আশরাফ আলী থানভী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত
আশরাফ আলী থানভী
জন্মআশরাফ আলী
আগস্ট ১৯, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ/ রবিউস সানি ৫ (মতান্তরে রবিউল আউয়াল ১২), ১২৮০ হিজরী[১]
থানাভবন, উত্তর প্রদেশ, ভারত
মৃত্যুজুলাই ১৯, ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ/ রজব ১৬, ১৩৬২ হিজরী[২]
থানাভবন, যুক্ত প্রদেশ (বর্তমানে উত্তর প্রদেশ), ভারত[৩]
সমাধি স্থানথানাভবন, উত্তর প্রদেশ, ভারত
জাতীয়তাভারতীয়
জাতিভুক্তএশীয়
যুগবিংশ-একবিংশ শতাব্দী
শাখাহানাফি
আন্দোলনদেওবন্দি
মূল আগ্রহফিকহ, সমাজসেবা, রচনা
লক্ষণীয় কাজবেহেশতী জেওর, বয়ানুল কোরআন, মুনাজাতে মকবুল
শিক্ষায়তনদারুল উলুম দেওবন্দ
সুফি তরিকাচিশতিয়া তরিকা

আশরাফ আলী থানভী (জন্ম: আগস্ট ১৯, ১৮৬৩ - মৃত্যু: জুলাই ৪, ১৯৪৫) (উর্দু: اشرف علی تھانوی‎‎) ছিলেন একজন দেওবন্দী আলেম, সমাজ সংস্কারক, ইসলামি গবেষক এবং পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি ভারতের থানাভবনের নিবাসী হওয়ার কারণে তাঁর নামের শেষে "থানভী" যোগ করা হয়।[৪] ভারত উপমহাদেশ এবং এর বাইরেরও হাজার হাজার মানুষ তাঁর কাছ থেকে আত্মশুদ্ধি এবং তাসাওউফের শিক্ষা গ্রহণ করার কারণে তিনি "হাকীমুল উম্মত" (উম্মাহর আত্মিক চিকিৎসক) উপাধিতে পরিচিত। মুসলমানদের মাঝে সুন্নতের জ্ঞান প্রচারের সংস্থা দাওয়াতুল হক তাঁরই প্রতিষ্ঠিত।[৫][৬]

জীবনী[সম্পাদনা]

জন্ম ও শৈশব[সম্পাদনা]

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ১৯ আগস্ট, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে / রবিউস সানী ৫, ১২৮০ হিজরীতে ভারতের উত্তর প্রদেশের থানাভবনে জন্মগ্রহণ করেন। বুজুর্গ হাফেজ গোলাম মোর্তজা পানিপথীর নির্দেশক্রমে নবজাতকের নাম রাখা হয় "আশরাফ আলী"। তাঁর বাবার নাম ছিল আবদুল হক। তিনি উমর রা.এর বংশের লোক ছিলেন আর তাঁর মাতা ছিলেন ছিলেন আলী রা.এর বংশের।আল্লামা থানভী ভাইবোনদের মাঝে সকলের বড় ছিলেন। শৈশবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান।[৭]

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

শৈশবেই তিনি হাফেয হোসাইন আলী রাহ.-এর কাছে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেন। ফার্সিআরবি ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নিজ গ্রামেই হযরত মাওলানা ফতেহ মুহাম্মদ থানভী রাহ.-এর কাছে। ১২৯৫ হিজরীতে হাকীমুল উম্মত ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। পাঁচ বছর পর ১৯ বছর বয়সে তিনি দেওবন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি হাদীস, তাফসীর, আরবী সাহিত্য, ইসলামী দর্শন, যুক্তিবিজ্ঞান, ইসলামি আইন এবং ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম যুগের শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্রদের মাঝে তিনি অন্যতম। এরপর তিনি কেরাত (কুরআন পাঠ সম্পর্কিত একটি বিদ্যা) ও তাজবীদের (কুরআনের শব্দসমূহ সঠিকভাবে উচ্চারণ করার বিদ্যা) শিখেন মক্কা মুকাররমায় মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ্‌ মুহাজিরে মক্কীর কাছে।[২][৩]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৩০০ হিজরীতে হাকীমুল উম্মত কানপুরের ফয়যে আম মাদ্রাসায় মাসিক ২৫ টাকা বেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর জ্ঞানের কারণে তাঁর উপাধি দেয়া হয় বাহরুল উলুম (জ্ঞানের সাগর)।[২] পরবর্তীতে তিনি কানপুরের টপকাপুরে জামেউল উলূম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালকের আসন অলংকৃত করেন। সেখানে তিনি ১৪ বছর শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে ১৩১৫ হিজরীতে হাজী ইমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কীর পরামর্শে তিনি থানাভবনের খানকাহে ইমদাদিয়ায় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেই ইসলাম প্রচার, আত্মশুদ্ধি,তাসাওউফ ও রচনার কাজ করে যান।[৩]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৬ রজব, ১৩৬২ হিজরী/ জুলাই ১৯, ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে আল্লামা থানভী থানাভবনে মৃত্যুবরণ করেন।[৭] সেদিন সোমবার ছিল। তাঁর জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা যফর আহমেদ উসমানী। থানাভবনেই ইশকে বাযান নামক কবরস্তানে মুজাহিদ হাফেয জামেন শহীদ রাহ.-এর মাযারের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।[২][৩]

রচনাবলী[সম্পাদনা]

তিনি সারা জীবনে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে তিনশো গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর মাঝে অন্যতম হলো ফিকহ বিষয়ক গ্রন্থ বেহেশতী জেওর (স্বর্গের অলংকার)। যা ভারত উপমহাদেশের সাধারণ মুসলমানদের মাঝে বহুল পঠিত। এছাড়া তাঁর রচিত কুরআন শরীফের উর্দু তরজমার গ্রন্থ বয়ানুল কুরআন (কুরআনের ব্যাখ্যা) সুপরিচিত। তিনি জাতির কল্যাণের জন্য তাঁর সকল গ্রন্থের স্বত্ব উন্মুক্ত রেখেছেন।[৭] তাঁর রচিত গ্রন্থের তালিকা:

  • আল-তাকাশশুফ আন মুহিম্মাত আল-তাসাওউফ
  • তারবিয়াতুস সালেক
  • বেহেশতী যেওর (স্বর্গের অলংকার)
  • মুনাজাতে মাকবুল (গৃহীত প্রার্থনা)
  • ইসলাহুর রুসুম (কুসংস্কার সংশোধন)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া
  • কাসদুস সাবীল (মধ্যপন্থা)
  • জাযাউল আমাল (কর্মফল)
  • তালীমুদ্দীন (ধর্মশিক্ষা)
  • তোহফায়ে রমজান (রমজানের উপহার)
  • আগলাতুল আউয়াম (জনসাধারণের মাঝে প্রচলিত ভুল)
  • আপনে ঈমান কি হিফাজাত কিজিয়ে (নিজের ঈমান রক্ষা করুন)
  • মালফুযাতে কামালাতে আশরাফিয়া
  • হাসিলে তাসাওউফ
  • মাওয়ায়িযে আশরাফিয়া
  • ফাওয়ায়িদুস সুহবাত (আল্লাহ্‌ওয়ালাদের সংস্পর্শের উপকারিতা)
  • আমালে কুরআনী (কুরআনের আমল)
  • সওম আউর ঈদ কি তাকমীল
  • তোহফায়ে যাওজাইন (স্বামী-স্ত্রীর উপহার)
  • ইসলাম মে পরদা কি আহমিয়াত (ইসলামে পর্দার গুরুত্ব)
  • রমজানুল মোবারক
  • রমজান কি তিন ইবাদাতে (রমজানের তিন ইবাদাত)
  • তাতহীরে রমজান
  • রমজান কা খালিস রাখনা
  • আশরাফুত তাফসীর
  • কালিদে মসনবী
  • জামালুল কুরআন (কুরআনের সৌন্দর্য)
  • আদাবুল মুআশারাত
  • ইসলামী জিন্দেগি কি চার আহাম উসুল (ইসলামি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ চার মূলনীতি)
  • হায়াতুল মুসলিমীন
  • আশরাফিয়া খুতবা

বাণীসমূহ[সম্পাদনা]

  • প্রত্যেকেই অনুসরণীয় হতে চায়, তাহলে অনুসারী আসবে কোত্থেকে।এটাই বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. মো: আলাউদ্দীন আল আযহারী (২০০৭)। "আশরাফ 'আলী থানাভী"। সম্পাদনা পরিষদ। সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ (৫ম সংস্করণ)। বাংলাদেশ: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ৮৪–৮৫। আইএসবিএন 9840602527 
  2. "Maulana Ashraf Ali Thanwi"। সংগ্রহের তারিখ ২৯ নভেম্বর ২০১৩ 
  3. তাশরীফ, আবু (ফেব্রুয়ারী ২০১০)। "থানাভবনের ফুল"। মাসিক আলকাউসার। সংগ্রহের তারিখ ২৯ নভেম্বর ২০১৩ 
  4. আবদুল মালেক, মুহাম্মাদ (মার্চ, ২০১২)। "আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ : পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য"। মাসিক আলকাউসার। সংগ্রহের তারিখ 29 November 2013  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  5. হাসান, মুহাম্মাদ মাসরুর। "মজলিসে দাওয়াতুল হক বাংলাদেশ ও মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান"। ২৪ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৩ 
  6. বাবর, জহির উদ্দিন (ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১২)। "দাওয়াতুল হক: শুদ্ধ ও শুভ্র জীবনের পথ দেখায়"। ইসলামবার্তা ডট কম। সংগ্রহের তারিখ ২৯ নভেম্বর ২০১৩ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  7. থানভী, আশরাফ আলী। ফরিদপুরী, শামসুল হক (১৯৯৬)। বেহেশতী জেওর বঙ্গানুবাদ। বাংলাদেশ: এমদাদিয়া লাইব্রেরি। পৃষ্ঠা ১–১০। 

আরো দেখুন[সম্পাদনা]