পঞ্চগড়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
পঞ্চগড়
শহরজেলা সদর
পঞ্চগড় বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
পঞ্চগড়
পঞ্চগড়
বাংলাদেশে পঞ্চগড় শহরের অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৬°২০′০৮″ উত্তর ৮৮°৩৩′০৮″ পূর্ব / ২৬.৩৩৫৫৫৬° উত্তর ৮৮.৫৫২৩২২° পূর্ব / 26.335556; 88.552322স্থানাঙ্ক: ২৬°২০′০৮″ উত্তর ৮৮°৩৩′০৮″ পূর্ব / ২৬.৩৩৫৫৫৬° উত্তর ৮৮.৫৫২৩২২° পূর্ব / 26.335556; 88.552322
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগরংপুর বিভাগ
জেলাপঞ্চগড় জেলা
উপজেলাপঞ্চগড় সদর উপজেলা
সরকার
 • ধরনপৌরসভা
 • শাসকপঞ্চগড় পৌরসভা
 • পৌরমেয়রমো: তৌহিদুল ইসলাম[১]
আয়তন
 • মোট২২.০ কিমি (৮.৫ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)
 • মোট৪৬,০৩৮
 • জনঘনত্ব২১০০/কিমি (৫৪০০/বর্গমাইল)
সময় অঞ্চলবাংলাদেশ সময় (ইউটিসি+৬)

পঞ্চগড় বাংলাদেশের সর্বউত্তরের একটি শহর। শহরটি উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলার জেলা শহর। প্রশাসনিকভাবে শহরটি পঞ্চগড় জেলা এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর দফতর। করতোয়া নদীর পাশে অবস্থিত এ শহরটি হিমালয়ের এতই কাছাকাছি অবস্থিত যে মাঝেমাঝে এ শহরে দাঁড়িয়েই দেখা যায় হিমালয় পর্বত।

নামকরণ[সম্পাদনা]

পঞ্চগড় নামকরণেও রয়েছে এক ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস। পঞ্চগড় নামকরণ সমন্ধে কতিপয় মতের মধ্যে একটি এরূপ যে, এ অঞ্চলটি অতি প্রাচীনকালে ‘পুণ্ড্রনগর রাজ্যের অর্ন্তগত ‘পঞ্চনগরী’ নামে একটি অঞ্চল ছিল। কালক্রমে পঞ্চনগরী ‘পঞ্চগড়’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এই অঞ্চলের নাম যে, পঞ্চগড়ই ছিল সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। সুতরাং পঞ্চগৌড়ের একটি অংশ হিসেবে প্রাকৃত ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পঞ্চগড়ের নামকরনের সম্ভাবনা থকে যায়। অর্থাৎ পঞ্চগৌড় >পঞ্চগোড়>পঞ্চগড়। এছাড়া পঞ্চনগরীর দূরত্ব পঞ্চগড় অঞ্চল থেকে বেশি দূরে নয়। আরেকটি বহুল প্রচলিত এবং সুষ্পষ্ট মতবাদ এই যে, এই অঞ্চলের পাঁচটি গড়ের সুস্পষ্ট অবস্থান। পঞ্চ’ অর্থ পাঁচ, আর ‘গড়’ অর্থ বন বা জঙ্গল। ভিতরগড়, মীরগড়, হোসেনগড়, রাজনগড় ও দেবেনগড় নামক এই ‘পঞ্চ’ (পাঁচ) গড়ের সমাহার। পাঁচটি গড়ের কারণেই এ অঞ্চলের নাম হতে হিসেবে পঞ্চগড় নামটির উৎপত্তি। [২] [৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

পঞ্চগড় একটি প্রাচীন জনপদ। এখানে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানব বসতি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল ব্যাপী পুন্ড্র, গুপ্ত, পাল, সেন ও মুসলিম শাসকদের সংস্পর্শে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য প্রত্ননিদর্শন। এসবের মধ্যে রয়েছে বহু গৌরবগাঁথা ও প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগে এই ভূখন্ডের পাশেই ছিল মগধ, মিথিলা, গৌর, নেপাল, ভূটান, সিকিম ও আসাম রাজ্যের সীমান্ত। আধুনিককালের মত অতীত কালেও জনপদটি ছিল সীমান্ত অঞ্চল। এই ভূখন্ডটি পর্যায়ক্রমে শাসিত হয়েছে প্রাগ- জ্যোতিষ, কামরূপ, কামতা, কুচবিহার ও গৌড় রাজ্যের রাজা, বাদশা, সুবাদার এবং বৈকুন্ঠপুর অঙ্গ- রাজ্যের দেশীয় রাজা ও ভূ-স্বামীদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। খ্রীস্টীয় ২য়, ৩য় শতকের মধ্যে রাজা ‘শালিবাহন’ রাজা ‘পৃথু’ এবং রাজা ‘জল্লেশ’ পঞ্চগড়ের শালবাহান ও ভিতরগড় এলাকায় রাজ্য, নগর ও সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে তুলেছিলেন। মৌর্য, গুপ্ত ও পাল (দেবপাল ধর্মপাল) রাজন্যবর্গও এই অঞ্চল শাসন করেছিলেন।মধ্যযুগের শুরুতেই প্রথম মুসলিম বঙ্গবিজীয় সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন খলজি তাঁর বহু বিতর্কিত তিব্বত অভিযানের এক পর্যায়ে পঞ্চগড় জনপদের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন বলে জানা যায়। সুলতান জালাল উদ্দিন ফাতেশাহ, সুলতান বারবক শাহ, শেরশাহ, খুররম খাঁ (শাহজাহান), মীরজুমলা, সুবাদার ইব্রাহীম খাঁ ফতে জঙ্গ এবং অন্ত মধ্যযুগে দেবী চৌধুরাণী, ভবানী পাঠক, ফকির মজনুশাহ প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পঞ্চগড় জনপদের নাম ও স্মৃতি নিবিড়ভাবে জড়িত। ষোড়শ শতকে কুচবিহার রাজ্য গঠিত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পঞ্চগড় অঞ্চল মূলত কোচ রাজন্যবর্গের দ্বারাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পঞ্চগড় থানাটি দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অর্ন্তভূক্ত হয়। ১৯৮০ সালে ১লা জানুয়ারী ঠাকুরগাঁও মহকুমার ৫টি থানা- তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জ নিয়ে পঞ্চগড় মহকুমা সৃষ্টি হয়। তখন মহকুমার সদর দপ্তর পঞ্চগড় শহরে স্থাপিত হয়। তখন প্রথমবারের মতো প্রশাসনিকভাবে পঞ্চগড় শহর হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী পঞ্চগড় মহকুমা জেলায় উন্নীত হয় এবং জেলা সদর পঞ্চগড় শহরে স্থাপনের ফলে পঞ্চগড় জেলা শহরের মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালের ১৫ জুন এ শহরের নাগরিক সেবার উদ্দেশ্য পঞ্চগড় পৌরসভা স্থাপিত হলে পঞ্চগড় পৌরশহরের মর্যাদা লাভ করে। [২]

ভাষা ও সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

বর্তমানে পঞ্চগড় অঞ্চলে প্রচলিত শব্দাবলী মূলত প্রাকৃত ও প্রাচীন বাংলারই সামান্য পরিবর্তিত রূপ। পালি, প্রাকৃত, প্রাচীন মধ্য বাংলা এবং ব্রজবুলি- আসামী- হিন্দী-বিহারী ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ এই অঞ্চলে অধিক প্রচলিত। মুন্ডা ও সাঁওতালী ভাষার কয়েকটি শব্দ যেমন চাউলি, চুলা, জাইত, পাড়া, হাল, ডোঙ্গা, মেয়েছেলে, বেটাছেলে, মেয়েলোক ইত্যাদি এই অঞ্চলে প্রচলিত। বিয়ে অর্থে ‘বিহা’, যুবক-যুবতি অর্থে ‘গাভুর’, ব্যাথা অর্থে ‘বিষ’ ইত্যাদি শব্দগুলো পঞ্চগড়ের ভাষায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নজরুল পাঠাগারকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ে সাংস্কৃতিক চর্চা গতিশীল হয়ে উঠে। অসংখ্য বই, মানচিত্র, বিশ্বকোষ, রচনাবলী ইত্যাদির সমৃদ্ধ সংগ্রহে এই পাঠাগারটি ছিল পঞ্চগড় অঞ্চলের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অমূল্য তীর্থ ক্ষেত্র। মুক্তি যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাঠাগারের অনেক মূল্যবান বই ও এনসাইক্লোপিডিয়া জ্বালিয়ে দেয়। পঞ্চগড় অঞ্চলে আঞ্চলিক সংস্কৃতির মধ্যে ‘হুলির গান’ সর্বাধিক প্রচলিত ও জনপ্রিয়। হিন্দুদের হুলি পুজা থেকে হুলির গান নামটির উৎপত্তি হলেও সমসাময়িক ঘটনা বা অসংগতিপূর্ণ সামাজিক চিত্র, প্রেম কাহিনী ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে ব্যাঙ্গাত্মক ও রসাত্মকভাবে সমালোচনার মাধ্যমেও এই গান পরিবেশিত হয়। সাধারণত শীতকালে রাতের বেলায় এ গান পরিবেশিত হয়। হুলি পালাধর্মী গান। ১০- ২০ জন অংশগ্রহণকারীর এ গানে যেমন রয়েছে নাটকীয়তা তেমনি আছে কাহিনীর ধারাবাহিক বিন্যাস। কাহিনীকে আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য একজন ছোকরা (মেয়ের সাজে ছেলে অভিনেতা) এবং একজন সং উপস্থিত থাকে। এরাই দর্শক ও শ্রোতার মনযোগ আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু। হুলি পরিবেশনের সময় ঢোল, বাঁশি, কাসর, সারেঙ্গী ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং বর্ণিল পোশাক ব্যবহৃত হয়। [৪]

প্রশাসন[সম্পাদনা]

১৯৮৫ সালে পঞ্চগড় শহরের নাগরিকদের পৌরসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে পঞ্চগড় পৌরসভা নামক একটি স্থানীয় সরকার সংস্থা(পৌরসভা) গঠিত হয় যা ৯টি ওয়ার্ড এবং ৩৭টি মহল্লায় বিভক্ত । ২২ বর্গ কি.মি. আয়তনের পঞ্চগড় শহরের পুরো এলাকাই পঞ্চগড় পৌরসভা দ্বারা শাসিত হয়। [৫]

ভৌগোলিক উপাত্ত[সম্পাদনা]

শহরটির অবস্থানের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ হল ২৬°২০′০৮″ উত্তর ৮৮°৩৩′০৮″ পূর্ব / ২৬.৩৩৫৫৫৬° উত্তর ৮৮.৫৫২৩২২° পূর্ব / 26.335556; 88.552322। সমুদ্র সমতল থেকে শহরটির গড় উচ্চতা ৬০ মিটার। পঞ্চগড় ভূ-খন্ডের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ২২ টি নদী। পঞ্চগড় শহরের উপর দিয়ে বা আশেপাশে দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল চাওয়াই, করতোয়া, তালমা ও কুরম নদী । করতোয়া নদীটি পঞ্চগড় শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত, নদীটি ২০ কি.মি. দীর্ঘ।[৬]

জনসংখ্যা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের আদমশুমারি ও গৃহগণনা-২০১১ অনুযায়ী দাগনভূঞা শহরের মোট জনসংখ্যা ৪৬,০৩৮ জন যার মধ্যে ২৩,৪৪৩ জন পুরুষ এবং ২২,৫৯৫ জন নারী। এ শহরের পুরুষ এবং নারী অনুপাত ১০৪:১০০। [৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  2. "পটভূমি"। panchagarh.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  3. "পঞ্চগড় নামটি এসেছে যেভাবে"বাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  4. "ভাষা ও সংস্কৃতি"। panchagarh.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  5. "পৌরসভা সম্পর্কে"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  6. "নদ-নদী"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  7. "Urban Centers in Bangladesh"। Population & Housing Census-2011 [আদমশুমারি ও গৃহগণনা-২০১১] (PDF) (প্রতিবেদন)। জাতীয় প্রতিবেদন (ইংরেজি ভাষায়)। ভলিউম ৫: Urban Area Rport, 2011। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। মার্চ ২০১৪। পৃষ্ঠা ২৬৯। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪