মাহাতো

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মাহাতো' বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাসকারী অন্যতম প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মত মাহাতোদেরও রয়েছে নিজেস্ব পরিচিতি, সামাজিক রীতি-নীতি, আচার ও কৃষ্টিকালচার, বর্ণ পরিচয় এবং সামাজিক বৈচিত্রতা যা তাদেরকে একটি নিজেস্ব জাতিসত্ত্বা হিসেবে পরিচিতি দান করেছে। অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস হলো ভারতের কুচবিহার জেলা বর্তমান ঝাড়খন্ড প্রদেশের নানা প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

বাংলাদেশের বেশ কিছু জেলাতে এদের বসবাস লক্ষ্য করা যায়, তবে সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও সলংগা থানায় এবং বগুড়া জেলার শেরপুর থানায় এরা বেশির ভাগ বসবাস করে। তাছাড়াও জয়পুরহাট জেলার কাশপুর, মহিপুর,ঘোড়াঘাট থানায় নওগাঁ জেলার ধামরহাট থানায়, রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী, তানোর ও নাচোলে, পাবনা জেলার চাটমোহরে, ফরিদপুর জেলার বালিয়াকান্দি বোয়ালমারী,তাছাড়াও নাটোর ও খুলনা জেলাতে বেশ কিছু মাহাতো পরিবার বসবাস করে আসছে। [১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস হলো ভারতের কুচবিহার জেলা বর্তমান ঝাড়খন্ড প্রদেশের নানা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখান থেকে কতদিন আগে তাঁরা বাংলাদেশে আসে তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি, তবে শোনা যায়, মাহাতোরা খুবই কর্মঠ, নিরীহ ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। ঝগড়া, গন্ডগোল, অশান্তিমুলক কার্যকলাপকে তাঁরা প্রশ্রয় কিংবা তাতে কখনই অংশগ্রহণ করে না। তারা সব সময় নিজেদের মধ্যে এবং অপরদের মধ্যে সর্বদা মিলে মিশে থাকতে বেশি পছন্দ করে। তাদের প্রধান আর্দশ হচ্ছে যে, “যদি প্রত্যেকের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি না থাকে তাহলে কিভাবে একটি শান্তিময় সমাজ তারা পাবে”। আর তাদের এ নিরীহ ও সরল স্বভাবের জন্য তৎকালীন ভারতবর্ষের ইসলামি ঊগ্রপন্থি শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত ছিল। ধর্মান্তরকরণ করার জন্য তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী তাদের উপর নানা কৌশলে অত্যাচার করত। কিছু জনের মতে, মাহাতোরা যেহেতু অত্যাচারিত ছিল তাই তারা এই ঊগ্রপন্থি শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে থাকে। এই সুযোগটি বাংলার জমিদাররা কাজে লাগিয়ে মাহাতোদের বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানায় যেহেতু মাহাতোরা ছিল খুবই পরিশ্রমী এবং সৎ আর এই গুনটি বাংলার জমিদারদের বেশি আর্কষন করেছিল। মাহাতোরা জাতি হিসেবে খুবই পরিশ্রমী এরা নিজের গায়ের ঘাম ঝরানো অর্থ ছাড়া অন্যর অর্থকে নিজের ব্যবহারের কথা কখনো চিন্তাও করে না। যেহেতু মাহাতোরা অত্যাচারিত ছিল তাই তারা অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য জমিদারদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাংলাদেশে আসে এবং বসবাস শুরু করে।

অন্য কিছু জনের মতে, মাহাতোরা কেবল যে, জমিদারদের আমন্ত্রনে বাংলায় এসেছিল তা পুরো পুরি ঠিক নয়। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজ পিতৃভূমি ছেড়ে এদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল এবং লুকিয়ে বনজঙ্গলে বসবাস শুরু করেছিল। তাঁরা মনে করে মাহাতোরা মুলত ক্ষত্রিয় বংশধর, নিজেদের সুযোগ সুবিধা এবং নিজেদের রক্ষা করার মত সমস্ত জ্ঞান তাদের ভিতর ছিল, কারণ তারা ছিল ক্ষত্রিয় বংশধর শান্তিযুদ্ধ করা এবং প্রতিরোধ করা ছিল তাদের আর্দশ কিন্তু তারা সংখ্যাই ছিল সীমিত এবং (এরা যারা বাংলাদেশে আছে) ভারতবর্ষের বিহারের প্রত্যান্ত অঞ্চলে ছিল তাদের বসবাস। সীমিত জনবলের কারণে তারা তৎকালীন ঊগ্রশাসক গোষ্ঠীর সাথে টিকতে না পেরে বাংলাদেশে আসে এবং খুবই নিরীহ জীবন যাপন করে, তবে এরা যে খবই কর্মঠ ছিল তা শতভাগ সত্য। তারা যে ক্ষত্রিয় বংশের ছিল তাহা তাদের জীবন যাপনে সময় মাঝে মাঝে যে অঞ্চলে তারা বসবাস করতো সেখানকার পুরোনো মানুষগুলো অকপটে স্বীকার করেগেছেন। তারা অর্থাৎ তৎকালীন মুসলমানরা বলতেন, “এরা এত সহজ সরল এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী যে, যেকোন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে এবং কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারত” মাঝে মাঝে তারা অর্থাৎ মাহাতোরা আমাদের বলত যে, “আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে দাড়াব না কিন্তু কেউ আমাদের একচেটিয়া আক্রমন করলে তার পরিনাম ভাল হবে না”। এরা কখনো নিজেরা কলহে লিপ্ত হতো না কিন্তু অন্যর কলহ দেখলে দ্রুত সমাধানে এগিয়ে আসতো। এদের জীবন প্রণালী খুবই সহনশীল ধরনের। এই মানুষ গুলো হলো বর্তমান বাংলাদেশে বসবাসকারী মাহাতো জাতিগোষ্ঠী।

মাহাতোরা অর্থাৎ বেশির ভাগ মাহাতো যারা বাংলাদেশে আছে তারা কুর্মী গোত্রের । কুর্মী কিংবা এদের অন্যান্য গোত্র আছে কিন্তু এরা নামের শেষে মাহাতো কথাটি ব্যবহার করে বলে এরা মাহাতো নামে অধিক পরিচিত। আসলে এরা সবাই কর্মী গোত্রের অর্ন্তগত কারণ এদের ভাষা কুর্মালী যা ভারতের ঝাড়খন্ড, হাজারিবাগ ও কুচবিহার জেলায় এখনো প্রচলিত আছে এবং মাহাতোরা নিজেদের মধ্যে কুর্মালী ভাষায় কথা বলে। আর এদের পবিত্র গ্রন্থ “অ্যাইনাস”, মানুষ মারা গেলে তাঁর আত্মার মুক্তির জন্য পাঠ করা হয় এবং কোন কাজ শুরু করার আগে এই “অ্যাইনাস” গ্রন্থ পাঠ করা হয় যা দেব নাগরী কুর্মালী ভাষায় রচিত। কেউ কেউ ধারণা করেন কুর্মী মাহাতোদের কিছু অংশ প্রথমে ঢাকার কুর্মীটোলায় হয়তো বসবাস শুরু করেছিল তাই হয়তো স্থানীয় লোকজন এই জায়গার নাম দিয়েছেন কুর্মীদের নাম অনুসারে কুর্মীটোলা। তাছাড়া হিন্দুদের পবিত্র ও প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ এর একটি শাখা ঋকবেদে কুর্মী সম্পর্কে উল্লেখ আছে। মুলত গোত্রগত দিক থেকে এরা সবাই কুর্মী হলেও এদের স¤প্রদায়ের নাম মাহাতো। এরা সবাই এদের নামের শেষে মাহাতো কথাটি ব্যবহার করে। অনেকে মনে করেন মহৎ থেকে মাহাতো কথাটি এসেছে, এটি আসলে ঠিক নয়, তবে কেউ কেউ নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে মাহাতো কথাটি মহৎ হতে এসেছে বলে বিশ্লেষন করেন কিন্তু এটি আসলে আদৌও যৌক্তিক নয় মাহাতো কথাটি পূর্ব থেকে আজো অবিকৃত অবস্থায় আছে।

সমাজ ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

মাহাতোদের সমাজ ব্যবস্থা দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত এক “গ্রাম ভিত্তিক” ও “সমাজ ভিত্তিক”। গ্রাম ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় একজনকে “গ্রাম্যপ্রধান” নির্বাচন করা হয়। গ্রামে যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষনশীল তিনি এ নির্বাচিত প্রতিনিধি হন এবং তার পর খেকে তিনি “মাহাতোয়া” নামে সমাজে পরিচিত লাভ করেন। গ্রামের যেকোন ধরনের সমস্যা ও সমাধানে সর্বদা তার সহযোগিতা নেওয়া হয়। গ্রাম ভিত্তিক যে কোন পুজায় কর্মী তেরী করা এবং দায়িত্ব বন্টন করা, বিবাহ, মৃত ব্যক্তির সৎকার ও শ্রাদ্ধ কিংবা গ্রাম ভিত্তিক যে কোন কাজ তার প্রত্যক্ষ পরিচালনায় সম্পাদিত হয়। সর্বপরি বলা যায় মাহাতোয়া গ্রামের হর্তাকর্তা কিন্তু তিনি যদি কোন অন্যায় করেন তাহলে গ্রামের মুরুব্বীগণ তাহা মনিটরিং করেন এবং সতর্ক করেন, তিনি যদি মুরব্বীদের সতর্ক না মানেন বা তাদের কথা না শোনেন, তাহলে সবাই মিলে তার মাহাতোয়া পদটি কেড়ে নেন তাই তিনি স্বেচ্ছাচারিত হতে পারেন না। আর সমাজ ভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় যে কয়টি গ্রাম নিয়ে সমাজ গঠিত হয়, সে কয়টি গ্রামের মাহাতোয়াদের মধ্যে একজনকে সমাজের প্রধান নির্বাচন করেন যাকে “সমাজপতি” বলা হয়। সমাজের যেকোন কাজে গ্রাম্যপ্রধান বা মাহাতোয়ারা “সমাজপতিকে” সহযোগিতা সহযোগিতা করেন। এখানে আমি নির্বাচন কথাটি ব্যবহার করেছি বলে মনে করবেন না যে তারা ভোটাভুটি করে নিবাচিত হন। আসলে তারা অর্থাৎ সমাজের সবাই তাদের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষটাকে মেনে চলেন আর সবাই তাকে মান্য করেন বলে তিনি সমাজপতি নির্বাচিত হন। কোন কারনে কোন গ্রামে যদি ঝগড়া কিংবা কোন আপত্তিকর ঘটনা ঘটে তাহলে তারা গ্রামের মাহাতোয়া অর্থাৎ গ্রাম্যপ্রধানের কাছে বিচার চান, গ্রাম্য প্রধান যদি কোন কারনে সিদ্ধান্ত দিতে না পারে তবে সমাজের সকল গ্রাম্যপ্রধান এবং যিনি সমাজপতি হন তিনি সহ সবাই মিলে বিষয়টি মিমাংসা করেন।

ভাষা[সম্পাদনা]

মাহাতোদের ভাষার নাম মুলত “কুর্মালী ভাষা” তবে বাংলাদেশের যে অঞ্চলে তারা বসবাস করে ,সেই অঞ্চলের মুসলিমেরা এদের ভাষাকে মাহাতোদের নামানুসারে মাহাতো ভাষা বলে কিন্তু আসলে তাদের ভাষার নাম কুর্মালী ভাষা। কুর্মী জাতির নাম অনুসারে এদের ভাষার নাম কুর্মালী ভাষা। কুর্মীদের কথা যেহেতু বেদে উল্লেখ আছে, তাই মাহাতোরা যে, আদিম যুগ হতে আছে তা সতত প্রতিয়মান। মাহাতোরা নিজেদের মধ্যে এই মাহাতো কুর্মালী ভাষায় কথা বলে। কুর্মালী ভাষার ধরন হলো আধা সংস্কৃতি ও আধাহিন্দি মেশানো। মাহাতোরা নিজ ভাষায় কথা বলতে খুবই গর্ববোধ করে তাছাড়াও তারা বাংলা এবং স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে শিখলেও সবাই বাংলায় কথা বলতে পারে না। যারা অন্য সমাজের সাথে মেশে না এরকম কিছু বয়স্ক লোকদের ক্ষেত্রে তা রেশি দেখা যায়। জন্মের পর এরা সাধারণত শিশুদের মাতৃভাষা হিসেবে কুর্মালী ভাষা শেখায় কারণ তারা পরিবারে সবাই এই ভাষায় কথা বলে। কেবল মাত্র অন্য সমাজের লোকদের সাথে কথা বলার সময় বাংলাভাষা ব্যবহার করে। এ সমাজের শিশুরা প্রথমে কুর্মালী মাহাতো ভাষায় কথা বলে পরে এরা স্কুল ও বড়দের কাছে বাংলা ভাষা শেখে।

ধর্ম[সম্পাদনা]

মাহাতো সম্প্রদায় সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী কেননা তারা মনে করে, আমাদের কুর্মীর কথা পবিত্র প্রাচীন গ্রন্থ বেদে উল্লেখ আছে তাই আমরা মনুর সন্তান। আর এ জন্য মাহাতোরা বেদ,রামায়ণ, মহাভারত, গীতা প্রভুতি গ্রন্থের কথা বিশ্বাস করে এবং মেনে চলে। ধর্মের প্রতি এদের এত বিশ্বাস যে, ধর্মান্তরীন যুগে খৃষ্টান মিশনারি এবং মুসলিমদের জোর করে ধর্মান্তরকরন অবস্থাতেও তারা একজনও ধর্মান্তরিত হয়নি। নানা প্রলোভন, নানা অত্যাচারের মধ্যেও তারা আজোও সনাতন ধর্মকে আকড়ে ধরে আছে। যেখানে অন্য স¤প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী গণহারে ধর্মান্তরীত হয়েছে সেখানে তারা আজও অবিকৃত রয়েছে। তারা এত ধর্মভীরু যে, যখন তাদের এলাকায় অর্থাৎ সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, তাড়াশে ওয়ার্ল্ডভিশন এবং একটি দাতা সংস্থা আসে তখন গুজব ছড়ায় যে, এই সংস্থাগুলো খৃষ্টান কর্তৃক পরিচালিত তাই তারা সংস্থাগুলোকে সম্পূর্ন রুপে বর্জন করে এমনকি এদের পরিচালিত প্রাথমিক স্কুল গুলোতে ছেলে মেয়েদের প্রর্যন্ত আসতে দিত না। হয়তো এরা এদের পূর্ব পুরুষকে বেশি শ্রোদ্ধা করে বলেই এরা আজোও সনাতন ধর্ম এবং সনাতনের আদর্শ সহিষ্ণুতা বুকে নিয়ে বেঁচে আছে। মাহাতোরা তাদের সমাজের সকল মানষকে নিজ সত্ত্বা সম্পর্কে ধারণা দেয়, সর্বদা নিজ জাতির প্রতি সতর্ক-তৎপর থাকার উপদেশ দেয়।

মাহাতোরা মুলত সনাতন ধর্মের অনুসারী বলে এরা বিভিন্ন দেব দেবীর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং পূজা করে। তারা অন্যান্য হিন্দু ধর্মের অনুসারী জাতিগোষ্ঠীর মত দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, শিব প্রভুতি মুর্তি পূজা করে। আবার এদের নিজেস্ব কিছু পূজা যেমন সূর্যপূজা অর্থাৎ মাহাতোরা একে “সূর্যাহি” পূজা বলে। পরিবারে পুত্র সন্তান জন্ম নিলে পুত্রের বয়স যখন এক বছর হয় তখন “সূর্যাহি” পূজা করে সন্তানের মাথা মুন্ডন করানো হয়। এসময় তারা দুই দিন উপবাস করে কেবল মাত্র গুড় দিয়ে রান্না করা ভাত খেয়ে। মাহাতোদের প্রধান উৎসব হলো “শহরায়”। কার্তিক মাসের আমাবস্যার রাত্রিতে তারা ঢোল,করতাল বাজিয়ে গ্রামের প্রতি বাড়ি বাড়ি গিয়ে শহরায় উৎসবের গান (রাহা মাতো হেরিন রে এ, রাহা মাতো হেরিন রে, রাহা রাহা রে এ) গায় আর চুয়ানি মদ খেয়ে রাত্রি জাগরণ করে। এই উৎসবে তারা সকল আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেয় এবং মজা করে। রাত্রি জাগরণের পরের দিন করে “গহালপূজা” অর্থাৎ যে ঘরে তারা গরু রাখে সেই গোয়ালঘরে পাঠি ছাগল জবাই করে বলে এর নাম “গহালপূজা”। মাহাতো অবিবাহিত মেয়েদের জন্য আছে আলাদা পূজা যাতে কেবল মেয়েরা অংশগ্রহণ করতে পারে। এই পূজাটির নাম হলো “কারামপূজা” বা “ডালপূজা”, করম গাছের ডাল আঙ্গিনার মাঝখানে পুঁতে পাড়ার সকল মেয়েরা নতুন নতুন পোশাক পরে কাঁসার থালায় পূজার উপকরণ নিয়ে আসে এবং আঙ্গিনায় পোতা করম গাছের ডালের চারপাশে ঘিরে বসে। তবে এই পূজা করার আগে মেয়েরা নিদিষ্ট তিথিতে বাঁশে তৈরী ছোট ছোট দুটি থালা আকৃতি ডালায় মাটি দিয়ে নানা রকম ডালের বীজ বোপন করে এবং ডালাগুলো খুব যতœ করে রাখে। প্রতিদিন রাত্রিতে খাওয়া-দাওয়ার পর পাড়ার সব মেয়েরা একত্রিত হয়ে ডালা দুটিকে বাড়ির আঙ্গিনায় রেখে দল বেধে ডালার চারপাশে ঘুরে ঘুরে নানা রকম গীত গায় এভাবে চলে পাঁচদিন। পাঁচদিনের দিন হয় পুজা। পুজা শেষ হলে মেয়েরা গীত গেয়ে ঢোলের তালে তালে ঝুমুর নাচে। আবার বিবাহিত মহিলাদের জন্য আছে আবার ভিন্ন পুজা। এই পুজার নাম “জিতিয়াপুজা” জিতাষ্টমী তিথিতে এই পুজা করা হয় বলে এই পুজার নাম মাহাতোরা দিয়েছে “জিতিয়াপুজা”। এই পুজায় বিবাহিত মহিলারা উপবাস থেকে সাত পাড়া ঘুরে একে অপরের বাড়ি থেকে নানা রকম ডাল জাতীয় দ্রবাদি এবং শাক চেয়ে আনে। চেয়ে আনা দ্রব্য গুলো দিয়ে তরকারী রান্না করে এবং আলো চাউল দিয়ে ভাত রান্না করে একে অপরের বাড়ি বিতরন করে। এই রান্না করা ভাত-তরকারীকে তারা পবিত্র মনে করে। এই পুজাটি ঠিক “কারামপুজার” মত হয় পাথক্য হলো কারামপুজায় অবিবাহিত মেয়েরা অংশগ্রহণ করে আর জিতিয়াপুজায় বিবাহিত মহিলারা অংশগ্রহণ করে। আর একটি পাথক্য হলো কারামপুজায় করমগাছের ডাল ব্যবহার করা হয় আর জিতিয়া পুজায় পাকৈড় গাছের ডাল ও আঁখেরগাছ (মাহাতোরা যাকে কুশাল বলে) ব্যবহার করা হয়।

দৈহিক গঠন[সম্পাদনা]

মাহাতোদের দৈহিক গঠন বাঙালীদের মতই। এদের গায়ের রং সাধারনত উজ্জ্বল শ্যামলা, তবে বেশির ভাগ ফর্সা। এদের দৈহিক গঠন মাঝারি, বেটে ও লম্বা ধরনের।

পোশাক[সম্পাদনা]

মাহাতো পুরুষরা ধুতির সাথে গাভিন শার্ট পরতে বেশি পছন্দ করে তবে তারা লুঙ্গিও পরে। মেয়েরা সাধারণত শাড়ি পরে তবে তাদের শাড়ি পেচিয়ে পরার ধরণ আলাদা ধরণের। অলংকার হিসেবে পুরুষরা কানে সোনার এক ধরণের গোলাকৃতির কানাসি পরে আর মেয়েরা হাতে পরে কাটাবাজু, পায়ে গড়মল, গলায় ধানবিছা, কোমরে ফিতা ও তারাহারা বা তারার মত অলংকার।

খাদ্য[সম্পাদনা]

মাহাতোদের প্রধান খাদ্য হলো ভাত ও মাছ। তাছাড়া তারা পাঠার মাংস, খাসির মাংস, শুকরের মাংস, কাঁকড়া, কাছিম, শামুক প্রভুতি খায়। মদের সাথে শুকুরের মাংস খেতে এরা খুবই ভালোবাসে। এদের মধ্যে কাছিমের (যা মাহাতো ভাষায় দ্যুড়া নামে পরিচিত) মাংস তারা খুব বেশি পছন্দ করে। নানা উৎসবে তারা পচানি অর্থাৎ এক ধরনের চাউল পচানো হাড়ি মদ নামে পরিচিত যা তারা পানিয় হিসেবে ব্যবহার করে। এই পচানি তৈরী করতে হলে প্রথমে চাউল ভেজে তা গুড়া করতে হয়, ঐ চাউল গুড়ার সাথে এক প্রকার ঔষদ মিশিয়ে পাঁচ-ছয় দিন রেখে দিলে তা সুন্দর ভাবে মিশে যায় এবং পরে তা পরিস্কার কাপড় দিয়ে আলাদা পাত্রে ছেঁকে খায়।

বিবাহ[সম্পাদনা]

মাহাতোরা নিজ সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোন সম্প্রদায়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় না, তবে যদি কেউ এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে তাহলে সমাজ থেকে তাকে একঘরে রাখে অর্থাৎ সমাজ তার সাথে সহযোগিতার সব সম্পর্ক ছিন্ন করে। মাহাতোরা বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের মুরব্বীদের মতামতের প্রাধান্য দেয়। মাহাতো সম্প্রদায় মনে করে যদি বিবাহের ক্ষেত্রে সন্তানদের মতামতের প্রাধান্য দেওয়া হয় তাহলে সমাজে অবক্ষয় শুরু হবে, যার পরিণতি খুবই খারাপ। বিয়ের পাঁচ কিংবা তিন দিন আগে লগ্ন বাধা হয়, এর পর থেকে তারা নিমন্ত্রণ দিতে শুরু করে। নিমন্ত্রণের সাক্ষী হিসেবে তারা পান খাওয়ার সুপারি ব্যাবহার করে। সাধারণ আত্মীয়দের দুটি করে সুপারি দেয় এবং জামাই শ্রেণীর আত্মীয় স্বজনকে তারা তিনটি করে সুপারি দেয়। লগ্ন বান্ধার দিন থেকে বিয়ের দিন পর্যন্ত প্রত্যেক দিন রাত্রে পাড়ার সকল মেয়েরা বর ও কন্যার গায়ে হলুদ দিয়ে দেয়। এসময় তারা নানা রকম বিয়ের গীত গায় এবং আনন্দ করে। যেদিন বিয়ে, সেদিন তারা বরের বাড়ি থেকে দুপুর বেলা কন্যার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়, তবে যাওয়ার আগে মহিলারা বরকে সাথে নিয়ে অমলো খাওয়ার উদ্দেশে আমগাছের নিচে নিয়ে যায়। আম গাছের গোড়ায় দাড়িয়ে বরকে দেওয়া হয় কচি আমের পাতা চিবানোর জন্য। কোন রকম চিবানো হলে পাতা চিবানো অবস্থায় মুখে পানি নেয়, বরের মুখের এই পানি মহিলারা বরকে কোলে নিয়ে তার মুখ থেকে অল্প অল্প করে মখে দেয় এবং আর্শিবাদ করে, একে অমলো খাওয়া বলে। এরপর গরুর গাড়ি অথবা পাল্কিতে করে বিয়ে করার উদ্দেশে কনে বাড়ি যায়। কনে বাড়ি পৌচার সাথে সাথে পাড়ার সকল কৌতুহলি মানুষ গুলো বরকে দেখতে বরের গাড়ির কাছে ভিড় জমায়। মহিলারা কাঁসার থালার মধ্যে আতপ চাউল, দুর্বঘাস, দিয়ালী জ্বালিয়ে বরকে আহব্বান জানায়। এসময় বরপক্ষের সাথে কন্যা পক্ষের নটুয়া খেলা হয়, এই খেলাই বাঁশে তৈরী করা ঢাল ও তলওয়ার ব্যাবহার করা হয়। যারা খেলায় জেতে তাদের মেড়লা উপহার দেওয়া হয়, মেড়লা হলো পিঠা ভর্তি বড় কলস। বিবাহ বাসর হিসেবে বাড়ির আঙিনায় বর্গাকৃতির একটি ঘের তৈরী করা হয় যাকে মাহাতোরা মাড়োয়া বলে। এই মাড়োয়ার উপরে কাপড়ের সামিয়ানা টানানো হয় এবং মাড়োয়ার মাঝ খানে চারটি ছোট কলা গাছ রোপন করে বিবাহ মন্ডব তৈরী করে, যার মাঝখানে চারটি কলস রাখার মত স্থান তৈরী করে। বিবাহ মন্ডবটি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। চারটি ছোট কলস মন্ডবের মাঝ খানে রেখে মখে চারটি দিয়ালী রেখে বাতি জ্বালানো হয়। তারপর কন্যাকে মাড়োয়ার মাঝখানে পিঁড়িতে বসিয়ে কন্যার গায়ে সোনা পিতল স্পর্শ করানো হয় একে মাহাতো ভাষায় সোনাপিতার বলে। সোনাপিতার শেষ হওয়ার কন্যাকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়ে সাজানো হয়। কন্যাকে সাজিয়ে বাঁশের ডালিতে বসিয়ে শুন্যি করে মাড়োয়ার মাঝখানে বরের সামনে নিয়ে আসে এসময় কন্যা তার মুখ পানপাতা দিয়ে ঢেকে রাখে। বর মন্ডপের এক পাশে দাড়ায় আর যারা কন্যাকে ডালিতে ধরে নিয়ে আসে তারা মন্ডপের চারপাশে একবার ঘুরে বরের সামনা সামনি কনেকে নিয়ে আসে, তখন বর কন্যার পানপাতা সহ হাত সরিয়ে মুখ দর্শন করে তখন এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, একে শুভ দৃষ্টি বলে। এভাবে শুভ দৃষ্টির সময় বর কন্যার মাথায় পাঁচ পাকে পাঁচ বার সিঁদুর দিয়ে দেয় শুভ দৃষ্টি সম্পন্ন করে। তারপর ব্রাহ্মন মন্ত্র পড়ে বিবাহ সমাপ্ত করে। তবে কোন কোন পরিবার বিয়ের পরের দিন সকালে আবার বাসি বিয়ে দেয়, বাসি বিয়ে এজন্য বলা হয় কারণ সকাল বেলা টিউবয়েল পাড়ে বিয়েটি অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে কন্যা বরকে গোসল করিয়ে দেয়। প্রয়োজনীয় কাজ শেষে ব্রাহ্মন বিবাহ সম্পন্ন করেন।

সৎকার পদ্ধতি[সম্পাদনা]

হটাৎ করে কোন ব্যক্তি মারা গেলে সমাজের সবাইকে মৃত্যাসৎকারের জন্য নিমন্ত্রন করে। সবাই একত্রিত হলে মৃত ব্যক্তিকে স্নান করিয়ে তুলসী তলায় আনা হয়। শেষ বিদায় জানানোর জন্য সবাই তার মুখ দর্শন করে এবং সবাই মিলে মৃত দেহকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। শ্মশানে লাশকে চিতার উপর কাঠ সহ সাজানোর পর মৃত ব্যক্তির পুত্র বা উত্তরাধীকারী মুখাগ্নি করে। আবার কেউ কেউ মৃতাকে মাটি দিয়ে সৎকার কার্য সম্পন্ন করে। মৃতদেহ সৎকারের পর শ্মশান বন্ধুগণ সহ সবাই পুকুরে গোসল করে, যে যার ঘরে ফেরে আগুন কেটে অর্থাৎ মাটি বাটখোরার মধ্যে আগুন ও সরিষা রেখে বাটখারাটি শরীরের চার পাশে ঘুরিয়ে শরীরকে পবিত্র করে, তার উপর দিয়ে পার হয় বলে একে আগুনকাটা বলে। মৃত ব্যক্তির পুত্রগণ সাদা সেলাই বিহীন কাপড় পরিধান করে। পিতার বা মাতার মৃত্যুর পর পিতার মঙ্গল কমনায় পুত্ররা বার দিন হবিস পালন করে, এই বার দিন তারা পিতা বা মাতার আত্মার মুক্তির উদ্দেশে ঐ এক কাপড় পরিধান করে থাকে অর্থাৎ তারা প্রতিদিন গোসল করার পর রোদে দাড়িয়ে কাপড় শুকায়। হবিস করার সময় খাদ্য হিসেবে তারা চব্বিশ ঘন্টায় মাত্র এক বার গুড়মিশ্রিত ভাত গ্রহণ করে। পবিারের অন্য সকল লোকজন এই বারদিন তেল,হলুদ ছাড়া তরকারী দিয়ে ভাত খায়। মৃত্যুর দিন থেকে তিন দিনের দিন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে করা হয় তিনাকামান অর্থাৎ তিন দিনের নির্ধারিত শ্রাদ্ধ্য। মৃত ব্যক্তিকে যারা শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিল বা যারা সাথে শ্মশানে গিয়েছিল তারা সবাই সেদিন আবার পবিত্র হওয়ার উদ্দেশ্যে হাতের নখ, মাথার চুলকাটা, গোফ-দাড়ি পরিস্কার করে। দশদিনের দিন করা হয় দশাশ্রাদ্ধ্য, পুকুর ঘাটে পিন্ডদান, সমাজের সকল মানুষকে ভোজ খাওয়ানো ইত্যাদি কাজ দিনে সম্পন্ন করা হয়। রাত্রিতে যে ঘরে লোকটি মারা যায় বা যে ঘরে সে রাত্রিতে ঘুমাতো সেই ঘরে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে দেওয়া হয় সামাজ অর্থাৎ সামাজ এই জন্য বলা হয় যে, এই দিন রাত্রে সমাজের সকল মুরুব্বীদের ডেকে রাত্রিভর “অ্যাইনাস” পাঠ করে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে মঙ্গলাচরণ অনুষ্ঠান করা হয়। তারা তারপরের দিন থেকে সেলাই বিহীন কাপড় ছেড়ে নতুন কাপড় পরিধান করে এবং সাভাবিক জীবন যাপন শুরু করে।

বাসস্থান[সম্পাদনা]

মাহাতোরা একত্রে মিলেমিশে থাকতে বেশি ভালোবাসে আর সে জন্যই পূর্ব থেকেই একত্রে বসবাস করে আসছে। তারা প্রথমে বিভিন্ন পরিত্যক্ত অঞ্চলে বসবাস শুরু করেছিল, আর তাই যে সকল জমি তারা জঙ্গল সাফ করে তৈরী করে নিজেরা আবাদ করত সেগুলোর কোন দলিল ছিল না, বলে স্থানীয় মুসলমানরা তাদের জমি জবর দখল করেছে। মাহাতোদের বেশির ভাগ ঘর বাড়ি মাটির তৈরী এবং পাশাপাশি। ধারণা করা হয় বা এদের মুরব্বীদের কাছে তথ্য পাওয়া যায়, এরা যেখানে বসবাস করছে তা পূর্বে জঙ্গলে পরিপূর্ন ছিল। তারা যখন এখানে অর্থাৎ সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, তাড়াশে বসবাস শুরু করেছিল তখন এদের বাড়ির চারপাশের জঙ্গলে বাঘের মত হিংস্র প্রাণী রাত্রিতে দাপিয়ে বেড়াতো। এদের অনেকে বন্য প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত ও আহত হত। তাই তারা যে আদিম অধীবাসীদের মত জীবন ধারণ করেছে তার প্রমান মেলে এদের অতীত কথায়। তারা কথা বলত মাহাতো কুর্মালী ভাষায় বলে স্থানীয় মুসলমানরা তাদের সাথে মিশতে চাইতো না। একদিকে ভাষাগত অসুবিধা, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর সাথে যুদ্ধ করে কিভাবে এরা সমাজে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে তা মনে করলে মন আৎকে উঠতে চায়। এদের বাড়ি মুলত মাটির দেওয়াল দিয়ে তৈরী, উপরে চালা হিসেবে শন, পাট, খড়পাতা দিয়ে তৈরী করা হয়। যারা গরীব তারা বাঁশের কুনচি দিয়ে তৈরী ঘরে বাস করে। ইদানিং ধনী মাহাতোরা চালা হিসেবে টিন ব্যাবহার করছে, মাঝে মাঝে ইটের তৈরী বাড়িও নজরে পড়ে। আপনি যদি কোন মাহাতো বাড়িতে বেড়াতে যান। তাহলে তারা আপনাকে সমাদর করে বসার জন্য কাঠের তৈরী পিঁড়ি দিবে অথবা বাঁশ দড়ির তৈরী খাট নতুবা খেজুর পাতার তৈরী শীতলপাটিতে বসতে দিবে।

শিল্প ও সাহিত্য[সম্পাদনা]

মাহাতো ভাষায় প্রথম উপন্যাস 'কারাম'। [২]] মাহাতোদের ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে উপন্যাসটি লিখেছেন উজ্জ্বল মাহাতো। মাহাতো ভাষায় প্রথম নাটক হটংটয়া [৩]- নাটকটি রচনা ও পরিচালনা করেন দেবা ও রবীন্দ্র নাথ মাহাতো

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]