সুফিবাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(সুফি দর্শন থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সুফিবাদ বা তাসাউফ , (আরবি: الْتَّصَوُّف‎, ব্যক্তিবাচক বিশেষ্য: صُوفِيّ‎, সুফি, مُتَصَوِّف‎ মুতাসাউইফ) যাকে বিভিন্নভাবে ইসলামী আধ্যাত্মবাদ, ইসলামের অন্তর্নিহিত রূপ, ইসলামের অন্তর্গত আধ্যাত্মিকতার অদৃশ্য অনুভূতি হিসেবেও সংজ্ঞায়িত করা হয়, তা হল ইসলামে আধ্যাত্মবাদ, যা নির্দিষ্ট মুল্যবোধ, আচার-প্রথা চর্চা, মূলনীতি দ্বারা বিশেষায়িত, যা ইসলামের ইতিহাসের খুব প্রাথমিক দিকে শুরু হয়েছিল, এবং এটি ইসলামের আধ্যাত্মিক চর্চার "প্রধান অভিব্যক্তি ও কেন্দ্রীয় স্বচ্ছতা"কে তুলে ধরে। [১][২] সুফিবাদের চর্চাকারীদের "সুফি" বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে (আরবি বহুবচন: صُوفِيَّةসুফিয়াহ; صُوفِيُّونসুফিয়ুন; مُتَصَوُّفََةমুতাসায়িফাহ; مُتَصَوُّفُونমুতাসায়িফুন)।[৩] ইসলামে তাসাউফের আরেকটি সমার্থক ধারণা হল তাজকিয়া (تزكية)।

ঐতিহাসিকভাবে, সুফিগণ প্রায়শই বিভিন্ন তরিকা বা ধারার অনুসারী - এমন কিছু ধর্মসভা যা কোন মহান শিক্ষাগুরুকে কেন্দ্র করে গঠিত, যাদের ওয়ালী বলে আখ্যায়িত করা হয়, এবং তারা আনুসারীদের সঙ্গে ইসলামী নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর সরাসরি সংযোগ বা সিলসিলা স্থাপন করেন।[৪] এই তরিকাগুলো জাওয়াবিয়া, খানকা বা তেক্কে নামক কোন নির্দিষ্ট স্থানে মজলিস নামক আধ্যাত্মিক বৈঠকে মিলিত হয়[৫] তারা ইহসানের (ইবাদতের পূর্নাঙ্গতা) জন্য সংগ্রাম করে, যা একটি হাদীসে বিস্তারিত বর্নিত আছে: "ইহসান হল এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যে, তুমি তাকে দেখছো, অথবা তুমি তাকে না দেখলেও নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন।"[৬] সূফিগণ মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আল-ইনসান আল-কামিল (প্রথম ব্যক্তি যিনি আল্লাহর নৈতিকতাকে পরিপূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করেছেন) বলে আখ্যায়িত করে থাকে,[৭] এবং তাকে নেতা ও প্রধান আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখে।

সকল সূফি তরিকা মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছ থেকে পাওয়া তাদের অধিকাংশ অনুশাসন তার চাচাতো ভাই ও জামাতা আলীর বরাতে গ্রহণ করে থাকে, এবং তাকে উল্লেখযোগ্য আলাদা ও বিশেষ ব্যক্তি মনে করে।

যদিও প্রাচীন ও আধুনিক সূফিদের সিংহভাগই ছিল সুন্নি ইসলামের অনুসারী, মধ্যযুগের শেষভাগে শিয়া ইসলাম পরিমন্ডলের ভেতরেও কিছু সুফি ধারার বিকাশ ঘটে।[৩] যদিও সুফিগণ কট্টর রীতিনীতির বিরোধী, তারপরও তারা ইসলামী আইন কঠোরভাবে মেনে চলে এবং তারা ইসলামী ফিকহ ও ধর্মতত্ত্বের বিভিন্ন ধারার অন্তর্ভূক্ত। [৮]

সুফিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাদের সন্ন্যাসবাদ, বিশেষত যিকির নামক আল্লাহকে স্বরণের চর্চার সাথে তাদের ঐকান্তিক সম্পর্ক, যা তারা প্রায়সময় সালাতের পর করে থাকে।[৯] প্রারম্ভিক উমাইয়া খিলাফতের (৬৬১-৭৫০) জাগতিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরুপ তারা মুসলিমের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য হারে অনুসারী লাভ করে[১০] এবং এক সহস্রবছর সময়ের মধ্যে বহু মহাদেশ ও সংস্কৃতিতে তারা বিস্তৃতিলাভ করে, প্রাথমিকভাবে আরবি ভাষায় এবং পরবর্তীতে ফারসি, তুর্কি ও উর্দু ভাষায় অন্যান্যদের মাঝে তাদের বিশ্বাসের প্রচার ও প্রসার করে। [১১] সুফিগণ তাদের ধর্মপ্রচার ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।[১২] উইলিয়াম চিট্টিকের মতে, "বিস্তৃত পরিসর হতে দেখলে, সুফিবাদকে ইসলামী বিশ্বাস ও চর্চার অন্দরসজ্জা ও প্রগাঢ়তার কার্যক্রম হিসেবে বর্ননা করা যেতে পারে।"[১৩]

আধুনিক সময়ে সুফি তরিকাগুলোর সংখ্যা ব্যাপকহারে হ্রাস পাওয়া এবং সুফিবাদের কিছু দিক নিয়ে আধুনিকতাবাদী চিন্তাবিদ ও রক্ষণশীল সালাফিবাদীদের সমালোচনা সত্ত্বেও, সুফিবাদ ইসলামী বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, এবং পাশাপাশি পাশ্চাত্যের আধ্যাত্মিকতার বিভিন্ন রূপকেও প্রভাবিত করেছে।

পরিচ্ছেদসমূহ

সংজ্ঞা[সম্পাদনা]

সুফিবাদ হচ্ছে ইসলামের আধ্যাত্বিক-তাপসদের মরমীবাদ। এটি কোন সম্প্রদায় নয়, বরঞ্চ এটিকে ইসলামিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা মানুষের স্বীয় অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধতার সাথে সম্পর্কযুক্ত।আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। সুফিবাদের মূল বিষয় হল, আপন নফসের সঙ্গে, নিজ প্রাণের সাথে, নিজের জীবাত্মার সাথে, শয়তানের সাথে জিহাদ করে তার থেকে মুক্ত হয়ে এ জড় জগত থেকে মুক্তি পাওয়া।[মৌলিক গবেষণা?] আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হল এই মতবাদের মর্মকথা। সুফিবাদে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যানজ্ঞানের মাধ্যামে জানার প্রচেষ্টা করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] হযরত ইমাম গাজ্জালি এর মতে, আল্লাহর ব্যতীত অপর মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে পবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহুতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সুফিবাদ বলে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ‘সুফ অর্থ পশম আর তাসাওউফের অর্থ পশমী বস্ত্রে পরিধানের অভ্যাস (লাব্‌সু’স-সুফ) - অতঃপর মরমীতত্ত্বের সাধনায় কারও জীবনকে নিয়োজিত করার কাজকে বলা হয় তাসাওউফ। যিনি নিজেকে এইরূপ সাধনায় সমর্পিত করেন ইসলামের পরিভাষায় তিনি সুফি নামে অভিহিত হন।’[১৪] ইসলামি পরিভাষায় সুফিবাদকে তাসাওউফ বলা হয়, যার অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান। তাসাওউফ বা সুফিবাদ বলতে আত্মার পরিশুদ্ধির সাধনাকে বুঝায়। সুফীরা দাবি করে যে, আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। তাসাওউফ দর্শন অনুযায়ী আল্লাহ-প্রাপ্তির সাধনাকে 'তরিকত' বলা হয়। বলা হয়, তরিকত সাধনায় মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন। সেই পথ হলো ফানা ফিশ্‌শাইখ, ফানা ফিররাসুল ও ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন। তখন সুফির অন্তরে সার্বক্ষণিক শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে। সুফিগণের মতে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) স্বয়ং সুফিদর্শনের প্রবর্তক। এর সপক্ষে সুফিগণ মুহাম্মাদ (সা.) এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন যা হল, "সাবধান! প্রত্যেক রাজা -বাদশাহর একটি সংরক্ষিত এলাকা আছে। আর আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হচ্ছে তাঁর হারামকৃত বিষয়াদি। সাবধান! নিশ্চয়ই শরীরের মধ্যে একটি মাংসপিণ্ড আছে; যখন তা ঠিক থাকে তখন সমস্ত শরীর ঠিক থাকে, আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায় তখন গোটা দেহ নষ্ট হয়ে যায় -এটা হচ্ছে কলব (হৃদপিণ্ড)।"[১৫] সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে কল্‌বকে কলুষমুক্ত করে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন এবং যারা তার ভালোবাসা লাভ করেছেন, তাদের তরিকা বা পথ অনুসরণ করে "ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ অর্জন করা" সুফিবাদের উদ্দেশ্য।

শব্দতত্ত্ব[সম্পাদনা]

সুফি শব্দটির দুইটি ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়। সাধারণভাবে, শব্দটির আভিধানিক অর্থ ṣafā (صفاء) এর থেকে এসেছে, যার আরবি অর্থ বিশুদ্ধতা বা পবিত্রতা বা শুদ্ধতা বা পাপশূণ্যতা । আরেকটি আরবি মূল পাওয়া যায়, যা পশম, ṣūf (صُوف), শব্দটি থেকে সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারনা করা হয়ে থাকে। পশম ছিল তৎকালীন মুসলিম তাপসদের সাধারণ পোশাক। সুফি আল-রুধাবারি এই দুইটি মূলকে একত্রিত করেছেন যিনি বলেন, "সুফি হলেন সে ব্যক্তি যিনি সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ অবস্থায় পশমী বস্ত্র পরিধান করেন।"[১৬][১৭] মুসলিম পন্ডিতরা একমত হয়েছেন যে, "সুফ" (ṣūf) বা পশম হল "সুফি" শব্দটির সম্ভাব্য মূল।

তাসাউফ বনাম সুফিবাদ[সম্পাদনা]

ঐতিহাসিকভাবে, মুসলমানরা সুফিদের আধ্যাত্বিক সাধনাকে প্রকাশ করার জন্য তাসাউফ শব্দটি ব্যবহার করত।[১৮] ঐতিহাসিক সুফিদের মতে, তাসাউফ ইসলামের একটি বিশেষ রূপ যা ইসলামিক শরীয়াহ আইন এর অনুরূপ।[১৮] তাদের মতে, বিশ্বের সকল প্রকার মন্দ এবং গর্হিত কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শরীয়াহ এই বিশ্বকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। তারা মনে করেন, তাসাউফ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য এবং ইসলামিক বিশ্বাস এবং অনুশীলনের অপরিহার্য অংশ।[১৯] কার্ল এর্নস্ট এর মতে, সুফিবাদ শব্দটি কোন ইসলামিক গ্রন্থ বা কোন সুফিদের কাছ থেকে আসেনি। তার মতে শব্দটি এসেছে প্রাচ্যের ভাষা বিষয়ক ব্রিটিশ গবেষকদের থেকে। ইসলামিক সভ্যতায় (ইসলামিক আধ্যাত্বিকতা) তারা যে মনোমুগ্ধকর বিষয় উপলব্ধি করেন এবং তৎকালীন যুক্তরাজ্যে ইসলাম সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা বা বিশ্বাস বিরাজ করছিল তার মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য সৃষ্টি করতে তারা সুফিবাদ শব্দটি ব্যবহার করেন।[২০]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

উৎস[সম্পাদনা]

ইসলামে আলীকে 'সুফিবাদের জনক" বলে মনে করা হয়।[২১]

কার্ল ডব্লিউ. আর্নস্ট এর মতে, সুফিবাদের প্রাচীনতম ব্যক্তিত্ব স্বয়ং মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তার সাহাবীগণ।[২২] সুফি তরিকাগুলোর ভিত্তি হল "বায়াত" (بَيْعَة বাইআত, مُبَايَعَة মুবাই'আত "অঙ্গীকার, চুক্তি, শপথনামা") যে শপথ সাহাবারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে করতেন। এই শপথের মাধ্যমে সাহাবাগণ আল্লাহর কাজে নিজেদের নিয়োগ করতেন।[২৩][২৪][২২]

নিশ্চয় যারা আপনার (মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কাছে বাই’আত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বাই’আত করে। আল্লাহ্‌ হাত তাদের হাতের উপর। তারপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম বর্তাবে তারই উপর এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তবে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন। — [কুরআনের অনুবাদ, ৪৮:১০]

সুফিগণ বিশ্বাস করে যে, কোন বৈধ সুফি শাইখের নিকট বাইয়াত বা শপথ নেওয়ার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নিকট আনুগত্যের শপথ করে; ফলে, প্রার্থী ও মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাধ্যমে সুফিগণ আল্লাহ সম্পর্কে জানে, আল্লাহকে বোঝে এবং আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করে।[২৫] আলী হলেন সাহাবাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি যিনি সরাসরি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নিকট আন্গত্যের শপথ পাঠ করেন, এবং সুফিগণ আলীর মাধ্যমেই এই শপথকে বজায় রাখেন, যেন মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও তার সাথে সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়। এমন একটি ধারণা হাদিস থেকে বোঝা যায়, যাকে সূফিগণ সহীহ বলে মনে করেন, যেখানে মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, "আমি জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা"।[২৬] আলি হুজ্যিরির ন্যায় প্রসিদ্ধ সুফিগণ আলীকে তাসাউফের অনেক উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী বলে মনে করেন। উপরন্তু, বাগদাদের জুনায়েদ আলীকে তাসাউফের রীতিরেওয়াজের শাইখ বলে গণ্য করেছেন। [২১]

ইতিহাসবেত্তা জোনাথন এ.সি. ব্রাউন লিখেছেন, মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সময়ে, কিছু সাহাবা অন্যান্য সাহাবার চেয়ে "প্রবল ভক্তি, পুন্যময় নিরাসক্তি ও আল্লাহর রহস্যে"র প্রতি অধিক ঝোঁকবিশিষ্ট ছিলেন, এমনকি ইসলামে যা বলা হয়েছে তারচেয়েও বেশি, উদাহরণস্বরূপ আবু যর গিফারীহাসান বসরী নামক একজন তাবেঈকে "অন্তর-বিশুদ্ধকরণ-বিজ্ঞানে"র "স্থপতি" বলে বিবেচনা করা হয়। [২৭]


ইসলামের মৌলিক বিষয় হিসেবে অবস্থান তৈরি[সম্পাদনা]

মতবাদ হিসেবে ক্রমঃবিকাশ[সম্পাদনা]

প্রভাব বিস্তার[সম্পাদনা]

আধুনিক যুগ[সম্পাদনা]

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য[সম্পাদনা]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ (সাঃ)[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ (সাঃ) বিষয়ক সুফি বিশ্বাস[সম্পাদনা]

সুফিবাদ ও ইসলামী আইন[সম্পাদনা]

ঐতিহ্যবাহী ইসলামী চিন্তাধারা ও সুফিবাদ[সম্পাদনা]

নব্য-সুফিবাদ[সম্পাদনা]

তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় অবদান[সম্পাদনা]

সুফিদের আত্মত্যাগী চর্চা[সম্পাদনা]

যিকির[সম্পাদনা]

মুরাকাবা[সম্পাদনা]

সুফি চক্রঘুর্নন[সম্পাদনা]

সংগীত[সম্পাদনা]

দরবেশগণ[সম্পাদনা]

জিয়ারত[সম্পাদনা]

কেরামত[সম্পাদনা]

নির্যাতন[সম্পাদনা]

সুফিদের ও সুফিবাদের উপর নির্যাতনের অন্তর্ভূক্ত হল সুফি মাজার ও মসজিদগুলোকে ধ্বংস করা, তরিকাগুলোকে দমন করা, ও অধাকংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এর অনুসারীদের প্রতি বৈষম্য। ১৯২৫ সালে তুর্কি সুফিগণ নতুন ধর্মনিরপেক্ষ অধ্যাদেশের বিরোধিতা করায় তুর্কি গনপ্রজাতন্ত্রী সরকার সকল সুফি তরিকাকে নিষিদ্ধ করে, এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিকগুলো উচ্ছেদ করে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে সিনাইয়ের একটি মসজিদে হামলায় অন্ততপক্ষে ৩০৫ জন নিহত ও ১০০রও বেশি লোক আহত হয়।[২৮][২৯]

স্বনামধন্য সুফিগণ[সম্পাদনা]

মাজার[সম্পাদনা]

প্রধান সূফি তরিকাসমূহ[সম্পাদনা]

সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত ওলিদের অবলম্বন করে নানা তুরুক বা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:

  1. আব্দুল কাদের জিলানীর নামে প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা,
  2. খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দি তরিকা,
  3. শাইখ আহমেদ আল ফারুকি সিরহিন্দি প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা ও
  4. সৈয়দ আহমদ উল্লাহ প্রতিষ্ঠিত মাইজভাণ্ডারী তরিকা।

বেকতাশিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

তেরো শতকে ইসলামী সুফি সাধক বেকতাশ ভেলি বেকতাশি তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পনের শতকে তরিকাটির প্রাথমিক পর্যায়ে হুরুফি আলী আল-আলা কর্তৃক ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল এবং ষোল শতকে বালিম সুলতান তরিকাটিকে পুর্নগঠন করেন।

চিশতিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

চিশতিয়া ত্বরিকা (ফার্সি: چشتیہ) বর্তমান আফগানিস্তানের হেরাতের উত্তর দিকে প্রায় ৯৫ মাইল দূরের ক্ষুদ্র শহর চিশতে ৯৩০ সালের দিকে এই তরিকার উদ্ভব হয়। তরিকাটি প্রতিষ্ঠাতা হলেন (খাজা) আবু ইশক শামিলেভ্যান্টে ফিরে আসার পূর্বে, স্থানীয় আমীর (খাজা) আবু আহমাদ আবদালের (মৃত্যু ৯৬৬) পুত্রকে বায়াত করান, তাকে সুফিতত্ত্বের উপর প্রশিক্ষণ দেন এবং খেলাফত (আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্ব) দান করেন। আবু আহমদের বংশধরদের, তারা চিশতিয়া নামেও পরিচিত, নেতৃত্বে চিশতিয়া তরিকা একটি অঞ্চলভিত্তিক তরিকা হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।এই তরিকায় ভালবাসা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ১২ শতকের মধ্যভাগে মইনুদ্দিন চিশতি লাহোর ও আজমিরে এই তরিকা আনয়ন করেন। চিশতি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা আবু ইশক শামির পর তিনি এই ধারার অষ্টম ব্যক্তি। বর্তমানে এই তরিকার বেশ কিছু শাখা রয়েছে।[৩০]

কুবরাইয়া তরিকা[সম্পাদনা]

কুবরাইয়া তরিকা তেরো শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারায় তরিকাটি প্রতিষ্ঠা করেন নাজমুদ্দীন কুবরা নামে একজন ইসলামিক সুফি সাধক। ১২২১ সালে মঙ্গোলরা বুখারাকে দখল করে নিয়েছিল, তারা এলাকাটির প্রায় মানুষকেই গণহত্যার মাধ্যমে হত্যা করেছিল। মঙ্গলদের দ্বারা নিহতদের মধ্যে শেখ নাদজম ইদ-দিন কুবরাও ছিলেন।

মেভলেভি তরিকা[সম্পাদনা]

মুরিদিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

নকশবন্দিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

নি'মাতুল্লাহি তরিকা[সম্পাদনা]

কাদেরিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

সেনুসি তরিকা[সম্পাদনা]

সাধিলিল্লা তরিকা[সম্পাদনা]

সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

তিজান্যিয়া তরিকা[সম্পাদনা]

মাইজভান্ডারী তরিকা[সম্পাদনা]

এছাড়া মাদারিয়া, আহ্‌মদীয়া ও কলন্দরিয়া নামে আরও কয়েকটি তরিকার উদ্ভব ঘটে।

সুফি তরিকাসমূহের সাথে সম্পর্কিত প্রতীকসমূহ[সম্পাদনা]

প্রাপ্তি[সম্পাদনা]

ইসলামের বাইরে উপলব্ধি[সম্পাদনা]

ইহুদিধর্মে প্রভাব[সম্পাদনা]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে[সম্পাদনা]

সংগীত[সম্পাদনা]

২০০৫ সালে, রবি শেরগিল বুল্লে কি জানা নামে একটি সুফি রক গান প্রকাশ করেন, যা ভারতপাকিস্তানের জনপ্রিয় গানের তালিকার শীর্ষ উঠে আসে।[৩১][৩২]

সাহিত্য[সম্পাদনা]

তের শতকের ফার্সি ভাষার কবি রুমিকে সুফি জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লামা রুমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক পঠিত কবিদের অনত্যম।[৩৩] রুমির রচনাসমূহ অনুবাদ করে তা প্রকাশে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে কলেম্যান বার্কস।ইরানী শামস তাবারিজির সাথে রুমির আধ্যাত্মিক সর্ম্পক নিয়ে ইলিফ শাফাক দি ফর্টি রুলস অব লাভ নামে একটি উপন্যাসও লিখেন।[৩৪]

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উর্দু ভাষার কবি আল্লামা ইকবাল দি রিকনস্ট্র্যাকশান অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম (ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন) নামক ইংরেজি গ্রন্থে সুফিবাদ, দর্শন এবং ইসলাম সিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছেন।[৩৫]

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Compare: Nasr, Seyyed Hossein (২০০৭)। Chittick, William C., সম্পাদক। The Essential Seyyed Hossein Nasr। The perennial philosophy series। Bloomington, Indiana: World Wisdom, Inc। পৃষ্ঠা 74। আইএসবিএন 9781933316383। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৬-২৪Sufism is the esoteric or inward dimension of Islam [...] Islamic esoterism is, however [...] not exhausted by Sufism [...] but the main manifestation and the most important and central crystallization of Islamic esotericism is to be found in Sufism. 
  2. Shah, Idries (১৯৬৪–২০১৪)। The SufisISF Publishing। পৃষ্ঠা 30। আইএসবিএন 978-1784790035According to Idries Shah, Sufism is as old as Adam and is the essence of all religions, monotheistic or not. See Perennial philosophy 
  3. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; ReferenceB নামের সূত্রের জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  4. Editors, The (২০১৪-০২-০৪)। "tariqa | Islam"। Britannica.com। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মে ২০১৫ 
  5. Glassé 2008, পৃ. 499।
  6. Bin Jamil Zeno, Muhammad (১৯৯৬)। The Pillars of Islam & Iman। Darussalam। পৃষ্ঠা 19–। আইএসবিএন 978-9960-897-12-7 
  7. Fitzpatrick ও Walker 2014, পৃ. 446।
  8. Schimmel, Annemarie (২০১৪-১১-২৫)। "Sufism | Islam"। Britannica.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৬-২৬Opposed to the dry casuistry of the lawyer-divines, the mystics nevertheless scrupulously observed the commands of the divine law. [...] the mystics belonged to all schools of Islamic law and theology of the times. 
  9. A Prayer for Spiritual Elevation and Protection (2007) by Muhyiddin Ibn 'Arabi, Suha Taji-Farouki
  10. G. R Hawting (২০০২)। The First Dynasty of Islam: The Umayyad Caliphate 661-750। Taylor & Francis। আইএসবিএন 978-0-203-13700-0 
  11. Sells 1996, পৃ. 1।
  12. Schimmel, Annemarie (২০১৪-১১-২৫)। "Sufism"। Britannica.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৬-২৬ 
  13. Chittick 2007, পৃ. 22।
  14. (সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ, প্রথম খণ্ড, পৃ.৪৫২)
  15. বুখারী ৫২, মুসলিম ১৫৯৯
  16. The Naqs hbandi Sufi Tradition Guidebook of Daily Practices and Devotions, p. 83, Muhammad Hisham Kabbani, Shaykh Muhammad Hisham Kabbani, 2004
  17. "Sufism in Islam"। Mac.abc.se। ২০১২-০৪-১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-০৮-১৩ 
  18. Qamar-ul Huda (২০০৩), Striving for Divine Union: Spiritual Exercises for Suhraward Sufis, RoutledgeCurzon, পৃষ্ঠা 1–4 
  19. Chittick (2008), p.3,4,11
  20. Chittick (2008), p.6
  21. "Khalifa Ali bin Abu Talib - Ali, The Father of Sufism - Alim.org"। সংগ্রহের তারিখ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ 
  22. Carl W. Ernst (২০০৩), Tasawwuf [Sufism], Encyclopedia of Islam and the Muslim World 
  23. Taking Initiation (Bay'ah), Naqshbandi Sufi Way 
  24. Muhammad Hisham Kabbani (জুন ২০০৪), Classical Islam and the Naqshbandi Sufi tradition, Islamic Supreme Council of America, পৃষ্ঠা 644, আইএসবিএন 9781930409231 
  25. "Taking Initiation (Bay'ah) | The Naqshbandiyya Nazimiyya Sufi Order of America: Sufism and Spirituality"naqshbandi.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৫-১২ 
  26. Shaykh Tariq Knecht (২০১৮-১১-০৯), Journal of a Sufi Odyssey, Tauba Press, আইএসবিএন 9781450554398 
  27. Brown, Jonathan A.C. (২০১৪)। Misquoting Muhammad: The Challenge and Choices of Interpreting the Prophet's LegacyOneworld Publications। পৃষ্ঠা 58। আইএসবিএন 978-1780744209। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুন ২০১৮ 
  28. Walsh, Declan, and Youssef, Nour, Militants Kill 305 at Sufi Mosque in Egypt’s Deadliest Terrorist Attack, The New York Times, November 24, 2017
  29. Specia, Megan, Who Are Sufi Muslims and Why Do Some Extremists Hate Them?, The New York Times, November 24, 2017
  30. Rozehnal, Robert. Islamic Sufism Unbound: Politics and Piety in Twenty-First Century Pakistan. Palgrave MacMillan, 2007. Print.
  31. Zeeshan Jawed (৪ জুন ২০০৫)। "Soundscape for the soul"The TelegraphCalcutta। সংগ্রহের তারিখ ২৩ এপ্রিল ২০০৮ 
  32. Bageshree S. (২৬ মার্চ ২০০৫)। "Urban balladeer"The Hindu। Chennai, India। সংগ্রহের তারিখ ২৩ এপ্রিল ২০০৮ 
  33. Curiel, Jonathan (৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৫)। "Islamic verses / The influence of Muslim literature in the United States has grown stronger since the Sept. 11 attacks"। SFGate। 
  34. "The Forty Rules of Love by Elif Shafak – review"The Guardian (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১১-০৭-০১। আইএসএসএন 0261-3077। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৫-০৫ 
  35. 1877-1938., Iqbal, Muhammad, Sir (১৯৯০)। The reconstruction of religious thought in Islam (4th সংস্করণ)। New Delhi: Kitab Bhavan। আইএসবিএন 978-8171510818ওসিএলসি 70825403 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]