতবাদীদের অনেকেই ঘৃণার চোখে দেখত। মাদানির বিরোধিতাকারীরা তাকে ওয়াহাবি মতবাদের প্রচারক হিসেবে প্রচার করা শুরু করে। এক পর্যায়ে বিষয়টি মদিনার গভর্নর উসমান পাশাকেও জানানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তার উপর উত্থাপিত অভিযোগ সমূহ মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং তার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। এভাবে ৭ বছর অধ্যাপনার পর তিনি আবার ভারতে যান।[৪৬]

১৯১১ সালে ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করে তৃতীয়বারের মতো মসজিদে নববীতে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। মসজিদে নববীতে অনেক ক্লাস চালু থাকলেও তার ক্লাসের ছাত্র সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হত। ছাত্রদের পাশাপাশি মদিনার ওলামা, কাজী, মুফতি, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাগণের অনেকে উপস্থিত থাকতেন।[৪৭]

শিক্ষাদানে তিনি মাহমুদ হাসান দেওবন্দির অনুসরণ করতেন। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত আব্দুল হামিদ ইবনে বাদিস ও তার সহযোগী মুহাম্মদ বশির ইব্রাহিমী হিজরত করে মদিনায় চলে আসেন এবং মাদানির ক্লাসে যোগ দেন। তিনি তাদেরকে কিছুদিন নিজের সঙ্গে রাখেন। তাদেরকে তিনি মাহমুদ হাসান দেওবন্দির রাজনৈতিক চিন্তাধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সংগ্রামের জন্য পুনরায় আলজেরিয়ায় পাঠিয়ে দেন।[৪৮]

১৯১৩ সালে ভারতে গিয়ে কয়েক মাস অবস্থান করে আবার মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯১৫ সালের শেষদিকে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মসূচিতে মদিনায় আগমন করলে মাদানি প্রত্যক্ষ জিহাদ ও রাজনীতিতে যোগ দেন।[৪৯] পরবর্তী বছর (১৯১৬) ইংরেজ সরকারের সহযোগী তুর্কি বিদ্রোহী গভর্নর শরিফ হুসাইন কর্তৃক বন্দি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি মসজিদে নববীতে হাদিসের অধ্যাপনা অব্যাহত রেখেছিলেন।

মদিনায় অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা করার কারণে তার ছাত্রদের নিয়মতান্ত্রিক কোন তালিকা পাওয়া যায় না। যে ক'জনের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে: প্রসিদ্ধ কবি আব্দুল হক মাদানি, মদিনার সরকারি উচ্চ পরিষদের সদস্য আব্দুল হাকিম আল কুর্দি, নায়েবে কাজী ও মুফতি আহমদ আল বাসাতি, পৌরসভার চেয়ারম্যান মাহমুদ আবদুল জাওওয়াদ প্রমুখ।[৪৮]

মাল্টায় কারাবরণ[সম্পাদনা]

১৯১৯ সালে মাল্টার কারাগার থেকে মুরাদাবাদ জেলার অন্তর্গত আমরুহার মাওলানা জাহিদ হাসানের কাছে হুসাইন আহমদ মাদানির লিখিত একটি চিঠি ও চিঠির খাম। নীচে তার একটি স্বাক্ষর।

১৯১৫ সালে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি মদিনায় আসলে মাদানি তার সাথে আন্দোলনে যোগ দেন। তখন তার বয়স ৩৬। এরপর এক বছরের মাথায় মদিনায় তার প্রথম কারাবরণ শুরু হয়। ১৯১৬ সালের সফর মাসে তিনি দেওবন্দির সাথে মাল্টায় নির্বাসিত হন। ৩ বছর ৭ মাস মাল্টায় নির্বাসনে থাকার পর ১৯২০ সালের রোজার মাসে মুক্তি পান।[৫০]

মদিনায় তিনি মাহমুদ হাসান দেওবন্দির বিপ্লবের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। প্রথমদিকে গভর্নর বসরি পাশা কতিপয় মিথ্যা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেওবন্দিকে সন্দেহের চোখে দেখত এবং কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করত। মাদানির প্রচেষ্টায় এই সমস্যার সমাধান হয় এবং কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তুর্কি সরকারের যুদ্ধমন্ত্রী আনোয়ার পাশা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সামরিক সর্বাধিনায়ক জামাল পাশা মদিনায় আগমন করলে তাদের সাথে তিনিই মাহমুদ হাসান দেওবন্দির একান্তে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি উপলক্ষে মদিনায় আয়ােজিত মাশায়েখ সম্মেলনে তিনি মুসলিম বিশ্বের সমকালীন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জিহাদের গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি দেওবন্দির মক্কাতাইফ সফরে সঙ্গে ছিলেন। মক্কার বিদ্রোহী গভর্ণর শরিফ হুসাইনের বিদ্রোহের পর দেওবন্দি তাইফে অবরুদ্ধ হলে তারই প্রচেষ্টায় বেরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। তারপর ইংরেজদের সহযোগী শরিফ কর্তৃক দেওবন্দিকে গ্রেফতারের আদেশ জারী করা হলে তিনিই তাকে আত্মগোপনের ব্যবস্থা করে দেন। পুলিশ দেওবন্দিকে খুঁজে না পেয়ে মাদানিকে গ্রেফতার করে ও জেলে প্রেরণ করে।[৫১] এরই মধ্যে দেওবন্দিকেও গ্রেফতার করে জেদ্দায় প্রেরণ করা হয়। মাদানির উপর তখন পর্যন্ত ইংরেজ সরকারের বড় ধরনের কোন অভিযােগ না থাকায় মাদানি মুক্তি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দেওবন্দির বার্ধক্য ও কারাজীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা চিন্তা করে তিনি মদিনায় ফিরে যান নি। তিনি কৌশলে কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে দেওবন্দির সাথে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন।[৫২]

১৯১৬ সালের সফর মাসে তাদেরকে মিশরের রাজধানী কায়রো প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে নীলনদের অপর তীরে অবস্থিত জীযার প্রাচীন জেলখানা আল মাকালুল আসওয়াদের সামরিক আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচার করা হয়।[৫৩] আদালতে মাদানির জিজ্ঞাসাবাদ ২ দিন অব্যাহত ছিল। ইংরেজ গােয়েন্দা বিভাগ থেকে প্রেরিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ট্রাইবুনাল কর্মকর্তাদের ইচ্ছা ছিল তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদানের। এ লক্ষ্যে কারাগারে পূর্বেই তাদেরকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের সেলে পৃথক পৃথক ভাবে রাখা হয়। তাছাড়া উভয়ের মধ্যে কোন প্রকারের দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা-বার্তার উপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।[৫৩] এ প্রসঙ্গে মাদানি বলেন, “মাল্টার জীবনে এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে কষ্টকর মুহূর্ত। কারণ পারস্পরিক সাক্ষাৎ বন্ধ থাকায় কার উপর কখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে তা জানারও সুযােগ ছিল না।” এক মাস পর সরকারের মনােভাব পরিবর্তিত হয়। গােয়েন্দা প্রতিবেদনের সমর্থনে পর্যাপ্ত প্রমাণ ও স্বীকারােক্তি উদ্ধারে ব্যর্থ হলে আদালত তাদেরকে দ্বীপান্তরের রায় দেয়। ১৯১৭ সালের রবিউস সানি মাসে তারা মাল্টা দ্বীপে প্রেরিত হন।[৫৪] সেখানে তখন বিভিন্ন দেশীয় প্রায় ৩০০০ যুদ্ধবন্দী বিদ্যমান ছিল।

মাদানি আজীবন রাজনীতিতে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির নীতি অনুসরণ করেছেন এবং ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। ১৯০৯ সালে প্রথমবার তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন যখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে হাদিস অধ্যয়ন করছিলেন। ১৯১৫ সালের আগ পর্যন্ত তিনি দেওবন্দির ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারেননি কারণ তা গোপনে পরিচালিত হয়েছিল। ১৯১৫ সালের মুহররম মাসে দেওবন্দি মদিনায় পৌঁছে তাকে ও খলিল আহমদ সাহারানপুরিকে বিপ্লবের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করলে উভয়ই তাতে সংযুক্ত হন।[৫৫]

মদিনায় এই বৈঠকের পর মাদানির জীবনধারায় পরিবর্তন আসে। তিনি মদিনায় হাদিস অধ্যাপনার বদলে ইংরেজ বিরোধী জিহাদকে জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য স্থির করেন। মাহমুদ হাসান দেওবন্দির সাথে স্বেচ্ছায় কারাবরণের পর মুক্তি পেলে তিনি মদিনায় না গিয়ে দেওবন্দির সাথে ভারতে চলে আসেন। এর প্রায় ছয় মাস পর মাহমুদ হাসান দেওবন্দি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে মাদানি তার উত্তরসূরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।[৫৬]

বন্দী অবস্থায় তিনি ইংরেজ সরকারের দেওয়া শাস্তির সম্মুখীন হলেও নিজ আদর্শ থেকে সরে যান নি। মিশরের আল আসওয়াদ জেলখানায় তাকে ও তার সহবন্দীদের প্রত্যেককেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকতে দেওয়া হয়েছিল যেখানে হাত-পা প্রসারিত করে শয়নের সুযােগ ছিল না। যাবতীয় কাজ একই স্থানে সম্পাদন করতে হত। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ ঘণ্টার জন্য একজনের পরে অপরজনকে পালাক্রমে বের করা হত যেন তাদের পারস্পরিক সাক্ষাতের কোন সুযােগ না ঘটে। মাদানি ঐ দিনগুলােতে সারাক্ষণ নামায, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও মুরাকাবায় মশগুল থাকেন। মাল্টায় পৌঁছলে তাদের অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়। তখন একজন অন্যজনের সাথে সাক্ষাতের সুযােগ পান। তবে তা একদিন পূর্বেই কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে মঞ্জুর করে নিতে হত। বাইরে যােগাযােগের জন্য সপ্তাহে ২ দিন চিঠিপত্র আদান-প্রদানের সুযােগ দেওয়া হয়। জেল কর্তৃপক্ষই কাগজ ও খাম সরবরাহ করত। পত্রে অতিরিক্ত কথা লেখার জন্য নিজস্ব কাগজ ব্যবহারের অনুমতি ছিল না।[৫৭]

তিনি মাল্টা গমনকালে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিজ স্ত্রী, ১ কন্যা, ২ পুত্র ও পিতাকে রেখে যান । মা ইতােপূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন। বন্দী জীবন শেষ করে ফিরে এসে পরিবারে তাদের কাউকে জীবিত পাননি।[৫৮]

বন্দী জীবনে তিনি মাহমুদ হাসান দেওবন্দির দীর্ঘ সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তার সেবা করতেন।[৫৯] এর মাধ্যমে তিনি দেওবন্দির চিন্তাধারা ও রাজনীতি গভীরভাবে আত্মস্থ করে নেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নতি করেন। বন্দী শিবিরে সহস্রাধিক রাজদ্রোহীদের মধ্যে অর্ধেক ছিল জার্মান। অবশিষ্টরা ছিল অস্ট্রেলিয়ান, বুলগেরীয়, মিসরীয়, সিরীয় ও তুর্কী। মাল্টায় বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অবস্থান করায় তিনি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও রাজনীতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা লাভ করেন। শৈশবে তিনি কুরআন হেফজ করার সুযােগ পান নি। মাল্টায় প্রথম বছরেই তিনি কুরআন হেফজ করেন এবং রমজানে মেহরাবে শােনান। এখানে তুর্কী বন্দীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। তিনি তাদের ভাষা আয়ত্ত করেন।[৬০]

মাল্টায় মুসলিম কয়েদীদেরকে যন্ত্রের সাহায্যে বধকৃত জন্তুর গােশত খেতে দেওয়া হত। তিনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং অকাট্য দলীলের দ্বারা এ পদ্ধতির যবাহকে ইসলামের দৃষ্টিতে অশুদ্ধ প্রমাণ করেন। তার প্রবল আপত্তির কারণে কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। মুসলিম কয়েদীদের কেউ মারা গেলে ইংরেজদের সরকারী নিয়মেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করা হত। এখানেও তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে জেলের ভিতর আন্দোলন গড়ে তােলেন। কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সেই দাবীও মেনে নেয়। ফলে তার সহকর্মী হাকিম নসরত হুসাইন মাল্টা মৃত্যুবরণ করলে ইসলামি পদ্ধতিতে তার গােসল, কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল। তার উদ্যোগের দ্বারা মাল্টায় নামাযের সময় আযান ও জামাআতের ব্যবস্থা হয়। তারপর নামায শেষে যিকির, তালীম ও তালকীনের কাজও চলে। এভাবে বন্দীখানা একটি ধর্ম বিদ্যালয় ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।[৬১]

মাহমুদ হাসান দেওবন্দি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বহু বছর পূর্বে রেশমি রুমাল আন্দোলনের গােপন তৎপরতা শুরু করেন। বৃটিশ কর্তৃপক্ষ এ আন্দোলনের সন্ধান পেতে বিলম্ব হয়। ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে বৃটিশ জোটভুক্ত মিত্রশক্তি এবং জার্মান জোটভুক্ত অক্ষশক্তির মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ বাধে। ঐ বছর নভেম্বরে তুরস্ক জার্মানির পক্ষে যােগ দেয় এবং যুদ্ধ ইউরােপ থেকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।[৬২] ১৯১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে মিত্রশক্তির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ ভারতীয়দের কাছে সাহায্য চাই। কিন্তু এরপূর্বেই মাহমুদ হাসান দেওবন্দির নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্ব প্রায় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। ঐ বছর শেষ দিকে গােয়েন্দা বিভাগ তার এই গােপন আন্দোলনের সন্ধান পায়। গােয়েন্দা বিভাগ রেশমি রুমালের সূত্র ধরে যাবতীয় তথ্য উদ্ধার করে। এ আন্দোলনের দ্বারা কোন বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বৃটিশের নির্দেশে মদিনা থেকে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি ও হুসাইন আহমদ মাদানি সহ ৫ নেতাকে গ্রেফতার করা হয় এবং মাল্টায় নির্বাসিত করা হয়। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। তখন অনেক রাজবন্দীকে ছেড়ে দেওয়া হলেও মাল্টার বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়নি। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে হিন্দু-মুসলিমের এক যৌথ জনসভায় পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের নির্দেশে জনসাধারণের উপর এলােপাতাড়ি গুলি চালিয়া গণহত্যা করা হয়েছিল। তাতে অনেক লােক হতাহত হয়।[৬৩] রাওলাট আইনের বলে ভারতের অন্যান্য স্থানেও অনুরূপ ঘটনা সংগঠিত হয়। ফলে সারা উপমহাদেশে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এদিকে খেলাফত আন্দোলনের কারণে উপমহাদেশে বৃটিশের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ক্রমে বৃদ্ধি পায়। ১৯১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর জমিয়তে উলামা অমৃতসর অধিবেশনে বৃটিশের বিরুদ্ধে অসহযােগের প্রস্তাব পাস করে। ঐ বছর খেলাফত কমিটির আমন্ত্রণ ক্রমে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও খেলাফতে যােগ দেন। এভাবে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, খেলাফত কমিটি ও জাতীয় কংগ্রেস মিলিতভাবে প্রতিবাদ শুরু করলে রাজনৈতিক জটিলতা বৃদ্ধি পায় এবং এক পর্যায়ে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ দেশ ও বিদেশে অবস্থিত ভারতীয় সকল রাজবন্দীকে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এ সময় দেওবন্দি ও মাদানি সহ মাল্টার বন্দীগণ মুক্তির পরওয়ানা লাভ করেন। ফলে ১৯২০ সালের ৮ জুন তাদেরকে মাল্টা থেকে প্রিজন জাহাজে করে বােম্বাই বন্দরে এনে বেড়ী খুলে দিয়ে মুক্তি প্রদান করা হয়।[৬৪]

খেলাফত কমিটির মাওলানা শওকত আলি সহ জমিয়তে উলামার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলভী, দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম হাফেজ মুহাম্মদ আহমদ প্রমুখ সহ বহু লােক বন্দরে তাদের স্বাগত জানান। তখন স্থানীয় মিনার মসজিদ মাঠে খেলাফত কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ নিজেদের বাড়ী না গিয়ে খেলাফত অধিবেশনে যােগ দেন। বােম্বাইয়ে তাদের অবস্থান কাল ছিল ২ দিন। এ সময়ে আবদুল বারী ফিরিঙ্গীমহল্লী ও মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও তাদের সাক্ষাতে মিলিত হন।[৬৫]

ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তন[সম্পাদনা]

মাল্টার কারাগার থেকে মুক্তির আদেশ পাওয়ার পর তিনি নতুনভাবে নিজের অবস্থানের ক্ষেত্র নির্ধারণের চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ইতিপূর্বে তিনি নিজ দেশ ত্যাগ করে ২১ বছর বয়সে মদিনায় বসবাস শুরু করেছিলেন। সেখানে বসবাস করার কিছুটা ব্যবস্থা থাকলেও কারাগারে আসার পর তা লুণ্ঠিত হয়ে যায় এবং তার পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান সবাই মৃত্যুবরণ করেছিল।[৬৫] তখন তার বয়স হয়েছিল ৪১। তিনি জীবনের অবশিষ্টাংশ মসজিদে নববীতে হাদিসচর্চার কাজে অতিবাহিত করার মনঃস্থ করলেন। সে মোতাবেক তিনি মুম্বাইয়ে আসার পর স্থায়ীভাবে মদিনায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।[৬৬] কিন্তু তার এই ইচ্ছা মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে ব্যক্ত করলে দেওবন্দি তাতে অনুমতি দেন নি।[৬৬]

ভারতে প্রত্যাবর্তনকালে সুয়েজ অতিক্রম করার সময় দেওবন্দির কাছে এ মনোভাব ব্যক্ত করলে উত্তরে দেওবন্দি বলেন, “আমি বুখারী শরীফের ‘তারাজিমুল আবওয়াব’ এর ভাষ্য রচনা করতে ইচ্ছুক। এ কাজ আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তােমাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে। তখন মাদানি বললেন, “এক শর্তে আমি ভাষ্য রচনার সমাপ্তি পর্যন্ত দেওবন্দে অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট কাজে আপনার সহযােগিতা করতে প্রস্তুত আছি।” দেওবন্দি বললেন, “শর্তটি কি? মাদানি উত্তরে বললেন, “শর্তটি হল, যে সময়টুকু আপনি এ কাজের জন্য নির্ধারণ করবেন সে সময়ে যত বড় ব্যক্তিই আপনার নিকট উপস্থিত হােক না কেন তার জন্য সেখান থেকে সময় ব্যয় করা যাবে না।” দেওবন্দি শর্তটি মেনে নিয়ে তারও একটি শর্ত আছে বলে জানান। মাদানি শর্তটি জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন, “পরে বলব”।[৬৬] দেওবন্দি ঐ শর্তটির কথা পরে বলেন নি। বলে থাকলেও মাদানি কোথাও তা উল্লেখ করেন নি।

তিনি দেওবন্দির সঙ্গে তারাজিমের কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মুম্বাই পৌছার পর তিনি দেখলেন ভারতে খেলাফত আন্দোলনের তােড়জোর চলছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেওবন্দিকে ঘিরে রেখেছেন এবং দেওবন্দিও স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজকর্মের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছেন। এমতাবস্থায় তারাজিমের কাজ শীঘ্র শুরু করা আদৌ সম্ভব হবে না অনুমান করে তিনি দেওবন্দিকে আবারাে মদিনার চলে যাওয়ার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন। উত্তরে দেওবন্দি শরিফ সরকারের আমলে কোনোক্রমেই তার মদিনায় ফিরে যাওয়া উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেন।[৬৭]

দেওবন্দে পৌছার পর মাহমুদ হাসান দেওবন্দির পূর্ণ সময় ও পূর্ণ মনােযােগ স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে নিবেদিত দেখে তিনিও নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।[৬৮]

ভারতে আসার পর মাহমুদ হাসান দেওবন্দি রাজনীতিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। তখন মাদানি তার অন্যতম সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে আমরুহা মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ জাহিদ হাসান মাদানিকে তার মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের অনুরোধ করেন। দেওবন্দি অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাদানিকে শিক্ষকতা করার অনুমতি প্রদান করেন।[৬৯] শিক্ষকতা শুরুর পর মাদানি তৃতীয় বিবাহের কাজ সম্পন্ন করেন। ইতিপূর্বে তার দুই স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেছিল। শিক্ষকতা শুরুর ২ মাসের মাথায় দেওবন্দি মাদানিকে তার নিকট চলে আসার নির্দেশ দেন। সংবাদ পেয়ে মাদানি তার সাথে দেখা করেন এবং আমরুহা মাদ্রাসায় তার পদে বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য ১ মাস সময় নিয়ে যান। ঐ সময় মাহমুদ হাসান দেওবন্দি তাকে নিয়ে পুরো ভারত সফর করার মনঃস্থ করেন। এরই মধ্যে দেওবন্দি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার উদ্বোধনের জন্য আলিগড়ে আগমন করেন এবং মাদানিকে তার সাথে আলীগড় সম্মেলনে মিলিত হওয়ার আদেশ দেন।[৬৯]

এ সম্মেলনের পর দেওবন্দি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে চিকিৎসা করার জন্য দিল্লি নেওয়া হলে মাদানিও তার সাথে দিল্লিতে যান। তখন দিল্লিতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ২য় বার্ষিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। অসুস্থতা নিয়ে দেওবন্দি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন এবং জাতির উদ্দেশ্যে সর্বশেষ বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করার নির্দেশ দেন।[৭০]

ঐদিকে খেলাফত আন্দোলনের কলকাতা শাখার সভাপতি আবুল কালাম আজাদও স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করার লক্ষ্যে শহরের নাখোদা মসজিদে একটি জাতীয় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। আজাদ মাহমুদ হাসান দেওবন্দিকে সেই মাদ্রাসার প্রধান হওয়ার অনুরোধ করেন। দেওবন্দি বার্ধক্যে উপনীত হওয়ায় সে অনুরোধ পালন করতে পারেন নি।[৭১] অনেক যাচাই বাছাইয়ের পর মাহমুদ হাসান দেওবন্দি মাদানিকে সেই পদে যোগদানের নির্দেশ দেন। বিদায়ের সময় দেওবন্দি মাদানির মাথার উপর হাত রেখে বলেন, “যাও, আমি তোমাকে মহান আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিলাম”।[৭২][৭৩]

মাদানি কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করলে পথিমধ্যে আমরুহায় যাত্রা বিরতি করতে বাধ্য হন। সেখানে শিয়া-সুন্নি বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছিল। মুহাম্মদ আলি জওহরের মত জনপ্রিয় নেতাও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন নি। ফলে খলিল আহমদ সাহারানপুরির অনুরোধে তিনি সেখানে একদিন যাত্রা বিরতি করেন।[৭৩] তিনি সেখানে শিয়া-সুন্নি প্রসঙ্গে না গিয়ে সবাইকে ব্রিটিশদের অত্যাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং দেশ স্বাধীন না হলে ধর্ম টিকবে না বলে বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পরদিন কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে পথিমধ্যে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির মৃত্যু সংবাদ পান। ফলে কলকাতা না গিয়ে তিনি দেওবন্দে চলে যান।[৭৪]

দেওবন্দির মৃত্যুর পর দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ তাকে কলকাতা না গিয়ে দেওবন্দে থাকার পরামর্শ দেন, দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষকতার জন্যও তার প্রয়োজন ছিল। তিনি দেওবন্দির জীবদ্দশায় তার নির্দেশকে অলঙ্ঘনীয় মনে করতেন। তাই সবার পরামর্শ গ্রহণ না করে কলকাতায় চলে যান এবং মাহমুদ হাসান দেওবন্দির মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প করেন।[৭৫]

দেওবন্দির মৃত্যুর পর মাদানি তার স্থলাভিষিক্ত হন। দেওবন্দির পরিবার, ছাত্র-শিষ্য ও ভক্তরা সবাই একবাক্যে তাকে “জানাশীনে শায়খুল হিন্দ” উপাধিতে ভূষিত করে।[৭৬] পত্র-পত্রিকায় এই তার নামের পূর্বে এই শব্দটার অবশ্যই উল্লেখ থাকত।[৭৭]

কলকাতায় অধ্যাপনা ও রাজনৈতিক কার্যক্রম[সম্পাদনা]

১৯২০ সালের ডিসেম্বরে মাদানি কলকাতায় পৌছেন। এখানে আবুল কালাম আজাদমোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর উপস্থিতিতে নতুন মাদ্রাসার ভিত্তি স্থাপিত হয়।[৭৮] তিনি এই মাদ্রাসায় হাদিস, তাফসীর ও ইসলামি শিক্ষার অধ্যাপনা শুরু করেন। এখান থেকেই তার পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। তিনি খেলাফত আন্দোলনভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভায় প্রধান অতিথি কিংবা সভাপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করতেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগদান করেন।[৭৯] এই ব্যপারে তিনি বলেন,

আমি মাল্টা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কংগ্রেসের সদস্যপদ গ্রহণ করি এবং স্বাধীনতার কাজে নিজেকে জড়িত রেখে সর্বদা দেশবাসীর জেল-জুলুমের কষ্টও বরণ করতে থাকি।

— [৭৯]

এই সময়ে তিনি রাজনীতিতে প্রথম সারির নেতৃত্বে চলে আসেন। মদিনায় অবস্থানরত তার দুই ভাই তাকে মদিনায় চলে আসার অনুরোধ করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভারতেই থেকে যান। কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি সিলেটের মৌলভীবাজারে একই সময়ে অনুষ্ঠিত জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ ও খেলাফত অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।[৮০] ১৯২১ সালের ২০-২১ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিউহারায় খেলাফত আন্দোলন ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের একইস্থানে উভয়ের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এবং তৎকালীন ভারতে ইংরেজদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের অবস্থা উপস্থাপন করেন।[৮১] একই বছর ২৫ মার্চে রংপুরের মহিমাগঞ্জে “আঞ্জুমানে উলামায়ে বাঙ্গাল” কর্তৃক আয়োজিত মহাসম্মেলনে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেমসমাজের কর্তব্যের বিবরণ দেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। তিনি তৎকালীন অবস্থায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য করেন।[৮২]

১৯২১ সালের ৮-৯ জুলাই মুহাম্মদ আলি জওহরের নেতৃত্বে করাচিতে অনুষ্ঠিত “অল ইন্ডিয়া খেলাফত কনফারেন্সে” তিনি ভারতবর্ষকে স্বাধীন ও শৃঙ্খলমুক্ত করার প্রয়োজনীতা ব্যাখ্যা করেন।[৮৩] এই সম্মেলনে তিনি ইংরেজ সরকারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করা হারাম ঘোষণা করেন। পরবর্তী নেতারা তাদের বক্তব্যে এই ফতোয়ার উপর সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দেয়।[৮৪] পরবর্তীতে এটি আরও কয়েকজন বড় আলেমের স্বাক্ষর সহ ফতোয়া আকারে মুদ্রিত হলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তার এই ফতোয়াকে বৃটিশ সরকার উস্কানিমূলক ও সহিংস প্রস্তাব আখ্যা দিয়ে তা বাজেয়াপ্ত করে এবং ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।[৮৩]

সম্মেলনের আড়াই মাস পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে আসে, তখন মাদানি দেওবন্দে অবস্থান করছিলেন। দিনভর পুলিশ ও সাধারণ জনতার সংঘর্ষ চলার পর সন্ধ্যার দিকে তিনি স্বেচ্ছায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।[৮৫] করাচির ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট “খালেকদীনা” হলে অভিযুক্তদের উপস্থিত করে জেরা করা হয়। মাদানিকে জেরা করা হলে তিনি লিখিত বক্তব্যে এর জবাব দিবেন বলে জানান। পরবর্তীতে তার ১৬ পৃষ্ঠার এই বক্তব্যটি “বেনজীর পহেলা বয়ান” শিরোনাম প্রকাশিত হয়। এই বক্তব্যে তিনি কুরআনের ৯টি আয়াত এবং ৩৪টি সহিহ হাদিস সহ কালাম শাস্ত্রের গ্রন্থগুলির উদ্ধৃতি দেন।[৮৬]

তিনি এই বক্তব্যে তার দুটি পরিচয়: মুসলমান ও আলেম তুলে ধরেন বলেন, “প্রথমত আমি মুসলমান হিসেবে কুরআন হাদিসের কথা আমার মানতে হবে। দ্বিতীয়ত আলেম হিসেবে কুরআনের হক কথা মানুষদের জানাতে হবে”। এরপর তিনি তার ফতোয়ার পক্ষে এবং বৃটিশের দুঃশাসন নিয়ে কথা বলেন। সর্বশেষে ইসলামের জন্য তিনি সর্বপ্রথম শহীদ হবেন বলে উল্লেখ করেন।[৮৭]

তার এই বক্তব্যে “খালেকদীনা” হলে মারহাবা, মারহাবা ধ্বনি উচ্চারিত হয় এবং মুহাম্মদ আলি জওহর সম্মুখ অগ্রসর হয়ে তার পদ চুম্বন করে।[৮৮] জবানবন্দির পর মামলাটি নিম্ন কোর্ট থেকে স্থানান্তর করে সেশন কোর্ট জুডিশিয়াল কমিশনারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এখানেও তিনি আরো বিস্তারিতভাবে পূর্বের বক্তব্য তুলে ধরেন। যা “দেলীরানা ওয়া শুজাআনা দুসরা বয়ান ” নামক পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। তার এই বক্তব্য আদালতে উপস্থাপন করা হলে তাকে ২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।[৮৭]

মাল্টা থেকে মুক্তির ১৫ মাস পর তার আবার কারাবরণ শুরু হয়। তিনি পূর্বের ন্যায় জেলেও বিভিন্ন অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে আপত্তি জানান। যেমন: শুধু হাটু পর্যন্ত পায়জামা পড়তে দেয়া, তল্লাশীকালে উলঙ্গ করে ফেলা, উচ্চ আওয়াজে আজান দিতে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। তার এই প্রতিবাদের কারণে তাকে অতিরিক্ত শাস্তি প্রদান করা হত। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এই অতিরিক্ত শাস্তির বিরুদ্ধে "ইয়াং ইন্ডিয়া" পত্রিকায় প্রতিবাদ জানান, ফলে অতিরিক্ত শাস্তি মওকুফ করা হয় এবং দাবিসমূহ মেনে নেয়া হয়।[৮৯] তিনি বন্দি অবস্থাতেও সেখানে বিভিন্ন ইসলামি ও আধ্যাত্মিক সাধনা অব্যহত রাখেন। জেলখানায় মুহাম্মদ আলি জওহর তার কাছে তাফসীর অধ্যয়ন করেন।[৯০]

দুই বছর পর তিনি ১৯২৩ সালের অক্টোবর মাসে মুক্তিলাভ করেন। তার জন্য বিভিন্ন জায়গায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হলেও তিনি গোপনে বাড়িতে চলে যান। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “আমাদের কিসের আনন্দ মিছিল? আমরা কি ইংরেজকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছি?”

তার মুক্তির আগের বছর ১৯২২ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের উসমানীয় খিলাফতের খলিফা ৬ষ্ঠ মুহাম্মদকে পদচ্যুত করেছিলেন। তার আহ্বানকৃত আন্দোলনটিও প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছিল। তিনি মুক্তির পর আন্দোলনটিতে পুনরায় জনসাধারন এবং আলেমগণকে উৎসাহিত করতে থাকেন। এক সময় চৌরী-চৌরা ঘটনায় রাগান্বিত হয়ে জনতা থানায় অগ্নিসংযোগ করে, যার ফলে ১২জন পুলিশ অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন। এই ঘটনার কারণে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু মাদানি তার আন্দোলন অব্যহত রাখেন।

সিলেটে আগমণ[সম্পাদনা]

১৯২৩ সালে মুক্তির পর তার জন্য কর্মসংস্থান আবশ্যক হয়ে পড়ে। ইতিপূর্বে কলকাতা মাদ্রাসায় চাকরি করলেও দীর্ঘ সময় কারাবরণ করায় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার আবাসনেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং সাথে আন্দোলন থেকে বিরত থাকার শর্তও প্রদান করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে তৎকালীন ৪০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে অধ্যাপনার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরকম আরেকটি প্রস্তাব আসে মিশর সরকারের পক্ষ থেকে যেখানে তাকে মাসিক ১ হাজার টাকায় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শায়খুল হাদিস পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

সিউহারার কাজী জহুরুল ইসলাম তার দারিদ্র্য দেখে তৎকালীন হায়দ্রাবাদের নিযাম সরকারের সাথে যোগাযোগ করে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ভাতার ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি উদ্যােগ নেন। তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন আলেম, কবি-সাহিত্যিক নিযাম সরকার কর্তৃক ভাতাপ্রাপ্ত ছিলেন। তবে মাদানি এই ভাতাকে "লজ্জাজনক" মন্তব্য করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

সিলেটে অবস্থিত তার অনুসারিগণ তার অধ্যাপনায় মুগ্ধ হয়ে তাকে সিলেটে আগমনের প্রস্তাব দেন যেন সেখানকার ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন করতে পারেন। কেননা তখন উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা বা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হত। তাই তারা মাদানিকে লিখেছিলেন,

সুবা আসাম ও বঙ্গদেশে তিন কোটি মুসলমান বসবাস করে। কিন্তু এখানে মুসলমানদের শিক্ষাগত অবস্থা খুব নিম্নমানের। বিশেষতঃ ধর্মীয় ও ইলমে হাদিসের শিক্ষাব্যবস্থা খুবই দুর্বল। তাই আপনাকে একবার এখানে এসে অবস্থান করা এবং সিহাহ সিত্তারপাঠদান করা আবশ্যক। যার মাধ্যমে আমরা হাদিস অধ্যয়ন করতে পারব।

অন্য জায়গা থেকে তার কাছে শিক্ষকতার প্রস্তাব আসলেও সিলেটিদের পীড়াপীড়ির কারণে তিনি ২ বছরের জন্য সিলেটে আগমন করেন।

১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সিলেটে আগমন করেন এবং "খেলাফত বিল্ডিং মাদ্রাসায়" শিক্ষকতা শুরু করেন। দৈনিক পাঁচ ঘণ্টার ক্লাসে তিনি শারহু নুখবাতিল ফিকার, আল-ফাওযুল কাবীর, জামি তিরমিজিসিহাহ সিত্তার প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠদান করতেন। তিনি এখানে তাসাউফের কাজও চালিয়ে যান। তিনি ছোটোখাটো সমাবেশে বক্তৃতাও দিতেন। তার প্রত্যাবর্তনকালে তার অনুসারীরা মর্মাহত হন। মাদানি তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদানতঃ এই প্রতি রমজান মাসে তিনি সিলেটে আগমনের অঙ্গীকার করেন এবং ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত তা পালন করেন।

১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ভারতে চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু-মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা আত্মদ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে, ফলে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ঐক্য প্রায় ভেঙে গিয়েছিল। অসহযোগ আন্দোলনকারী প্রায় ২০ হাজার বন্দিদের মাঝ থেকে কতিপয় বন্দিদেরকে বিনাশর্তে মুক্তি দেয়া হলে তারা রাজপুতনার সদ্য ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হিন্দুদেরকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে থাকে, ফলে মুসলমানদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম রক্ষার্থে মুসলমানরা দিল্লিতে 'তাবলীগ' ও পাঞ্জাবে 'তানযিম' নামে দু'টি সংগঠন গড়ে তোলে। তবে কতিপয় খেলাফত ও কংগ্রেসপন্থীগণ ধর্মীয় বৈষম্যরোধে কোন সংগঠনেই যোগদান করেন নি। মাদানি মুক্তিলাভের পর এই ধর্মীয় বৈষম্যকে স্বাধীনতা আন্দোলনরোধে "ইংরেজদের ষড়যন্ত্র" বলে দাবি করেন। তখন বাদশাহ সৌদের নামে চলমান সমালোচনার ব্যাপারে তিনি বলেন, যেহেতু তার কুফুরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি, সেহেতু তাকে কাফের জ্ঞান করা অনুচিত এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো শরিয়তবিরোধী আইন জারি না করেন, ততক্ষণ তার অনুসরন করা আরবদের উপর আবশ্যক।

তিনি সিলেট অবস্থানকালে খুব কর্মব্যস্ত থাকতেন। ১৯২৮ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ কর্তৃপক্ষের জরুরী নির্দেশনার কারণে সিলেট থেকে দেওবন্দে গমন করেন এবং সেখানে "সদরুল মুদাররিস" (প্রধান শিক্ষক) পদে যোগদান করেন।

দেওবন্দ যাত্রা[সম্পাদনা]

১৯২৮ সালে মাদানি যখন দারুল উলুম দেওবন্দে আসেন, তখন মাদ্রাসার অভ্যন্তরীন কিছু মতানৈক্য চলছিল। যার মূল বিষয়টি ছিল, আনোয়ার শাহ কাশ্মিরির প্রশাসনিক বিষয়াদিতে মতামত প্রদানের অধিকার নিয়ে। এই মতানৈক্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলে এক পর্যায়ে কাশ্মিরি অনুসারীদের নিয়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করেন। পরবর্তিতে তিনি সব দাবি মেনে নেয়ার শর্তে মাদ্রাসায় প্রত্যাবর্তন করলেও তার অনুসারীদের অনুরোধে তিনি পুনরায় মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। এমতাবস্থায় মাদানি বাধ্যতাপূর্বক মজলিশে শূরার ১৯টি শর্তে "সদরুল মুদাররিসিন" পদ গ্রহণ করেন। যেহেতু আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র ছিলেন, সেহেতু এই মতানৈক্যের সূত্র ধরে এই ধারনার জন্ম নেয় যে, দারুল উলুম দেওবন্দ খেলাফত আন্দোলন-বিরোধী মনোভাবধারী। খেলাফত আন্দোলন ঘটনা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত শুরু করলে মাদানি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তিতে এই সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, মাদ্রাসার অবস্থা স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। তারীখে দারুল উলুম দেওবন্দ গ্রন্থে বলা হয়েছে, মাদানি "সদরুল মুদাররিস"-এর দায়িত্ব পাবার পর মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৩৪৬ থেকে ১৩৭৭ হিজরি পর্যন্ত আনুমানিক ৩২ বছর যাবত এই দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বাধীন অবস্থায় হাফেজ মুহাম্মদ আহমদহাবিবুর রহমান উসমানি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে মুহতামিম নিযুক্ত হন কারী মুহাম্মদ তৈয়ব। তিনি তার কাছেও পূর্বের ১৯টি শর্ত মঞ্জুর করে নেন।

জিহাদ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম[সম্পাদনা]

১৮০৩ সালে সূচিত আলেমদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নীতি রেশমি রুমাল আন্দোলন পর্যন্ত ছিল সশস্ত্র সম্মূখ যুদ্ধ নীতি। তবে মাহমুদ হাসান দেওবন্দি মাল্টা থেকে মুক্তির পর এই নীতির পরিবর্তন ঘটে। তিনি প্রস্তাব দেন যে, সরকারকে যদি জনগণের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা প্রদান করা না হয়, তবে সরকার স্বেচ্ছায় পদচ্যুত হতে বাধ্য হবে। কেননা জনসাধারণের সর্বাত্মক সহযোগিতা ব্যাতিরেকে কোন সরকার ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবেনা। তার এই নীতি শুধু মুসলমানরাই নয়, বরঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ও এই নীতি মেনে নেয়, যে তাদের পক্ষ থেকে সরকার কোন সহযোগিতা লাভ করবেনা। হুসাইন আহমদ মাদানি এবং তার অনুসারীগণ মুক্তিলাভের পর তৎকালীন ভারতীয় রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটিতে যোগদান করেন। দেওবন্দি জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের বার্ষিক অধিবেশনে বলেছিলেন, মুক্তির জন্য হিন্দু, মুসলিমশিখদেরকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করতে হবে। মুক্তির ৫ মাস পর মাহমুদ হাসান দেওবন্দি মৃত্যুবরণ করলে হুসাইন আহমদ মাদানি তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং আন্দোলন অব্যহত রাখেন। যা ১৯২১ সালে একটি গণজোয়ারে রূপ নেয়। তবে তখন ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে যাওয়ায় আন্দোলন অব্যহত রাখা সম্ভব হয়নি। তাদের এই নীতি গ্রহণের কারণ ব্যাখ্যা করে স্যার জন মিলকম বলেন, "এই সুবিশাল ভারতে আমাদের সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য একমাত্র উপায় হল, ভারতের বৃহৎ বৃহৎ দল সমূহকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে খন্ড-বিখন্ড করে দেওয়া। তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাখা। তারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আমাদের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কখনই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবেনা"। বলা হয় যে, ইংরেজ কর্মকর্তা হেনরি এলিট ও মি. কিমসন মুসলিম সাম্রাজ্যের ইতিহাস বিকৃত করে গ্রন্থ রচনা করতেন, যার মধ্যে মুসলমানদের শাসনামলে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের বানোয়াট কাহিনি উল্লেখ থাকত। যা তখন হিন্দুদের উপর চরম প্রভাব ফেলে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়িয়ে পরে। পরবর্তিতে মি. কিমসন এটি স্বীকার করেন। ১৮৫৯ সালে মুম্বইয়ের (তৎকালীন বোম্বে) গভর্ণর এলফিনেস্টোন প্রাচীন রোমের "বিভাজন ও শাসন নীতি" (Divide and Rule) গ্রহণের প্রস্তাব দেন। ১৮৮৫ সালে কলকাতা কোর্টের উকীল উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস গঠন করেন। ইংরেজরা দেশীয় সাম্রাজ্যবাদ সমর্থকদের মাধ্যমে বিভেদ ছড়ানোর চেষ্টা করে, যেমন- আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ স্যার মি. ডিওথোর স্যার সায়্যিদকে নিয়ে কংগ্রেসবিরোধী একটা দল প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও তিনি তাতে সফল হননি। ১৯০১ সালে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারন সম্পাদক মুহসিনুল মুলক "মোহামেডান রাজনৈতিক সংঘ" নামে একটি দল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৬ সালে তিনি এবং স্যার মুহাম্মদ আগা ৩২ জন মুসলমানকে নিয়ে ইংরেজ গভর্ণর লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাত করেন এবং তার আনুগত্য স্বীকারপূর্বক কাউন্সিল ও সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য পর্যাপ্ত আসন সংরক্ষণ ও ধর্মভিত্তিক পৃথক একটি নির্বাচনের অনুমতি প্রদানের দাবি জানান। তাদের দাবি লর্ড মিন্টো মেনে নেন। বড় লাটের স্ত্রীর নিকট একজন উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তা একটি পত্রে লিখেছিলেন যে, আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদিত হয়েছে, আজ ৬ কোটি ৩০ লক্ষ লোককে বিদ্রোহীদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হল। যা ভবিষ্যতে ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহর এই স্বাক্ষাতকারের ব্যাপারে এই মন্তব্য করেন যে, এটি ছিল ইংরেজ সরকিরের সাজানো নাটক, যা গভর্ণরের সামনেই মঞ্চস্থ করা হয়েছে।

সাক্ষাতকারের ৩ মাসের মধ্যেই ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় নওয়াব ভিকারুল মুল্‌কের নেতৃত্বে মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ' নামে মুসলমানদের রাজনৈতিক দল গঠিত হয় এবং উগ্রপন্থী হিন্দুদেরও অনুরূপ একটি প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। স্যার এন্টুনী ম্যাকডোনান্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০০ সালে দিল্লীতে 'মহামণ্ডল' নামে হিন্দুদের বৃহৎ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বারভাঙ্গার মহারাজা বেদ হাতে নিয়ে খালিপায়ে ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে থাকেন। এ অনুষ্ঠানে প্রায় ১ লক্ষ হিন্দু যোগদান করে। ১৯০৬ সালের একই বছরে লাহোরে মহামন্ডলের ৬ষ্ঠ বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে উগ্রপন্থী হিন্দুরা 'অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভা' নামে হিন্দুদের পৃথক প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। এভাবে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। ১৯১৮ সালে খেলাফত আন্দোলন পূনরুজ্জীবিত হয়ে উঠলে ইংরেজরা এই বিভেদ সৃষ্টিতে আরও তৎপর হয়ে উঠে। ১৯১৮ সালের এই বিভেদ সৃষ্টির প্রয়াস তেমন সফলতা অর্জন করেনি। বরং অসহযোগ আন্দোলনের কারণে তা পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পায়। চৌরী-চৌরা ঘটনার পর স্বামী শর্দানন্দ "শুদ্ধি অভিযান" পরিচালনা করে নবমুসলিমদেরকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে থাকে এবং অপরদিকে কংগ্রেসনেতা ড. মুঞ্জে 'সংগঠন' নামক একটি দল গঠন করে। উভয় দলের প্রতিষ্ঠাতা কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা হবার কারণে কংগ্রেস প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে।

আলিগড়ে পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী স্যার মিয়াঁ ফজলে হুসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনের একটি সভাতে ফজলে হুসাইন নিজের বক্তব্যে ইসলামি তাবলিগের ব্যাপারে গুরুত্ত্ব আরোপমূলক বক্তব্য দেয়াতে আখবারুল বাশীর নামক পত্রিকায় ধর্মীয় বিরোধিতা সৃষ্টির প্রয়াস বলে সন্দেহ করা হয়। ইংরেজ সরকার তাদের স্বার্থ উদ্ধারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষ দলের বিরোধিতা বাঁধানোর পরিকল্পনাও করা হয়। এই পরিকল্পনাটি যুক্তপ্রদেশের বিচারপতি মি. প্লাউডন কর্তৃক প্রেরিত একটি পত্রের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। যার মধ্যে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও ছিল।

ব্রিটিশকর্তৃক সংশোধিত আইন প্রয়োগের তদন্ত করতে ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সংসদ স্যার জন সায়মনের নেতৃত্বে ৭ জন সদস্যের একটি কমিশন গঠন করে, যা সায়মন কমিশন নামে পরিচিত। কিন্তু সেই কমিশনে কোন ভারতীয়দেরকে রাখা হয়নি বলে ভারতীয়রা ক্ষুব্ধ হয়। তারা এই কমিশনকে "জাতীয় অবমাননা" বলে মন্তব্য করে। তারা এই কমিশন বয়কটের উদ্দেশ্যে ৭ ফেব্রুয়ারী কমিশন বোম্বাই অবতরণ করলে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে, এবং "কমিশন ফিরে যাও" শ্লোগানে মূখরিত হয়ে উঠে। এই কমিশন ফিরানোর ব্যপারে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ, খেলাফত কমিটি ও কংগ্রেস ঐকমত্য প্রকাশ করে। ডিসেম্বরে ড. মুখতার আহমদ আনসারির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে, পেশাওয়ারে আনোয়ার শাহ কাশ্মিরির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জমিয়তের অধিবেশনে, কলকাতায় অনুষ্ঠিত খেলাত কমিটির অধিবেশনে, স্যার মুহাম্মদ ইয়াকুবের সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের অধিবেশনে কমিশন বয়কটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কমিশনের ব্যাপারে হুসাইন আহমদ মাদানি বলেন, দেশ আমাদের, জনতা আমাদের, সমস্যা আমাদের, আর আইন প্রনয়ন ও সংশোধন করবে ইংরেজরা; এটা কখনও মেনে নেওয়া যায়না। স্যার মুহাম্মদ শফির নেতৃত্বাধীন শফি লীগ কমিশনকে সমর্থন জানায় এবং কমিশনবিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধাচরন করে। শফি লীগ মুসলিম লীগের অতিক্ষূদ্র শাখা হলেও এর প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তবে এই দল কমিশনের সমর্থক হলেও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কমিশনবিরোধী ছিলেন। ইংরেজ এবং তাদের সমর্থনপ্রাপ্ত দলগুলো ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচন দাবি করলেও কিন্তু জিন্নাহ ধর্মীয় ঐক্য রক্ষার্থে এর প্রতিবাদ করেন। তবে পরবর্তিতে "নেহেরু রিপোর্ট"-এর কারণে তিনি এই চিন্তাধারা থেকে সরে যেতে থাকেন।

১৯২৭ সালে দিল্লিতে মুহাম্মদ আলি জওহরের উদ্যোগে জিন্নাহর সভাপতিত্বে ৩০ জন রাজনৈতিক নেতার অংশগ্রহণে রাজনৈতিক সমস্যা ও সাম্প্রদায়িক বৈরী মনোভাব নিরসনের উদ্দেশ্যে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ১৯টি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা "দিল্লি প্রস্তাব" নামে পরিচিত। সেই প্রস্তাবগুলোর মূল বিষয় ছিল:

  1. যৌথ নির্বাচনে আইনসভা গঠিত হবে এবং হিন্দু-মুসলিম উভয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষন করা হবে।
  2. সিন্ধু ও বোম্বাইকে পরস্পর পৃথক করে এক আলাদা মুসলিম প্রদেশ গঠন করতে হবে।
  3. মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশবেলুচিস্তানের সংস্কারকৃত আইন পরিবর্তন করতে হবে।
  4. কেন্দ্রীয় আইন সভার এক-তৃতীয়াংশ আসন মুসলমানদের জন্য সংরক্ষন করতে হবে।
  5. পাঞ্জাব, বঙ্গ প্রভৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রদেশে হিন্দু ও মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব স্বীয় অবস্থান অনুসারে গ্রহণ করতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রদেশে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের জন্য সমানভাবে কাউন্সিলের সদস্যপদ ও আইনসভার আসন সংরক্ষন করতে হবে।

ডিসেম্বরে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে এই প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা হয়। এবং এই প্রস্তাবের সূত্র ধরে আরও কিছু প্রস্তাব যুক্ত হয়:

  1. ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যাপারে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের সমান অধিকার থাকবে
  2. বিধানসভার তিন-চতুর্থাংশের সম্মতি ব্যতিত কোন খসড়া আইন কোন সম্প্রদায়ের উপর প্রয়োগ করা যাবেনা।

১৯২৮ সালে ইংরেজ সচিব লর্ড বাকেন হেডের সংবিধান রচনার ক্ষমতার চ্যালেঞ্জের উত্তরে মতিলাল নেহেরুকে সভাপতি করে একটি সংবিধান রচনা করা হয়, যা 'নেহেরু রিপোর্ট' নামে পরিচিত। খেলাফত কমিটির নেতা মাওলানা শওকত আলী এবং জমিয়তের নেতা মাওলানা মুফতি কেফায়াতুল্লাহর উপস্থিতিতে একটি অধিবেশনে কংগ্রেস এই সংবিধানটি অনুমোদন করে। তবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এটি এড়িয়ে যান। এই অধিবেশনের এক বছর পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তলাভের জন্য একটি সভার আহ্বান করা হয়। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মাওলানা মুহাম্মদ আলী এবং অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ আশা করেছিলেন যে, কংগ্রেস মুসলিম লীগের 'দিল্লি প্রস্তাব' এর প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করবে, তবে তা হয়নি। স্যার তেজ বাহাদুর চোপড়া সকলের দৃষ্টি আকর্ষনের উদ্দেশ্যে বলেন, "নেহেরু রিপোর্টে দিল্লি প্রস্তাবকে উপেক্ষা করা হলে এমন এক ক্ষত সৃষ্টি হবে, যা বহু বছরেও শুকাবে না"।

বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দলও এর বিরোধিতা করে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এর প্রতি কোন সহানুভুতি দেখানো হয়নি। এটাও বলা হয় যে, মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করার কোন অধিকার নেই। জিন্নাহ এতে খুবই মর্মাহত হন। এই ব্যাপারে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বলেন, "আমি চাইলেও অনুমোদন দিতে পারিনি। কেননা শিখ নেতৃবৃন্দ পূর্বেই বলেছিলেন, যে নেহেরু রিপোর্টে কোন পরিবর্তন করা হলে আমরা সভা ত্যাগ করব"। চৌধুরী খালিকুজ্জামান এই ব্যাপারে বলেছিলেন, এই ঘটনায় যেন ভারতের ভবিষ্যতের উপর একটি সীল মোহর লেখে গেল। হিন্দু রাজনীতিবিদরা পরমত-অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছেন।

১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে "নেহেরু রিপোর্ট" বাতিল করা হয়।

১৯১৯ সালে ৫০ জন শীর্ষস্থানীয় আলেমের উপস্থিতিতে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির সভাপতিত্বে "জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ" গঠিত হয়। দেওবন্দি মাল্টায় কারাবরণকালে মাওলানা কিফায়াতুল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং মাওলানা আহমদ সাঈদকে সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এর প্রথম অধিবেশন অমৃতসরে আব্দুল বারী ফিরিঙ্গিমহল্লীর সভাপতিত্বে ৮০ জন আলেমের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। তখন শীর্ষস্থানীয় আলেমগণও ইংরেজবিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন। কংগ্রেস এবং জমিয়ত একই পন্থার সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল হলেও দলদুটির মাঝে কিছু পার্থক্যও ছিল। যেমন, তারা সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সুবিধাও লাভ করত। এছাড়াও তারা ব্রিটিশ ভারতীয় সংসদের সদস্যপদও লাভ করত, গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করত, বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ইংরেজদের ভোজসভায় আমন্ত্রিত হত। ১৯২৩ সালে জমিয়ত স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। এবং কাকনাদে মাওলানা মাদানির সভাপতিত্বে এর বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে মাদানি বলেন, "'ইংরেজদের এই দেশ থেকে উৎখাৎ করে দেশকে স্বাধীন করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে হবে। এই দেশ থেকে তাদেরকে তাড়ানোর আগ পর্যন্ত আমরা স্বস্তির নিংশ্বাস ফেলব না এবং সাম্রাজ্যবাদকেও স্বস্তিতে থাকতে দেব না। ১৯২৫ সালে জমিয়তের চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশনে ইংরেজ সরকারকে কোন প্রকার সাহায্য না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলে সদস্যপদ গ্রহণ করা হারাপ ঘোষণা করা হয়। ১৯২৭ সালে সায়মন কমিশনকে বাধা দেওয়ায় ধর্মীয় ঐক্য পূর্বের নিস্তেজ অবস্থা থেকে উন্নতি হয়েছিল। ১৯২৮ সালে নেহরু রিপোর্টে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা না হওয়ায় কেফায়াতুল্লাহ দেহলভি কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রচন্ড প্রতিবাদ জানান। উক্ত বছর সার্দা এক্টের বাল্যবিবাহ বেআইনি ঘোষণা করলে মুসলমানরা ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপে আপত্তি জানায়। এটি হিন্দুদের জন্য উপকারি হলেও এটি মুসলমানরা ধর্মীয় বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ বলে দাবি করে। ১৯২৯ সালে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের উদ্যোগে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য গঠিত ন্যাশনালিস্ট মুসলিম কনফারেন্স-এর সভা অনুষ্ঠিত হয়। জমিয়তের নেতৃবৃন্দই এই দলের শীর্ষ নেতা ছিলেন। জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম, মজলিসে আহরার প্রভৃতি দলও এই জোটে যোগদান করেছিল। ১৯৩১ সালের ৩১ ডিসম্বরে লাহোরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে সরাসরি স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হলে জমিয়ত এবং কংগ্রেসের সাংগঠনিক ঐক্য বৃদ্ধি পায়। ১৯৩০ সালে আমরোহায় মাদানির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জমিয়তের বার্ষিক অধিবেশনে হিফজুর রহমানের পরামর্শে সাংগঠনিক ভাবে কংগ্রেসকে পূর্ণ সমর্থন জানানো হয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেসের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঐবছরই ঐক্যবদ্ধ ভাবে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের কারণে গান্ধী, কেফায়াতুল্লাহ দেহলভি, আবুল কালাম আজাদ প্রমূখ গ্রেফতার হন। জমিয়তের আর্থিক সংকটের কারণে কংগ্রেসনেতা মতিলার নেহরু ফান্ড থেকে জমিয়তকে অনুদান দেওয়ার ইচ্ছা পোষন করলেও জমিয়ত তা গ্রহণে অস্বিকৃতি জানায়। এই সূত্রে দেহলভি বলেন, আমরা কারো উপর ভরসা করে দল গঠন করিনি। আর্থিক সংকটের ফলে প্রয়োজনে দল ভেঙে দেব, তবুও অনুদান গ্রহণ করতে পারব না। ১৯৩১ সালে মাদানি সপরিবারে হজ্জ্বে গমন করেন। তার ভ্রাতৃদ্বয় তাকে সেখানে অবস্থানের জন্য বললে তিনি বলেন, "আমাদের এত বছরের আন্দোলনের সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এই পর্যায়ে ভোগ-বিলাসের উদ্দেশ্যে নিজের দল এবং দেশকে ত্যাগ করে পলায়ন করলে পরকালে প্রভূর সামনে মুখ দেখবো কিভাবে?" মাদানি হজ্জ্ব সমাপ্ত করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। গোলটেবিল বৈঠক ব্যার্থ হয়ে গেলে ১৯৩১ সালে পুনরায় ঐক্যবদ্ধভাবে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ইংরেজরা জমিয়ত ও কংগ্রেসকে বেআইনী ঘোষণা করে। দলদ্বয়ের নথি ও তহবিল বাজেয়াপ্ত করে। আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য জমিয়ত কার্যনির্বাহী পরিষদের স্থলে একশন কমিটি গঠন করে এবং ধারাবাহিক ভাবে অধিনায়ক নিযুক্ত করে। তন্মদ্ধে মাদানি ৩য় অধিনায়ক নিযুক্ত হন। ইতোপূর্বে যথাক্রমে কেফায়াতুল্লাহ দেহলভি ও আহমদ সাঈদ অধিনায়ক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে তাদের নাম গোপন রাখা হয়েছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় অধিনায়ক গ্রেফতার হয়েছিলেন। দিল্লি জামে মসজিদে যাত্রাকালে মাদানি নিজে গ্রেফতার হওয়ার কথা সুনিশ্চিত হয়ে নিজের বক্তব্য লিখে গ্রেফতারের আগমূহুর্তে মাওলানা আবুল মাহাসিন সাজ্জাদকে এটি মসজিদে পড়ে শুনাতে বলেন। এবং রাস্তাতেই গ্রেফতার হয়ে যান।

সমকালীন রাজনীতিকদের ভূমিকা[সম্পাদনা]

১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা অর্থাৎ হিন্দু- মুসলিমের পৃথক নির্বাচন নীতি বহাল ও গভর্ণর কিংবা ভাইসরয়ের জন্য চূড়ান্ত রায় প্রদানের অধিকার সংরক্ষিত রেখে বৃটিশ সরকার ১৯৩৫ সালে ‘ভারত সরকার আইন ১৯৩৫’ পাস করে। এ আইনে ভারতীয়দের প্রদেশে ও কেন্দ্রে বিধানসভামন্ত্রিপরিষদ গঠনের সুযোগ করে দেয়। মন্ত্রিত্বের সুযোগ প্রাপ্তি রাজনীতিকদের এই আইন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।[৯১]

এই আইনে জমিয়তে উলামা ও কংগ্রেসের নিকট মনঃপুত হয়নি এবং উভয় দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণে অসম্মতি জানায়। জওহরলাল এই আইনকে দাসত্বের নতুন অধ্যায় বলে অভিহিত করেন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আইনে বর্ণিত প্রাদেশিক স্থায়ত্বশাসনের বিধানগুলো সমর্থন করেন আর বাকি বিধানের নিন্দা করেন। পরে ১৯৩৬ সালে কংগ্রেস নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে মুসলিম লীগও নির্বাচনে যোগ দেয়।[৯১]

আলেমদের অগ্রযাত্রা[সম্পাদনা]

মাহমুদ হাসান দেওবন্দি এর মৃত্যুর পর হুসাইন আহমদ মাদানি তার স্থলাভিষিক্ত হন। ‘জানেশীনে শায়খুল হিন্দ” হিসেবে সর্বত্র পরিচিত হওয়ার কারণে তখন থেকে মুসলিম সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষা বিষয়ক সমস্যার সমাধানে তার অভিমত বিশেষভাবে বিবেচিত হতে থাকে। ১৯২০ সালে মুফতি কেফায়তুল্লাহ জমইয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি হন। এর আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বে রেশমি রুমাল আন্দোলন গড়ে উঠে, কিন্তু তা ব্যর্থ হলে আলেম সমাজ আবার একত্রিত হয়। তিনি টানা ১৮ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে সেচ্ছায় তিনি অব্যাহতি নেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় জমিয়তের সভাপতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলভী দায়িত্ব পালনে অপরাগতা প্রকাশ করলে সর্বসাধারণকে সিদ্ধান্তক্রমে মাদানি জমিয়তের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি জৌনপুর অধিবেশনে বক্তব্য দেন যা ৪০পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

বক্তব্যে তিনি ভারতীয়দের উপর ইংরেজদের অত্যাচার নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেন এবং কুরআনহাদিসের আলোকে স্বাধীনতা জিহাদের আবশ্যকতা প্রমাণ করেন।

ছেচল্লিশের নির্বাচন[সম্পাদনা]

বিভক্তির পরিণতি[সম্পাদনা]

রাজনৈতিক চিন্তাধারা[সম্পাদনা]

১৮০৩ সালে শাহ আবদুল আজিজের মাধ্যমে আলেমগণের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে সৈয়দ আহমদ বেরলভি, শাহ ইসমাইল শহীদ, ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি, মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি, রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি, মাহমুদ হাসান দেওবন্দি প্রমূখ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।[৯২] মাদানি ১৯১৬ সালে এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।[৯৩] ১৯২০ পর্যন্ত তিনি মাহমুদ হাসান দেওবন্দির একান্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯২০ সালে দেওবন্দির মৃত্যুর পর এ আন্দোলন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব তার উপর অর্পিত হয়।

১৯১৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত মোট ৩১ বছর মাদানি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছেন। এই ৩১ বছরের মধ্যে ৮ বছরের অধিক সময় তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। অবশিষ্ট ২৩ বছর তিনি মাঠে-ময়দানে সক্রিয় আন্দোলনের সুযোগ পান। তিনি জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, খেলাফত আন্দোলনের অসংখ্য সভা ও সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার অনেক বক্তৃতা পুস্তিকা আকারেও প্রকাশিত হয়েছে। তার স্বরচিত নকশে হায়াত এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ। তাছাড়া মাকতুবাতে শায়খুল ইসলামের বিশাল অংশ তার রাজনৈতিক বিষয়ের উপরে লিখিত।[৯৪] এসব রচনা ও বক্তৃতা থেকে তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায়:

  • বিগত অষ্টাদশ, উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে এশিয়াআফ্রিকার দেশগুলাের উপর বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহ ও মুসলমানদের খেলাফত ব্যবস্থার উপর যে সব বিশৃংখলা ও ষড়যন্ত্র আপতিত হয়ে আসছে, তার জন্য তিনি প্রধানত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে দায়ী করেন। তিনি মনে করতেন, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশ মুসলিম হওয়ার কারণে এবং মুসলমানদের সাম্রাজ্য বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য হওয়ার কারণে মুসলমানরা ইউরােপীয়দের চক্ষুশূলে পরিণত হয়ে আছে। ফলে ইউরােপীয় কূটনৈতিক মহল বিভিন্ন ছল চাতুরীর মাধ্যমে মুসলমানদের বরাবর ক্ষতি সাধন করে এসেছে। কাজেই সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ক্ষতি সাধনকারী এ অশুভ শক্তিটি প্রতিহত করা আবশ্যক।[৯৫]
  • তিনি আরও মনে করতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ পুরো বিশ্বের উপর যেই আধিপত্য বিস্তার করে আছে তার মূলে রয়েছে ভারতবর্ষ থেকে আহরিত তাদের সামরিক শক্তি। এই সাম্রাজ্যবাদকে কোন ক্রমে ভারত থেকে উৎখাত করা সম্ভব হলে শুধু মুসলিম দেশগুলােই নয়, বরং পুরো বিশ্ব থেকেও তারা উৎখাত হতে বাধ্য। তার দৃষ্টিতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রকৃত প্রস্তাবে শুধু ভারতবর্ষের স্বার্থেই নয় বরং সমগ্র এশিয়াআফ্রিকাকে মুক্ত করার স্বার্থেও ছিল জরুরী।[৯৬]
  • তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করা প্রত্যেক মুসলমান এবং ভারতীয় প্রতিটি নাগরিকের একান্ত কর্তব্য। তার মতে স্বাধীনতা ব্যতিরেকে মানুষ ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কোন ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে না। জন্মগত প্রতিভা ও যােগ্যতার লালন ও বিকাশের জন্যও এটি আবশ্যক।[৯৭]
  • তার নিকট এটা সুবিদিত ছিল যে, ভারত কোটি কোটি মানুষের দেশ, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী, বহু সম্প্রদায়ের দেশ। এ সম্প্রদায়গুলাে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ না হলে ভারত থেকে সাম্রাজ্যবাদ তাড়ানাে কখনাে সম্ভব নয়। তাই তিনি ভারতীয় সকল সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ঐক্য গঠনে জোর দেন। তার মতে ঐক্যই হল স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল করার একমাত্র উপায়। তবে এ ঐক্য হবে কেবল রাজনীতি ও আন্দোলনের ঐক্য, ভারতবাসীর পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ঐক্য। স্বধর্ম ত্যাগ করা কিংবা ধর্মীয় বিধান যথার্থভাবে পালনে ত্রুটি কিংবা লংঘন করার ঐক্য নয়। কাজেই প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনে থাকবে পূর্ণ স্বাধীন। তার মতে স্বাধীনতার আন্দোলন সফলের জন্য সাম্প্রদায়িকতার প্রতিরােধ করাও আবশ্যক। সাম্প্রদায়িকতা পরিহারপূর্বকক নিজেদের দৃঢ় ঐক্য স্থাপন না করা পর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা অর্জন কখনাে সম্ভব হবে না।[৯৮]
  • শাহ আবদুল আজিজ, সৈয়দ আহমদ বেরলভি, মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি, মাহমুদ হাসান দেওবন্দির মত তিনিও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ইসলামে বর্ণিত জিহাদের অংশ মনে করতেন এবং এজন্য তিনি আপােসহীনতার নীতি অবলম্বন করেন।[৯৯] এ জিহাদের শুরু থেকেই তিনি প্রত্যহ কুনুতে নাজেলা পড়তেন।[১০০]
  • তার দৃষ্টিতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রকৃত অর্থে বস্তুবাদধর্মহীনতার বিরুদ্ধে মানবতাবাদ ও ধার্মিকতার সংগ্রাম। এশিয়া মহাদেশ আবহমানকাল থেকে ধর্ম ও মানবতার লালনক্ষেত্র হিসেবে চলে আসছে। কুরআনে বর্ণিত অধিকাংশ নবী-রাসূল এই এশিয়ার ভূখণ্ডেই ছিলেন। পক্ষান্তরে ইউরােপের পরিবেশ তদ্রপ নয়। তাই ইউরোপ দীর্ঘকাল থেকে ধর্মহীনতা, নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুতান্ত্রিকতার প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। তার বিশ্বাস ছিল যে, ব্রিটিশরা রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে ধার্মিকতার লালন ক্ষেত্র এশিয়ার উপর ইউরােপীয় ধর্মহীনতা চাপিয়ে দিচ্ছে। ইউরােপীয় আগ্রাসনের ফলে এশিয়ার ধার্মিকতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে আছে। কাজেই হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও ফার্সী নির্বিশেষে সকল ধর্মাবলম্বীর কর্তব্য ঐ ধর্মহীনতার আগ্রাসন প্রতিরােধ করা। নতুবা পরিণামে ভারত এবং এশিয়ার কোন ধর্মেরই অস্তিত্ব অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হবে না।[১০১]

তিনি বিশ্বাস করতেন, তুমুল আন্দোলন ও সংগ্রাম ছাড়া সাম্রাজ্যবাদকে ভারত ত্যাগে সম্মত করা যাবে না। তাছাড়া স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয় সকল সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে ব্রিটিশ সরকারকে বয়কট করা আবশ্যক। এ নীতির আলােকেই তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং বিলাতি পণ্য পরিহারের নীতি অবলম্বন করেন। তিনি মাল্টা থেকে প্রত্যাবর্তনের পরই কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হন। তারপর প্রাদেশিক শাখার নেতৃত্ব দেওয়া, বিভিন্ন সম্মেলনে সভাপতিত্ব করা, কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যােগদান ইত্যাদির মাধ্যমে শেষ অবধি কংগ্রেস কর্তৃক গৃহীত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাহায্য করে যান। এ দীর্ঘ সময়ে কংগ্রেসের কোন কোন সিদ্ধান্তের সাথে তার মতানৈক্য ঘটে থাকলেও ব্রিটিশ বিতাড়ন আন্দোলনের ব্যাপারে কখনাে তিনি বিচ্ছিন্ন হননি। প্রথম দিকে তিনি সশস্ত্র বিপ্লব ও সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সমর্থক দলগুলাের সাথে যুক্ত ছিলেন। এজন্য তাকে মাল্টায় ৪ বছর কারাবরণ করতে হয়। মাল্টা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যােগ দেন। ১৯২০ থেকে নিয়মিত বাৎসরিক ফি আদায়সহ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসজমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। ঐ সময় থেকে তিনি খেলাফত কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে খেলাফত আন্দোলন বিলুপ্ত হওয়ায় খেলাফতের কাজ করার সুযোগ থাকেনি। [১০২] এ সম্পর্কে তিনি বলেন,

“বিগত ২৫ বছর থেকে আমি কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে আছি। এ সূত্রেই আমি তাদের সভায় যােগদান করি। বক্তব্য রাখি। চাদা দেই। আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করি ও জেলে যাই। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দেরও আমি সক্রিয় সদস্য। তবে ইংরেজ সমর্থক কিংবা ইংরেজ তাবেদার সাম্প্রদায়িক কোন দল কিংবা সংগঠনের সাথে আমি নেই, সেটি মুসলমানদের হােক কিংবা অমুসলিমদের। তাদের কোন সভা-সমিতিতেও আমি অংশগ্রহণ করি না।”

কংগ্রেসে যােগদানের বিষয়কে তিনি কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়ােজনেই নয় বরং ধর্মীয় প্রয়ােজনেও গ্রহণ করেন। তার দৃষ্টিতে যেহেতু বিশ্ব মুসলিমের মুক্তি লাভের বিষয়টি ভারতের স্বাধীনতার উপর নির্ভরশীল, সেহেতু কংগ্রেসে যােগ দিয়ে হলেও স্বাধীনতার আন্দোলন বেগবান করে তােলা জরুরী। এ যােগদানকে তিনি বিশ্ব মুসলিমের স্বার্থে সম্পাদিত একটি ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।[১০৩] এক বক্তব্যে তিনি বলেন,

“কোন সন্দেহ নেই যে, আমি কংগ্রেসের একজন সদস্য হিসেবে আছি। কংগ্রেস একটি সম্মিলিত দল। এ দলের সদস্যপদ গ্রহণে অসুবিধা কোথায়? ভারতের সকল সম্প্রদায়ের লােকেরা এখানে সদস্য হিসেবে আছে এবং থাকতে পারে। ১৮৮৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে প্রায় ৮/৯ জন সভাপতি মুসলমান ছিলেন। মুসলিম লীগ, খেলাফত কমিটি, জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ প্রভৃতির সকলেই ১৯২০ সালে এ সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েই কাজ করেছেন। তখন কংগ্রেসের সাথে মিলিত হয়ে কাজ করতে কারােই তাে আপত্তি ছিল না। এটি হিন্দুদের একান্ত ধর্মীয় সংগঠন নয়। হিন্দুদের একান্ত ধর্মীয় সংগঠন হল হিন্দু মহাসভা। ঐ সংগঠন শুধুমাত্র হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক দাবী-দাওয়া নিয়েই কাজ করে। অনুরূপে মুসলিম লীগ মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংগঠন। কাজেই যেভাবে অন্যান্য মুসলমান নিজেদের নাগরিক সুযােগ সুবিধা আদায়ের জন্য ইংরেজদের সাথে মিউনিসিপালিটি বাের্ড, ডিস্ট্রিক বাের্ড, কাউন্সিল ও এসেম্বলিতে যােগ দেয় এবং যােগদান করাকে অবৈধ মনে করে না, তেমনি আমিও ইংরেজ শাসনের অক্টোপাস থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের যথাসাধ্য শক্তি নিয়ােগের জন্য কংগ্রেসে যােগদান করাকে অবৈধ মনে করি না। বরং পরিস্থিতির দাবী অনুসারে এটিকে আমি জিহাদ এমনকি উত্তম জিহাদ বলে মনে করি।”

তার এই কর্মপন্থা নিয়ে আবুল হাসান আলী নদভী বলেন,

“ভারতবর্ষে যদি কাউকে আমিরুল মুজাহিদীন হজরত সৈয়দ আহমদ শহিদের সার্থক উত্তরাধিকারী বলে চিন্তা করা হয়, তা হলে তিনি হবেন হজরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি। মনে রেখ, হযরত মাদানির কংগ্রেসে যােগদান করে স্বাধীনতার আন্দোলন করা তার রাতে তাহাজ্জুদ পড়া থেকে কোন অংশেই কম মানের নয়।”

মাদানি বিলাতি পণ্য ব্যবহারের ঘাের বিরােধী ছিলেন। তিনি স্পষ্ট বর্ণনা করেন যে, বাণিজ্যের পথ ধরেই ইংরেজ ভারতের সিংহাসন দখল করেছে এবং এ পথ দিয়েই ভারতের ধনভাণ্ডার ইংল্যান্ডে পাচার করছে। বিলাতি পণ্যের বাণিজ্যই তাদের সকল উত্থানের বুনিয়াদ। কাজেই এ বুনিয়াদ বিধ্বস্ত করা আবশ্যক। তিনি ইংরেজকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার লক্ষ্যে এবং স্বদেশি পণ্যের বৃহত্তর বিকাশের স্বার্থে বিলাতি পণ্য পরিহারের আন্দোলন করেন। তার ব্যক্তিগত নীতি ছিল, একান্ত বাধ্য ও নিরুপায় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কখনো বিদেশি পণ্য ব্যবহার করতেন না। নিজের ঘরবাড়ি ও আসবাব পত্রের সর্বত্র ছিল দেশি পণ্য। ভুলক্রমে কখনাে যদি কোন বিদেশি পণ্য তার গৃহে এসে যেত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেটি ফিরিয়ে দিতেন কিংবা নষ্ট করে ফেলতেন। উপমহাদেশের সর্বত্র তার অসংখ্য শিষ্য ও ভক্ত ছিল। তিনি তাদের কাউকে কোন বিদেশি পণ্য ব্যবহার করতে দেখলে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। এ ব্যাপারে তিনি এত কঠোর ছিলেন যে, কোন জানাজার কাফন যদি বিদেশি কাপড় দ্বারা করা হত তাহলে তিনি ঐ জানাযায় শরীক হতেন না। আর শরীক হলেও নিজে জানাজার নামাজ পড়াতেন না। তারই জনৈক মামাত ভাই সৈয়দ খলিল আহমদ মৃত্যুবরণ করলে তিনি তার জানাযায় যান কিন্তু কাফনে বিলাতি কাপড় ছিল বলে অনেক পীড়াপীড়ির পরেও ইমামতি করেননি।[১০৫] তার জীবনে এ ধরনের আরাে বহু ঘটনার উল্লেখ আছে। তিনি আজীবন দেশি খদ্দর কাপড় ব্যবহার করেন।

এ সম্পর্কে মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভি বলেন,

“হজরত মাদানির মনে দেশি খদ্দরের প্রতি ছিল গভীর ভালবাসা। পক্ষান্তরে বিলাতি কাপড়ের প্রতি ছিল প্রচণ্ড ঘৃণাবােধ। আমার সাথে তার সম্পর্ক অনেক দিনের। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন কিন্তু আমার শরীরে কখনাে বিদেশি কাপড়ের জামা দেখলে অসন্তুষ্ট হতেন। এক পর্যায়ে এমন হল যে, আমাকে বিদেশি কাপড়ের জামা পরিহিত দেখলেই নিজে হাতে নিয়ে তা ছিড়ে ফেলতেন। তাই তার জীবদ্দশায় আমি শুধু খদ্দর কাপড়ই ব্যবহার করি। কারণ তিনি এই এই অধমের বাড়ী আসতেন। আগমনের কোন নির্ধারিত সময় ছিল না। যে কোন দিন যে কোন সময়ই এসে যেতেন বিধায় সর্বদাই আমাকে খদ্দরের কাপড় পরিধান করে থাকতে হত।”

স্বদেশি পণ্যের ব্যবহার ও বিদেশি পণ্যের পরিহার সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতেন, ভারত যদি নিজের উৎপাদিত পণ্যের উন্নতি সাধনে একনিষ্ঠ হয় এবং বিদেশি পণ্যের খরিদ বন্ধ করে দেয় তাহলে পৃথিবীর কারাে সাধ্য নেই যে, অর্থনৈতিকভাবে ভারতকে পরাভূত করতে পারে। বিলাতি পণ্য খরিদের দ্বারা প্রকারান্তরে ইংরেজকে সাহায্য করা হয়। এ সাহায্য দান ভারতীয়দের আত্মহননের শামিল। এক চিঠিতে তিনি উপদেশ দিয়ে লিখেছেন, তারপরেও আমি উপদেশ দিয়ে বলছি, সাবধান! ইংরেজের প্রতি তুচ্ছ পর্যায়েরও কোন সমর্থন কিংবা কোন সাহায্য সহযােগিতা করবেন না। এটি দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর। বিলাতি পণ্যের ব্যবহার থেকে বিশেষত বিলাতি কাপড়ের ব্যবহার থেকে নিজে বিরত থাকুন। অন্যদেরকেও বিরত রাখুন। যতটুকু সম্ভব মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও শৃংখলাবােধ সৃষ্টি করুন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নির্মূল করার চেষ্টায় নিয়ােজিত থাকুন।[১০৩]

রাজনীতি সম্পর্কে ইসলামের বিধান আলােচনায় দুটি প্রান্তিক অভিমত পাওয়া যায়। কারাে মতে ইসলামে রাজনীতি নেই। আবার কেউ বলেন ইসলাম মানেই রাজনীতি। মাদানি দুটি অভিমতকেই অতিশয়তা ও বাড়াবাড়ি বলে মনে করেন। তার মতে রাজনীতি করা ইসলাম বহির্ভূত নয়। সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে রাজনীতি চর্চায় ইসলামের কোথাও নিষেধ করা হয়নি। পক্ষান্তরে মিথ্যা, প্রতারণা ও শঠতার অবলম্বন করা, সেটি রাজনীতির ক্ষেত্রে হােক কিংবা অন্য যে কোন ক্ষেত্রে হােক সর্বত্র পরিত্যাজ্য।[১০৭]

তিনি ছাত্র রাজনীতির সমর্থক ছিলেন না। তার দৃষ্টিতে, শিক্ষার্থীদের যারা নিজেদের শিক্ষা কোর্স সম্পন্ন করেনি এবং শিক্ষা লাভের কাজে রত আছে তাদের জন্য শিক্ষা বাদ দিয়ে রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ উচিত নয়। শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সম্পন্ন করার প্রতি প্রথম মনােযােগ দান জরুরী। তবে ছুটির সময়ে কিংবা অবসর সময়ে রাজনীতি সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা অর্জনে দোষ নেই।[১০৮]

স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে তিনি ভারতীয় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে যে ঐক্য স্থাপন করেন সেটি ছিল একান্ত রাজনৈতিক। আকীদা বিশ্বাস কিংবা ধর্মীয় কাজকর্মের ক্ষেত্রে ঐক্য নয়। তার মতে, ইসলামে এ ধরনের ঐক্য স্থাপনে বাধা নেই। তিনি দলীল দিয়ে বলেন, “মদিনায় পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার ইহুদিদের সাথে সন্ধি স্থাপন করে মক্কার মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। আবার হুদায়বিয়ায় তিনি ঐ মুশরিকদের সাথে সন্ধি করে ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করেন। উপরােক্ত ২ টি ঘটনা থেকে বােঝা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে বিশেষ প্রয়ােজনে অমুসলিমদের সাথে ঐক্য করা বৈধ।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা শরীয়তের বিধি-বিধানে বিকৃতি সাধন কিংবা মুসলিম বা অমুসলিম কারও নির্দেশে শরীয়তের কোন বিধান পরিত্যাগ বা পরিবর্তন করা কোন ক্রমেই বৈধ মনে করি না।”[১০৯]

এ সম্পর্কে মুশতাক আহমদ লিখেন,

“বস্তুত মুসলমানদের প্রধান শত্রু ইংরেজকে পরাস্ত করার লক্ষ্যে তিনি হিন্দুদের সাথে ঐক্য স্থাপনে বাধ্য হন। পরিস্থিতির দাবী অনুসারে এটি করা ব্যতিরেকে তাঁর গত্যন্তর ছিল না। কারণ তৎকালে এককভাবে মুসলমানদের শক্তি এতটুকু ছিল না, যার দ্বারা সম্রাজ্যবাদী সরকারকে কাবু করা যায়। এ কারণেই তাঁকে কংগ্রেস ও অন্যন্য জাতীয়তাবাদী অমুসলিমের সাথে মিলে ঐক্য গঠন করতে হয়।”

ঐক্য গঠন সম্পর্কে মাদানি বলেন, “হিন্দুদের বর্তমান অবস্থায় এতটুকু শক্তি নেই যতটুকু শক্তি রয়েছে ইংরেজদের হাতে। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের নিরিখে এ কথা সুস্পষ্ট যে, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইংরেজ। হিন্দুদের ব্যাপারে শুধু এতটুকু বলা যায় যে, হয়ত ভবিষ্যতে তারা ইংরেজদের ন্যায় কিংবা তাদের চেয়েও বড় ধরনের অনিষ্টকারী হতে পারে। তবে সেটি কেবল ধারণা ও আশংকা মাত্র। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। এ কারণে আকাবির উলামা ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা উদ্ধার করা এবং ইংরেজ আধিপত্য নির্মূল করার বিষয়টি সর্বদা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করে আসেন।” এ লক্ষ্যেই কংগ্রেস গঠিত হয় এবং মুসলমানরা তাতে অংশ গ্রহণ করে। জমিয়তে উলামার নেতৃবৃন্দ কংগ্রেসের সাথে কর্মসূচীর ঐক্য স্থাপনে এটিই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তার বক্তব্য ছিল, যতদিন পর্যন্ত ভারতবর্ষ স্বাধীন না হবে, ততদিন পর্যন্ত এ ঐক্যের আবশ্যকতা বিদ্যমান থাকবে। কংগ্রেস যদি কোনোদিন এমন কোন ঘােষণা দেয় যে, তারা ইংরেজকে ভারত থেকে উৎখাত করতে ইচ্ছুক নয়, তখন জমিয়ত অবশ্যই কংগ্রেসের সাথে কর্মসূচীর উপরােক্ত ঐক্য পরিত্যাগ করবে।[১১১] আজ আপনাদের সুযােগ হয়েছে নিজের শত্রুকে দমন করার। কাজেই অসহযােগের অস্ত্র দ্বারা বড় শত্রুটি দমন করুন। তাকে পরাস্ত করতে অন্যদেরকেও সঙ্গে নিন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে খায়বারের যুদ্ধে বনু হারিসার ইহুদীদেরকে, হুনাইনের যুদ্ধে মক্কার সাফওয়ান ইবন উমাইয়া ও অন্যান্য গোত্রকে এবং হুদাইবিয়ার সন্ধিকালে খােযা গােত্রের লােকদেরকে এ নীতির উপরই মুসলমানদের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল।”[১১২]

মোহনদাস করমচন্দ গান্ধীর নেতৃত্বাধীন আইন অমান্য আন্দোলনে বিপ্লবী ইসলামি পণ্ডিতগণ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনাসহ অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনে বহু পণ্ডিত কারারুদ্ধও হন। কতিপয় সমালােচক এটিকে তিরস্কার করে বলেছিল যে, কোন অমুসলিমের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন ইসলামের পবিত্র জিহাদ হতে পারে না। তাদের যুক্তি ছিল, অমুসলিমের নেতৃত্ব মুসলমানের জন্য নাজায়েজ ও হারাম। মাদানি উপরােক্ত অভিযােগের খণ্ডনে বলেন, “অমুসলিমকে জিহাদের ইমাম নিযুক্ত করা যায় না। তবে জিহাদের অধীনে পরিচালিত কোন কাজে অমুসলিমের সহযােগিতা নেওয়া বা নেতৃত্ব দ্বারা নিজেরা উপকৃত হওয়া দোষের বিষয় নয়। যেমন কোন হিন্দুকে মসজিদের ইমাম বানােনো যায় না। কিন্তু মসজিদের নির্মাণ কাজে কিংবা কোন মুসলিম রােগীর চিকিৎসা কাজে অমুসলিমকে নেতা বানানাে যায়।”[১১৩]

তিনি বলেন, এ কথা সম্পূর্ণ ভুল যে, জমিয়ত কোন অমুসলিমকে নিজদের ইমাম নিযুক্ত করেছে। জমিয়ত স্বায়ত্তশাসিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এটি অন্য কোন দল বা সংগঠনের তাবেদার বা লেজুড় নয়। কংগ্রেস ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, জমিয়ত ঐ সকল সিদ্ধান্ত নিজেদের বৈঠকে গভীর পর্যালােচনা করে থাকে। তারপর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তথা কুরআন-হাদীস ও ফিকহের আলােকে ঐ সিদ্ধান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা পূর্বক মুসলমানদের জন্য যতটুকু সঠিক ও উপযুক্ত বিবেচিত হয়, ততটুকুই গ্রহণ করেন। আর যা শরীয়তের খেলাফ কিংবা উম্মতের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হয় তা বর্জন করেন। যদি ইমামত ও নেতৃত্বের অর্থ সেটিই হয় যা সমালােচকরা বলে বেড়াচ্ছেন এবং যদি অমুসলিমের কোন ধরনের নেতৃত্বই মুসলমানের জন্য নাজায়িয হয়, তা হলে মিউনিসিপ্যালিটি বাের্ড, ডিস্ট্রিক বাের্ড প্রভৃতিতেও কোন মুসলমানের অংশগ্রহণ জায়িয হবে না। কারণ ঐ সকল বাের্ডের অধিকাংশেরই প্রেসিডেন্ট কিংবা সেক্রেটারি অমুসলিম। অনুরূপ ইংরেজ সরকারের প্রশাসন, সামরিক, বাণিজ্য, শিক্ষা ইত্যাদি বিভাগেও মুসলমানদের চাকুরী করা বৈধ হবে না। অথচ সমালােকরা কখনাে ঐ ক্ষেত্রগুলিতে অংশ গ্রহণ হারাম বলেন না বরং নিজেরা প্রতিযােগিতা করে সেখানে প্রবেশ করে থাকেন।[১১৩]

তিনি তার পূর্বসূরীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই অভিন্ন জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন। কতিপয় ইসলামি পণ্ডিত তার মতাদর্শকে ইসলাম পরিপন্থী বলেও ফতোয়া দেন। তাদের বক্তব্য ছিল যে, হিন্দু মুসলিম অভিন্ন জাতি হতে পারে না। মুসলমানদের জাতীয়তা হল ইসলাম। মাদানি তাদের জবাবে বলেন, হিন্দু মুসলিম অভিন্ন মিল্লাত হতে পারে না। তবে অভিন্ন জাতি হতে পারে। কুরআনের অসংখ্য স্থানে মুসলিম ও অমুসলিম সকলকে যুক্ত করে অভিন্ন জাতি হিসেবে নির্দেশ করা আছে। ‘জাতি’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবােধক। এই ব্যাপকতার দরুন বহু নবী নিজের অমুসলিম জাতিকে ‘ইয়া কওমি' (হে আমার জাতি) বলে সম্বােধন করেছেন। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতেও জাতীয়তার মৌল উপাদান শুধুমাত্র ধর্ম নয়। ভাষা, অঞ্চল, ভূখণ্ড, পেশা ইত্যাদির নিরিখেও জাতীয়তা গড়ে উঠে। কাজেই হিন্দু-মুসলিমকে অভিন্ন জাতি বলা ইসলাম পরিপন্থী নয়।[১১৪]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ভারত দ্রুত স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়। স্বাধীনতার মূহুর্ত যত ঘনিয়ে আসে ভারতের শাসনতন্ত্র ও তার রূপরেখা বিষয়ক প্রশ্ন তত প্রকট হতে থাকে। কংগ্রেস, মুসলিম লীগজমিয়ত উলামায়ে হিন্দ প্রত্যেকে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির আলােকে শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি চিন্তাভাবনা করতে থাকে। শাসনতন্ত্রের ব্যাপারে কংগ্রেসের উচ্চপদস্থ নেতারা অবিভক্তি ও অসাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে আগ্রহী থাকলেও সেখানে এমন কতিপয় নেতা ছিল, যারা কট্টর হিন্দু সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী। এ অংশটি মুসলমানদেরকে সংখ্যালঘুর পর্যায়ে রেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নেতৃত্বে সরকার গঠনের চিন্তা ভাবনা করে।

মাদানি তাদেরকে এ ধরনের চিন্তা ভাবনা করা অন্যায় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। ১৯৩৯ সালে জমিয়তের বার্ষিক অধিবেশনের ভাষণে ঐ গ্রুপকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, “ভারতীয় রাজনীতিকদের একটি অংশ স্বাধীন ভারতের শাসনতন্ত্র সম্পর্কে এমন স্বপ্ন দেখছেন যে, সরকার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের মাধ্যমে গঠিত হবে। আর মুসলমানদের রাখা হবে সংখ্যালঘুর পর্যায়ে। ফলে মুসলমানদের জীবন ও অস্তিত্ব ঐ সংখ্যাগরিষ্ঠের দয়া ও ইচ্ছার অধীন হয়ে থাকবে। এটি তাদের একান্ত স্বপ্ন মাত্র। এ ইচ্ছা কোন দিন বাস্তবায়িত হবে না, হতে পারে না। এটি চক্ষুহীন রাজনীতিপ্রসূত কল্পনা। চক্ষুষ্মান চিন্তাশীল মানুষের কাছে এ ধারণা কোন পাত্তা পাবে না।”[১১৫]

মাদানি এ মর্মে আরও বলেন, “ভারতবর্ষে মুসলমানের সংখ্যা ইউরোপের বড় বড় যে কোন দেশের সম্মিলিত লােকসংখ্যার চেয়েও অনেক বেশী। ভারতবর্ষের বিনির্মাণে মুসলমানদের অবদান সর্বাধিক। এখানে তাদের সংখ্যা ৯/১০ কোটির মত। এখানকার সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিনির্মাণেও মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ভৌগােলিক দিক থেকেও তাদের সুদৃঢ় শক্তি রয়েছে। গােটা ভারতের মােট ১১টি সুবার ৪টি সুবায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। যদি সুবাগুলাে নতুনভাবে সংস্কারপূর্বক পূনর্গঠন করা হয় তাহলে প্রস্তাবিত ১৩টি সুবার ৬টির মধ্যে তাদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। এহেন অবস্থায় মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক সংখ্যালঘু আখ্যা দিয়ে অপরাপর সংখ্যালঘুদের ন্যায় গণ্য করার চেয়ে মারাত্মক অন্যায় কিছুই হতে পারে না। দুনিয়াতে এর চেয়ে বড় প্রতারণা আর কি থাকতে পারে?”[১১৬]

স্বাধীন ভারতের শাসনতন্ত্র কিরূপ হবে তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি জটিলতা দেখা দেয় মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে। সমগ্র ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৯—১০ কোটি আর হিন্দুদের সংখ্যা ৩৫ কোটির বেশী। মুসলমানরা হিন্দুদের ৪ ভাগের ১ ভাগ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার গঠিত হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৪টি সুবায় মুসলিম সরকার গঠিত হলেও মুসলিম সংখ্যালঘু অন্যান্য সুবা এবং কেন্দ্রীয় সরকারে সব সময়ই প্রাধান্য থাকবে হিন্দুদের। পরিণামে মুসলমানরা নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকবে। এ সমস্যা লক্ষ্য করেই মুসলিম লীগ নেতারা পূর্ব থেকেই মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলাের সমন্বয়ে একটি পৃথক ভূখণ্ড রচনার চিন্তা করেন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, আমরা ৫ কোটি মুসলমানের নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে ৩ কোটি মুসলমানের ক্ষতিগ্রস্ততা সহ্য করে যাচ্ছি। কিন্তু মুসলিম লীগের এ চিন্তার সাথে মাদানি একমত হতে পারেন নি। তিনি মনে করেন যে, পৃথক ভূখণ্ড রচনার পদক্ষেপ হিন্দু-মুসলিম সকলের স্বার্থবিরােধী। এ পদক্ষেপ দ্বারা ভারতীয়দের বর্তমান সমস্যার নিরসন তাে হবেই না বরং আরও জটিল আকার ধারণ করবে।[১১৭] এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সংখ্যালঘু সুবার ৩ কোটি মুসলমানের প্রতি নির্মমতা প্রদর্শন করা হবে। অধিকন্তু উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজের উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ সমস্যার উদ্রেক হবে। তাছাড়া শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও এটি খিয়ানতমূলক সিদ্ধান্ত যা গ্রহণ করা কোন মুমিনের পক্ষে সম্ভব নয় । লীগ নেতাদের সেই চিন্তাভাবনার কথা উল্লেখ করে সাহারানপুরের ভাষণে তিনি বলেন, “অপর একটি প্রতিক্রিয়াশীল দল যারা প্রথমােক্ত দলের বিপরীতে ভারতের ভৌগােলিক ঐক্য খান খান করে নিজেদের পৃথক ভূখণ্ড রচনার এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে নিজেদের ভাগ্য সংশ্লিষ্ট করার জন্য ইচ্ছুক। এ দলটি বিভক্তির দাবীকে অতি উন্নত পােষাকে সজ্জিত করে পেশ করছে এবং অত্যন্ত জোরেশােরে জনগণকে গিলানাের চেষ্টা করছে। তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই যে, ভারতবর্ষের প্রত্যেক সুবায় মুসলমানের বসবাস রয়েছে। প্রত্যেক সুবায় তাদের ধর্মীয় পবিত্র স্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা, গােরস্তান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আওফাক ও খানকা এত বিপুল সংখ্যক বিদ্যমান, যেগুলাে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া কোন ক্রমেই সম্ভব হবে না। বিভক্তির পরিণামে ঐ মুসলমানদের অবস্থা কি দাঁড়াবে, সেই দিকটি তারা আদৌ চিন্তা করেন না। তিনি আরও বলেন, “যারা পৃথক ভূখণ্ডের দাবী করছেন তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের নিরিখে এ কথা স্পষ্ট যে, খণ্ডিত অংশের শাসন ব্যবস্থা কোন ইসলামি শাসন ব্যবস্থা হবে না। সেটি হবে ইউরােপীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। কাজেই ভারতকে হিন্দু ভূখণ্ড ও মুসলিম ভূখণ্ডে খণ্ডিত করা হলে হিন্দু ভূখণ্ডে মুসলমানদের সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ ১৪ % আর সর্বনিম্ন ৫ %। আনুপাতিক এই হার ঐ ভূখণ্ডে মুসলমানদেরকে জীবন্ত সমাধিস্ত করা বৈ কিছুই নয়। অপর দিকে মুসলিম ভূখণ্ডে অমুসলিমদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৫% যা মুসলিম সরকারের জন্য নিত্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকবে।”

মাদানির মতে কয়েকটি বিশেষ দিকে লক্ষ্য রেখে; যথা: ভূখণ্ডের অখণ্ডতা বজায় রাখা, প্রধান ২ টি সম্প্রদায় তথা হিন্দু ও মুসলিমের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমান অধিকার ভােগের ব্যবস্থা করা, ছােট বড় প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা, সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষিত রাখা এবং সর্বপ্রকারের সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরােধের চেষ্টা করা; জমিয়ত উলামার নেতৃত্বে বিপ্লবী আলেমগণ শাসনতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের একটি ফর্মুলা তৈরি করেন।[১১৮] ১৯৪২ সালে জমিয়তের লাহাের অধিবেশনে ঐ ফর্মূলা গৃহীত হয়। মাদানির উদ্যোগে ফর্মুলা রচিত হয়েছিল বিধায় এটি ‘মাদানি ফর্মুলা’ নামে পরিচিত। এ ফর্মুলার নিরিখে স্বাধীন ভারতের জন্য শাসনতান্ত্রিক রূপরেখার প্রস্তাবনা ছিল নিম্নরূপ:[১১৯]

  • স্বাধীন ভারতের জন্য মৌলিক কিছু নীতিমালার আলােকে সুবাগুলাের সমন্বয়ে কনফেডারেশন ধরনের একটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হবে।
  • এই কনফেডারেশনে যােগদানকারী প্রত্যেক সুবা নিজ নিজ স্থানে থাকবে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসনের অধিকারী।
  • কেন্দ্রীয় সরকার কোন সুবার স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করবে না।
  • কেন্দ্রের হাতে কেবল ঐ সকল অধিকারই থাকবে যেগুলাে ফেডারেশন সদস্যদের সম্মিলিত রায়ে গৃহীত হবে।
  • সুবা সরকারের হাতে থাকবে অলিখিত অন্যান্য সকল ক্ষমতা।
  • প্রত্যেক সরকার সংখ্যালঘুদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণে বাধ্য থাকবে এবং তারা যেভাবে ভাল মনে করবে, সে ভাবে সংখ্যালঘুদের পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন সংখ্যাগরিষ্ঠরা নিজেদের গরিষ্ঠতার কারণে উপকৃত হতে পারে, পাশাপাশি সংখ্যালঘিষ্ঠরা সামগ্রিকভাবে সুস্থির ও নিরাপদ জীবন যাপনের পূর্ণ সুযােগ পায়।

এ ফর্মুলা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের বিপরীত ছিল। এই ফর্মুলায় দেশীয় সম্প্রদায়গুলাের মধ্যে ধর্মীয় কিংবা আঞ্চলিকতার কোন প্রতিহিংসা পছন্দ করা হয়নি এবং বিদেশী কোন শক্তিকেও এমন কোন সুযােগ দেওয়া হয়নি, যার দ্বারা বিদেশীরা ভারতকে খণ্ডিত করে মুসলমানদেরকে নিজেদের কূটনৈতিক আধিপত্য কায়েমের হাতিয়ারে পরিণত করতে পারে।[১২০] এ প্রসঙ্গে মাদানি বলেন, “এ সব ব্যপারকে শুধু হিন্দু বৈরিতার দৃষ্টিতে বিচার না করা চাই। পাকিস্তানের নামে যেই প্রস্তাব পেশ করা হচ্ছে, সেটির ভাল মন্দ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। আমাদের ভাবতে হবে যে, প্রস্তাবিত পাকিস্তান সরকার ব্যবস্থা আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে কিনা? আমাদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য যথােপযুক্ত হবে কিনা? সেই দৃষ্টিতে চিন্তা করলে দেখা যায়, যে সকল সুবায় মুসলমান সংখ্যালঘু, তাদের জন্য যত বেশি সম্ভব অধিকার সংরক্ষণ করে সুবাগুলােকে ভারত ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত রাখা এবং অবিভক্ত ভারতের রাষ্ট্রীয় উপায়-উপকরণের দ্বারা উপকৃত হয়ে মুসলিম মিল্লাতকে একটি জীবন্ত ও শক্তি সম্পন্ন অন্যতম বৃহত্তম সম্প্রদায়ে পরিণত করা-ই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার দাবী।”[১২১]

মাদানির পূর্ণ অসম্মতির উপরই ভারত বিভক্ত হয়। বিভক্তির পর তিনি উভয় ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষিত রাখা জরুরী বলে মত প্রকাশ করেন। তার অবিভক্তির চেষ্টা ব্যর্থ হলেও তিনি ভাগ্যকে মেনে নেন এবং পেছনের দিকে না তাকিয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য যা করণীয় তা সম্পাদনে পুনরায় আত্মনিয়ােগ করেন। ভারত বিভক্তির কারণে মুসলমানরা উভয় ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উভয় ভূখণ্ডেই তার শিষ্য, কর্মী ও ভক্তরা ছিলেন। তিনি প্রত্যেককে স্ব-স্ব ভূখণ্ডে অবস্থিত মুসলমানদের সেবায় আত্মনিয়ােগের আদেশ দেন।[১২২] এ আদেশের কারণে পাকিস্তান ভূখণ্ডে অবস্থিত বহু জমিয়তকর্মী পরবর্তীকালে মুসলিম লীগে যােগদান করে পাকিস্তানের সেবায় নিয়ােজিত হয়।

বিভক্তির পূর্বে ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৯ কোটির বেশী। কিন্তু বিভক্তির পর ভারতের মূল ভূখণ্ডে মুসলমানদের সংখ্যা ৩/৪ কোটিতে নেমে যায় এবং তারা দুর্বল একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। মাদানি তাদেরকে সান্ত্বনা দেন এবং ভাগ্য মেনে নেওয়ার উপদেশ দিয়ে তাদেরকে নতুনভাবে একটি শক্তিশালী সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে উঠার সাহস যােগান। তার মতে শক্তির মানদণ্ড জনসংখ্যার আধিক্য নয়। শক্তির মানদণ্ড হল খাঁটি ঈমান, তাকওয়াজিহাদের অনুপ্রেরণা।

তিনি ভারতীয় মুসলমানদের ভাগ্য উন্নয়নের পথনির্দেশ করে ১৯৪৮ সালে জমিয়তের বােম্বাই অধিবেশনে বলেন, “ভারতে মুসলিম জনশক্তি যদিও দুই সপ্তমাংশ থেকে এক সপ্তমাংশে নেমে গিয়েছে এবং তাদের বহুকালের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা নষ্ট হয়ে গিয়েছে তবুও ইন্ডিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত মুসলমানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলা যায় না। তবে এর জন্য প্রয়ােজন মুসলমানদের নিজেদের কাজকর্ম ও নিজেদের অবদানের দ্বারা নিজেদেরকে দেশের কল্যাণকামী প্রমাণ করা। যদি মুসলমানরা ভারতে নিজেদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে চায়, তাহলে কর্ম ও অবদানের মাধ্যমে নিজেদের গুরুত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা প্রমাণ করা আবশ্যক। তারা দেশের জন্য যতবেশী উপকারী প্রমাণিত হবে, তাদের মর্যাদা ও সম্মান ততই বৃদ্ধি পাবে। আপনারা নিজেদের মধ্যে দেশ ও দেশবাসীর সত্যিকার সেবক হওয়ার যােগ্যতা সৃষ্টি করুন। নিঃসন্দেহে বিজয় ও সফলতা আপনাদের পদ চুম্বন করবে।”[১২৩]

ভারত ভূখণ্ডে অবস্থিত মুসলমানদেরকে তিনি দাওয়াত, জিহাদ ও মুজাহাদার জন্য বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন। তার মতে ভারতে মুসলমানদের অবস্থান ইসলামের নবীর মক্কা নগরীতে অবস্থানের সাথে তুলনীয়। নবী মক্কায় থাকাকালে যেমন মুসলমানদের আকীদার পরিশুদ্ধ করা, ঈমান, আমল ও আখলাকের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রতি বেশি জোর দেন, ভারতীয় মুসলমানদেরকেও তদ্রুপ ঐ বিষয়গুলাের উপর বেশি জোর দেওয়া আবশ্যক। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য তরবারীর দ্বারা নয় বরং ঈমান, আখলাক ও আদর্শের দ্বারা অমুসলিমদের জয় করার পন্থা মেনে চলতে হবে।

বােম্বাই ভাষণে তিনি আরও বলেন, “আপনাদের সম্মুখে ইসলামের শিক্ষা, পবিত্র কুরআনের আদেশ, উপদেশ ও বিধানাবলীর সবই উপস্থিত। আপনারা যদি এ বিধানের আলােকে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হন, তা হলে আপনাদের মর্যাদা ও গৌরব পুনরায় রচিত হতে পারে এবং আপনাদের মাঝে এমন বহু মনীষী জন্ম নিতে পারেন, যারা হিন্দু-মুসলিম সকলের আরাধ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন, যাদেরকে সকল দল ও সকল সম্প্রদায়ের ভাল মানুষেরা ইজ্জত ও সম্মানের চোখে দেখতে বাধ্য হবে। আজ মুসলমানদের কাছে জিহাদের শুধু শব্দটিই আছে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছে যে, মক্কাবাসীর ন্যায় ইসলাম বিদ্বেষী ও ধর্ম বিদ্বেষী কাফির শ্রেণীর মােকাবেলায় মুসলমানদের ধৈর্য ও সহনশীলতার উন্নত আদর্শ প্রদর্শনকে ইসলামে সবচেয়ে বড় জিহাদ বলে অভিহিত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে নিজেদেরকে মন্দ চেতনা, খাহেশাতের অনুসরণ ও মন্দ চরিত্র ইত্যাদি থেকে দূর করে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ মােতাবেক মানবতার উত্তম চেতনা ও উত্তম চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত করাকে জিহাদে আকবর বলা হয়েছে। এই উত্তম জিহাদ সম্পাদনের জন্য অস্ত্রসস্ত্র কিংবা গােলা বারুদের প্রয়ােজন হয় না। প্রয়ােজন শুধু দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে আমল করা, যা জগতের বড় বড় যুদ্ধাস্ত্র থেকেও অনেক বেশি শক্তি সম্পন্ন।”[১২৪]

তিনি পাকিস্তান ও পাকিস্তানি মুসলমানদের সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক সকল দিক থেকে সুসম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দেন। বিভক্তির যৌক্তিকতা ও অযৌক্তিকতা বিষয়ে দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর কোথাও কোন বিতর্কে লিপ্ত হওয়া তার দৃষ্টিতে একটি নিষ্ফল কর্ম ছাড়া কিছুই নয়। ১৯৫১ সালে জমিয়তের হায়দ্রাবাদ অধিবেশনে তিনি বলেন, “বিশ্ব মানচিত্রে যেভাবে ভারতের রাজনৈতিক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্রুপ পাকিস্তানও বিশ্ব রাজনীতির একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করেছে। তাই এখন আর পুরাতন কিসসার পুনরাবৃত্তি করে শুকিয়ে যাওয়া ঘা চুলকানাের অর্থ নেই। এখন সেটি মেনে নেওয়ার মধ্যেই কল্যাণ।”

মাদানি আরও বলেন, “বর্তমানে শুধু ভারতের জন্যই নয়, সমগ্র এশিয়ার স্বার্থ রক্ষার প্রয়ােজনেও ভারত-পাকিস্তান এই দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক ও আস্থা গড়ে তােলা আবশ্যক। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলাে পারস্পরিক সমঝােতার মাধ্যমে নিরসন করা হবে কল্যাণকর পন্থা। এ চেষ্টা অব্যাহত থাকলে দুই ভূখণ্ডের মুসলমানগণ ক্রমান্বয়ে নিকটবর্তী হবে। তাদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হবে। পারস্পরিক আসা যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। বিশেষতঃ বণ্টন ও বিভক্তিকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক যেই তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ক্রমে দূরীভূত হয়ে সকলের মধ্যে প্রেম ও ভালবাসার বন্ধন গড়ে উঠবে।”[১২৪]

তবে কখনাে এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক কোন বিষয়ে মতবিরােধ দেখা দিলে মুসলমানদের কী করণীয় হবে সেটিও তিনি আলােচনা করেন। তার মতে, যেহেতু উভয় ভূখণ্ডেই উল্লেখযােগ্য সংখ্যক মুসলমান আছেন সেহেতু প্রত্যেক দেশের মুসলমানরা নিজ নিজ দেশের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার যিম্মাদার। পাকিস্তানি মুসলিম জনগণ পাকিস্তানে অবস্থিত মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়কে অগ্রাধিকারের সাথে চিন্তা করবে। ভারতীয়রা ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করবে। বােম্বাই অধিবেশনের ভাষণে তিনি স্পষ্ট বলেন, “ভারতবর্ষের বিভক্তি মুসলিম স্বার্থকেও বিভক্ত করে দিয়েছে। কাজেই যেই কাজ পাকিস্তানি মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর হবে, সেটি ভারতীয় মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর হওয়া আবশ্যক নয়। অনেক সময় দুই দেশের মুসলিম স্বার্থের মধ্যে বৈপরীত্যও ঘটে যেতে পারে। অনুরূপে যে কাজ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর, সেটি পাকিস্তানি মুসলমানদের জন্যও কল্যাণকর হবে এমন নয়। বরং হতে পারে যে, কোন কাজ হয়ত পাকিস্তানি মুসলমানদের জন্য খুবই উপকারী অথচ এটি ভারতীয় মুসলমানদের বেলায় সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক। মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণে এ ধরনের কোন বৈপরীত্য দেখা দিলে প্রশ্ন উঠবে যে, আমরা পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করবাে, না ভারতের স্বার্থ? স্পষ্ট কথা, স্বভাবিকভাবে আমাদের উপর পাকিস্তানি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের দায়িত্বশীল। আমাদের উপর ভারতের ৩ কোটি মুসলমানের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব অর্পিত। তাই আমাদের সর্বাবস্থায় এমন পদ্ধতি ও নীতি অবলম্বন করা আবশ্যক, যা ভারতীয় মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর বিবেচিত হবে। আমরা সদিচ্ছা পােষণ করি যেন ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সম্পর্ক যতটুকু সম্ভব দৃঢ় ও শক্তিশালী হতে পারে। উভয় দেশের মুসলমানরা যেন শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে ইসলামী সঠিক আদর্শের উপর জীবন যাপনে সক্ষম হয়।”[১২৪]

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান[সম্পাদনা]

শিক্ষা দর্শনে তিনি মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবির অনুসারি ছিলেন। দেওবন্দে পড়ার সময় তিনি নানুতুবিকে পান নি, এর আগেই নানুতুবির মৃত্যু হয়। তবে নানুতুবির শিষ্য মাহমুদ হাসান দেওবন্দির মাধ্যমে তার উপর এই দর্শন প্রভাব বিস্তার করে। তার শিক্ষালাভ, শিক্ষকতা ও শিক্ষা বিস্তারের কাজকর্ম নানুতুবি শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে বিকশিত হয়েছিল।

আধ্যাত্মিকতা[সম্পাদনা]

মাদানির বিভিন্ন পরিচয় থাকলেও তার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল আধ্যাত্মিকতা, এটিই তার মূল পরিচয়। মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবির মত তিনিও নিজের আধ্যাত্বিক পরিপূর্ণতা লুকিয়ে রাখতেন। আধ্যাত্বিকতা চর্চায় তার প্রথম ও প্রধান উৎস ছিল নিজ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তিনি বংশগতভাবে ও শিক্ষাগতভাবে আধ্যাত্মিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার পূর্বপুরুষ সকলেই পীর ছিলেন। দেওবন্দ আগমনের পর তিনি যে সকল শিক্ষকের কাছে অধ্যয়ন করেছেন তারাও সমকালীন শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের দুই বিখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফজলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদী ও ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি। মাদানির পিতা গঞ্জে মুরাদাবাদীর খলিফা ছিলেন। তিনি পিতার কাছ থেকে খেলাফত পাওয়ার মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতায় গঞ্জে মুরাদাবাদীর সাথে সম্পৃক্ত হন। মুহাজিরে মক্কির খলিফা ছিলেন রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি। মাদানি গাঙ্গুহির কাছ থেকে খেলাফত পাওয়ার মাধ্যমে মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতায় মুহাজিরে মক্কির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। [১২৫]

রচনাবলি[সম্পাদনা]

মাদানি লেখক হিসেবেও সমাদৃত ছিলেন। তিনি ধর্ম, অর্থনীতি এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে অসংখ্য বই লিখেছিলেন। তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে ব্রিটিশরা ভারতীয় জনগণকে শোষণ করেছিল। তার বইগুলিতে তিনি ব্রিটিশদের নীতি সমালোচনা করে বিশ্লেষণ করেছেন এবং ভারত থেকে ব্রিটিশদের সম্পদ আহরণের বর্ণনা দিয়েছেন।[১২৬] তার রচিত বইসমূহের মধ্যে রয়েছে:

নাম প্রকাশকাল প্রকাশনী বিষয়বস্তু তথ্যসূত্র
মুত্তাহেদায়ে কাওমিয়াত আওর ইসলাম ১৯৩৮ মক্তবায়ে মজলিসুল মাআরিফ, দেওবন্দ সম্মিলিত জাতীয়তাবাদ
নকশে হায়াত ১৯৫৩ মাকতাবায়ে দ্বীনিয়্যাত আত্মজীবনী [১২৭]
সালাসিলে তাবিয়্যাহ
মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম (৪খন্ড)
ফাতাওয়ায়ে শায়খুল ইসলাম
আসীরে মাল্টা
সিয়াসী মাক্বালাত (২ খন্ড)
তাক্বরিরে বোখারী
তাক্বরিরে তিরমিযি
মাকতুবাতে তাসাউফে মাদানি
শিহাব আস-সাক্বিব

পরিবার[সম্পাদনা]

ভারতের আজমগড়ের এক মহিলার সাথে তার প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই সংসারে তার দুটি কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিল। বড় মেয়ে জোহরা, যিনি চৌদ্দ বছর বয়সে সিরিয়া যাওয়ার পথে অ্যাড্রিয়োনপল শহরে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে সেখানেই কবর দেওয়া হয়েছিল। এর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় কন্যাও মারা যায়। তারপরে তার প্রথম স্ত্রী দীর্ঘস্থায়ী জ্বর এবং যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।[১২৮]

এরপর তিনি মোরাদাবাদের হাকিম গোলাম আহমদের জ্যেষ্ঠ কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সংসারে তার দুই পুত্র আখলাক আহমদ এবং আশফাক আহমদ জন্মলাভ করেছিল। আখলাক আহমদ আট বছর বয়সে এবং আশফাক আহমদ দেড় বছর বয়সে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মা-ও সিরিয়া যাওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। মাদানি মাল্টায় কারাবন্দি অবস্থায় এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল।[১২৮]

দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি হাকিম গোলাম আহমদের দ্বিতীয় কন্যাকে বিয়ে করেন। এই সংসারে তিনি দুটি সন্তানের জন্মদান করেন: আসআদ মাদানি এবং মাজেদা নামে এক কন্যা। মাজেদা শৈশবেই মারা যায়, তখন মাদানি সিলেটে অবস্থান করছিলেন। ১৯৩৬ সালের ৫ নভেম্বর তার এই স্ত্রী মারা যান, যখন আসআদ মাদানির বয়স ছিল ৯ বছর। তাকে মাজারে কাসেমিতে সমাহিত করা হয়।[১২৮]

তার তৃতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে তিনি সিলেট যাচ্ছিলেন, যা প্রতি রমজানে তার রীতি ছিল। আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা করার জন্য তিনি কয়েক দিন তান্দায় থেমেছিলেন। এখানেই চাচাত ভাই বশিরুদ্দিনের মেয়ের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব করা হয়। তখন মাদানির বয়স ষাটের কাছাকাছি এবং মেয়ের বয়স ২২ বছর। বয়সের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে মাদানি প্রথম দিকে এই বিবাহে আগ্রহী ছিলেন না। পরবর্তীতে আত্মীয়স্বজনের চাপ এবং ইস্তেখারা করে এই বিবাহে রাজি হন। এই সংসারে তার দুই পুত্র ও পাঁচ মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। দুই ছেলের নাম আরশাদ মাদানিআসজাদ মাদানি। পাঁচ কন্যার নাম রাইহানা, সাফওয়ানা, রুখসানা, ইমরানা এবং ফারহানা। এই সব সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল এমন এক সময়ে যখন তার বয়স সত্তর বছরের বেশি। তার কনিষ্ঠ সন্তান আসজাদ মাদানি জন্মগ্রহণের সময় তার বয়স ছিল আশি বছর। তার এই স্ত্রী ২০১২ সালের ৫ জুলাই ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।[১২৮]

মৃত্যুবরণ[সম্পাদনা]

১৯৫৫ সালে তিনি হজ্জে গমন করেন, যা ছিল তার জীবনের শেষ হজ্জ। এ হজ্জের পর তিনি বেশিদিন বেঁচে থাকেন নি। ঐ বছর জেদ্দা নৌবন্দরে তাকে রাজকীয় সম্মান জানানো হয় এবং তাকে স্বাগত জানিয়ে জাতীয় পত্রিকায় বিশেষ প্রবন্ধ ছাপানো হয়। হজ্জ শেষে মদিনা থেকে বিদায়ের সময় তিনি মুআজাহা শরীফে তিন ঘণ্টা দাড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন।[১২৯] এ সফরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে ভারতে এসে পূর্বের ন্যায় একটানা সফর করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১৯৫৭ সালের ৪ জুলাই তিনি দেড় মাসের সফর সূচি নিয়ে মাদ্রাজ গমন করেন। অত্যধিক অসুস্থতায় ১৫ দিন যেতেই সফর থেকে ফিরে আসেন। ২৫ আগস্ট হাদিসের অধ্যাপনা করাও তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি এই দায়িত্ব ফখরুদ্দীন আহমদ মুরাদাবাদীর নিকট ন্যস্ত করে বাসায় অবস্থান করেন।[১৩০] ১ ডিসেম্বর তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন। ৫ ডিসেম্বর সকাল ৯টা বাজে কামরা থেকে বের হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে নিজ কামরায় বিশ্রামে চলে যান এবং এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।[১৩১] পরদিন শুক্রবার সকাল ৯টায় দারুল উলুম দেওবন্দ চত্বরে মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভির ইমামতিতে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মাজারে কাসেমিতে মাহমুদ হাসান দেওবন্দির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।[১৩২] মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর ৬ মাস ২৪ দিন।

ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বলেছিলেন,

দারুল উলুম দেওবন্দজমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি খুবই ব্যথিত। তিনি একজন মহান ব্যক্তি, ইসলামি পণ্ডিত এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিক ছিলেন। এটি জাতির জন্য এক অসামান্য ক্ষতি হল।”

প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহ্‌রু বলেছিলেন,

“মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির মৃত্যুর সংবাদ আমার অনুভূতিকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে, হুসাইন আহমদ মাদানির মৃত্যু একজন দেশপ্রেমিকের মৃত্যু। তিনি জাতীয় আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই ঘটনায় আমি তার পরিবার ও দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতি সমবেদনা জানাই।

শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন,

“হুসাইন আহমদ মাদানি জাতির জন্য যে ভূমিকা পালন করেছেন তা অনেক মূল্যবান,আমরা তাকে ভুলতে পারি না যিনি জাতির পক্ষে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। তিনি কংগ্রেসে একটি নতুন চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কারাগারে ও বাইরেও তিনি বহু কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু এক বিরাট জাতীয় ক্ষতি।”

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

২০১২ সালে প্রকাশিত ভারতের ডাকটিকিটে হুসাইন আহমদ মাদানি
সিলেটে হুসাইন আহমদ মাদানির স্মৃতিতে নির্মিত মাদানি চত্বর

১৯৫৪ সালে ভারত সরকার কর্তৃক তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন।[১৩৪] ২০১২ সালের ২৯ আগস্ট ভারতীয় ডাক বিভাগ তার সম্মানে একটি স্মারক ডাকটিকিট বের করেছিল।[১৩৩] দেওবন্দে তার নামে একটি সড়কের নাম “মাওলানা মাদানি রোড” এবং সিলেটে তার স্মৃতি বিজড়িত স্থানে মাদানি চত্বর নির্মিত হয়েছে।[১৩৫] ২০০১ সালে ভারতে “হুসাইন আহমদ মাদানি এডুকেশনাল ট্রাস্ট” নামে একটি শিক্ষা ও সেবামূলক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।[১৩৬] তার শিষ্যরা বিশ্বব্যাপী তার নামে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। মাদানি জীবদ্দশায় ১৯৫৪ সালে নকশে হায়াত নামে স্বরচিত একটি জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তার অনেক জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং তার উপর অনেক পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। আবুল হাসান আলী নদভী, মুহাম্মদ মিয়া দেওবন্দি, নিজামুদ্দিন আসির আদ্রাভি, কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, মুহিউদ্দীন খান, মুশতাক আহমদ তার জীবনীকারদের মধ্যে অন্যতম। তার জীবনীগ্রন্থ ও পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মধ্যে রয়েছে:

জীবনীগ্রন্থ[১৩৭]
নং গ্রন্থের নাম লেখক প্রকাশকাল ভাষা দেশ
হুসাইন আহমদ মাদানি : দ্য জিহাদ ফর ইসলাম এন্ড ইন্ডিয়াস ফ্রিডম বারবারা ডি. মেটকাল্ফ ২০০৯ ইংরেজি অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য
মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি : এ বায়োগ্রাফিকাল স্টাডি ডি. আর. গোয়েল ২০০৪ ইংরেজি কলকাতা, ভারত
মাআসিরে শায়খুল ইসলাম রহ. নিজামুদ্দিন আসির আদ্রাভি ১৯৮৭ উর্দু ভারত
দ্যা লাইফ এন্ড মিশন অফ শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. তালিমি বোর্ড, জমিয়তে উলামা ২০১৭ ইংরেজি দক্ষিণ আফ্রিকা
হায়াতে মাদানি রহ. ১৯৬২ বাংলা বাংলাদেশ
বায়োগ্রাফি অব শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. বায়েজিদ পান্ডোর সাহিব ২০০৭ ইংরেজি দক্ষিণ আফ্রিকা
চেরাগে মুহাম্মদ (সা.) কাজী মুহাম্মদ জাহিদ আল হুসাইনি ১৯৯৮ উর্দু
সীরাতে শায়খুল ইসলাম রহ. নাজমুদ্দিন ইসলাহি ১৯৮৮ উর্দু ভারত
ইহ দি শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. আবুল হাসান আজমি ১৯৯৯ উর্দু ভারত
১০ দু আজিম ইনসান মোমেন খান উসমানি ২০১৩ উর্দু পাকিস্তান
১১ শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. ফরিদুল ওয়াহিদী ১৯৯২ উর্দু ভারত
১২ হায়াতে মাদানি রহ. (আকাবির সিরিজ-১) বিলাল হুসাইন খান ২০১৫ বাংলা বাংলাদেশ
১৩ শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. আফজাল ইলাহি দেওবন্দি ১৯৬৭ উর্দু ভারত
১৪ আসীরানে মাল্টা (মাল্টার কারাগারে নির্যাতিত আকাবিরগণ) মুহাম্মদ মিয়া দেওবন্দি ১৯৭৬ উর্দু ভারত
১৫ হায়াতে শায়খুল ইসলাম : হাফেজ সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. মুহাম্মদ মিয়া দেওবন্দি ১৯৯৯ উর্দু ভারত
১৬ তাজকেরায়ে মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. ২০১৬ উর্দু ভারত
১৭ হায়াতে শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি কে হায়রাতে এন্জেজ ওয়া কিলাত আবুল হাসান বারাবাংভি ১৯৭৫ উর্দু ভারত
১৮ শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. আবদুল ওয়াহেদ বুখারী ১৯৭২ উর্দু ভারত
১৯ মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম নাজমুদ্দিন ইসলাহি ১৯৫২ উর্দু ভারত
২০ ছোটদের হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. মাহমুদাতুর রহমান ২০১৯ বাংলা বাংলাদেশ
২১ হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানির রাজনৈতিক চিন্তাধারা আবু সালমান শাহজাহানপুরী ২০০২ উর্দু পাকিস্তান
২২ বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর (হুসাইন আহমদ মাদানির সংগ্রামী জীবন ও কর্ম) কাজী মুতাসিম বিল্লাহ ২০১৫ বাংলা বাংলাদেশ
২৩ শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি : এক ছিয়াছি মুতালা আবু সালমান শাহজাহানপুরী ১৯৮৭ উর্দু পাকিস্তান
২৪ সাভানিহয়ে শায়খুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. আনোয়ার সাবরি ১৯৬৬ উর্দু ভারত
২৫ শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. স্মারক গ্রন্থ সংকলকবৃন্দ ১৯৯৩ উর্দু ভারত
  • মুহাম্মদ সুলাইমান সাবির
  • গুফরান আহমদ
  • খা'ভার হাশিমী
২৬ সাবানিহ শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. আবদুল কাইয়ুম হক্কানি ২০০৪ উর্দু ভারত
২৭ শায়খুল ইসলাম মাদানি : হায়াত ওয়া কারণামে রশিদুল ওয়াহিদী ১৯৮৮ উর্দু ভারত
পিএইচডি অভিসন্দর্ভ
নং শিরোনাম গবেষক প্রকাশকাল ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়
রিজওয়ান মালিক মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি এন্ড জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ, ১৯২০—১৯৫৭: স্ট্যাটাস অফ ইসলাম এন্ড মুসলিম ইন ইন্ডিয়া ১৯৯৫ ইংরেজি টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
মুশতাক আহমদ শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. ২০০০ বাংলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
তালাত সুলতানা খান জাতীয় আন্দোলনে হুসাইন আহমদ মাদানির ভূমিকা ২০১৪ ইংরেজি ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর মারাঠওয়াদা বিশ্ববিদ্যালয়
সায়েদা লুবনা শিরিন স্বাধীনতা আন্দোলনে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির বিশেষ উল্লেখ সহ জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের একটি গবেষণা (১৯১৯ — ১৯৪৭) ২০১৪ ইংরেজি ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর মারাঠওয়াদা বিশ্ববিদ্যালয়

কালপঞ্জি[সম্পাদনা]

মাদানির কালপঞ্জি[১৩৮]
বছর বয়স ঘটনা
১৮৭৯ জন্ম
১৮৯১ ১৩ বছর দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি
১৮৯৯ ২০ বছর দারুল উলুম দেওবন্দে পড়াশোনা সমাপ্ত
১৮৯৯ ২০ বছর রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির কাছে বায়আত গ্রহণ
১৮৯৯ ২০ বছর পরিবারের সাথে মদিনা গমন
১৯০০ ২১ বছর মসজিদে নববীতে শিক্ষাদান শুরু
১৯০১ ২২ বছর রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি থেকে খেলাফত লাভ
১৯০৮ ৩০ বছর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু
১৯০৯ ৩১ বছর প্রথমবারের মত দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষকতা শুরু
১৯১৭ ৩৯ বছর মাল্টায় কারাবরণ
১৯১৮ ৪০ বছর দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু
১৯২০ ৪২ বছর মাল্টা কারাগার থেকে মুক্তি
১৯২২ ৪৪ বছর পাকিস্তানে কারাবরণ
১৯২৫ ৪৭ বছর সিলেটে শিক্ষকতা শুরু
১৯২৮ ৫০ বছর দারুল উলুম দেওবন্দে শায়খুল হাদিস হিসেবে যোগদান
১৯২৮ ৫০ বছর আসআদ মাদানির জন্ম
১৯৩৬ ৫৯ বছর তৃতীয় স্ত্রীর মৃত্যু
১৯৩৯ ৬২ বছর হজ্জে গমন
১৯৪১ ৬৪ বছর জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি নির্বাচিত
১৯৪১ ৬৪ বছর আরশাদ মাদানির জন্ম
১৯৪৩ ৬৬ বছর নৌনিতে কারাবরণ
১৯৪৭ ৭০ বছর ভারতের স্বাধীনতা লাভ
১৯৫৫ ৭৮ বছর শেষ হজ্জ
১৯৫৭ ৮১ বছর মৃত্যু

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. আরবি বর্ণমালার সংখ্যামানের হিসাব অনুসারে চেরাগ মুহাম্মদ শব্দের মান: (৩ + ২০০ + ১ + ১০০০ + ৪০ + ৮ + ৪০ + ৪)= ১২৯৬, যা মাদানির হিজরি জন্মসাল।
  2. তার বংশধারা: شاه سید حسین احمد مدني بن سید حبیب الله بن سبد پیر علی بن سید جهانغير بخش بن سبد نور أشرف بن شاه مدن بن شاہ محمد ماه شاهي بن الله بن شاه صفة الله بن شاه محب الله بن شاہ محمود بن شاد لدهن بن شاه قلندر بن شاه منور بن شاہ راجو بن شاہ عبد الواحد بن شاه محمد زاهدی بن شاہ نور الحق بن سید شاه زيد بن سید شاه أحمد زاهد بن سید شاه حمزة بن شاه أبو بكر بن سید شاہ عمر بن سید شاہ محمد بن سید شاه أحمد توخنه تمثال رسول بن د علي بن سید حسین بن سید محمد مدني المعروف سید ناصر ترمذي بن سید حسین بن سید موسی حمصة بن سيد علي بن سیدحسين أصغر بن الإمام علي زين العابدين بن الإمام حسين ابن فاطمة بنت محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم
  3. আরবি ব্যকরণের বই
  4. ফার্সি কবি শেখ সাদির রচিত কবিতার বই
  5. মাহমুদ হাসান দেওবন্দির কাছে পঠিত কিতাবগুলো : ( ۱ ) دستور تبتدي ( ۲ ) زرابي ( ۳ ) زناني ( ٤ ) مراح الأرواح ( ٥ ) قال أقول ( ٦ ) الشرقا ( ۷ ) الهذيب ( ۸ ) شرح التهذيب ( ٩ ) القطني تصديقات ( ۱۱ ) متر قطي ( ۱۲ ) مفيد الطالبين ( ۱۳ ) نفحة اليمن ( ١٤ ) الو ( ۱۰ ) اداه الآخرين ( ١٦ ) ام للامام الترمذي ( ۱۷ ) الن للإمام البخاري ( ۱۸ ) ال للإمام أبي داود ( ۱۹ ) التفسير البيضاوي ( ۲۰ ) حبة الفكر ( ۲۱ ) شرح العقائد الشقي ( ۲۲ ) حاشيه للعﻻم الخيالي ( ۲۳ ) الموطأ الإمام مال ۲٤) الموطأ للإمام محمد)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "A Short Biography of Husain Ahmad Madani"। elwahabiya.com। 
  2. পরিষদ, সম্পাদনা (জুন ১৯৮২)। সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ ২য় খণ্ড। শেরেবাংলা নগর, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ৫১১। আইএসবিএন 954-06-022-7 
  3. এস্পোসিতো, জন এল. (২০০৩)। (হুসাইন আহমদ মাদানি)দ্য অক্সফোর্ড ডিকশনারি অফ ইসলাম (ইংরেজি ভাষায়)। অক্সফোর্ড, নিউইয়র্ক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসআইএসবিএন 978-0-19-512559-7ওসিএলসি 60655364ডিওআই:10.1093/oi/authority.20110803100124571। ১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০ ডিসেম্বর ২০২০ 
  4. "হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর জীবন ও সংগ্রাম"কালের কণ্ঠ। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-০৪ 
  5. W. Kesler Jackson (আগস্ট ২০১৩)। "A SUBCONTINENT'S SUNNI SCHISM: THE DEOBANDI-BARELVI DYNAMIC AND THE CREATION OF MODERN SOUTH ASIA"B.S., Brigham Young University, 2004 M.A., Pennsylvania State University, 2010 M.S., Syracuse University, 2011: 212—244 পৃষ্ঠা – Syracuse University-এর মাধ্যমে। 
  6. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া, আবুল ফাত্তাহ (১৯৯৮)। দেওবন্দ আন্দোলন : ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান। আল আমিন রিসার্চ একাডেমি বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ২০৯ ~~। ১২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২০ 
  7. Syeda, Lubna Shireen (২০ অক্টোবর ২০১৫)। "A study of jamiat-ulama-i-hind with special reference to maulana hussain ahmad madani in freedom movement (A.D. 1919-A.D.1947)"Dr. Babasaheb Ambedkar Marathwada University 
  8. Khan, Talat Sultana Gulam Azam Khan (১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। "Role of Husain Ahmed Madani in National Movement"Dr. Babasaheb Ambedkar Marathwada University 
  9. "Husain Ahmad Madani"Oxford Reference (ইংরেজি ভাষায়)। ডিওআই:10.1093/oi/authority.20110803100124571। ২০২১-০১-১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১২-২০ 
  10. ওয়াহিদী, ফরীদুল (১৯৯২)। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি। দিল্লী: কওমী কিতাব ঘর। পৃষ্ঠা ৩৪। 
  11. আসির আদ্রাভি, নিজামুদ্দিন (১৯৮৭)। মাআসিরে শায়খুল ইসলাম : মুজাহিদে জলিল হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি (কু.) কি মিসালি জিন্দেগী আওর কারণামা (উর্দু ভাষায়)। দেওবন্দ, উত্তর প্রদেশ, ভারত: দারুল মুয়াল্লিফীন। পৃষ্ঠা ২৩। ওসিএলসি 20799587 
  12. মাদানি, হুসাইন আহমদ (১৯৫৪)। নকশে হায়াত (উর্দু ভাষায়)। ১ম। দেওবন্দ: মুহাম্মদ আসাদ। পৃষ্ঠা ১৫। ওসিএলসি 219633287। ১০ জুলাই ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  13. খান, মুহিউদ্দীন; ছফিউল্লাহ, মুহাম্মদ (১৯৯৬)। হায়াতে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি (৩য় সংস্করণ)। ঢাকা: আশরাফিয়া লাইব্রেরি। পৃষ্ঠা ২৭। 
  14. টেমপ্লেট:মাদানি
  15. “শাজারায়ে মুবারাকা” আল জমিয়ত পত্রিকা, দিল্লী, জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ, ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮, শায়খুল ইসলাম সংখ্যা, পৃ. ৮
  16. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২১
  17. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬
  18. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭
  19. মেহবুব রিজভী, সৈয়দ (১৯৭৭)। তারীখে দারুল উলুম দেওবন্দ (উর্দু ভাষায়) (২য় সংস্করণ)। দেওবন্দ: ইদারায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ। পৃষ্ঠা ৮২। ওসিএলসি 30891962। ২৩ মার্চ ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  20. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত। ফরীদ উদ্দিন মাসউদ সম্পাদিত, শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা মাদানি : জীবন ও সংগ্রাম (১৯৯১), জামান প্রিন্টার্স, ঢাকা, পৃ. ৬
  21. রশিদুল ওয়াহিদী, ডক্টর (১৯৮৮)। শায়খুল ইসলাম মাদানি : হায়াত ওয়া কারণামে। দিল্লী: আল জমিয়ত বুক ডিপো। পৃষ্ঠা ৪৫০—৪৫৮। 
  22. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫৯
  23. নাজমুদ্দিন ইসলাহি, মাওলানা (১৯৯৩)। সীরাতে শায়খুল ইসলাম১মদেওবন্দ: মাকতাবা দ্বীনিয়া। পৃষ্ঠা ৮৩। 
  24. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯
  25. মাদানি, নকশে হায়াত, ১ম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬
  26. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৫
  27. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫—৪৬
  28. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬
  29. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১
  30. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬
  31. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৬
  32. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২
  33. হামিদী, সৈয়দ রশিদ উদ্দিন (১৯৯৫)। ওয়াকিআত ওয়া কারামাত। মুরাদাবাদ: মাকতাবায়ে নেদায়ে শাহী। পৃষ্ঠা পৃ. ১৯৪। 
  34. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৩
  35. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫
  36. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬
  37. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮০—৮১, ৮৭
  38. হাবীবুর রহমান, মাওলানা (১৯৯৮)। আমরা যাদের উত্তরসূরী : শতাধিক পীর মাশায়েখ ও উলামায়ে কেরামের জীবন কর্ম (২য় সংস্করণ)। ঢাকা: আল কাউসার প্রকাশনী। পৃষ্ঠা ১১১। 
  39. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৪
  40. আসির আদ্রাভি, ফরীদ উদ্দিন মাসউদ সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০—২২
  41. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২
  42. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯২
  43. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৩
  44. মাদানি, নকশে হায়াত, পৃ. ৭৭
  45. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪
  46. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০
  47. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৮—১৬৯
  48. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৮—১৭১
  49. মাদানি, নকশে হায়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২
  50. মুশতাক আহমদ, ডক্টর, “শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি”(ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮, ১৩ বর্ষ, ২য় সংখ্যা), মাসিক অগ্রপথিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, পৃ. ৮০—৮৩
  51. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪
  52. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৫
  53. দেওবন্দি, মুহাম্মদ মিয়া; আবু সালমান শাহজাহানপুরি (২০০৫)। উলামায়ে হক আওর উনকি মুজাহিদানা কারণামে। লাহোর: জমিয়ত পাবলিশার্স। পৃষ্ঠা ১৫১—১৫৭। আইএসবিএন 978-969-8793-25-8ওসিএলসি 70629055lay summary 
  54. মাদানি, নকশে হায়াত, ২য় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৫৪
  55. দেওবন্দি, মুহাম্মদ মিয়া (১৯৭৫)। তাহরীকে শায়খুল হিন্দ (উর্দু ভাষায়)। দিল্লী: আল জমিয়ত বুক ডিপো। পৃষ্ঠা ৮০। ওসিএলসি 978188683। ৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  56. আরশাদ, আবদুর রশিদ (১৯৭৫)। বিশ বড়ে মুসলমান (উর্দু ভাষায়)। পাকিস্তান: মাকতাবা রশিদিয়া। পৃষ্ঠা ৭৭। lay summaryসিআইএনআইআই লাইব্রেরি (১৪ জানুয়ারি ২০২১)। 
  57. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৭—১৩৯
  58. আল হুসাইনি, মুহাম্মদ জাহেদ (নভেম্বর ১৯৯৮)। চেরাগে মুহাম্মদ (স.)খান, মুহিউদ্দীন কর্তৃক অনূদিত। বাংলাবাজার, ঢাকা: মদিনা পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা ১০৮—১০৯। আইএসবিএন 984-70099-0014-3lay summary 
  59. আরশাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৬
  60. আল হুসাইনি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৩
  61. খান, মুহিউদ্দিন, হায়াতে মাওলানা, প্রাগুক্ত, পৃ.৭৯—৮০
  62. কে আলী, অধ্যাপক (১৯৮৭)। মুসলিম ও আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস। ঢাকা: আলী পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা ১৯২—১৯৩। 
  63. দেওবন্দি, উলামায়ে হক, ১ম খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ.১৯২—১৯৩
  64. দেওবন্দি, মুহাম্মদ মিয়া (১৯৭৬)। আসীরানে মাল্টা (উর্দু ভাষায়)। দিল্লী: আল জমিয়ত বুক ডিপো। পৃষ্ঠা ৩২। ওসিএলসি 20256861 
  65. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৯
  66. মাদানি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭১
  67. মাদানি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭২
  68. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০
  69. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১—১৫২
  70. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৫—২৩৭
  71. আরশাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫০
  72. মাদানি, নকশে হায়াত, ২য় খণ্ড, ৬৮২
  73. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, ১৫৪
  74. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, ১৫৬
  75. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, ১৫৮
  76. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৭—৮৯
  77. শামীমী, খোরশেদ আলম, “শায়খুল ইসলাম কা খেতাব” (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮, শায়খুল ইসলাম সংখ্যা), দৈনিক আল জমিয়ত:দিল্লি, পৃ. ৯৬
  78. আব্বাসি, মুহাম্মদ আদিল (১৯৭৮)। তাহরীকে খেলাফত। ভারত: তারাক্কী উর্দু বুক। পৃষ্ঠা ১৭৭–১৭৮। আইএসবিএন 978-969-8455-56-9ওসিএলসি 1044641120lay summary 
  79. মাদানি, ২য় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৯২
  80. ফরীদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, ২৪৫
  81. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৯—১৬০
  82. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪—১৬৫
  83. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, ডক্টর (মে ১৯৮৭)। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর (PDF)। ১ম। ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ৩৯। 
  84. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৭
  85. আরশাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৭—৪৭৮
  86. ফরীদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬২—২৬৩
  87. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২—১৭৪
  88. আরশাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮০
  89. দেওবন্দি, আসীরানে মাল্টা, প্রাগুক্ত, পৃ.১২৬
  90. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮০
  91. ড.অতুল চন্দ্র, প্রাগুক্ত. পৃষ্ঠা‌ ৪৯৮-৪৯৯।
  92. দেওবন্দি, মুহাম্মদ মিয়া (১৯৭৫)। তাহরীকে শায়খুল হিন্দ রহ. (উর্দু ভাষায়)। দিল্লি, ভারত: আল জমিয়ত বুক ডিপো। পৃষ্ঠা ৫১—৬০। ওসিএলসি 978188683lay summary 
  93. মাদানি, নকশে হায়াত, ২য় খণ্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৩৬
  94. রশীদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৫
  95. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৭
  96. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৬
  97. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭১
  98. রশীদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮০
  99. বারাবাংকুভি, আবুল হাসান (১৯৬৪)। মালফুজাতে শায়খুল ইসলাম (উর্দু ভাষায়)। দেওবন্দ: মাকতাবায়ে ইলম ও আদব। পৃষ্ঠা ১১৭। ওসিএলসি 19935472 
  100. খান, মুহিউদ্দিন, হায়াতে মাদানি রহ., প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৮
  101. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৮
  102. ফারুকি, জিয়াউল হাসান (১৯৬৩)। দ্যা দেওবন্দ স্কুল এন্ড দ্যা ডিমান্ড ফর পাকিস্তান [দেওবন্দ মতবাদ ও পাকিস্তানের দাবি] (ইংরেজি ভাষায়)। মুম্বাই: এশিয়ান পাবলিশিং হাউস। পৃষ্ঠা ২৪,২৫। আইএসবিএন 978-0210338353এএসআইএন B0000CLPB6ওসিএলসি 471548979 
  103. মাদানি, হুসাইন আহমদ; ইসলাহি, নাজমুদ্দিন (১৯৫২)। মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম (উর্দু ভাষায়)। ৪ খণ্ড। দেওবন্দ: মাকতাবায়ে দ্বীনিয়া। পৃষ্ঠা ৩৩৭—৩৪০। ওসিএলসি 20069582 
  104. ইসলাহি, নাজমুদ্দিন (১৯৮৮)। সীরাতে শায়খুল ইসলাম : ইয়ানি মুহাদ্দিসে কাবির, মুজাহিদে জলিল, শায়খে কামিল, হজরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি কু.সি. কে সাবানিহ হায়াত, কামালাত, খিদমাত, ইমতিয়াজাত ও খুসুসিয়াত কা মুফাচ্ছাল তাজকিরাহ (উর্দু ভাষায়)। দেওবন্দ, সাহারানপুর, ইউপি, ভারত: মাকতাবায়ে দ্বীনিয়া। পৃষ্ঠা ১৬২। এলসিসিএন 89903418ওসিএলসি 21149167 
  105. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৪
  106. কান্ধলভি, মুহাম্মদ জাকারিয়া (১৯৮৭)। আপবীতি (মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভির আত্মজীবনী)। সাহারানপুর, ভারত: মাকতাবায়ে শায়খ জাকারিয়া। পৃষ্ঠা ৬৪। ওসিএলসি 23687920 
  107. আবুল হাসান বারাবাংকুভি, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৭
  108. আবুল হাসান বারাবাংকুভি, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৩
  109. আবুল হাসান বারাবাংকুভি, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৬
  110. আহমদ, মুশতাক (২০০০)। শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. (PDF)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখক কর্তৃক সম্পন্ন একটি গবেষণা কর্ম। ঢাকা, বাংলাদেশ: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ৩১৫। 
  111. আবুল হাসান বারাবাংকুভি, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৬
  112. আবুল হাসান বারাবাংকুভি, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৩
  113. আবুল হাসান বারাবাংকুভি, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৪—১১৫
  114. রশিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৪—৩৮৯
  115. মাদানি, খুুুুুুতবায়ে সাদারাত লাহোর, ১৯৪২
  116. আসির আদ্রাভি, প্রাগুক্ত, পৃ.২৬৬
  117. দেওবন্দি, আসীরানে মাল্টা, প্রাগুক্ত, পৃ.১৯৭
  118. দেওবন্দি, উলামায়ে হক, প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃ.১৩৫
  119. দেওবন্দি, আসীরানে মাল্টা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৫
  120. হিফজুর রহমান সিওহারবি, ''তাহরীকে পাকিস্তান পর এক নজর'', পৃ.১৪০
  121. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ.৪৮৯
  122. ফরিদুল ওয়াহিদী, প্রাগুক্ত, পৃ.৭৮১—৭৮২
  123. মাদানি, খুতুবায়ে সাদারাত, ১৯৪৮
  124. মাদানি, খুুুুুতুবায়ে সাদারাত, প্রাগুক্ত
  125. "khulafa list of Shaikh ul Islam Hazrat Maulana Syed Hussain Ahmed Madani (rah)"www.muftisays.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০১-২৪ 
  126. খান, তালাত সুলতানা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০
  127. খান, তালাত সুলতানা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০—১০২
  128. তালিমি বোর্ড (২০১৭)। দ্যা লাইফ এন্ড মিশন অফ শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি [সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানির জীবন ও কর্ম] (PDF)দক্ষিণ আফ্রিকা: জমিয়তে উলামা। পৃষ্ঠা ১০৯—১১৩। আইএসবিএন 978-0-6399008-3-4 
  129. আল হুসাইনি, কাজী মুহাম্মদ জাহিদ (নভেম্বর ১৯৯৮)। চেরাগে মুহাম্মদ (সা.)খান, মুহিউদ্দীন কর্তৃক অনূদিত। বাংলাবাজার, ঢাকা: মদীনা পাবলিকেশন্স। পৃষ্ঠা ৪৪২। আইএসবিএন 9847009900143lay summary 
  130. আরশাদ, আবদুর রশিদ (১৯৭৫)। বিশ বড়ে মুসলমান (উর্দু ভাষায়)। পাকিস্তান: মাকতাবা রশিদিয়া। পৃষ্ঠা ৫০৮। lay summaryসিআইএনআইআই লাইব্রেরি (১৪ জানুয়ারি ২০২১)। 
  131. ইসলাহি, নাজমুদ্দিন (১৯৮৮)। সীরাতে শায়খুল ইসলাম : ইয়ানি মুহাদ্দিসে কাবির, মুজাহিদে জলিল, শায়খে কামিল, হজরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি কু.সি. কে সাবানিহ হায়াত, কামালাত, খিদমাত, ইমতিয়াজাত ও খুসুসিয়াত কা মুফাচ্ছাল তাজকিরাহ (উর্দু ভাষায়)। ২য়। দেওবন্দ, সাহারানপুর, ইউপি, ভারত: মাকতাবায়ে দ্বীনিয়া। পৃষ্ঠা ৫৩২। এলসিসিএন 89903418ওসিএলসি 21149167 
  132. রশিদুল ওয়াহিদী, ডক্টর (১৯৮৮)। শায়খুল ইসলাম মাদানি : হায়াত ওয়া কারণামে। দিল্লী: আল জমিয়ত বুক ডিপো। পৃষ্ঠা ৪৮৮। 
  133. তালাত সুলতানা, খান (১৮ নভেম্বর ২০১৪)। "জাতীয় আন্দোলনে হোসেন আহমেদ মাদানির ভূমিকা" (ইংরেজি ভাষায়)। ঔরঙ্গাবাদ, মহারাষ্ট্র: ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর মারাঠওয়াদা বিশ্ববিদ্যালয়: ২৪৮,২৪৯। 
  134. "পদ্মভূষণ পুরস্কার" (PDF)স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ভারত)। ২০১৫। ১৫ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০২১ 
  135. জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। "সিলেটের নয়াসড়ক এখন থেকে 'মাদানী চত্বর'"বাংলানিউজ২৪.কম। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জানুয়ারি ২০২১ 
  136. "ট্রাস্ট সম্পর্কে"মাদানিএডুট্রাস্টদেওবন্দ.ওআরজি। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০১-২৫ 
  137. "হুসাইন আহমদ মাদানির জীবনীগ্রন্থের তালিকা"ওয়ার্ল্ডক্যাটএলসিসিএন n84230671 
  138. তালিমি বোর্ড (২০১৭)। দ্যা লাইফ এন্ড মিশন অফ শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি [সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানির জীবন ও কর্ম] (PDF)দক্ষিণ আফ্রিকা: জমিয়তে উলামা। পৃষ্ঠা ১৪। আইএসবিএন 978-0-6399008-3-4 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

জীবনীগ্রন্থ[সম্পাদনা]

পত্রিকা[সম্পাদনা]

বই[সম্পাদনা]

সাময়িকী[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]