বাঁকুড়া জেলার ভূগোল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বাঁকুড়া জেলা পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বর্ধমান বিভাগভুক্ত একটি জেলা। বাঁকুড়া জেলার ভূগোল মধ্য রাঢ়ের এক বৃহদায়তন অঞ্চলের ভৌগোলিক বিস্তৃতির পরিচায়ক। পশ্চিমের উচ্চভূমি, ছোট ছোট টিলা, কাঁকুড়ে লাল মাটি, খরস্রোতা নদীনালা ও চরমভাবাপন্ন জলবায়ু বাঁকুড়া জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য।

অবস্থান ও বিস্তৃতি[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলা পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যভাগে ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল থেকে মধ্য গাঙ্গেয় নিম্নভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই জেলা দক্ষিণে ২২º৩৮´ উত্তর অক্ষাংশ থেকে উত্তরে ২৩º৩৮´ উত্তর অক্ষাংশ এবং পশ্চিমে ৮৬º৩৬´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে পূর্বে ৮৭º৪৬´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। জেলার মোট ভৌগোলিক আয়তন ৬৮৮২ বর্গ কিলোমিটার। জেলার উত্তরে উত্তরে ও পূর্বে বর্ধমান জেলা, দক্ষিণে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা, দক্ষিণ-পূর্ব হুগলি জেলা এবং পশ্চিমে পুরুলিয়া জেলা। অজয় নদ বাঁকুড়া ও বর্ধমান জেলাদুটিকে পৃথক করেছে।

রাজনৈতিক ভূগোল[সম্পাদনা]

প্রশাসনিক বিভাগসমূহ[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলা ৩টি মহকুমা ও সর্বমোট ২২টি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকে বিভক্ত। এগুলি হল:

মহকুমা ব্লক
সদর মহকুমা বাঁকুড়া-১, বাঁকুড়া-২, ছাতনা, শালতোড়া, মেজিয়া, গঙ্গাজলঘাটি, বড়জোড়াওন্দা ব্লক
বিষ্ণুপুর মহকুমা বিষ্ণুপুর, জয়পুর(পশ্চিমবঙ্গ), কোতুলপুর, সোনামুখী, পাত্রসায়রইন্দাস ব্লক
খাতড়া মহকুমা খাতড়া, ইন্দপুর, হীরাবাঁধ, রানিবাঁধ, তালডাংরা, রায়পুর(পশ্চিমবঙ্গ) সিমলাপাল ও সারেঙ্গা

এছাড়া তিনটি পুরসভা আছে এই জেলায় – একটি জেলাসদরে ও অপর দুটি বিষ্ণুপুর মহকুমার বিষ্ণুপুরসোনামুখীতে। তবে এই জেলায় কোনও পৌরসংস্থা নেই।

ভূপ্রকৃতি[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলার বিস্তৃতি ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমির মধ্যভাগ পর্যন্ত। এই অঞ্চলের মধ্যে ভূপ্রাকৃতিক তারতম্য অনুযায়ী বাঁকুড়া জেলাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় – পশ্চিমের উচ্চভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চল, মধ্যভাগের অসমতল ভূমিভাগ ও পূর্বের পলিগঠিত সমভূমি।

পশ্চিমের উচ্চভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হল বন্ধুর ভূমিভাগ, ঘন অরণ্য, স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্ন ল্যাটেরাইট পাহাড়, টিলা, শিলাস্তুপ ও উপত্যকা। এই অঞ্চলের উত্তরভাগ শুশুনিয়া উচ্চভূমি নামে পরিচিত। শুশুনিয়াবিহারীনাথ এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পাহাড়। মধ্যভাগের অসমতল ভূমিভাগও শিলাস্তুপ, নিম্নশৈলশিরা ও উপত্যকাযুক্ত। অন্যদিকে সমগ্র বিষ্ণুপুর মহকুমা ও সদর মহকুমার অধিকাংশ থানা নিয়ে গঠিত পূর্বের সমভূমি অঞ্চল দামোদরদ্বারকেশ্বর নদের সঞ্চিত পলিদ্বারা গঠিত। এখান থেকেই পশ্চিমে ভূমিভাগ ক্রমশ উঁচু হয়েছে।

ভূতত্ত্ব[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলার অধিকাংশ অঞ্চল ল্যাটেরাইট ও পলিমৃত্তিকা দ্বারা গঠিত। যদিও জেলার পশ্চিমাংশ গঠিত হয়েছে আর্কিয়ান যুগের সিস্টোস ও নিসোস শিলার দ্বারা ও দক্ষিণাংশ গণ্ডোয়ানা সিস্টেমের পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত। জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে কিছু মেসোজোয়িক যুগের ডলোরাইট গঠিত ডাহক লক্ষিত হয়। অন্যদিকে বিষ্ণুপুর মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল গঠিত হয়েছে সাম্প্রতিক পলি দ্বারা।

নদনদী[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলার প্রধান নদনদীগুলি হল দামোদর, দ্বারকেশ্বর, শিলাইকংসাবতী। নদীগুলি পরস্পরের সঙ্গে প্রায় সমান্তরালে ভূমির ঢাল অনুসারে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়েছে। এগুলির উৎপত্তি ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল ও মৌসুমি বৃষ্টির জলে পুষ্ট হওয়ায় বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অন্য সময়ে এই সকল নদীতে জল অত্যন্ত কম থাকে। যদিও বর্ষায় প্রায়ই এই জেলায় দুকুল ছাপিয়ে বন্যা দেখা দেয় কিন্তু শীতকাল আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার জলতলের উচ্চতা নেমে যায়। দামোদর এই জেলার প্রধান নদ ও এই নদ বাঁকুড়াকে বর্ধমান থেকে পৃথক করেছে। ভয়াল বন্যা এই নদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই কারণে দামোদর ‘বাংলার দুঃখ’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন এই নদে বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সালি ও বোদাই বাঁকুড়ায় দামোদরের প্রধান উপনদী। দ্বারকেশ্বর নদ জেলার মধ্যভাগ দিয়ে উত্তর-পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত। এর প্রধান উপনদী হল আরকুসা, গন্ধেশ্বরী, শিলাই, বরাহ ইত্যাদি। এছাড়া জয়নাগু, কুমারী, কানা দামোদর, ভৈরববাঁকি, তারাফেনী জেলার উল্লেখযোগ্য নদনদী। দামোদরের জলোচ্ছ্বাসে মেজিয়া ব্লকে একটি বিল তৈরি হয়েছে। এটি মেজিয়া বিল নামে পরিচিত।

পাহাড়-পর্বত[সম্পাদনা]

বিহারীনাথ বাঁকুড়া জেলার সর্বোচ্চ পাহাড়। জেলার উত্তরভাগে শালতোড়া ব্লকে অবস্থিত এই পাহাড়ের উচ্চতা ১৪৬৯ ফুট। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় ছাতনা ব্লকে অবস্থিত শুশুনিয়া। উচ্চতা ১৪৪২ ফুট। তৃতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় রানিবাঁধ ব্লকের বামনীসিনি। এর উচ্চতা ৮০০ ফুট। অন্যান্য পাহাড়ের মধ্যে খাতড়া ব্লকের মশক ও লেভি পাহাড়, গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের কাড়ো পাহাড়, রানিবাঁধ ব্লকের ছেঁদাপাহাড়, মেজিয়া ব্লকের মেজিয়া পাহাড় ও মুকুটমণিপুর ব্লকের মুকুটমণিপুর পাহাড় উল্লেখযোগ্য।[১]

জলবায়ু[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলার জলবায়ু উষ্ণ ও শুষ্ক। সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন, যদিও স্বাস্থ্যকর। উষ্ণ গ্রীষ্ম, উচ্চ আর্দ্রতা ও সুষম বৃষ্টিপাত এই অঞ্চলের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য। শীতকাল (নভেম্বরের মধ্যভাগ থেকে-ফেব্রুয়ারির শেষভাগ), গ্রীষ্মকাল (মার্চ-মে), বর্ষাকাল (জুন-সেপ্টেম্বর) ও শরৎকাল (অক্টোবর-নভেম্বরের প্রথম ভাগ) – এই চারটি ঋতু এই জেলায় বিশেষভাবে লক্ষিত হয়। গ্রীষ্মকালীন সর্বাধিক তাপমাত্রা ৪৪º-৪৫º সেন্টিগ্রেড ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫º সেন্টিগ্রেড এবং শীতকালীন সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩৩º সেন্টিগ্রেড ও ৬º সেন্টিগ্রেড। মার্চ মাস থেকে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে ও মে মাসে তাপমাত্রা সর্বাধিক হয়। অপরদিকে শরৎকালে উষ্ণতা হ্রাস পেতে শুরু করে ও ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে এই জেলা সর্বাধিক শীতল থাকে। গ্রীষ্মে মাঝে মাঝে লু ও শীতে শৈত্যপ্রবাহও বইতে দেখা যায়। জেলার গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪০০ মিলিমিটার, যার অধিকাংশই বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঘটে। উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পায়। গ্রীষ্মে কালবৈশাখী ঝড় দেখা যায়।

মৃত্তিকা[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলার অধিকাংশ স্থানই কাঁকুড়ে ল্যাটেরাইট বা বেলে-দোঁইয়াশ মাটিতে গঠিত। কিন্তু দামোদর অববাহিকার ইন্দাস, কোতুলপুর ও সোনামুখী ব্লক এলাকার উত্তরভাগ সাম্প্রতিক পলি দ্বারা গঠিত। উচ্চভূমির মাটি অনুর্বর হলেও ধান, ভূট্টা ও গম চাষের উপযুক্ত। নিম্নভূমির মাটি উর্বর। এই মাটি সালি ও সুমা – এই দুই ধরনের। সালি মাটিতে ধান ও সুমা মাটিতে নানাপ্রকার ফসলের চাষ ভাল হয়।

স্বাভাবিক উদ্ভিদ[সম্পাদনা]

বাঁকুড়া জেলার মোট বনভূমির আয়তন ২৪৭.৭০ হাজার হেক্টর, যা জেলার মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২১.৪৭%। জাতীয় অরণ্য নীতি কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে এটি সামান্য কম। মূলত শুষ্ক ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্য বা শালবন এখানে বেশি দেখা যায়। এছাড়া পিয়াশাল, সেগুন, বহেড়া, পলাশ, কুসুম, মহুয়া, পিপুল, বাবলা, আম, কাঁঠাল, পারাষি এবং আগাছার মধ্যে ধুতুরা, নিশিন্দা, আশশেওড়া ইত্যাদি দেখা যায়। জেলার সোনামুখী, জয়পুর, বিষ্ণুপুর, রানিবাঁধ এলাকায় অরণ্যাঞ্চল নিবিড়। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছাড়া জেলার সর্বত্রই অরণ্য অসমান বিস্তৃত। তবে ভূমিরূপের বিচ্ছিন্নতার উপর অরণ্যের বিস্তার নির্ভরশীল। উচ্চভূমি, পাহাড়ের ঢাল, শৈলশিরাগুলিতে অরণ্যের ঘনত্ব বেশি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষচ্ছেদন করে চাষাবাদ ও বসতিস্থাপনের ফলে অরণ্যপ্রকৃতি অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বর্তমানে তাই কৃত্রিম উপায়ে বনায়ন ঘটিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চলছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

ধনধান্যে পত্রিকা (যোজনা – বাংলা), জুন ২০০৭ সংখ্যা

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. রাঢ় পরিচিতি : রাঢ়ের জনজাতি ও লোকসংস্কৃতি, মিহির চৌধুরী কামিল্যা, উচ্চতর বিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, বাংলা বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৬, পৃষ্ঠা ৪৯