গাজন উৎসব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
গাজন উৎসব, নারনা, হাওড়া।

গাজন পশ্চিমবঙ্গে পালিত একটি হিন্দু লোকউৎসব। এই উৎসব শিব, নীল ও ধর্মঠাকুরের পূজাকেন্দ্রিক উৎসব।

বাংলা গাজন শব্দটি গর্জন শব্দ থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীরা প্রচণ্ড গর্জন করেন বলে উৎসবের এইরূপ নামকরণ হয়।[১] অপর মতে, গা শব্দের অর্থ গ্রাম এবং জন শব্দের অর্থ জনসাধারণ; গ্রামীণ জনসাধারণের উৎসব হওয়ায় এই উৎসবের এই রূপ নামকরণ হয়।[২]

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, গাজন উৎসবের দিনে দেবী হরকালীর সঙ্গে শিবের বিবাহ হয়। বিবাহ উৎসবে সন্ন্যাসীরা বরযাত্রী হিসেবে অংশ নেন। অন্যধিকে ধর্মঠাকুরের গাজন হল ধর্মঠাকুর ও দেবী মুক্তির বিবাহ উৎসব।[১] গাজন উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল মেলা।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

রাঢ়বঙ্গের শৈব-সংস্কৃতির একটি বিশেষ অঙ্গ হচ্ছে ‘গাজন’। গাজন অর্থে (গাঁ= গ্রাম, জন= জনগণ) গ্রামের জনগণের নিজস্ব উৎসব। নবদ্বীপ মহিমার লেখক কান্তিচন্দ্র রাঢ়ি ‘গাজন’-কে ধর্মগাজনের অপভ্রংশ বলেছেন। গাজন বিষয়ে ভারতকোষকার জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের লৌ্কিক উৎসব। ইহা নিম্নশ্রেণির লোকের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ...বাংলাদেশে ইহা নানা পৌ্রাণিক ও লৌ্কিক দেবতার নামের সহিত যুক্ত হইয়াছে, যেমন শিবের গাজন, ধর্মের গাজন, নীলের গাজন, আদ্যের গাজন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই উৎসবের লক্ষ্য সূর্য এবং তাহার পত্নী বলিয়া কল্পিত পৃথিবী। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। চৈত্র মাস হইতে বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচণ্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও সুবৃষ্টির আশায় কৃষিজীবী সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করিয়াছিল। গ্রাম্য শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া এই উৎসবের অনুষ্ঠান হয়।[৩] যে শিবকে সারা বছর আগলে রাখেন ব্রাহ্মণেরা, গাজনের কদিন সেই শিব সমাজের নিম্ন কোটির মানুষের হাতে পূজা গ্রহণ করেন। এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই, জাত নেই, কুল নেই, উচ্চবর্ণের অবজ্ঞা অবহেলা নেই। এ কদিন সবাই সমান মর্যাদায় সমাসীন। এখানেই শৈব সংস্কৃতির সঠিক উত্তরণ। গাজনের সময় শিব প্রকৃত অর্থে গণদেবতা।

ছড়া গানে গাজন[সম্পাদনা]

ছড়া গানেও প্রবেশ করেছে শিবের গাজন-
‘আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই
মা গিয়েছেন গয়া কাশী ডুগডুগি বাজাই’

নবদ্বীপে গাজন[সম্পাদনা]

নবদ্বীপের শিবলিঙ্গগুলো বেশিরভাগই বৌদ্ধ প্রভাবিত। পাল যুগে নবদ্বীপ ছিল বৌদ্ধ ধর্মের পীঠস্থান। নবদ্বীপের পশ্চিমে একটি ঢিবি ছিল। তার পূর্ব নাম ‘পারডাঙা’ বর্তমানে ‘পাড়পুর’। নবদ্বীপের বৌদ্ধ-প্রভাবিত শিবমূর্তিগুলি পারডাঙার ধ্বংস স্তুপ থেকে প্রাপ্ত। নবদ্বীপের পূর্বে অবস্থিত ‘বল্লালসেনের ঢিবি’ খননের পর প্রাপ্ত স্থাপত্য শৈলীকে অনেকে বৌদ্ধ মন্দির বলে মনে করেছেন।[৪] পানশিলা সুবর্ণবিহার নবদ্বীপের সন্নিকটে অবস্থিত। নবদ্বীপের বুড়োশিব, যোগনাথ, বানেশ্বর, হংসবাহন, পারডাঙার শিব প্রভৃতি এই শ্রেণির বৌদ্ধ প্রভাবিত শিবলিঙ্গ। এঁদের কোন গৌরীপট্ট নেই।
নবদ্বীপে শিবের সংখ্যা অনেক গুলি- বুড়োশিব, যোগনাথ, বানেশ্বর, দণ্ডপাণি, হংসবাহন, অলকনাথ, বালকনাথ, ভবতারণ, পোলোশ্বর। এর মধ্যে ভবতারণ ও অলোকনাথ ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির চিহ্ন যুক্ত প্রতিষ্ঠিত শিব। নদিয়ার রাজারা এই দুই শিবের প্রতিষ্ঠাতা। অলকনাথ প্রতিষ্ঠা করেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র আর ভবতারণ প্রতিষ্ঠা করেন মহারাজ গিরিশচন্দ্র রায়(১৮২৫ খ্রি)। ভবতারণ শিবের গাজন হয় না। বালকনাথ শিব কুড়িয়ে পেয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্যামাচরণ দাস। পোলো দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে যে মুরতি পাওয়া গেছে তার নাম পোলোশ্বর শিব। হংসবাহন শিব সারাবছর হংসদার বিলে নিমজ্জিত থাকেন, গাজনের কদিন মন্দিরে অধিস্থান করেন। আদিতে এটা ছিল বৌদ্ধ মূর্তি, হংসের উপর স্থাপিত প্রস্তর নির্মিত পঞ্জর চিহ্নযুক্ত শিলাটি এখন শিব রূপে পূজিত হচ্ছেন।
গাজনের পাঁচ দিন নবদ্বীপের আপামর জনগণ মেতে ওঠেন উৎসবে। সাতগাজন, ফুল,ফল, নীল ও চরক- এই নিয়ে গাজন।


পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ Mitra, Dr. Amalendu, Rarher Sanskriti O Dharmathakur, First published 1972, 2001 edition, pp. 165-169, Subarnarekha, 73 Mahatma Gandhi Road, Kolkata
  2. Ghosh, Binoy, Paschim Banger Sanskriti, (in Bengali), part I, 1976 edition, p. 67, Prakash Bhaban
  3. ভারতকোষ- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত ৩য় খণ্ড, পৃ. ১০০-১০১
  4. ‘পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকায় নদিয়া জেলা সংখ্যায় প্রকাশিত মোহিত রায়ের প্রবন্ধ, পৃ. ৫৩