চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জেলা
বাংলাদেশের মানচিত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অবস্থান (লাল রঙে)
বাংলাদেশের মানচিত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অবস্থান (লাল রঙে)
চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৪°৪৩′৪৮″ উত্তর ৮৮°১২′০″ পূর্ব / ২৪.৭৩০০০° উত্তর ৮৮.২০০০০° পূর্ব / 24.73000; 88.20000স্থানাঙ্ক: ২৪°৪৩′৪৮″ উত্তর ৮৮°১২′০″ পূর্ব / ২৪.৭৩০০০° উত্তর ৮৮.২০০০০° পূর্ব / 24.73000; 88.20000 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ  বাংলাদেশ
বিভাগ রাজশাহী বিভাগ
আয়তন
 • মোট ১৭০২.৫৬ কিমি (৬৫৭.৩৬ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (2011)
 • মোট ১৬,৪৭,৫২১
 • ঘনত্ব ৯৭০/কিমি (২৫০০/বর্গমাইল)
স্বাক্ষরতার হার
 • মোট ৬৭% [১]
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
পোস্ট কোড ৬৩০০ উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
ওয়েবসাইট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এই জেলাটিকে কখনো নবাবগঞ্জ এবং চাঁপাই নামেও ডাকা হয়।। ভারত উপমহাদেশ বিভাগের আগে এটি মালদহ জেলার একটি অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে এটি মালদহ থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্থানে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং রাজশাহী জেলার একটি মহাকুমা হিসেবে গন্য হয়। ১৯৮৪ সালে একটি একক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অনেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কে 'আমের দেশ' বলেও জানে।

ভৌগোলিক সীমানা[সম্পাদনা]

মোট ১,৭৪৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে সর্ব পশ্চিমে। এর পূর্বে রাজশাহীনওগাঁ জেলা, উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলা, পশ্চিমে পদ্মা নদী ও মালদহ জেলা দক্ষিণে পদ্মা নদীভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলা। এটি ভৌগোলিকভাবে ২৪°২২′ হতে ২৪°৫৭′ উত্তর অক্ষাংশে এবং ৮৭°৫৫′ হতে ৮৮°২৩′ পূর্ব দ্রাঘিমার মধ্যে অবস্থিত।[২]

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ[সম্পাদনা]

আমের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রহনপুর আমের হাট থেকে তোলা ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ৫টি উপজেলায় বিভক্ত। এগুলি হলঃ

উপজেলা ওয়েবসাইট আয়তন (কিঃমিঃ²) জনসংখ্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ৪৫১.৮০ ৪,৫২,৬৫০
গোমস্তাপুর উপজেলা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ৩১৮.১৩ ২,৪০,১২৩
নাচোল উপজেলা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ২৮৩.৬৮ ১,৪৬,৬২৭
ভোলাহাট উপজেলা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ১২৩.৫২ ১,২০,৪২৯
শিবগঞ্জ উপজেলা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ৫২৫.৪৩ ৫,৯১,১৭৮

ইতিহাস[সম্পাদনা]

নামকরণ[সম্পাদনা]

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামটি সাম্প্রতিকালের। এই এলাকা ‘নবাবগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়, প্রাক-ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চল ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহারভূমি এবং এর অবস্থান ছিল বর্তমান সদর উপজেলার দাউদপুর মৌজায়। নবাবরা তাঁদের পাত্র-মিত্র ও পরিষদ নিয়ে এখানে শিকার করতে আসতেন বলে এ স্থানের নাম হয় নবাবগঞ্জ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ নামের ইতিবৃত্ত নবাব আমলে মহেশপুর গ্রামে চম্পাবতী মতান্তরে ‘চম্পারানী বা চম্পাবাঈ’ নামে এক সুন্দরী বাঈজী বাস করতেন। তাঁর নৃত্যের খ্যাতি আশেপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নবাবের প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন। তাঁর নামানুসারে এই জায়গার নাম ‘চাঁপাই”। এ অঞ্চলে রাজা লখিন্দরের বাসভূমি ছিল। লখিন্দরের রাজধানীর নাম ছিল চম্পক। চম্পক নাম থেকেই চাঁপাই। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৫-১৯৬৯ খ্রি) বাঙলা সাহিত্যের কথা গ্রন্থের প্রথম খন্ডে বর্ণিত লাউসেনের শত্রুরা জামুতিনগর দিয়ে গৌড়ে প্রবেশ করে। বর্তমান ভোলাহাট উপজেলার জামবাড়িয়া পূর্বে জামুতিনগর নামে পরিচিত ছিল। এসবের ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো গবেষক চাঁপাইকে বেহুলার শ্বশুরবাড়ি চম্পকনগর বলে স্থির করেছেন এবং মত দিয়েছেন যে, চম্পক নাম থেকেই চাঁপাই নামের উৎপত্তি হয়েছে ।

তেভাগা আন্দোলন[সম্পাদনা]

নাচোলে তেভাগা আন্দোলন শুরূ হয়। পদ্মা-মহানন্দা-পুনর্ভবার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিল মধ্যযুগের মুসলিম বাংলার প্রাণকেন্দ্র গৌড় নগরীর এক অগ্রসর জনপদ। ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই জনপদ কখনোই বাংলার শাশ্বত প্রতিবাদমুখর ঐতিহ্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়নি ; বরং স্বদেশী ও ভিনদেশী সব রকমের শোষণ, নিপীড়ন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে এখানকার বরেন্দ্রভূমি চিরকাল স্বাধীনচেতা মানুষের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংঘটিত নীল বিদ্রোহ ও সাঁওতাল বিদ্রোহ, পাকিস্তান আমলে নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং এমনকি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী তাঁদের বিদ্রোহী ও অধিকারসচেতন সত্তার প্রমাণ দিয়েছেন।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। এই জেলার বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। তারা মূলত কৃষিকাজ করে তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। তার মধ্যে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী আছে যারা মৌসুমের সময় অর্থ উপার্জন করে। তার মধ্যে আম ব্যবসায়ী প্রধান। চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা এই মৌসুমি আম ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার উপযুক্ত স্থান। আমের মৌসুমে এই শিবগঞ্জ উপজেলাহয়ে উঠে লোকে লোকারণ্য। আমের মৌসুমে এখানে চাঁপাই নবাবগঞ্জের সবচেয়ে বড় আমের বাজার বসে যা বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় না।

আম ব্যবসায়ী ছাড়াও এখানে টমেটো ব্যবসায়ী,কাঁসা-পিতল ব্যবসায়ী, পান ব্যবসায়ী দেখতে পাওয়া যায়। তবে আমের ব্যবসায়ীই প্রধান। উল্লেখ্য যে সদর উপজেলার যাদুপুর গ্রামের পান এই অঞ্চলের সেরা পান। অধিকাংশ পান ব্যবসায়ীই এই অঞ্চলের।

আম[সম্পাদনা]

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ,কারণ গ্রীষ্মকালীন এই ফলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্থনীতির প্রধান উৎস। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অধিকাংশ জমি ভিবিন্ন ধরনের আমের গাছে ভরপুর থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি আম উৎপন্ন হয় শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় উৎপাদিত আমের মধ্যে হচ্ছে, ফজলি, ল্যাংড়া, হিমসাগর, আশ্বিনা, বোম্বাই অন্যতম ।

ধর্ম[সম্পাদনা]

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ১৯৮৭ টি মসজিদ, ৪৭৪ টি মন্দির, ৫৬ টি বৌদ্ধ মন্দির এবং ২৮ টি চার্চ আছে । ছোট সোনামসজিদ, চাঁপাই মসজিদ, ১৫শতকের দারসবাড়ী মসজিদ ইত্যাদি হচ্ছে বিখ্যাত মসজিদ । জোড়া মঠ হচ্ছে বৌদ্ধদের অন্যতম আশ্রম এবং নওদা স্তুপ হল বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা ক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বেশ উন্নত। এখানে রয়েছেঃ

  • ৩৭০টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়;
  • ২৮২টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়;
  • ৪টি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়;
  • ২০৪টি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়;
  • ৪টি সরকারি কলেজ;
  • ৪৮টি বেসরকারি কলেজ;
  • ১২৮টি মাদ্রাসা;
  • ১টি সরকারী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র;
  • ১টি বেসরকারী কারীগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
  • ১টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং
  • ১টি যুব উন্নয়ন কেন্দ্র ।

এখানকার উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

চিত্তাকর্ষক স্থান[সম্পাদনা]

মহানন্দা নদী

সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

ভাষা[সম্পাদনা]

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষেরা বাংলাতে কথা বললেও তাদের উচ্চারণশৈলী প্রমিত বাংলা থেকে একটু আলাদা। তাদের কিছু শব্দের উচ্চারণ এখানে দেয়া হলঃ

অ্যাইগন্যা = উঠান, আইলস্যা = অলস, কাড়ি = ধানের খড়, ইন্দারা/কুমহা = কুয়া, উফাদিক = উপাধিক/অকর্মন্য, উসকাঠী = রান্নার কাজে ব্যবহৃত একটি দন্ড যা দ্বারা জ্বালানী চুলার মধ্যে পাঠানো হয়, কান্টা = বাড়ির পিছনের জায়গা, গঁঢ়্যা = ছোট ডোবা, ভূঁইশ = মহিষ, বল/আঁইড়্যা = ষাঁড় , বকরী = ছাগল, পাঘা = দড়ি , লাহি = নাভী, ঘুটা/নোন্দা = গরুর গোবর দিয়ে তৈরি এক প্রকার জ্বালানি, তহোমন = লুঙ্গী, সাঠা = এক ধরনের লাঠি, পির্হ্যান = পোষাক, ছুঁড়ি = কুমারী মেয়ে, ঘাঁটা = রাস্তা, গাঁটঠা/ বেহুদ্দা= বদমাইশ, ড্যারমা/মোটাহুস/হুসমোটা = কান্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তি, নাথ = গরুর নাখের ভিতর ফুটো করে দড়ি হিসাবে যেটা দেয়া হয়, গোলদান= গরুর গলায় যে দড়ি পরানো থাকে, ছাইনচ্যা = টিনের চালা বেয়ে যেখানে পানি পড়ে, সলহি = গরুর গাড়ির জোয়ালের দুই ফুটোর মধ্যে দেয়ার জন্য কাঠের লম্বা দন্ড, ঢুঁইড়া = খোঁজ করা, সানকি = রান্না ঘরে ব্যবহারিত মাটির পাত্র, ছেঁচকি = তরকারী নাড়ার জন্য ব্যবহারিত লোহার দন্ড, ঢাকুন = ঢাকনা, ডই = ডাল নাড়ার জন্য কাঠের দন্ড, হাইস্যা = হাসুয়া, পাইহ্যা = চাকা, লদদ্দি = নদী, পোখর = পুকুর, গোহিল = গোয়াল, আইল = জমির কিনারা, হ্যালা = সাঁতার কাটা, কোচ্চুল= চামচ, লেহেলি = লেপ, পঁহাত = সকাল, কান্ধা = কিনারা, আড়া/আইল = জমির সীমানা/আল, জাফত = দওয়াত, ন্যাংটা= উলঙ্গ, টাপিয়্যা = দৌড়ে, তাম্বাস= ভাত উঠানো চামচ , প্যাইচ্ছা = ডালি, গুড়ল বাতি/গুললতি = গুলতি,লাহার়ী=নাস্তা,খইলহ্যা=অলস, হামি=আমি, হাঁকে/হামাকে=আমাকে, হাঁরঘে=আমাদের, তাঁহিস -জ্বালা

গম্ভীরা[সম্পাদনা]

গম্ভীরা বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের অন্যতম একটি ধারা। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চলে গম্ভীরার প্রচলন রয়েছে। গম্ভীরা দলবদ্ধভাবে গাওয়া হয়। এটি বর্ণনামূলক গান। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা অঞ্চলের গম্ভীরার মুখ্য চরিত্রে নানা-নাতি খুব জনপ্রিয়। ধারণা করা হয় যে, গম্ভীরা উৎসবের প্রচলন হয়েছে শিবপূজাকে কেন্দ্র করে। শিবের এক নাম ‘গম্ভীর’, তাই শিবের উৎসব গম্ভীরা উৎসব এবং শিবের বন্দনাগীতিই হলো গম্ভীরা গান। গম্ভীরা উৎসবের সঙ্গে এ সঙ্গীতের ব্যবহারের পেছনে জাতিগত ও পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে।

কৃতি ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "এক নজরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ২০ জুন, ২০১৪ 
  2. অবস্থান