আহ্‌মদীয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(আহ্‌মদি থেকে পুনর্নির্দেশিত)
Jump to navigation Jump to search
আহমদীয়া
احمدیہ আহমদীয়া
মোট জনসংখ্যা
১০ মিলিয়ন[১]
উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যার অঞ্চল
ধর্ম
আহ‌মদীয়া মুসলিম জামাত, লাহোর আহমদিয়া আন্দোলন
ধর্মগ্রন্থ
কুরআন, হাদিস
ভাষা
উর্দু, আরবি

আহমদীয়া (/ɑːməˈdiʲə/;[২] পূর্ণরূপ আহমদীয়া মুসলিম জামাত আরবি: الجماعة الإسلامية الأحمدية‎‎‎‎) একটি ধর্মীয় আন্দোলন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যেটির উদ্ভব হয়েছিল পাঞ্জাবে মির্যা গোলাম আহমদের জীবন ও শিক্ষার ভিত্তিতে। এটি কাদিয়ানী আন্দোলন নামেও পরিচিত। মির্যা গোলাম আহমদ (১৮৩৫-১৯০৮) শেষযুগের বিশ্বের মানুষের জন্য সংস্কারক হিসেবে প্রেরিত হবার দাবী করেছিলেন। তিনি দাবী করেছিলেন যে, আল্লাহ তাকে ইসলামের মুজাদ্দিদ (সংস্কারক), সেই প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হিসেবে প্রেরণ করেছেন যাঁর অপেক্ষা মুসলিম বিশ্ব করছিল। আহমদীয়া আন্দোলনের সদস্যগণকে আহমদী মুসলিম বা সংক্ষেপে আহমদী বলা হয়।

আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে যে (ক) মির্যা গোলাম আহমদ একজন মুজাদ্দিদ (সংস্কারক), (খ) তিনি ইসলাম ধর্মে বর্ণিত ও প্রতিশ্রুত মসীহ্‌, ইমাম মাহদী এবং প্রত্যাবর্তনকারী যীশু খ্রিস্ট, (গ) মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ’র শেষ নবী নন, এবং (ঘ) পাশাপাশি (গ) মির্যা গোলাম আহমদ ইসলামের নবী মুহাম্মদ-এর প্রদর্শিত পথে পাঠানো একজন “উম্মতী নবী”। তাদের মতে নবুয়াতের সমাপ্তি মানে আর কোন নতুন নবী আসতে পারবেন না তা নয়; নতুন নবী আসতে পারবেন তবে তিনি হবেন ‘উম্মতী নবী’ এবং তাকে অবশ্যই আল্লাহ’র রাসুল মুহাম্মদ সা: যে পথ-প্রদর্শন করে গেছেন তা অনুসরণ করতে হবে। তিনি কোনো নতুন শরীয়ত আনবেন না।[৩] মির্যা গোলাম আহ্‌মেদ কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘উম্মতী নবীর’ ধারণা কুরআনহাদীস দ্বারা সমর্থিত নয়। এ কারণে মূলধারার মুসলমানরা তাদেরকে মুসলমান বলে না।[৪][৫] পাকিস্তান সরকার আহমদীয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে। আহমদীরা মনে করে তাদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করার অধিকার কারো নেই।[৬]

আহমদীয়া মুসলিম জামাতের কার্যক্রম ক্রমবর্ধমান। পৃথিবীর ২০০ দেশে আহমদীয়াদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই সংগঠনের সদরদপ্তর লন্ডনে অবস্থিত। গোলাম আহমদের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা খিলাফত প্রবর্তন করে এবং তাদের নির্বাচিত ৫ম খলিফা মির্যা মাসরুর আহমেদ লণ্ডন থেকে এই সংগঠনের কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন।[৭] আহমদী বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডকে ‘আহ্‌মদীয়াত’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।[৮]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

উনবিংশ শতকের শেষের দিকে মির্যা গোলাম আহমদ নিজেকে একজন সংস্কারক, প্রতিশ্রুত মসীহ্‌, ইমাম মাহদী এবং প্রত্যাবর্তনকারী যীশু খ্রিস্ট হিসাবে দাবী করেন। তিনি বলেন যে, তার আগমন হয়েছে ইসলাম কে তার আসল অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে। তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আহমদীয়া মুসলিম জামাতের। ১৮৮৯ সালে মির্যা গোলাম আহমদ এই সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন যাকে পরবর্তীতে "আহমদীয়া মুসলিম জামাত" নাম দেয়া হয়। ভারতবর্ষে ১৯'শ শতকের প্রথম দিকে ইসলামের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায় খ্রিস্টান এবং আর্য সমাজীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ইংরেজ সরকারের পক্ষে অনেক পুস্তক রচনা করেন এবং জিহাদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন ।

বর্তমান অবস্থা[সম্পাদনা]

প্রচলিত কোরআন ও হাদিসের বর্ণনার সাথে আহমদীদের মতবাদের ভিন্নতা থাকায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মূলধারার মুসলমানগণ প্রথম থেকেই আহমদীয়াদের বিরোধিতা করে আসছে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান সরকার আহমদীয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করে। পাকিস্তানের মত বাংলাদেশ-এর বিভিন্ন ইসলামী দলগুলোর পক্ষ থেকে আহমদীদের অমুসলিম ঘোষণা করার জন্য আন্দোলন হতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে আহমদী মুসলমানরা বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়ে থাকেন বলে দাবি করা হয়।

বিশ্বাস[সম্পাদনা]

আহমদীয়া মুসলিম জামাত রা বিশ্বাস করে যে আল্লাহ্যীশুকে সশরীরে (জ়ীবন্ত অবস্থায়) আসমানে তুলে নিয়ে যান নি। তিনি এই পৃথিবীতেই স্বাভাবিক মৃত্যবরণ করেছেন এবং মৃত্যুর পর জান্নাতবাসি হয়েছেন। যীশুর আগমন হবে এবং তা হবে মুহাম্মদ(সঃ)এর উম্মতদের মধ্য থেকে। তাদের যুক্তি, যদি ইসলাম ধর্মকে পুনর্গঠনের জন্য জান্নাত থেকে যীশুকেই পাঠাতে হয় তাহলে মুসলমানরা কি ভূমিকা পালন করবে? যীশুর দায়িত্ব পালন করার জন্য তাই মুসলমানদের মধ্য থেকে উঠে আসবেন কেউ, যিনি ইসলাম ধর্মের পুনর্গঠনের জন্য কাজ করবেন। আর ইনি হলেন মির্যা গোলাম আহমদ

মির্যা গোলাম আহমদ নিজে আহমদীদের বিশ্বাসের ব্যপারে বলেছেন,

“আমরা ঈমান রাখি, খোদা তা‘লা ব্যতীত কোন মা‘বুদ নাই এবং সৈয়্যদানা হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র রসূল এবং খাতামুল আম্বিয়া। আমরা ঈমান রাখি, কুরআন শরীফে আল্লাহ্ তা‘আলা যা বলেছেন এবং আমাদের নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে যা বর্ণিত হয়েছে উল্লিখিত বর্ণনানুসারে তা সবই সত্য। আমরা এ-ও ঈমান রাখি, যে ব্যক্তি এই ইসলামী শরীয়ত থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয় অথবা যে বিষয়গুলি অবশ্যকরণীয় বলে নির্ধারিত তা পরিত্যাগ করে এবং অবৈধ বস্তুকে বৈধকরণের ভিত্তি স্থাপন করে, সে ব্যক্তি বে-ঈমান এবং ইসলাম বিরোধী। আমি আমার জামা‘তকে উপদেশ দিচ্ছি, তারা যেন বিশুদ্ধ অন্তরে পবিত্র কলেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’-এর উপর ঈমান রাখে এবং এই ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করে। কুরআন শরীফ হতে যাদের সত্যতা প্রমাণিত, এমন সকল নবী (আলাইহিমুস সালাম) এবং কিতাবের প্রতি ঈমান আনবে। নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত এবং এতদ্ব্যতীত খোদা তা‘লা এবং তাঁর রসূল (সা.) কর্তৃক নির্ধারিত কর্তব্যসমূকে প্রকৃতপক্ষে অবশ্য-করণীয় মনে করে যাবতীয় নিষিদ্ধ বিষয়সমূহকে নিষিদ্ধ মনে করে সঠিকভাবে ইসলাম ধর্ম পালন করবে। মোট কথা, যে সমস্ত বিষয়ে আকিদা ও আমল হিসেবে পূর্ববর্তী বুজুর্গানের ‘ইজমা’ অর্থাৎ সর্ববাদী-সম্মত মত ছিল এবং যে সমস্ত বিষয়কে আহলে সুন্নত জামা’তের সর্বাদি-সম্মত মতে ইসলাম নাম দেয়া হয়েছে, তা সর্বতোভাবে মান্য করা অবশ্য কর্তব্য। যে ব্যক্তি উপরোক্ত ধর্মমতের বিরুদ্ধে কোন দোষ আমাদের প্রতি আরোপ করে, সে তাকওয়া বা খোদা-ভীতি এবং সততা বিসর্জন দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটনা করে। কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ থাকবে, কবে সে আমাদের বুক চিরে দেখেছিল, আমাদের এই অঙ্গীকার সত্বেও অন্তরে আমরা এসবের বিরুদ্ধে ছিলাম”?

[৯]

মির্যা গোলাম আহমদের এই বক্তব্য মূলধারার ইসলামের পরিপন্থী নয়। কিন্তু নিজেকে ঈমাম মাহদী ও মাসীহ দাবী করা কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী হওয়ায় মুসলমানরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

সমালোচনা[সম্পাদনা]

কুরআনের সূরা আহযাবের ৪০তম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মদ সাঃ সর্বশেষ নবী।

হাদীসে বলা হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন "আমি শেষ নবী, আমার পরে কোন নবী নেই।" আরো বলেছেন, "আমার পরে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী নবুয়তের দাবি করবে অথচ আমিই শেষ নবী।"

কাদিয়ানীদের দাবি মতে ঈসা ইবনে মরিয়ম(আ) পুনর্জন্ম নিয়েছে। কিন্তু ইসলামের মতে একজন মানুষ শুধু একবার জন্ম নিবে।

হাদিসে থেকে জানা যায়, ঈসা ইবনে মরিয়ম(আ) আকাশ থেকে সরাসরি অবতরণ করবেন সিরিয়ার একটি মসজিদের মিনারায়। তিনি এসে ইমাম মাহদী(যিনি ফাতেমা(রা) বংশের হবেন) এর নেতৃত্বে দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। অর্থাৎ ইমাম মাহদী এবং ঈসা (আ) দুইজন আলাদা ব্যক্তি হবেন। তাই কাদিয়ানীদের দাবি ভিত্তিহীন বলে মনে করেন সুন্নি মুসলিমরা।

বাংলাদেশে আহমদীয়াত[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ক্ষুদ্র পরিসরে আহমদীয়া জামাতের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে সারা দেশে ১০৩টি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪২৫টি স্থানে আহমদীদের বসবাস বা কার্যক্রম রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুন্দরবন, আহমদনগর-শালসিঁড়ি, রাজশাহী, কুমিল্লা এবং জামালপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে আহ্‌মদীদের সংখ্যা উল্ল্যেখযোগ্য। জামাতের সাংগঠিক কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা পরিচালিত হয়। জামাতের ৬৫জন মোবাল্লেগ রয়েছে যারা জামাতের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এই জামা’ত ১৯২০ সন থেকে বাংলাদেশের প্রাচীনতম পাক্ষিক পত্রিকা ‘আহ্‌মদী’ নিয়মিতভাবে বের করে আসছে। অঙ্গসংগঠনসমূহের নিজস্ব ম্যাগাজিন/বুলেটিন রয়েছে। [১০]

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Major Branches of Religions. Adherrents.com.
  2. টেমপ্লেট:OED
  3. Finality of Prophethood
  4. "কাদিয়ানী সম্প্রদায় পর্যালোচনা"। মাসিক আলকাউসার। ফেব্রুয়ারি ২০১৩। 
  5. "কাদিয়ানী সম্প্রদায় পর্যালোচনা ২"। মাসিক আলকাউসার। মার্চ ২০১৩। 
  6. Ahmadis are True Muslims
  7. Official Website of Ahmadiyya Muslim Community
  8. http://www.ahmadiyyabangla.org/Ahmadiyyat-in-Bangladesh.htm বাংলাদেশে আহ্‌মদীয়াত]
  9. [(আইয়ামুস্‌সুলেহ্ পুস্তক, পৃষ্ঠা: ৮৬-৮৭)]
  10. বাংলাদেশে আহ্‌মদীয়াত

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]