আদি পরাশক্তি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হিন্দুধর্ম অনুযায়ী জগতের স্রষ্টা ব্রহ্ম, আবার তিনিই পুরুষ ও প্রকৃতিতে দ্বিধাবিভক্ত। পুরুষ পুংশক্তি; প্রকৃতি নারীশক্তি। আর এ পরমা প্রকৃতিই পরমব্রহ্মের শক্তি। হিন্দু শাক্তমতে তিনিই আদি শক্তি বা আদ্যাশক্তি মহামায়া। শক্তির উৎস শক্তিমান ব্রহ্ম, আর এই মাতৃশক্তি তাঁরই একটি প্রকাশ। সে জন্য তাঁকে বলা হয় ব্রহ্মারূপিণী। হিন্দু শাক্ত অনুসারীগণ তাঁকে পরমাশক্তি, মহাশক্তি, মহাগৌরী, মহাদেবী, মহালক্ষ্মী, চামুন্ডা, কালী, তারা, দূর্গা, জগদম্বা, মহাসরস্বতী, সীতা, রাধা ইত্যাদি নামে পূজা করেন।

আদিশক্তির বিভিন্ন রূপ[সম্পাদনা]

হিন্দু পুরাণে আদিশক্তির বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলা বারো মাসের সাথে সম্পর্কিত আদিশক্তির বারোটি রূপ বাঙ্গালী শাক্ত অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। এগুলি হলো - গন্ধেশ্বরী, ফলহারিণী, কামাক্ষ্যা, শাকম্ভরী, পার্বতী, দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, কাত্যায়নী, পৌষকালী, রটন্তীকালী, সঙ্কটনাশিনী ও বাসন্তী।

গন্ধেশ্বরী[সম্পাদনা]

বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস, বৈশাখে দেবী গন্ধেশ্বরীর পূজা করা হয়। প্রতিবছর বৈশাখী পূর্ণিমাতে গন্ধবণিকরা গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজা করেন। গন্ধেশ্বরী মাতৃ শক্তির প্রতীক। বাংলার গন্ধবণিকরা শুরুতে শৈবধর্মের উপাসক অর্থাৎ শিবের উপাসক হলেও পরবর্তী কালে শাক্ত উপাসক হয়ে ওঠেন।

ফলহারিণী[সম্পাদনা]

হিন্দু তন্ত্রমতে ফলহারিণী বা ফলহারিনী কালি হল আদিশক্তির একটি রূপ। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে বাঙ্গালী হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর করার জন্য নানাবিধ ফল দিয়ে ফলহারিনী কালির পূজা করে থাকেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই দিনেই স্ত্রী সারদা দেবীকে পূজা করেছিলেন। ১২৮০ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তির সগুণরূপের পূজা করেছিলেন। আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রমে এই পূজা 'ষোড়শী' পূজা নামে পরিচিত।

কামাক্ষ্যা[সম্পাদনা]

আদিশক্তির আরেক রূপ হল উর্বরতার দেবী কামাক্ষ্যা। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী আষাঢ় মাসে দেবী কামাক্ষ্যার পূজা করা হয়। বাংলায় একটি প্রচলিত কথা আছে- '৬ আষাঢ় অম্বুবাচি, তার নেই কোন পাঁজিপুঁথি'। এই পূজা উপলক্ষে বাংলার বিভিন্ন স্থানে অম্বুবাচি উৎসব পালিত হয়। আসামের কামাক্ষ্যা মন্দিরে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ অম্বুবাচি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

শাকম্ভরী[সম্পাদনা]

শাকম্ভরী হলেন শ্রাবণ মাসের আরাধ্যা দেবী। দেবীর এই রূপের বর্ণনা মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণে বর্ণিত আছে। দেবীভাগবত পুরাণে উল্লেখ আছে, হিরণ্যাক্ষ বংশধর রুরুর পুত্র দুর্গমাসুরকে বধ করার নিমিত্ত দেবী পার্বতী শাকম্ভরী রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শ্রাবণ মাসে প্রকৃতিতে প্রাচুর্য আনেন তিনি, তাঁর কৃপাতেই বাংলার মাঠঘাট ভরে ওঠে শাকসব্জিতে, এমনটাই মনে করেন দেবীর ভক্তরা। আর তাই এই দেবীর বর্ণও সবুজ। আদিশক্তির এই রূপের পূজা এখন বিরল।

কৌশিকী[সম্পাদনা]

একবারশুম্ভ আর নিশুম্ভ্[সম্পাদনা]

একবারশুম্ভ আর নিশুম্ভ্ নামে দুই অসুর ভাতৃদ্বয় ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে ত্রিলোক জয় করে। তখন দেবতাদের অনুরোধে দেবী পার্বতী নিজের কোষিকা থেকে একজন দেবীর সৃষ্টি করেন যিনি ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে অসুর দুইকে বধ করেন ।


দুর্গা[সম্পাদনা]

আশ্বিন মাসে যাঁর আরাধনায় মেতে ওঠে বাংলা, তিনিই হলেন দেবী দুর্গা। রামায়ণের কাহিনীতে যে অকালবোধনের কথা বলা হয়েছে এবং রামচন্দ্র যাঁর আরাধনা করেছিলেন, তিনি হলেন আদিশক্তির এই রূপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দেবীর সঙ্গেই মহিষাসুরমর্দিনী ও চার সন্তানের জননী দেবী পার্বতীর রূপটি মিশিয়ে দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয় বাংলায়। এখন বাঙালী হিন্দুদের সর্ববৃহৎ উৎসব দুর্গোৎসব। দুর্গম নামক দৈত্ বধ করে দেবী পার্বতীর এই নাম হয় ।

জগদ্ধাত্রী[সম্পাদনা]

দেবী জগদ্ধাত্রী কার্তিক মাসের আরাধ্য দেবী, এটা সর্বজনবিদিত। পৌরাণিক কাহিনীতে আছে, একসময় ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র– এই চার দেবতা খুব অহংকারী হয়ে উঠলেন। আদিশক্তির শক্তিতেই যে তাঁরা বলীয়ান সেটা ভুলে গেলেন। তখনই তাঁদের সামনে দেবী পার্বতী উপস্থিত হন দেবী জগদ্ধাত্রী রূপে। তিনি জগতের রক্ষাকারিণী দেবী। চন্দনগরের (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) জগদ্ধাত্রী পূজা উপমহাদেশে বিখ্যাত।

কাত্যায়নী[সম্পাদনা]

আদিশক্তির কাত্যায়নী রূপের আরাধনা করা হয় অগ্রহায়ণ মাসে। বিবাহ ও সন্তানকামনা পূরণার্থে অনেকে দেবী কাত্যায়নীর পূজা করে থাকেন। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রজের গোপিণীরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামীরূপে পাওয়ার কামনায় এই দেবীর মূর্তি গড়ে পুজো করতেন। বাংলাদেশের মাগুরায় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ কাত্যায়নী উৎসবের আয়োজন করা হয়। ঋষি কত্যায়ান এর কন্যা হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেন তাই দেবী পার্বতীর এই নাম হয় ।

পৌষকালী[সম্পাদনা]

বাংলার অনেক প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দিরে পৌষকালীর পূজা করা হয়। আদিশক্তির এই রূপকে বলা হয় মোক্ষদানকারিণী। পৌষ মাসে পূজা বলে এই মাসের অন্যতম প্রধান সবজি মুলো নিবেদন করা হয় দেবীকে। তাই এখনও অনেকেই দেবীর পূজাকে মুলোকালী পূজা বলেন।

রটন্তীকালী[সম্পাদনা]

মাঘ মাসে আদিশক্তির আরেক রূপের পূজা করা হয় বাংলার বিভিন্ন কালী মন্দিরে। দেবীর এই রূপকে বলা হয় রটন্তীকালী। মাঘ মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে হয় রটন্তীকালী পূজা। আদিশক্তির এই রূপকে গৃহের সুখশান্তির রক্ষাকারিণী বলা হয়। দেবীর এই রূপের আরাধনায় সাংসারিক জীবন সুখের হয় বলেই মনে করা হয়।

সংকটনাশিনী দুর্গা[সম্পাদনা]

দেবী সংকটনাশিনী হলেন বাংলা ফাল্গুন মাসের আরাধ্যা দেবী। বসন্তের শুরুতে এই সময় বাংলার ঘরে ঘরে নানা ধরনের রোগের প্রকোপ দেখা যায়। জীবনসঙ্কট ও অন্যান্য বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য মায়ের ভক্তরা তাই সঙ্কটনাশিনী পূজা করে থাকেন এই মাসে।

বাসন্তী[সম্পাদনা]

দেবী দুর্গা বাংলা চৈত্র মাসে বাসন্তী দেবী হিসেবে পূজিত হয়ে থাকেন। শরৎ কালে দুর্গা পূজাকে যেমন শারদীয় দুর্গাপূজা বলা হয়, চৈত্র মাস বা বসন্তকালে বাসন্তী পূজাকে তেমনিভাবে বাসন্তী দুর্গাপূজা বলা হয়ে থাকে। পূরাণ মতে, রাজা সুরথ ও সমাধি বৈস্য বাসন্তী দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। চৈত্র মাসে বাংলার অনেক স্থানে আদিশক্তিকে অন্নপূর্ণা রূপেও পূজা করা হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]