মাহিষ্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রাণী রাসমণি, কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা মাহিষ্য পরিবারের

মাহিষ্য হলো বাঙালি হিন্দু জাতি। মাহিষ্য জাতিকে অগ্রসর জাতি হিসাবে গণ্য করা হয়। আজকাল মাহিষ্যদের বাংলায় প্রভাবশালী, শিক্ষিত, আধুনিকমনস্ক ও উচ্চ জাতিগোষ্ঠী হিসাবে ধরা হয়।[১][২][৩] এদের প্রধানত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরা এবং ওড়িশা রাজ্যে পাওয়া যায়। মাহিষ্যেরা পশ্চিমবঙ্গের - হাওড়াপশ্চিম মেদিনীপুরপূর্ব মেদিনীপুরহুগলি, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা, মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর এবং নদিয়া জেলার মূলনিবাসী অধিবাসী। এছাড়াও বাংলাদেশের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা জেলার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উচ্চবিত্ত জনগোষ্টী হল মাহিষ্য।

বর্ণ মর্যাদা[সম্পাদনা]

মনুসংহিতার প্রাচীন গ্রন্থ অনুসারে মাহিষ্য সম্প্রদায়ের মানুষজনের পিতা ক্ষত্রিয় ও মাতা বৈশ্য বর্ণের হয়ে থাকে। এই কারণে বাংলায় মাহিষ্যেদের ক্ষত্রিয় বর্ণ হিসাবে মনে করা হয়। অতীতে মাহিষ্যেরা যুদ্ধবিগ্রহ, জমিদারী ও রাজ্যশাসন করতেন । বর্তমানে মাহিষ্যরা শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, আইনজীবী, ডাক্তার,বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, ব্যবসা ও কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন।[৪] [৫]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বাংলার সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী হল মাহিষ্য। ঊনবিংশ শতকের শেষের পণ্ডিতদিগের মতে বঙ্গীয় সমাজে মাহিষ্যদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ লক্ষ্য করা গেছে। প্রাচীনপন্থী সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মতে, মাহিষ্যরা ক্ষুদ্র চাষী সম্প্রদায়ের যারা আধুনিকতাকে অর্থাৎ বিদ্যালয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত না। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর ১৮৯৬ সালে বাংলার "হিন্দুবর্ণ ও সম্প্রদায়"-এর উপর রচিত প্রধান গ্রন্থ অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, মাহিষ্যরা মোটামুটি উন্নত জাতের, মেদিনীপুরের পরিসংখ্যানে তারা আধা-রাজকীয় পরিবারের অন্তর্ভূক্ত, আইনজীবি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সহ বেশিরভাগই বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত মানুষ। এই উন্নত শ্রেণীর মানুষদের পরিচয় ছিল চাষী-কৈবর্ত এবং ধরা হয় যে, ১৮৯০ দশকে শেষভাগে সম্ভবত ১৮৯৭ সালে মাহিষ্য জাত নামে এরা পরিচিত হয়। মাহিষ্যরা সম্ভবত সর্বাধিক বিচিত্র বাঙালি জাত বাংলার। তারা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ভাবে সচ্ছল আর্থিক অবস্থা অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে মেদিনীপুরের কিংবদন্তি রাজা বা জমিদার  ―  যেমন ছিলেন শাসমলেরা বা কলকাতার জানবাজারের বাসিন্দা রাণী রাসমণি। অপর দিকে মাহিষ্যদের মধ্যে বহু সংখ্যক আইনজীবী ও উদ্যোগপতিও ছিলেন। যেমন এরা ছিলেন ―  বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাওড়ার আয়রন ফাউণ্ড্রি সেক্টরের আলামোহন দাশের পরিবার ও অসংখ্য সৎ ও বিনয়ী উদ্যোক্তারা। তবুও তাদের বেশিরভাগই মানুষজন ছিলেন সম্ভবত ক্ষুদ্র চাষীই। ১৮৬০ দশকে পূর্ব মেদিনীপুরের একচেটিয়া লবণের ব্যবসা বন্ধের ফলে তারা সে জমি পুনরুদ্ধার করে। সেই সঙ্গে কেউ কেউ গৃহস্থালির কাজে অথবা কৃষি মজদুর হিসাবে কাজ করতে থাকেন। যদিও তাদের অনেকেই গ্রামীণ এলাকায় পুরুষানুক্রমে কাজে লিপ্ত থাকেন, মাহিষ্য সম্প্রদায়ের বহুসংখ্যক মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে হাওড়া ও কলকাতার শহুরে এলাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রশিক্ষিত কর্মী হিসাবে কাজ করতে থাকেন। হাওড়ায় মাহিষ্যেরা সংখ্যায় অনেক এবং প্রায় সবাই সফল ব্যবসায়ী। বিশ শতকের শুরুতে জেলার বেশিরভাগ জমি ও কারখানার মালিক ছিলেন কায়স্থ সম্প্রদায়ের। কিন্তু ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৬৭ শতাংশ ইঞ্জিনিয়ারিং - সামগ্রীর ব্যবসা মাহিষ্যেরা নিয়ে নেয়।[৬]

স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা[সম্পাদনা]

দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ছিলেন মাহিষ্য সম্প্রদায়ের মূল রাজনৈতিক নেতা যিনি মেদিনীপুরে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন  এবং ১৯২০ দশকে কলকাতার মেয়র পদে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।

১৯৪০ এর দশকে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মাহিষ্যেরা মেদিনীপুরে ও দক্ষিণ বঙ্গে সামগ্রিকভাবে ছিলেন আসল শক্তি। প্রকৃতপক্ষে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বেশিরভাগ নেতা ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন মাহিষ্য। তারা তমলুকে সমান্তরাল জাতীয় সরকার  ― তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠন করেন এবং এটি প্রায় দু-বছর চলেছিল। সরকারের নিজস্ব সেনাবাহিনী,  বিচার ব্যবস্থা ও অর্থ দপ্তর ছিল। সমান্তরাল জাতীয়  সরকারের মুখপত্র বিপ্লবী ইংরাজীতে প্রকাশিত হত। মূল মুখপত্রের কপি দিল্লির নেহেরু মেমোরিয়াল মিউজিয়া অ্যান্ড লাইব্রেরীতে আজো সংরক্ষিত আছে। সেসময় বাংলার গান্ধীবাদী নেতা সতীশচন্দ্র সামন্ত ছিলেন একজন মাহিষ্য।

সামাজিক কলঙ্ক[সম্পাদনা]

যদিও মাহিষ্যদের সেসময় আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান উল্লেখযোগ্য ছিল, কিন্তু কেবল কৃষিভিত্তিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে উচ্চবর্ণের দ্বারা অনেক সময় হেনস্থা বা অপদস্থ হতে হয়েছে। মহিষ্যরা শারীরিক শ্রমের প্রতি বিরূপ হননি (প্রায়শই "উচ্চ বর্ণের" দ্বারা সম্মানিত বিবেচনা করা হয়); [৬] উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, অতি দক্ষ প্রশাসক হওয়া সত্বেও কেবলমাত্র জাতের দোহাই দিয়ে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলকে কলকাতা কর্পোরেশনের  এক্সিকিউটিভ অফিসার হতে দেন নি তৎকালীন উচ্চ বর্ণের মানুষ এই কারণে যে, শহরের কায়স্থেরা বিক্ষুব্ধ হবেন।[৭][৮] শেষ পর্যন্ত সেই পদে সুভাষ চন্দ্র বসু নিযুক্ত হন।[৯]

পদবী সমূহ[সম্পাদনা]

মাহিষ্য সম্প্রদায়ের বেশির ভাগের পদবী : মন্ডল, সিংহ, চক্রবতী, আর্য, চৌধুরী, রায়চৌধুরী, অধিকারী, গোস্বামী, কবিরাজ, ওঝা, উকিল, পুরকায়স্থ, তরফদার, আদক, সাঁতরা, ভৌমিক, প্রামাণিক, দাস, সরকার, রায়, মজুমদার, বিশ্বাস, মল্লিক, মণ্ডল, মাইতি, জানা, বেরা, ধাড়া, গিরি, মান্না, দিন্দা, কারক, সামন্ত, হাজরা প্রভৃতি হয়ে থাকে।[১০]

বিশিষ্ট মাহিষ্যেরা[সম্পাদনা]

আধ্যাত্মিক[সম্পাদনা]

স্বাধীনতা সংগ্রামী[সম্পাদনা]

উদ্যোগপতি[সম্পাদনা]

  • আলামোহন দাশ, অগ্রণী বাঙালি শিল্পপতি, ইন্ডিয়া মেসিনারি কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা। এঁর স্মৃতিতে হাওড়ার শিল্পশহর দাশনগরের নামকরণ।

সাংবাদিক[সম্পাদনা]

  • সুনীল জানা, বামপন্থী ফটো সাংবাদিক এবং ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার

ক্রীড়াবিদ[সম্পাদনা]

  • শৈলেন মান্না,  ভারতীয় ফুটবলার - বিশ্বের দশ শ্রেষ্ঠ অধিনায়কের  মধ্যে এশিয়া মহাদেশের একমাত্র অধিনায়ক। (ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইংলিশ এফএ -এর বিচারে)
  • অশোক দিন্দা, ভারতীয় ক্রিকেটার।

শিক্ষাবিদ[সম্পাদনা]

রাজনীতিবিদরা[সম্পাদনা]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

 

  1. Chatterjee, Partha (১৯৯৭)। The Present History of West Bengal: Essays in Political Criticism। Oxford University Press। পৃষ্ঠা 73। আইএসবিএন 978-0-19-563945-2 
  2. Nicholas, Ralph W (২০০৩)। Fruits of Worship: Practical Religion in Bengal। Orient Longman Ltd। পৃষ্ঠা 53। আইএসবিএন 978-8180280061 
  3. Das, Pyari Mohan। The Mahishyas 
  4. Agarwalla, Shyam. S. (১৯৯৮)। Religion and Caste Politics। Rawat Publications। পৃষ্ঠা 133। 
  5. Kumar, Sangeet (২০০৫)। Changing Role of the Caste System: A Critique। Rawat Publications। পৃষ্ঠা 48। আইএসবিএন 8170338816 
  6. Lessinger, Johanna M. (১৯৮২)। "The New Vaishyas.": 920–924। ডিওআই:10.1086/452603 
  7. Rāẏa, Jībendu (১৯৯৩)। Prasaṅga, ekālera prabandha o samālocanā। Sāhityaśrī। 
  8. Maity, Sachindra (১৯৭৫)। Freedom Movement in Midnapore। Firma, K.L.। 
  9. Desk, Developer (২০২০-১০-২৬)। "মেদিনীপুরের মুকুটহীন সম্রাট 'দেশপ্রাণ' বীরেন্দ্র শাসমল : ১৪০ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি"The Bengal Post (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-০১ 
  10. "Amader Podobir Itihaas by Lokeshwar Bosu | PDF"Scribd (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-২২