মিশ্রিতকরণ (বিশ্বাস)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

মিশ্রিতকরণ (ইংরেজি: Syncretism সিন্‌ক্রেটিজ্‌ম্‌) হল বিভিন্ন বিশ্বাসের একত্রিকরণ, যেখানে বিভিন্ন চিন্তাধারা বা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে (স্কুল অব থট) একত্রে মেশানো হয়ে থাকে। মিশ্রিতকরণ প্রক্রিয়াতে উৎপত্তিগতভাবে আলাদা আলাদা ঐতিহ্যকে একত্রে মিশিয়ে দেয়া বা মিলিয়ে দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধর্মে ধর্মতত্ত্বের (Theology) সাথে পুরাণকে (Mythology) একত্রিত করা হয়ে থাকে। এভাবে একাধিক বিশ্বাসে একটি একতা আনার চেষ্টা করা হয় এবং এর মাধ্যমে অন্যদের বিশ্বাসকে নিজেদের চিন্তাধারার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটা এক ধরনের সাকল্যবাচক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি (inclusive approach) যেখানে অন্যান্য বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্তিকরণের একটি পথ করে দেয়া হয়। মিশ্রিতকরণ শিল্প এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও হতে দেখা যায় (যা ইংরেজিতে Eclectism একলেকটিজম নামে পরিচিত)। রাজনীতিতে মিশ্রিতকরণ প্রক্রিয়া মিশ্রণবাদী রাজনীতি (Syncretic politics) নামে পরিচিত।

ইংরেজি নামের উৎস[সম্পাদনা]

Syncretism ইংরেজি শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৭ শতকে।[১] মডার্ন ল্যাটিন syncretismus থেকে শব্দটি নেয়া হয় যা আবার এসেছিল গ্রীক শব্দ synkretismos থেকে, এর অর্থ হল "ক্রিটান ফেডারেশন"।

এই গ্রিক শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় প্লুটার্কের (১ম শতকে লেখা) মোরালিয়া এর রচনা "ফ্র্যাটার্নাল লাভ" এ। তিনি এখানে ক্রিটানদের উদাহরণ দেন, যারা তাদের চিন্তাধারার বিভেদের সাথে আপস করে একত্রে মিলিত হয়ে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন এবং একত্রে মিলে বিপদের মোকাবেলা করেন। আর এটাই ছিল তাদের সিনক্রেটিজম (ক্রিটানদের একত্রীকরণ)।

ইরাসমাস সম্ভবত তার এডাজিয়া-তে (১৫১৭-১৮ এর শীতে প্রকাশিত) সিনক্রেটিজম এর ল্যাতিন শব্দটির আধুনিক ব্যবহার তুলে ধরেছিলেন। তিনি এক্ষেত্রে এটা বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক মতামতের সমন্বয়ের জন্য শব্দটি ব্যবহার না করে ভিন্ন মতের ব্যক্তি বা অননুগামী ব্যক্তিদের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করেন। ১৫১৯ সালের ২২ এপ্রিল তার মেলাংকথনকে পাঠানো চিঠিতে ইরাসমাস প্লুটার্কের ক্রিটানের কথা নিয়ে আসেন এবং লেখেন, "ঐক্য প্রচণ্ড শক্তিশালী"।

সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভূমিকা[সম্পাদনা]

লোকজ বিশ্বাসে প্রকাশ্য মিশ্রিতকরণের ফলে বিজাতীয় বা পূর্ব ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণ দেখা যায়, কিন্তু এই "ভিন্ন" আচার এরকম অনুমোদিত মিশ্রিতকরণ ছাড়াও টিকে যেতে পারে বা প্রবেশ করতে পারে। যেমন, কিছু কনভারসো (ইনকুইজিশনের ফলে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে স্পেন ও পর্তুগালে ইহুদি থেকে ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি) স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের শিকার ও শহীদদের উদ্দেশ্যে কিছু আচার পালন পালন করতেন, এদের ক্ষেত্রে ক্যাথলিসিজম এর বিভিন্ন ধর্মীয় উপাদান তারা প্রতিহত করলেও অনেক কিছু তাদের বিশ্বাসের সাথে একত্রিত হয়ে যায়।

কিছু ধর্মীয় আন্দোলন প্রকাশ্য মিশ্রিতকরণকে আলিঙ্গন করেছে, যেমন শিন্তো বিশ্বাসের সাথে বৌদ্ধধর্মের মিশ্রণ বা ব্রিটিশ আইল, গল (ফ্রান্স), স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তারেরর সময় জার্মানিক এবং কেল্টিকদের পৌত্তকিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে খ্রিষ্টধর্মের মিশ্রণ বা ত্রিনিদাদে শিয়া ইসলামের ধর্ম চর্চায় ভারতীয় প্রভাব। অন্যেরা আবার খুব জোরের সাথেই মিশ্রিতকরণকে পরিত্যাগ করেন, কারণ এতে বিশ্বাসের প্রকৃত এবং মূল্যবান উপাদানগুলোর সাথে আপস করতে হয় এবং সেগুলোর মর্যাদা হানি করা হয়। এক্ষেত্রে উদাহরণগুলো হল ইহুদি ধর্মের দ্বিতীয় মন্দির, ইসলাম এবং প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মের বেশিরভাগ ধারা।

মিশ্রিতকরণের ফলে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক ভাবনার (আন্তসাংস্কৃতিক উপযোগিতা) একই সাথে অবস্থান করার সুযোগ সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এই আন্তসাংস্কৃতিক উপযোগিতা হল ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্য সঠিকভাবে যোগাযোগ করার একটি সক্ষমতা। বহুজাতিক রাজ্যের শাসকদের মধ্যে এই প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়, এবং তাদেরকে এটি আয়ত্ত করতে হয়। আবার সনাতনপন্থার কারণে মিশ্রিতকরণকে পরিত্যাগ করাটা একটি সুসংজ্ঞায়িত সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর মধ্যে একটি আপস না করা সাংস্কৃতিক ঐক্যকে তৈরি করতে, শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।

ধর্মীয় মিশ্রিতকরণ[সম্পাদনা]

ধর্মীয় মিশ্রিতকরণের ফলে দুই বা ততোধিক ধর্মীয় ব্যবস্থার মিশ্রণের মাধ্যমে একটি নতুন ব্যবস্থার সৃষ্টি হয় অথবা পরষ্পর সম্পর্কহীন ঐতিহ্যগুলো একটি নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসে গৃহীত হয়। এটা বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে এবং কোন এলাকায় একাধিক ধর্মীয় ঐতিহ্য নৈকট্যে থাকলে এবং সংস্কৃতিতে এদের প্রভাব প্রকট থাকলে এটা হওয়া খুবই সাধারণ। আবার কোন সংস্কৃতির উপর বিজয় লাভ করা গেলেও এটা দেখা যায়, বিজয়ীরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে তাদের সাথে নিয়ে আসেন, কিন্তু তারা সম্পূর্ণভাবে সেই অঞ্চলের পুরনো বিশ্বাসকে, বিশেষ করে আচারগুলোকে নির্মূল করতে সক্ষম হন না।

ধর্মগুলোর বিশ্বাস ও ইতিহাসেও মিশ্রিতকরণের উপাদান থাকতে পারে, কিন্তু সেই ধর্মের অনুসারীরা প্রায়ই তাদের ধর্মের এই মিশ্রিতকরণের উপাদানগুলোকে অস্বীকার করে থাকেন, বিশেষ করে "উদ্ঘাটিত" ধর্মব্যবস্থার অনুসারীগণ যেমন আব্রাহামিক ধর্মগুলোর ক্ষেত্রে অথবা এরকম অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে এক্সক্লুসিভিস্ট বা স্বতন্ত্র পথাবলম্বন করতে দেখা যায়। অন্তর্ভুক্তিবিরোধী ধর্ম হচ্ছে সেগুলোই যেগুলো অন্য ধর্মের কোন উপাদান নিজেদের ধর্মে প্রবেশ করতে দেয় না, নিজেদের ধর্মে একটি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। এই ধর্মগুলোর অনুসারীগণ কখনও কখনও মিশ্রিতকরণকে তাদের পবিত্র সত্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হল, ধর্মে কোন সংগতিহীন বিশ্বাস প্রবেশ করলে মূল ধর্মটি দূষিত হয়ে যাবে, যার ফলে ধর্মটি আর সত্য থাকবে না। কোন নির্দিষ্ট মিশ্রিতকরণ প্রথার সমালোচকগণ কখনও কখনও "মিশ্রিতকরণ" শব্দটিকে অবজ্ঞাসূচক উপাধি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কারণ একটি পরিবর্তনটি নির্দেশ করে, যারা একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস বা আচারকে কোন ধর্মব্যবস্থায় প্রবেশ করাতে চান তারা আসল বিশ্বাসটিকে বিকৃত করে ফেলেন।

অন্যদিকে অন্তর্ভুক্তিবাদী বা সাতন্ত্র্য ধরে রাখে না এমন বিশ্বাসব্যবস্থাগুলো অন্যান্য ধর্মীয় ঐতিহ্যকে তাদের নিজেদের বিশ্বাসে স্থান দিতে স্বাধীন বোধ করে। অন্যেরা বলেন "মিশ্রিতকরণ" শব্দটি একটি ছলনাময় পরিভাষা।[২] এর মাধ্যমে কোন প্রভাবশালী ধর্মের কেন্দ্রীয় উপাদানকে অন্য কোন অঞ্চলের বিশ্বাস বা আচারের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিথ ফারদিনান্দোর মতে, এটা একটি প্রভাবশালী ধর্মের অখণ্ডতার ক্ষেত্রে একটি ক্ষতিকর আপস।

বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে, ধর্মসংস্কারকগণ কখনও কখনও মিশ্রিতকরণ প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে নতুন ধর্ম তৈরি করেন। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে থাকা উত্তেজনা এবং শত্রুতা কমানোর কৌশল হিসেবে তারা এটা করে থাকেন। আর এক্ষেত্রে প্রায়ই পূর্বের আসল ধর্মটির বিভিন্ন উপাদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এই সংস্কার করা হয়। এ ধরনের ধর্মগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি অন্তর্ভুক্তিবাদী ব্যক্তিকে আকৃষ্ট করে থাকে।

সংস্কৃতি এবং সমাজ[সম্পাদনা]

কোন কোন লেখকের মতে, "মিশ্রিতকরণকে প্রায়ই বর্তমানে থাকা কোন সংস্কৃতি, ধর্ম বা আচারের উপর বিজাতীয় সংস্কৃতি, ধর্ম বা আচারের বিশাল মাত্রায় আরোপ ও প্রতারণার ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়।"[৩] অন্যেরা যেমন জেরি বেন্টলি বলেন, মিশ্রিতকরণ সাংস্কৃতিক আপসের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। এটা অন্য কোন সংস্কৃতির বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং বিভিন্ন রীতি নীতিকে আনয়ন করার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংস্পর্ষে আসার একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। এরকম একটি অভিবাসন সাধারণত তখনই সম্ভব হয় যখন উভয় ঐতিহ্যের মধ্যে এক ধরনের অনুনাদ থাকে। যাইহোক, বেন্টলি এরকমটা বললেও, প্রসারণশীল সংস্কৃতি যে সবসময়ই বৈদেশিক অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়েছে, এরকমটা বলা যায় না।[৪]

আলোকিত যুগের সময়[সম্পাদনা]

মিশ্রিতকরণের আধুনিক, যৌক্তিক, অ-মর্যাদাহানিকর সংজ্ঞাটি ফরাসি বিশ্বকোষ রচয়িতা দ্যনি দিদেরোর অঁসিক্লোপেদি নিবন্ধ Eclecticisme and Syncrétistes, Hénotiques এবং ou Conciliateurs থেকে নেয়া হয়। দিদেরো মিশ্রিতকরণকে বিভিন্ন বিচিত্র উৎসের মধ্যে ঐক্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. The Oxford English Dictionary first attests the word syncretism in English in 1618.
  2. http://www.missiology.org.uk/pdf/cotterell-fs/15_ferdinando.pdf
  3. Peter J. Claus and Margaret A. Mills, South Asian Folklore: An Encyclopedia: (Garland Publishing, Inc., 2003).
  4. Jerry Bentley, Old World Encounters: Cross-Cultural Contacts and Exchanges in Pre-Modern Times (New York: Oxford University Press, 1993), viii.

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

  •  "Syncretism"। ব্রিটিশ বিশ্বকোষ 26 (১১তম সংস্করণ)। ১৯১১ [[বিষয়শ্রেণী:উইকিসংকলনের তথ্যসূত্রসহ ১৯১১ সালের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে উইকিপিডিয়া নিবন্ধসমূহে একটি উদ্ধৃতি একত্রিত করা হয়েছে]]
  • Cotter, John (1990). The New Age and Syncretism, in the World and in the Church. Long Prairie, Minn.: Neumann Press. 38 p. N.B.: The approach to the issue is from a conservative Roman Catholic position. ISBN 0-911845-20-8