নড়াইল জেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
নড়াইল
জেলা
বাংলাদেশে নড়াইল জেলার অবস্থান
বাংলাদেশে নড়াইল জেলার অবস্থান
নড়াইল বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
নড়াইল
নড়াইল
বাংলাদেশে নড়াইল জেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৩°৭′৪৮″ উত্তর ৮৯°৩০′০″ পূর্ব / ২৩.১৩০০০° উত্তর ৮৯.৫০০০০° পূর্ব / 23.13000; 89.50000স্থানাঙ্ক: ২৩°৭′৪৮″ উত্তর ৮৯°৩০′০″ পূর্ব / ২৩.১৩০০০° উত্তর ৮৯.৫০০০০° পূর্ব / 23.13000; 89.50000 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ  বাংলাদেশ
বিভাগ খুলনা বিভাগ
আসন
আয়তন
 • মোট ৯৯০.২৩ কিমি (৩৮২.৩৩ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১ আদমশুমারি)
 • মোট ৭,২১,৬৬৮
 • ঘনত্ব ৭৩০/কিমি (১৯০০/বর্গমাইল)
স্বাক্ষরতার হার
 • মোট ৬১.৩%
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
পোস্ট কোড ৭৫০০ উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
ওয়েবসাইট প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

নড়াইল জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি জেলা। ১৮৬১ সালে যশোর জেলার অধীন নড়াইল মহাকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। নড়াইল শব্দটি স্থানীয় লোকমুখে নড়াল নামে উচ্চারিত হয়। ঐ সময় নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া থানার সমন্বয়ে এই মহাকুমা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ নড়াইল মহাকুমাকে জেলায় রুপান্তরিত করা হয় । [১]

ভৌগোলিক সীমানা[সম্পাদনা]

নড়াইল জেলার পশ্চিমে যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলা, যশোর সদর উপজেলাঅভয়নগর উপজেলা , উত্তরে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলামহম্মদপুর উপজেলা, পূর্বে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলা, গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলাগোপালগঞ্জ সদর উপজেলা এবং দক্ষিণে বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলা, খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলা , দিঘলিয়া উপজেলাফুলতলা উপজেলা এবং যশোরের অভয়নগর উপজেলা। নড়াইলের ভূমি দক্ষিণ দিকে ঢালু। এ ভূ-প্রকৃতিকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। উত্তর পশ্চিমের অপেক্ষাকৃত উচ্চভূমি, উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলের মধুমতি নদী তীরবর্তী নিম্ন অঞ্চল এবং নবগঙ্গা নদীচিত্রা নদীর তীরবর্তী মধ্যম উচ্চতা বিশিষ্ট অঞ্চল। [২]

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ[সম্পাদনা]

নড়াইল জেলায় ৩টি উপজেলা ও একটি থানা্‌ আছে; এগুলো হলোঃ

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৬১ সালে যশোর জেলার অধীন নড়াইল মহাকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। নড়াইল শব্দটি স্থানীয় লোকমুখে নড়াল নামে উচ্চারিত হয়। ঐ সময় নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া থানার সমন্বয়ে এই মহাকুমা গঠিত হয় । পরবর্তীতে আলফাডাঙ্গা থানা এবং অভয়নগর থানা এই মহাকুমা ভূক্ত হয়। ১৯৩৪ সালে প্রশাসনিক সীমানা পূর্নগঠনের সময় অভয়নগরের পেড়লী, বিছালী ও শেখহাটি এই তিনটি ইউনিয়নকে নড়াইল জেলা ভূক্ত করে অবশিষ্ট অভয়নগর যশোর জেলা ভূক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় এই মহাকুমায় চারটি থানা ছিল ।[১]

১৯৬০ সালে আলফাডাঙ্গা থানা যশোর হতে ফরিদপুর জেলা ভূক্ত হয় । ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ নড়াইল মহাকুমাকে জেলায় রুপান্তরিত করা হয় । প্রথম জেলা প্রশসাক ছিলেন ম শাফায়াত আলী । ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ নড়াইল মহকুমার প্রশাসক জনাব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর নেতৃত্বে অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ, জনাব আব্দুল হাই এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায় নড়াইল ট্রেজারীর তালা ভেঙ্গে অস্ত্র নিয়ে যশোর সেনানিবাস আক্রমণের মধ্যে দিয়ে এ জেলার মানুষের মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়। অগনিত মুক্তি যোদ্ধার রক্ত এবং অনেক অত্যাচারিত , লাঞ্চিত মা-বোনদের অশ্রু ও সংগ্রামের ফলে ১৯৭১ সনের ১০ ডিসেম্বর নড়াইল হানাদার মুক্ত হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে নড়াইল জেলার বিশেষ অবদান রয়েছে। নড়াইল জেলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা অধ্যুসিত জেলা। এ জেলা হতে প্রায় ২০০০ জন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। দেশের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর একজন মরহুম ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ নড়াইলের কৃতি সন্তান। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে শাহাদাৎ বরণকারীর সংখ্যাও একেবারে কম নয়। পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক চিত্রা নদীর পাড়ে লঞ্চঘাটের পল্টুনের উপর ২৮০০ লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

নড়াইল জেলার নামকরণের ইতিহাস[সম্পাদনা]

কথিত আছে বাংলার সুবাদার আলিবর্দি খানের শাসন আমলে দেশের বিভিন্ন অংশে বর্গি ও পাঠান বিদ্রোহীরা নানা ধরনের উৎপীড়ন শুরু করে। আলিবর্দির মুঘল বাহিনী বর্গি ও পাঠানদের সম্পূর্ন শায়েস্তা করতে ব্যর্থ হন। এরপর বর্গি ও পাঠান দস্যুরা তাদের অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। সুবা বাংলার পশ্চিম ও উত্তর অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রাণভয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় পালাতে থাকে। সেই সময় মদনগোপাল দত্ত নামে সুবাদারের এক কর্মচারী কিসমাত কুড়িগ্রামে সপরিবারে নৌকা যোগে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি কচুড়ির শক্ত ধাপের উপর একজন ফকিরকে যোগাসনে উপবিষ্ট দেখতে পান। উক্ত ফকির দত্ত মশাইয়ের প্রার্থনায় তার নড়িটি (লাঠি) দান করেন এবং এই নড়ি পরবর্তীতে আশীর্বাদ হয়ে দাড়ায়। মদনগোপাল দত্ত ফকির বা সাধক আউলিয়ার নড়ি বা লাঠি পেয়ে ধীরে ধীরে প্রতিপত্তি অর্জন করেন। এই ভাবে কিসমাত কুড়িগ্রাম অঞ্চলের ঐ স্থানের নাম হলো নড়াল। নড়ালের লেখ্য রূপ হলো নড়াইল। স্থানটি নড়িয়াল ফকিরের নড়ি থেকে পরিচিতি লাভ করে। মদনগোপাল দত্তের পৌত্র বিখ্যাত রূপরাম দ্ত্ত। রূপরাম দত্তই নড়াইলের জমিদারদের প্রথম পুরুষ। যা হোক, মদনগোপাল দত্ত ও তার উত্তরাধিকারীরা নড়িয়াল ফকিরের অতি শ্রদ্ধাবশত নড়াল নামটি স্থায়ী করেন। তারা কোনো পরিবর্তন আনেননি। নড়াইলে নীলবিদ্রোহের কারণে মহকুমা স্থাপনের প্রয়োজন হলে ১৮৬৩ সালে ইংরেজ সরকার মহিশখোলা মৌজায় মহকুমার প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। এইভাবে মুঘল আমলের ’নড়াল’ নামটি ইংরেজ শাসনামলে নড়াইল নামে পরিচিতি পায়। কিসমাত কুড়িগ্রাম বা কুড়িগ্রাম নড়াইল বা নড়ালগ্রাম হতে প্রাচীন। কিসমাত কুড়িগ্রামে মুঘল শাসনামলের পূর্বে সুলতানি শাসনামলে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ও সেনাছাউনি ছিল। কিসমাত কুড়িগ্রামের আয়তন ও ছিল বেশ বিস্তৃত। [৩]

গবেষক এস,এম রইস উদ্দীন আহমদ এর মতে লড়েআল হতে নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে। যারা শক্রর বিরদ্ধে নড়াই করে সহানীয় ভাষায় তাদের লড়ে বলে । হযরত খান জাহান আলীর সময়ে রাজ্যের সীমান্তে সীমান্ত প্রহরী নিয়োজিত ছিল। নড়াইল এলাকা নদী নালা খাল বিল বেষ্টিত । খাল কেটে রাজ্যের সীমান্তে পরীখা তৈরী করা হত। খাল বা পরীখার পাশে চওড়া উচু আইলের উপর দাড়িয়ে লড়ে বা রক্ষী সেনারা পাহারা দিত। এভাবে লড়েআল হতে লড়াল > নড়াইল নাম এর উৎপত্তি হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে ।

আরেকটি প্রচলিত মত হল নড়ানো থেকে নড়াইল নামের উৎপত্তি হয়েছে। বাংলাদেশে অনেক স্থানের নামের সাথে ইল প্রত্যয় যুক্ত আছে যেমন টাঙ্গাইল, ঘাটাইল, বাসাইল, নান্দাইল ইত্যাদি। প্রত্যোকটি সহানের নামকরণের ক্ষেত্রে কিছু কিংবদন্তী বা লোক কাহিনী প্রচলিত আছে। একটি বড় পাথর সরানোকে কেন্দ্র করে নড়াল বা নড়াইল নামের উৎপত্তি বলে কেউ কেউ মনে করেন ।

তবে বাংলাপিডিয়া এবং কতিপয় লেখকদের বিভিন্ন লেখা থেকে নামকরনের ইতিহাস যা পাওয়া গেছে সেটা এরকমঃ-

"নড়াইল জেলার নামকরণ :

ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে আনুমানিক ১০ লক্ষ বৎসর পূর্বে গঙ্গা নদী প্রবাহিত পলিমাটি দ্বারা গাঙ্গেয় বদ্বীপ সৃষ্টি হয়। সমগ্র বঙ্গে নড়াইল জেলা ও দক্ষিণ বঙ্গের ব-দ্বীপের অন্তর্গত এক ভূখন্ড।” নড়াইল নামের কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। কিংবদন্তী আছে যে হযরত খানজাহান আলী (রা:) দক্ষিণ বঙ্গে ইসলাম প্রচার করতে এসে খলিফাতাবাদ রাজ্য স্থাপন করেছিলেন এবং রাজধানী স্থাপন করেছিলেন বাগেরহাটে। বাগেরহাটে তাঁর মাজার আছে। খলীফাতাবাদ রাজ্যের সীমানা বা আয়তন কতটুকু ছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। অনেকের মতে, খলিফাতাবাদ রাজ্যের উত্তর অংশের সীমান্ত ছিল আজকের নড়াইল এলাকা। এ রাজ্যের সীমান্ত প্রহরী ছিল। সীমান্ত রক্ষীরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। তাই লোকে তাদেরকে “লড়ে” বলত। “লড়ে” একটি আঞ্চলিক শব্দ। “লড়ে” শব্দটিকে সাধারণ মানুষ বুঝতো - যারা লড়াই করে। আর নড়াইল এলাকা হযরত খানজাহান আলী (রা:) এর সময় খাল-বিল ও নদী নালায় ভরপুর ছিল। তাই লড়েরা উঁচু আইল তৈরী করে তার ওপর দিয়ে সীমান্ত পাহারা দিতো। লোকে এই আইলকে নাম দিয়েছিল “লড়ে আল”। পরবর্তী সময়ে ‘লড়ে আল’ থেকে নড়াইল নাম হয়েছে। আর লড়েরা সেখানে এক পর্যায়ে বসবাস শুরু করে এবং সেখানে গ্রাম গড়ে ওঠে। লোকে গ্রামের নাম দেয় ‘লড়ে গাতী’। গাতি শব্দের অর্থ গ্রাম। ‘লড়েগাতি’ পরবর্তী সময়ে ‘নড়াগাতি’ হয়েছে। কালিয়া উপজেলায় ‘নড়াগাতি’ অবস্থিত (বর্তমানে একটি নতুন থানা)। নড়াগাতির পাশে যে নদী ছিল তারও নাম হয়েছিল ‘লড়াগাতী নদী’। পরবর্তীতে নাম হয় ‘নড়াগাতী নদী’। নড়াগাতী নামে একটি বন্দরও ছিল। বর্তমানে নড়াগাতিতে একটি বাজার আছে। তাই ‘লড়া আইল’ থেকে ‘নড়াইল’ নাম হবার ব্যাপারে অনেকেই সমর্থন করেছেন।"

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

নদ-নদী[সম্পাদনা]

নড়াইল জেলায় অনেকগুলো নদী রয়েছে। নদীগুলো হচ্ছে আঠারোবাঁকি নদী, নবগঙ্গা নদী, চিত্রা নদী, মধুমতি নদীভৈরব নদ[৪][৫]

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

  • মাশরাফি বিন মর্তুজা
  • চিত্রশিল্পী এস, এম সুলতান [৬]
  • কমরেড অমল সেন
  • বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ
  • রবি শংকর
  • নিহার রজ্ঞন গুপ্ত
  • কবিয়াল বিজয় সরকার
  • উদয় শংকর
  • কমল দাস গুপ্ত
  • সর্বকনিষ্ঠ শহীদ বুদ্ধীজীবি শেখ আব্দুস সালাম
  • জারী সম্রাট মোসলেম উদ্দিন বয়াতী
  • অমৃতনাল দাস অমৃত নগর জমিদার বাড়ী

আনুষঙ্গিক নিবন্ধ[সম্পাদনা]

ভৌগোলিক অবস্থান :

৯৯০.২৩ বর্গ কি: মি: আয়তন বিশিষ্ট নড়াইল জেলা উত্তরে মাগুরা জেলা, দক্ষিণে খুলনা জেলা, পূর্বে ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে যশোর জেলা দ্বারা বেষ্টিত। ভৌগোলিক অবস্থানে নড়াইল জেলা ৮৯.৩১ দ্রাঘিমাংশে এবং ২৩.১১ অক্ষাংশে অবস্থিত।

জলবায়ু ও বৃষ্টিপাত :

বার্ষিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৭.১০ সে: এবং সর্বনিম্ন ১১.২০ সে:। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমান ১৪৬৭ মি: মি:।

ভূ-প্রকৃতি :

ভূ-প্রকৃতি অনুসারে নড়াইল জেলাকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। ১) উত্তর ও উত্তর পশ্চিমে অপেক্ষাকৃত উচ্চ ভূমি। ২) নদীর উপকূলবর্তী সমভূমি। ৩) বিল অঞ্চলের নিম্নভূমি। ৪) মধ্যভাগের সমভূমি।

নদ-নদী ও বিল-বাওড় :

নড়াইলের প্রধান নদী ৪টি। মধুমতি, নবগংগা, ভৈরব, চিত্রা এবং কাজলা।

রয়েছে প্রচুর বিল ও বাওড়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চাচুরি বিল।

শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা :

নড়াইল শহর চিত্রানদীর তীরে অবস্থিত। ৯টি ওয়ার্ড ও ২৪টি মহল্লা নিয়ে গঠিত এই শহর। শহরের আয়তন ২৮.৮৯ বর্গ কি: মি:।

শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৫১.৩৪% ও নারী ৪৮.৬৬%। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১৪০০ জন। শহরের অধিবাসীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৫১.৭%। শহরে ১টি রেস্ট হাউজ ও ১টি ডাকবাংলো আছে।

প্রশাসন :

১৮৫০ সালের কয়েক বছর পূর্বে নড়াইল যশোর জেলার একটি থানা এবং ১৮৬১ সালে যশোর জেলার একটি মহাকুমা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর দীর্ঘ ১২৩ বৎসর পর ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এটি যশোর জেলা হতে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৩টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা, ১৮টি ওয়ার্ড, ৪৩টি মহল্লা, ৩৭টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৪৫টি মৌজা এবং ৬৪৯টি গ্রাম নিয়ে গঠিত নড়াইল জেলা। উপজেলাগুলো হচ্ছে নড়াইল সদর, কালিয়া এবং লোহাগড়া। পৌরসভাগুলো নড়াইল সদর এবং কালিয়া। নতুন একটি পুলিশি থানা হলো নড়াগাতি (২০০০ সালের জানুয়ারীতে শুরু হয়েছে)।

নড়াইলে জাতীয় সংসদে সংসদীয় আসন ২টি। কালিয়া উপজেলা ও নড়াইল উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে নড়াইল-১ এবং লোহাগড়া ও নড়াইল পৌরসভাসহ উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে নড়াইল-২ আসন।

পুলিশ ফাঁড়ি মোট ৫টি যথাক্রমে - নলদী, পেড়লী, মির্জাপুর, শেখহাটি, বিছাইল। পুলিশ ক্যাম্প ১টি কোমখালী। নৌ ফাঁড়ি ১টি বড়দিয়া।

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ :

নড়াইল জেলায় রয়েছে প্রায় দুইশত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, তাঁদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি সম্পন্ন ৭ জনের নাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। যেমন- সৈয়দ নওশের আলী (ফজলুল হকের মন্ত্রী সভার একজন মন্ত্রী ছিলেন), এস এম সুলতান (বিশ্ব বরেণ্য চিত্র শিল্পী), উদয় শঙ্কর (ভূবনখ্যাত শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী), পন্ডিত রবিশঙ্কর (আন্তর্জার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন সেতার শিল্পী), চারণ কবি মোসলেমউদ্দিন, কবিয়াল বিজয় সরকার, ডা: নিহার রঞ্জন গুপ্ত (প্রায় ৫০টি উপন্যাসের লেখক), নূর জালাল (তেভাগা আন্দোলনের মধ্যমনি), কমলদাশগুপ্ত (নজরুল সঙ্গীততের নির্ধারিত সুরকার), অমলকৃষ্ণ সোম (প্রখ্যাত মঞ্চাভিনেতা ১০০টির মতো মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন), বীরশ্রেষ্ঠ নূর মুহাম্মদ (১৯৭১ এর সম্মুখসমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা), মাশরাফি বিন মর্তুজা (ক্রিকেট খেলোয়ার)।

স্থাপত্য ঐতিহ্য এবং প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন :

গোয়াল বাথান গ্রামের মসজিদ (১৬৫৪), কদমতলা মসজিদ, নালদীতে গাজীর দরগা, উজিরপুরে রাজা কেশব রায়ের বাড়ী, জোড় বাংলায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত রাধাগোবিন্দ মন্দির। লক্ষ্মীপাশায় কালিবাড়ী, নিহিনাথতলার বড়দিয়াতে মঠ।

ঐতিহাসিক ঘটনা :

১৮৫৯.৬০ সালে এই জেলায় নীল বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে তেভাগা আন্দোলন হয়। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর নড়াইল জেলা শত্রু মুক্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন :

নড়াইলে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন হিসেবে রয়েছে ২টি গণকরব।

জনসংখ্যা :

নড়াইলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ। এর মধ্যে পুরুষ ৫৪.২২%, মহিলা ৪৫.৭৮%, মুসলিম ৭৫.৫৬%, হিন্দু ২৪.৩১% এবং অন্যান্য ০.১৩%।

একটি খৃষ্টান সাহেব পরিবার এখানে বসবাস করে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান :

মসজিদ ১১৫৬টি, মন্দির ২৪৪টি এবং গির্জা ১টি।

সাক্ষরতা :

নড়াইলে গড় সাক্ষরতা ৩৫.৬৫%। এর মধ্যে পুরুষ ৪২.২৩% এবং মহিলা ২৮.৯৯%।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান :

কলেজ ১৭টি, কারিগরি কলেজ ১টি, উচ্চ বিদ্যালয় ৯৪টি, জুনিয়র হাইস্কুল ২২টি, মাদ্রাসা ৮৫টি, মক্তব ১৬০টি, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৮৭টি, বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৭১টি, আর্ট স্কুল ১টি, বৃত্তিমূলক স্কুল ১টি, কারিগরি স্কুল ৩টি, অন্ধদের স্কুল ১টি, কিন্ডার গার্ডেন ২টি, কমিউনিটি স্কুল ৬টি এবং স্যাটেলাইট স্কুল ১৯টি।

উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল (১৮৫৬), নড়াইল সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৮৬), কালিয়া পাইলট হাইস্কুল (১৮৬৫), বারাইপাড়া প্রাইমারী স্কুল (১৮৫০), বাবরা প্রাইমারী স্কুল (১৮৯৫), ইতনা হাইস্কুল (১৯০০), সিংঙ্গিয়া হাটবালপুর হাইস্কুল (১৯২১)। বাশগ্রাম বিষ্ণুপুর হাইস্কুল (১৯৩২), লোহাগড়া পাইলট স্কুল,সি এম বি ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়,বাগুডাংগা।

স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্র ও সাময়িকী :

দৈনিক মহাসাগর, সাপ্তাহিক নড়াইল বার্তা, মাসিক প্রান্তিক (বিলুপ্ত), পাক্ষিক কিরণ, কল্যাণী এবং বারুজিবী।

সাংস্কৃতিক সংগঠন :

গণগ্রন্থাগার ৬টি, ক্লাব ১৬০টি, সিনেমা হল ৪টি, মহিলা সংগঠন ১০৪টি, থিয়েটার গ্রুপ ৭টি, সাহিত্য সমিতি ৭টি, অপেরা দল ৭টি, থিয়েটার গ্রুপ ১২টি এবং খেলার মাঠ ৩০টি।

প্রধান পেশা :

কৃষি ৪৭.৫৫%, মৎস্য ২.৮৮%, কৃষি মজুর ১৮.০২%, মজুরী শ্রমিক ২.৪৪%, শিল্প ১.৩১%, ব্যবসা ১০.৯২% এবং চাকুরী ৭.৮৪%, পরিবহন ২.৬% এবং অন্যান্য ৭.২৪।

ব্যবহৃত ভূমি :

মোট আবাদযোগ্য জমি ৭৮৪৫৮ হেক্টর। এর মধ্যে একক ফসল ৪৩.১৭%, দ্বৈত ফসল ৪৪.২৫% এবং ত্রিফসলী জমি ১২.৫৮%। সেচের আওতায় জমি ২২.১৬%।

ভূমি নিয়ন্ত্রণ :

চাষীদের মধ্যে ২৭.৫৪% ভূমিহীন, ৩৬.৮১% ক্ষুদ্র, ১৪.৭৭% মাঝারী এবং ধনী ২০.৯৭%।

প্রধান শষ্য :

ধান, পাট, গম, তেল বীজ, সরিষা, আলু, আখ, কলাই ও খেসারী। বিলুপ্ত অথবা প্রায় বিলুপ্ত শষ্যের মধ্যে রয়েছে নীল, কাউন, তুলা ও বার্লি।

প্রধান ফল :

আম, কাঁঠাল, পেঁপে, কলা, জাম, নারিকেল ও সুপারী।

যোগাযোগ সুবিধা :

পাকা সড়ক ২৪৩ কি: মি:, আধাপাকা ৭৪ কি: মি:, কাচা রাস্তা ১৬১৫ কি: মি: এবং জলপথ ৬৭ নটিকাল মাইল। ঐতিহ্যগত পরিবহনের মধ্যে রয়েছে পালকি (বিলুপ্ত), ঘোড়ার গাড়ি, মহিষের গাড়ি, গরুর গাড়ি (প্রায় বিলুপ্ত) এবং নৌকা।

কলকারখানা :

বৃহৎ ও মাঝারী শিল্পের মধ্যে রয়েছে বস্ত্রকল ১টি, বিস্কুট কারখানা ৬টি, কলম শিল্প ১টি, করাত কল ৪২টি, বরফ কারখানা ১৮টি, চাল ও আটা কল ৪৫টি, হলুদ মেশিন ৬টি, ওয়েল্ডিং ৭৩টি এবং ছাপাখানা ৪টি। কুটির শিল্পের মধ্যে তাঁত, বাঁশ ও বেতের কাজ, কাঠের কাজ, স্বর্ণকার, কামার, কুম্ভকার, দরজী ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত।

হাট বাজার ও মেলা :

হাট বাজার ৮৪টি, মেলা ১৯টি।

প্রধান রপ্তানী :

পান, নারিকেল, সুপারী এবং চিংড়ি।

এনজিও তৎপরতা : 

তৎপরতা চালাচ্ছে এমন গুরুত্বপূর্ণ এনজিওগুলি হচ্ছে ব্র্যাক, আশা, কেয়ার, প্রশিকা, কুমিল্লা প্রশিকা, গ্রামীণ ব্যাংক, প্রসেস, পল্লী উন্নয়ন প্রচেষ্টা, উদ্দীপন, গণসাহায্য সংস্থা, জাগরণী চক্র, আই এল ডি এবং প্রত্যয়।

স্বাস্থ্য কেন্দ্র :

জেলা সদর হাসপাতাল ১টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ২টি, প্রসূতি ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ১টি, মিশন হাসপাতাল ১টি, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৩৩টি, স্যাটেলাইট ক্লিনিক ৭টি, বেসরকারী ক্লিনিক ৬টি, দাতব্য হাসপাতাল ৪টি এবং পশু চিকিৎসা হাসপাতাল ১টি।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. চিত্রা (পত্রিকা) (জুন, ২০১৪)। "নড়াইল জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য"। নড়াইল জেলা সমিতি, ঢাকা, অভিষেক ও পূণর্মিলনী - ২০০৫। সংগৃহীত ২২ জুন, ২০১৪ 
  2. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "ভৌগলিক পরিচিতি"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ২২ জুন, ২০১৪ 
  3. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "জেলার পটভূমি"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ২২ জুন, ২০১৪ 
  4. ড. অশোক বিশ্বাস, বাংলাদেশের নদীকোষ, গতিধারা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৯০, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৮৯৪৫-১৭-৯
  5. মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, বাংলাদেশের নদনদী: বর্তমান গতিপ্রকৃতি, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫, পৃষ্ঠা ৬১২, ISBN 984-70120-0436-4.
  6. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ২২ জুন, ২০১৪ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]