নমঃশূদ্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

'নমঃশূদ্র বা নমঃস্বেজ হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় জনগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর বিস্তার মূলত বাংলাদেশ এবং ভারত। এছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন দেশে তারা অল্প সংখ্যায় ছড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যগতভাবে এরা পেশায় কৃষিজীবী।[১] সামাজিকভাবে তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের চারটি বর্ণের বাইরে অবস্থান করে অর্থাৎ তারা একটি অবর্ণ বা মুক্তবর্ণ হিন্দু জনগোষ্ঠী। ভারতীয় উপমহাদেশে বহুকাল ধরে তারা শোষিত এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠী এবং এক ধরনের বর্ণ বিদ্বেষের তথা রূপকার্থে তারা ইহুদী-ভাগ্যের শিকার। [২] ১৮৯১ সালে ব্রিটিশদের একটি পরিসংখ্যানে তাদের পূর্বপুরুষের শ্রুতি অনুযায়ী , অধিকাংশ নমঃশূদ্রই কাশ্যপ গোত্রের অন্তর্গত।[৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

নমশূদ্র আর্যায়ন প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভুত একটি বর্ণাশ্রয়ী সম্প্রদায়। প্রাচীন কালে সমাজে চতুবর্ণ প্রথাকে বংশানুক্রমিক বর্ণপ্রথায় রূপান্তরের যে প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় তারই ধারাবাহিকতায় এর উদ্ভব। তাত্ত্বিকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ায় সমাজে কোন গোষ্ঠীর প্রাধান্য নির্ধারণ করা হত এবং এ প্রক্রিয়ায় ব্রাহ্মণদের অবস্থান ছিল শীর্ষে ও সর্বনিম্ন স্তরে ছিল শুদ্র। ধর্ম-সামাজিক স্তর বিন্যাশে সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থানরত শুদ্রদের ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা হতো যে, সত্য উপলব্ধি ও পালন করার মতো কোনো গুণাবলী তাদের নেই। উপমহাদেশে আর্যাকরণের ফলে ধীরে ধীরে চতুবর্ণ প্রথার মধ্যে অনার্যদের আত্মীকরণ ঘটতে থাকে। বর্ণপ্রথার বৈশিষ্ট্যসমূহ পরবর্তীকালে জাতি ব্যবস্থার মধ্যে বিশদভাবে বর্ণিত হয়। পরবর্তী সময়ে বর্ণ শ্রেণির বৈশিষ্ট্যসূচক শ্রমভিত্তিক এ ব্যাপক বিভাজনের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় জাতি প্রথার মধ্যে। ফলে বিভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে পেশাগত স্বাতন্ত্র্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

বাংলায় আর্য সংস্কৃতির ক্রমবিস্তারের ফলে বিভিন্ন শ্রেণির জনগনকে নির্দিষ্ট পেশা সহকারে স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট জাতি হিসেবে শ্রেণি বিভাজনের দিকে চালিত করে। বর্ণের পরিভাষায় চাষী, ব্যবসায়ী, কারিগর ও সেবাপ্রদানকারী জাতসমূহ শুদ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জাতি ব্যবস্থার অধীনে পেশাজীবী শ্রেণির বিশাল জনগোষ্ঠী সমাজের প্রয়োজন মিটানোর কাজে আত্মনিয়োগ করেছিল। পরিণতিস্বরূপ, বাংলায় হিন্দু সমাজের গঠন বর্ণের পরিবর্তে জাতির পরিভাষা অনুসারে উপলদ্ধ হয়ে আসে। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতি ও পেশার মধ্যে সম্বন্ধের প্রতি জোর দেওয়ার ফলে জাত ব্যবস্থার সমর্থনকারিগণ উৎপাদন ও বণ্টনের একটি অ-প্রতিযোগিতামূলক বন্দোবস্তের ভিত্তি স্থাপনের চেষ্টা করছিল, যা প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকানির্বাহের উপায় ও ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সাধারণভাবে সমাজিক ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা খ্রিস্টীয় সাত শতক থেকে ভারতীয় স্থানীয় আর্থিক ব্যবস্থায় বিরাজমান সীমিত সম্পদ এবং ঘাটতি ও স্থবিরতার চাপের মধ্যেও সহজভাবে উৎপাদন ও তা বণ্টনের নিশ্চয়তা প্রদান করে থাকে।

বল্লালচরিতে বাংলায় শুদ্রদের উত্থান ও তাদের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তাদের দু’টি বৃহৎ শ্রেণিতে বিভক্ত করে দেখানো হয়েছে। তারা ছিল; সৎ শুদ্র (যাদের নিকট থেকে উচ্চ বর্ণের মানুষ খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে পারত) এবং অসৎ শুদ্র (যাদের ছোঁয়াকেও অপবিত্র বা অচ্ছুৎ বলে গণ্য করা হতো।) শুদ্রদের মধ্যে যারা কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বৃহত্তর অংশ ‘নমশুদ্র’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং অবশিষ্টাংশ দাস হিসেবে পরিগণিত হয়। সুলতানী আমলে অনেক পেশাজীবী শ্রেণিকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যেমন, সুবর্ণ বণিকদের সৎ শুদ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বিদেশি শাসন এই প্রবণতাকে ধরে রাখার ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। কারণ তখন সামাজিকভাবে বহিষ্কৃত ও বঞ্চিত শ্রেণি ব্যাপকহারে সামাজিক স্বীকৃতি প্রাপ্তির আশায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমানে রূপান্তরিত হচ্ছিল। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে সুলতানী ও মুগল আমলে নমশুদ্র জনগোষ্ঠী বাংলার বৃহৎ ও অর্থনৈতিকভাবে সর্বাধিক প্রভাবশালী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। ঔপনিবেশিক আমলে নমশুদ্র সম্প্রদায় প্রজনন বা জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পুনস্বীকৃতি প্রাপ্তি, উভয় প্রক্রিয়ায় সংখ্যার দিক দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর রূপ ধারণ করে এবং তাদের এ বিষয়টি বিশ শতকের গোড়া থেকেই ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। কারণ সে সময়ে নির্বাচন নির্ভর রাজনীতির ধারায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সামগ্রিক জাতির স্বার্থ রক্ষার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

পূর্ব বাংলার নমশুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে গতিশীলতা আসে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতক পর্যন্ত, যখন পশ্চিম বঙ্গের ভূমিহীন ও প্রাপ্তিক নমশুদ্রগণ পূর্ব বাংলার সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, মেঘনার অববাহিকা, সিলেট ও ময়মনসিংহের হাওড় অঞ্চল, জলপাইগুড়ি প্রভৃতি অঞ্চলে পুনর্বাসিত হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী হয় ও তারা এ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী হয়। উক্ত অঞ্চলের জোতদার ও অন্যান্য বড় ভূ-স্বামীগণ পরিত্যক্ত নিষ্কর জমিতে পুনর্বাসিত নমশুদ্র সম্প্রদায়কে বর্গাচাষী হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানায়। এ প্রক্রিয়ায় প্রধানত নমশুদ্রদের দ্বারা ইজারা চুক্তির মাধ্যমে বাংলায় একটি বৃহৎ বর্গাচাষী শ্রেণি সৃষ্টির পথ তৈরি হয়। নমশুদ্রগণ নিম্ন শ্রেণির সাধারণ রায়তে পরিণত হয় এবং সাধারভাবে এ শ্রেণিই উচ্চ শ্রেণির অধিকাংশ হিন্দু ভূমি মালিকদের মধ্যস্বত্বভোগীতে পরিণত হয়।

শ্রেণি হিসেবে নমশুদ্রগণ ছিল ঋণগ্রস্ত ও অনুন্নত। বাংলার এই অনুন্নত সম্প্রদায় ২০ শতকের গোড়া থেকেই বিভিন্ন সমিতি ও বর্ণাশ্রয়ী বিভিন্ন সংঘের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হচ্ছিল। তাদের দাবিসমূহ সরকারের নিকট সমবেদনার উদ্রেক করছিল। ফলে সাইমন কমিশন রিপোর্ট (১৯২৮-২৯) এবং গোল টেবিল কনফারেন্সে এই অনুন্নত সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে সুপারিশ করা হয়। অবশেষে কংগ্রেস পুনা প্যাক্টএ (১৯৩২) তাদের দাবিসমূহ মেনে নেয়। অনুন্নত শ্রেণি কথাটির মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা জড়িয়ে আছে তা পরিহার করতে বাংলা সরকার ১৯৩২ সালে ৭৬টি নিম্নবর্ণের হিন্দু শ্রেণিকে তফসিলী সম্প্রদায় অভিধায় আখ্যায়িত করে এবং ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনএর প্রথম তফসিলে তাদের নামের উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাক্টের আওতায় বঙ্গীয় আইনসভায় তফসিলী সম্প্রদায়ের জন্য বিশ শতাংশ (২০%) আসন সংরক্ষিত করা হয়। নমশুদ্র শ্রেণির মতো অনুন্নত না হলেও এ আইনে মুসলমান জনগোষ্ঠীও তাদের জন্য সংরক্ষিত সাধারণ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার লাভ করে। এভাবে বাংলার রাজনীতিতে তফসিলী সম্প্রদায় একটি শক্তিশালী ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তিতে পরিণত হয় এবং বাংলার রাজনীতিতে উভয় সম্প্রদায় উভয়ের ঘনিষ্ট সংস্পর্শে এসে স্ব স্ব শ্রেণির অবস্থার উন্নয়নে এক সঙ্গে পরিকল্পনা গ্রহণ করার সুযোগ লাভ করে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬ এবং ১৯৫৪ (পূর্ব বাংলা) সালের নির্বাচনে সর্ব-বঙ্গীয় তফসিলী সম্প্রদায় মুসলিম লীগের সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠনে নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করে।

নমঃস্বেজ     ও   চান্দেল  প্রসঙ্গ[সম্পাদনা]

নমঃশূদ্র বা নমঃস্বেজ আন্দোলন[সম্পাদনা]

মতুয়া ধর্মসম্প্রদায়কে কেন্দ্র করেই নমঃশূদ্রদের সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়। তাদের আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ফরিদপুর জেলার ওড়াকান্দি গ্রামে। নমঃশূদ্ররা এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে একটি সমিতি গঠন করে এবং নিয়মিত উন্নয়নী সভার আয়োজন করে। তা ছাড়া যাত্রানুষ্ঠান ও প্রতি পরিবার থেকে মুষ্টি সংগ্রহের মাধ্যমেও আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। নমঃশূদ্ররা ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে Bengal Namasutra Association প্রতিষ্ঠা করে পুরোপুরি সংগঠিত হয়ে আন্দোলন পরিচালনা করে।

  • নমঃশূদ্ররা তাদের নমঃশূদ্র নামের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দাবি করেছিল। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র শ্রী গুরুচরণ বা গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাতে। এবং তাকে প্রভূত সাহায্য করেছিলো মিড্ সাহেব। এর আগে ব্যবস্থা লিখিয়ে হিন্দু বর্ণ সমাজের পন্ডিতদের সম্মতি নিতে হয়। সেখানে ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার প্রধান পন্ডিত সহ বিভিন্ন জেলার আরও ৪১ জন পন্ডিত সহি করে। সেখানে কিন্তু এদের শূদ্র বলা হয় নাই। হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রত্যাদেশ নাম অর্থাৎ গোত্র সূত্র ধরে নমস মুনির থেকে সৃষ্ট বলে আত্মপরিচয়ের কথা বলা হয়েছে এবং গুরুচাঁদ ঠাকুর আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে তখনকার মতো এই শূদ্র-লেবেল যুক্ত নাম গ্রহণের কথা লেখেন এবং শূদ্র জুড়ে দেওয়ার ব্যাপারে তার আপত্তি লিখে রাখেন। জনগণনার নথিতে নাম পরিবর্তনের দাবিপত্রের সাথে এই ব্যবস্থার অনুলিপি জমা দেওয়া হয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারিতে নমঃশূদ্র নামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • এমনকি রিজলী সাহেবের লেখা বইতে 'নম' নামটি কিন্তু ১৯১১ এর আগেই লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ নমস স্বজন বা  নমস সৃজ  গোষ্ঠী এই ব্যাপারটা কিন্তু সমাজে চালু ছিল। হয়ত কোনো সামাজিক চাপেই এই অবর্ণ বা মুক্তবর্ণ গোষ্ঠীর নামের শেষে শূদ্র শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়।
  • নমঃশূদ্ররা তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ-সুবিধার দাবি করে এবং এক্ষেত্রে তারা কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে সক্ষম হয়।
  • রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নমঃশূদ্রদের দাবি ছিল পৃথক নির্বাচন ও স্বয়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ানো। ব্রিটিশ সরকার এক্ষেত্রেও নমঃশূদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তাই নমঃশূদ্ররাও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্ৰহণ করেনি।[৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Bose, N.K. (১৯৯৪ revised ed.)। The Structure Of Hindu Society। Orient Longman Limited। পৃ: 161–162। আইএসবিএন 81-250-0855-1 
  2. Rees, D. Ben, সম্পাদক (২০০২)। Vehicles of Grace and Hope: Welsh Missionaries in India, 1800-1970। William Carey Library। পৃ: ১৫৬। আইএসবিএন 978-0-87808-505-7 
  3. Risley, Herbert Hope (১৮৯১)। The Tribes and Castes of Bengal 2 
  4. ইতিহাস সহায়িকা। ৬সি রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলকাতা- ৭০০০০৯। জানুয়ারি, ২০১৬। পৃ: ৩২৭।