নমঃশূদ্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

নমঃশূদ্র বা নমঃস্বেজ হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি জাতি সমুহ। এই গোষ্ঠীর বিস্তার মূলতঃ বৃহৎবঙ্গ বর্তমানে যা ভারতএর পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা অল্প সংখ্যায় ছড়িয়ে আছে।।[১] বৈদিক সামাজিক কর্মক্ষেত্র তারা বৈদিক সনাতন (হিন্দু)ধর্মের চারটি বর্ণের( ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্র ) শূদ্র ও অন্তিম বর্ণের অন্তর্গত অবস্থান করে। মধ্যযুগীয় কাল খণ্ডে যখন বহু ইসলামিক আক্রমণ কারণে মূল ভারতীয় সামাজিক ও শৈক্ষনিক ব্যবস্থা যখন অস্ত-ব্যস্ত হতে থাকল তখন সমাজে শিক্ষা ও জাগ্রুক্ত অভাবে ধীরে-ধীরে সমাজের বিভিন্ন বর্গের থেকে মন-বিচ্ছেদ ও সামাজিক দূরত্ব হতে রইল । তাতে ধর্ম পরিবর্তনকারী ও মূল সমাজ থেকে বিচ্ছেদ করা হেতু উভয় পক্ষে মানসিক রূপে উচ্চ-নিম্নবর্গের নির্মাণ এরং উভয় পক্ষে এক অপরের প্রতি জাতি নিয়ে হীন ভাবনার সংঘর্ষ করাতে রইল। যাতে বৈদিক সমাজ ও সংস্কৃতি পতন হয়ে যাক। আজও বহু জাতিবিদ্বেষী দ‌‌ক্ষিনপন্থী রাজনৈতিক দল নিজক ক্ষমতা‌সিদ্ধি হেতু এইসব জাতি প্রতি হীন ভাবনা তুলে ধরার প্রত্ন করতে থাকে কিন্তু চৈতন্য কালীন যুগে থেকে বহু সীমা পর্যন্ত এইসব কুরীতি-কুসংস্কার এবং সামাজিক মন-বিচ্ছেদ একবার আবার সমাপ্তির পথে এগাতে রয়েছিল। তার সাথে সাথে এই জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ বৈষ্ণব সম্প্রদায় অনুগামী হয়েছিল। পরিসংখ্যানে তাদের পূর্বপুরুষের শ্রুতি অনুযায়ী, অধিকাংশ নমঃশূদ্রই কাশ্যপ গোত্রের অন্তর্গত।[২] এরা সাধারণত হীরা (সকলেই) বালা বিশ্বাস(সকলে নয়), মণ্ডল(সকলে না), হালদার, হাওলাদার, সরকার, সিকদার, মজুমদার(সকলে নয়), দাস(সকলে নয়), রায়(সকলে নয়) ইত্যাদি পদবি ব্যবহার করে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৯১ সালে ব্রিটিশদের একটি পরিসংখ্যানে তাদের পূর্বপুরুষের শ্রুতি অনুযায়ী , অধিকাংশ নমঃশূদ্র বা নমঃস্বেজ ই কাশ্যপ গোত্রের অন্তর্গত।[৩] এছাড়াও কয়েকটি গোত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঋষি কাশ্যপ এর পরবর্তী নমস মুনির বংশধর হেতু তারা নিজেদের সম্প্রতি নমঃস্বেজ বলে অভিহিত করে ।

নমঃস্বেজ     ও   চণ্ডাল  প্রসঙ্গ[সম্পাদনা]

১৮৭১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে ব্রিটিশ সরকারের ও বিধর্মী দের চক্রান্তে বঙ্গের নমঃ ক্ষুদ্র জাতিকে নমঃজাতিকে ‘চণ্ডাল জাতি’ নামে আখ্যত করে যাতে তারা ক্রোধিত হেয়ে তারা হিন্দু সমাজের পরিত্যাগ এবং ধর্ম পরিবর্তন করে নিক। এই সময় পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৮৭১ সালের সেন্সাস রিপোর্টের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমানের নমঃশূদ্ররা যে শুধু নমঃ জাতি বলেই স্বীকৃত ছিল তা আমরা ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের ‘বাংলার ইতিহাস’ ও রমাপ্রসাদ চন্দ্রের ‘গৌড়মালা’ থেকে জানতে পারি। তাই চণ্ডাল’ নাম অপসারণ করে নমঃ নামকরণের দাবিতে গুরুচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলনে অতিষ্ঠ হয়ে এবং বঙ্গভাষা আন্দোলনের পড়ে শেষ পর্যন্ত তারা কৌশল বদলাতে বমানিত করে।

নমঃশূদ্র বা নমঃস্বেজ আন্দোলন[সম্পাদনা]

মতুয়া ধর্মসম্প্রদায়কে কেন্দ্র করেই নমঃশূদ্রদের সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়। তাদের আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ফরিদপুর জেলার ওড়াকান্দি গ্রামে। নমঃশূদ্ররা এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে একটি সমিতি গঠন করে এবং নিয়মিত উন্নয়নী সভার আয়োজন করে। তা ছাড়া যাত্রানুষ্ঠান ও প্রতি পরিবার থেকে মুষ্টি সংগ্রহের মাধ্যমেও আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। নমঃশূদ্ররা ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে Bengal Namasutra Association প্রতিষ্ঠা করে পুরোপুরি সংগঠিত হয়ে আন্দোলন পরিচালনা করে।

  • নমঃশূদ্ররা তাদের নমঃশূদ্র নামের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দাবি করেছিল। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র শ্রী গুরুচরণ বা গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাতে। এবং তাকে প্রভূত সাহায্য করেছিলো মিড্ সাহেব। এর আগে ব্যবস্থা লিখিয়ে হিন্দু বর্ণ সমাজের পণ্ডিতদের সম্মতি নিতে হয়। সেখানে ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার প্রধান পণ্ডিত সহ বিভিন্ন জেলার আরও ৪১ জন পণ্ডিত হস্তাক্ষর করে । হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রত্যাদেশ নাম অর্থাৎ গোত্র সূত্র ধরে নমস মুনির থেকে সৃষ্ট বলে আত্মপরিচয়ের কথা বলা হয়েছে এবং গুরুচাঁদ ঠাকুর । জনগণনার নথিতে নাম পরিবর্তনের দাবিপত্রের সাথে এই ব্যবস্থার অনুলিপি জমা দেওয়া হয়। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারিতে নমঃশূদ্র নামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • নমঃশূদ্ররা তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ-সুবিধার দাবি করে এবং এক্ষেত্রে তারা কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতে সক্ষম হয়।
  • রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নমঃশূদ্রদের দাবি ছিল পৃথক নির্বাচন ও স্বয়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ানো। ব্রিটিশ সরকার এক্ষেত্রেও নমঃশূদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তাই নমঃশূদ্ররাও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্ৰহণ করেনি।[৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Bose, N.K. (1994 revised ed.)। The Structure Of Hindu Society। Orient Longman Limited। পৃষ্ঠা 161–162। আইএসবিএন 81-250-0855-1  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  2. Risley, Herbert Hope (১৮৯১)। The Tribes and Castes of Bengal2 
  3. Risley, Herbert Hope (১৮৯১)। The Tribes and Castes of Bengal2 
  4. ইতিহাস সহায়িকা। ৬সি রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলকাতা- ৭০০০০৯। জানুয়ারি, ২০১৬। পৃষ্ঠা ৩২৭।  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)