দুর্গাপূজা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দুর্গাপূজা
দুর্গাপূজা
বাগবাজার সার্বজনীনের দুর্গাপ্রতিমা, ২০১০
অপর নাম অকালবোধন, শারদোৎসব, বিজয়াদশমী, দশেরা
পালনকারী হিন্দু সম্প্রদায়
ধরন হিন্দু উৎসব
(প্রধানত বাংলা, অসমবিহারে উদযাপিত)
শুরু সাধারণত মহাষষ্ঠী (ক্ষেত্রবিশেষে কুলাচার অনুসারে, ভাদ্রকৃষ্ণানবমী বা আশ্বিন শুক্লা প্রতিপদ)
সমাপ্তি বিজয়াদশমী
তারিখ আশ্বিন শুক্লপক্ষ অথবা চৈত্র শুক্লপক্ষ
উদযাপন প্রথানুসারে পনেরো, দশ বা পাঁচ দিন
পালন শাস্ত্রীয়: দুর্গাষষ্ঠী: বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস;
মহাসপ্তমী: নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা;
মহাষ্টমী: মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, বীরাষ্টমী ব্রত, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, মহাপূজা ও মহোৎসবযাত্রা;
সন্ধিপূজা ও বলিদান;
মহানবমী: কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা;
বিজয়াদশমী: বিজয়াদশমী বিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়াদশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা।
সামাজিক: পত্রপত্রিকার পূজাসংখ্যা প্রকাশ, মণ্ডপ পরিক্রমা, শারদ পুরস্কার বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শাস্ত্রীয় সংগীতানুষ্ঠান, শিল্পপ্রদর্শনী ও সমাজসেবামূলক কাজকর্ম।
সর্ম্পকিত মহালয়া, দশেরা, জগদ্ধাত্রী পূজা

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল হিন্দু দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি উৎসব। দুর্গাপূজা সমগ্র হিন্দুসমাজেই প্রচলিত। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

দুর্গাপূজা ভারত, বাংলাদেশনেপাল সহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ার দরুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গত্রিপুরা রাজ্যে দুর্গাপূজা বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে মালিত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু হিন্দু সমাজেও দুর্গাপূজা বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। এমনকি চারতের অসমওড়িশা রাজ্যেও দুর্গাপূজা মহাসমারোহে পালিত হয়ে থাকে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবাসী বাঙালি ও স্থানীয় জনসাধারণ নিজ নিজ প্রথামাফিক শারদীয়া দুর্গাপূজা ও নবরাত্রি উৎসব পালন করে। এমনকি পাশ্চাত্য দেশগুলিতে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালিরাও দুর্গাপূজা পালন করে থাকেন। ২০০৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে "ভয়েসেস অফ বেঙ্গল" মরসুম নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসেবে স্থানীয় বাঙালি অভিবাসীরা ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এক বিরাট দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।[১]

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে "দুর্গাষষ্ঠী", "মহাসপ্তমী", "মহাষ্টমী", "মহানবমী" ও "বিজয়াদশমী" নামে পরিচিত। আশ্চিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় "দেবীপক্ষ"। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি প্রচলিত আছে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে মহাসপ্তমী থেকে বিজয়াদশমী পর্যন্ত (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মহাসপ্তমী থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত) চার দিন সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশে বিজয়াদশমী সরকারি ছুটির দিন।

পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা প্রধানত ধনী পরিবারগুলিতেই আয়োজিত হয়। কলকাতা শহরের পুরনো ধনী পরিবারগুলির দুর্গাপূজা "বনেদি বাড়ির পূজা" নামে পরিচিত। পারিবারিক দুর্গাপূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষ্যে বাড়িতে আত্মীয়-সমাগম হয়ে থাকে। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে এক একটি অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তা বারোয়ারি পূজা বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতারা বিভিন্ন সর্বজনীন পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। এখন সর্বজনীন পূজায় "থিম" বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপ, প্রতিমা ও আলোকসজ্জার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। থিমগুলির শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে "শারদ সম্মান" নামে বিশেষ পুরস্কারও দেওয়া হয়। এছাড়া বেলুড় মঠ সহ রামকৃষ্ণ মঠমিশনের বিভিন্ন শাখাকেন্দ্র এবং ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিভিন্ন কেন্দ্রে সন্ন্যাসীরা দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

অকালবোধন[সম্পাদনা]

রামের শারদীয়া দুর্গাপূজা, খিদিরপুর ভেনাস ক্লাব, কলকাতা

শারদীয়া দুর্গাপূজাকে "অকালবোধন" বলা হয়। কালিকা পুরাণবৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রামরাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাঁদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় "অকালবোধন"।[২] এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন।[৩] এই জন্য স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে।[২] হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, "...অকালবোধন শরতে বৈদিক যজ্ঞের আধুনিক রূপায়ণ ছাড়া আর কিছুই না।"[৪]

পৌরাণিক উপাখ্যান[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, কৃষ্ণ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। কৃষ্ণের মূর্তি, কুমারটুলি পার্ক সর্বজনীন, কলকাতা, ২০১০।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। বিভিন্ন দেবদেবীরা কিভাবে দুর্গাপূজা করেছিলেন, তার একটি তালিকা এই পুরাণে পাওয়া যায়। তবে এই প্রসঙ্গে কোনো পৌরাণিক গল্পের বিস্তারিত বর্ণনা এই পুরাণে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে:


প্রথমে পূজিতা সা চ কৃষ্ণেন পরমাত্মনা।
বৃন্দাবনে চ সৃষ্ট্যাদ্যৌ গোলকে রাগমণ্ডলে।
মধুকৈটভভীতেন ব্রহ্মণা সা দ্বিতীয়তঃ।
ত্রিপুরপ্রেষিতেনৈব তৃতীয়ে ত্রিপুরারিণা।।
ভ্রষ্টশ্রিয়া মহেন্দ্রেন শাপাদ্দুর্বাসসঃ পুরা। চ
তুর্থে পূজিতা দেবী ভক্ত্যা ভগবতী সতী।।
তদা মুনীন্দ্রৈঃ সিদ্ধেন্দ্রৈর্দেবৈশ্চ মুনিমানবৈঃ।
পূজিতা সর্ববিশ্বেষু বভূব সর্ব্বতঃ সদা।।

অর্থাৎ, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়ে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছে।[৫]

দেবীভাগবত পুরাণ[সম্পাদনা]

পূজা শুরুর প্রাগমুহুর্তে, কলকাতার একটি পূজামণ্ডপে মহাষষ্টীর বোধনের পূর্বে দেবীপ্রতিমা, ২০০৬

শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু[৬] পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দুর্গার মাটির মূর্তি তৈরি করে পূজা করেন। এই সময় তিনি "বাগ্‌ভব" বীজ জপ করতেন এবং আহার ও শ্বাস গ্রহণ ত্যাগ করে এক পায়ে দাঁয়ে একশো বছর ধরে ঘোর তপস্যা করেন। এর ফলে তিনি শীর্ণ হয়ে পড়লেও, কাম ও ক্রোধ জয় করতে সক্ষম হন এবং দুর্গানাম চিন্তা করতে করতে সমাধির প্রভাবে স্থাবরে পরিণত হন। তখন দুর্গা প্রীত হয়ে তাঁকে বর দিতে আসেন। মনু তখন দেবতাদেরও দুর্লভ একটি বর চাইলেন। দুর্গা সেই প্রার্থনা রক্ষা করেন। সেই সঙ্গে দুর্গা তাঁর রাজ্যশাসনের পথ নিষ্কণ্টক করেন এবং মনুকে পুত্রলাভের বরও দেন।[৭]

২০০৯ সালের বর্ধমানের একটি দুর্গা প্রতিমা

দেবীমাহাত্ম্যম্‌[সম্পাদনা]

বৈষ্ণবী ও বারাহী দেবী শুম্ভ-নিশুম্ভের অসুরসৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধরতা, সপ্তদশ শতাব্দীর পুথিচিত্রণ

দুর্গা ও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যতগুলি পৌরাণিক গল্প প্রচলিত আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি পাওয়া যায় শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্যম্-এ। এই গল্পটি হিন্দুরা এতটাই মান্য করে যে শ্রীশ্রীচণ্ডীর পাঠ দুর্গাপূজার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। দেবীমাহাত্ম্যম্ আসলে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর একটি নির্বাচিত অংশ। এতে তেরোটি অধ্যায়ে মোট সাতশোটি শ্লোক আছে। এই বইতে দুর্গাকে নিয়ে প্রচলিত তিনটি গল্প ও দুর্গাপূজা প্রচলনের একটি গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্পে দুর্গাই কেন্দ্রীয় চরিত্র।

রাজা সুরথের গল্প[সম্পাদনা]

রাজা সুরথের গল্পটি শ্রীশ্রীচণ্ডী-র প্রধান তিনটি গল্পের অবতরণিকা ও যোগসূত্র। সুরথ ছিলেন পৃথিবীর রাজা। সুশাসক ও যোদ্ধা হিসেবে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। কিন্তু একবার এক যুদ্ধে এক যবন জাতির হাতে তাঁর পরাজয় ঘটে। সেই সুযোগে তাঁর মন্ত্রী ও সভাসদেরা তাঁর ধনসম্পদ ও সেনাবাহিনীর দখল নেন। সুরথ মনের দুঃখে বনে চলে আসেন। বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মেধা নামে এক ঋষির আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। মেধা রাজাকে সমাদর করে নিজের আশ্রমে আশ্রয় দেন। কিন্তু বনে থেকেও রাজার মনে সুখ ছিল না। সব সময় তিনি তাঁর হারানো রাজ্যের ভালমন্দের কথা ভেবে শঙ্কিত হতেন। এমন সময় একদিন বনের মধ্যে সুরথ সমাধি নামে এক বৈশ্যের দেখা পেলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে সুরথ জানতে পারলেন, সমাধির স্ত্রী ও ছেলেরা তাঁর সব টাকাপয়সা ও বিষয়সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাও তিনি সব সময় নিজের স্ত্রী ও ছেলদের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা চিন্তা করে শঙ্কিত হন। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগল, যারা তাঁদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, তাদের প্রতি তাঁদের রাগ হচ্ছে না কেন? কেনই বা তাঁরা সেই সব লোকেদের ভালমন্দের কথা চিন্তা করে করে শঙ্কিত হচ্ছেন? দুজনে মেধা ঋষিকে এই কথা জিজ্ঞাসা করলে, ঋষি বললেন, পরমেশ্বরী মহামায়ার প্রভাবেই এমনটা হচ্ছে। সুরথ তাঁকে মহামায়ার কথা জিজ্ঞাসা করলে, তিনি একে একে তাঁকে তিনটি গল্প বলেন। এই গল্পগুলিই শ্রীশ্রীচণ্ডী-র মূল আলোচ্য বিষয়। বইয়ের শেষে দেখা যায়, মেধার গল্প শুনে সুরথ ও সমাধি নদীর তীরে তিন বছর কঠিন তপস্যা ও দুর্গাপূজা করলেন এবং শেষে দুর্গা তাঁদের দেখা দিয়ে সুরথকে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন এবং বৈশ্যকে তত্ত্বজ্ঞান দিলেন।[৮]

মধুকৈটভের কাহিনি[সম্পাদনা]

মধুকৈটভ বধরত নারায়ণ, সপ্তদশ শতাব্দীর পুথিচিত্রণ

শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে সংক্ষেপে মধুকৈটভের উপাখ্যানটি বর্ণিত হয়েছে : প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট কারণ-সমুদ্রে পরিণত হলে বিষ্ণু সেই সমুদ্রের উপর অনন্তনাগকে শয্যা করে যোগনিদ্রায় মগ্ন হলেন। এই সময় বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়ে বিষ্ণু নাভিপদ্মে স্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হল। ভীত হয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জাগরিত করবার জন্যে তাঁর নয়নাশ্রিতা যোগনিদ্রার স্তব করতে লাগলেন। এই স্তবটি গ্রন্থে উল্লিখিত চারটি প্রধান স্তবমন্ত্রের অন্যতম। এই স্তবে সন্তুষ্টা দেবী বিষ্ণুকে জাগরিত করলে তিনি পাঁচ হাজার বছর ধরে মধু ও কৈটভের সঙ্গে মহাসংগ্রামে রত হলেন। মহামায়া শেষে ঐ দুই অসুরকে বিমোহিত করলে তারা বিষ্ণুকে বলে বসে, “আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা প্রীত; তাই আপনার হাতে মৃত্যু হবে আমাদের শ্লাঘার বিষয়। পৃথিবীর যে স্থান জলপ্লাবিত নয়, সেখানে আপনি আমাদের উভয়কে বিনাশ করতে পারেন।” বিষ্ণু বললেন, “তথাস্তু।” এবং অসুরদ্বয়ের মাথা নিজের জঙ্ঘার উপর রেখে তাদের বধ করলেন।[৮]

মহিষাসুরের কাহিনি[সম্পাদনা]

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা, গুলের ঘরানার চিত্র, দ্রষ্টব্য এই চিত্রে দেবী ব্যাঘ্রবাহিনী

শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে বর্ণিত দেবী দুর্গার কাহিনিগুলির মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় আবার গ্রন্থের মধ্যম চরিত্র বা দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লিখিত মহিষাসুর বধের কাহিনিটি। এই কাহিনি অনুসারে : পুরাকালে মহিষাসুর দেবগণকে একশতবর্ষব্যাপী এক যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নিলে, বিতাড়িত দেবগণ প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাঁকে মুখপাত্র করে শিবনারায়ণের সমীপে উপস্থিত হলেন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনি শ্রবণ করে তাঁরা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। সেই ক্রোধে তাঁদের মুখমণ্ডল ভীষণাকার ধারণ করল। প্রথমে বিষ্ণু ও পরে শিব ও ব্রহ্মার মুখমণ্ডল হতে এক মহাতেজ নির্গত হল। সেই সঙ্গে ইন্দ্রাদি অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হল। সু-উচ্চ হিমালয়ে স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজঃপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করল। কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূত হওয়ায় এই দেবী কাত্যায়নী নামে অভিহিতা হলেন। অন্য সূত্র থেকে জানা যায়, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে দেবী কাত্যায়নী আবির্ভূতা হয়েছিলেন; শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে কাত্যায়ন দেবীকে পূজা করেন এবং দশমীতে দেবী মহিষাসুর বধ করেন। [৯]

যাই হোক, এক এক দেবের প্রভাবে দেবীর এক এক অঙ্গ উৎপন্ন হল। প্রত্যেক দেবতা তাঁদের আয়ূধ বা অস্ত্র দেবীকে দান করলেন। হিমালয় দেবীকে তাঁর বাহন সিংহ দান করলেন। এই দেবীই অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মী রূপে মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন (শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে, মহালক্ষ্মী দেবী মহিষাসুর বধ করেন। ইনিই দুর্গা। তবে বাঙালিরা এঁকে দশভূজারূপে পূজা করে থাকেন)। দেবী ও তাঁর বাহনের সিংহনাদে ত্রিভুবন কম্পিত হতে লাগল।

মহিষাসুর সেই প্রকম্পনে ভীত হয়ে প্রথমে তাঁর সেনাদলের বীরযোদ্ধাদের পাঠাতে শুরু করলেন। দেবী ও তাঁর বাহন সিংহ প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে একে একে সকল যোদ্ধা ও অসুরসেনাকে বিনষ্ট করলেন। তখন মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেন। যুদ্ধকালে ঐন্দ্রজালিক মহিষাসুর নানা রূপ ধারণ করে দেবীকে ভীত বা বিমোহিত করার প্রচেষ্টায় রত হলেন; কিন্তু দেবী সেই সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলেন। তখন অসুর অহঙ্কারে মত্ত হয়ে প্রবল গর্জন করল। দেবী বললেন,

গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ পিবাম্যহম। ময়া ত্বয়ি হতেঽত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতাঃ।।

- রে মূঢ়, যতক্ষণ আমি মধুপান করি, ততক্ষণ তুই গর্জন করে নে। আমি তোকে বধ করলেই দেবতারা এখানে শীঘ্রই গর্জন করবেন।।

এই বলে দেবী লম্ফ দিয়ে মহিষাসুরের উপর চড়ে তাঁর কণ্ঠে পা দিয়ে শূলদ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করে তাকে বধ করলেন। অসুরসেনা হাহাকার করতে করতে পলায়ন করল এবং দেবতারা স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়ে আনন্দধ্বনি করতে লাগলেন। [১০]

শুম্ভ-নিশুম্ভের কাহিনি[সম্পাদনা]

শুম্ভ ও নিশুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধরত দুর্গা।

দেবীমাহাত্ম্যম্-এ বর্ণিত দেবী দুর্গা সংক্রান্ত তৃতীয় ও সর্বশেষ কাহিনিটি হল শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের কাহিনি। গ্রন্থের উত্তর চরিত্র বা তৃতীয় খণ্ডে বিধৃত পঞ্চম থেকে একাদশ অধ্যায়ে এই কাহিনি বর্ণিত হয়েছে : শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুরভ্রাতা স্বর্গ ও দেবতাদের যজ্ঞভাগ অধিকার করে নিলে দেবগণ হিমালয়ে গিয়ে বৈষ্ণবী শক্তি মহাদেবীকে স্তব করতে লাগলেন (পঞ্চম অধ্যায়ে উল্লিখিত এই স্তবটি অপরাজিতস্তব নামে পরিচিত; এটি হিন্দুদের নিকট অতিপবিত্র ও নিত্যপাঠ্য একটি স্তবমন্ত্র; “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা” ও সমরূপ মন্ত্রগুলি এই স্তবের অন্তর্গত)। এমন সময় সেই স্থানে পার্বতী গঙ্গাস্নানে উপস্থিত হলে, আদ্যাদেবী ইন্দ্রাদি দেবতার স্তবে প্রবুদ্ধা হয়ে তাঁর দেহকোষ থেকে নির্গত হলেন। এই দেবী কৌশিকী নামে আখ্যাত হলেন ও শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। শুম্ভ-নিশুম্ভের চর চণ্ড ও মুণ্ড তাঁকে দেখতে পেয়ে নিজ প্রভুদ্বয়কে বললেন যে এমন স্ত্রীলোক আপনাদেরই ভোগ্যা হবার যোগ্য। চণ্ড-মুণ্ডের কথায় শুম্ভ-নিশুম্ভ মহাসুর সুগ্রীবকে দৌত্যকর্মে নিযুক্ত করে দেবীর নিকট প্রেরণ করলেন। সুগ্রীব দেবীর কাছে শুম্ভ-নিশুম্ভের কুপ্রস্তাব মধুরভাবে ব্যক্ত করল। দেবী মৃদু হেসে বিনীত স্বরে বললেন, “তুমি সঠিকই বলেছ। এই বিশ্বে শুম্ভ-নিশুম্ভের বীর কে আছে? তবে আমি পূর্বে অল্পবুদ্ধিবশতঃ প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যে আমাকে যুদ্ধে পরাভূত করতে পারবে, কেবলমাত্র তাকেই আমি বিবাহ করব। এখন আমি প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করি কি করে! তুমি বরং মহাসুর শুম্ভ বা নিশুম্ভকে বল, তাঁরা যেন এখানে এসে আমাকে পরাস্ত করে শীঘ্র আমার পাণিগ্রহণ করেন। আর বিলম্বে কি প্রয়োজন?” সুগ্রীব ক্রোধান্বিত হয়ে দেবীকে নিরস্ত হতে পরামর্শ দিল। কিন্তু দেবী নিজবাক্যে স্থির থেকে তাকে শুম্ভ-নিশুম্ভের কাছে প্রেরণ করলেন।

দেবীর কথায় কুপিত হয়ে অসুররাজ শুম্ভ তাঁকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দৈত্যসেনাপতি ধূম্রলোচনকে প্রেরণ করলেন। ধূম্রলোচনের সঙ্গে দেবীর ভয়ানক যুদ্ধ হল ও সেই যুদ্ধে ধূম্রলোচন পরাজিত ও নিহত হল। এই সংবাদ পেয়ে শুম্ভ চণ্ড-মুণ্ড ও অন্যান্য অসুরসৈন্যদের প্রেরণ করল। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দেবী নিজ দেহ থেকে দেবী কালীর সৃষ্টি করলেন। চামুণ্ডা ভীষণ যুদ্ধের পর চণ্ড-মুণ্ডকে বধ করলেন। তখন দেবী দুর্গা তাঁকে চামুণ্ডা আখ্যায় ভূষিত করলেন।

চণ্ড-মুণ্ডের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সকল দৈত্যসেনাকে সুসজ্জিত করে প্রেরণ করলেন দেবীর বিরুদ্ধে। তখন তাঁকে সহায়তার প্রত্যেক দেবতার শক্তি রূপ ধারণ করে রণক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। এই দেবীরা হলেন ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, নারসিংহী, ঐন্দ্রী প্রমুখ। এঁরা প্রচণ্ড যুদ্ধে দৈত্যসেনাদের পরাভূত ও নিহত করতে লাগলেন। এই সময় রক্তবীজ দৈত্য সংগ্রামস্থলে উপস্থিত হল। তার রক্ত একফোঁটা মাটিতে পড়লে তা থেকে লক্ষ লক্ষ রক্তবীজ দৈত্য সৃষ্টি হয়। এই কারণে দুর্গা কালীর সহায়তায় রক্তবীজকে বধ করলেন। কালী রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়তে না দিয়ে নিজে পান করে নেন।

এরপর শুম্ভ আপন ভ্রাতা নিশুম্ভকে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দেবী দুর্গা নিশুম্ভকে বধ করলেন। প্রাণপ্রতিম ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে আকুল হয়ে শুম্ভ দেবীকে বলল, “তুমি গর্ব করো না, কারণ তুমি অন্যের সাহায্যে এই যুদ্ধে জয়লাভ করেছ।” তখন দেবী বললেন,

একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মামপরা। পশ্যৈতা দুষ্ট মধ্যেব বিশন্ত্যো মদ্বিভূতয়ঃ।।

-একা আমিই এ জগতে বিরাজিত। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কে আছে? রে দুষ্ট, এই সকল দেবী আমারই বিভূতি। দ্যাখ্, এরা আমার দেহে বিলীন হচ্ছে।

তখন অন্যান্য সকল দেবী দুর্গার দেহে মিলিত হয়ে গেলেন। দেবীর সঙ্গে শুম্ভের ঘোর যুদ্ধ আরম্ভ হল। যুদ্ধান্তে দেবী শুম্ভকে শূলে গ্রথিত করে বধ করলেন। দেবতারা পুনরায় স্বর্গের অধিকার ফিরে পেলেন।

কৃত্তিবাসি রামায়ণ[সম্পাদনা]

বাল্মীকিরামায়ণে রামের দুর্গাপূজার কোনো বিবরণ নেই। কিন্তু রামায়ণের পদ্যানুবাদ করার সময় কৃত্তিবাস ওঝা কালিকাপুরাণবৃহদ্ধর্মপুরাণ-এর কাহিনি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে সংযোজিত করেছেন। কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুসারে, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। শিব তাঁকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের স্ত্রী দুর্গার পূজা করে তাঁকে তুষ্ট করতে। তাতে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজসাধ্য হবে। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম শরৎকালে দুর্গার বোধন, চণ্ডীপাঠ ও মহাপূজার আয়োজন করেন। আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন রাম কল্পারম্ভ করেন। তারপর সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন। মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও দুর্গার আবির্ভাব না ঘটায়, রাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। হনুমান তাঁকে ১০৮টি পদ্ম জোগাড় করে দেন। দুর্গা রামকে পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখেন। একটি পদ্ম না পেয়ে রাম পদ্মের বদলে নিজের একটি চোখ উপড়ে দুর্গাকে নিবেদন করতে গেলে, দুর্গা আবির্ভূত হয়ে রামকে কাঙ্ক্ষিত বর দেন।[১১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মূর্তিতত্ত্ব[সম্পাদনা]

বাংলায় দেবী দুর্গার যে মূর্তিটি সচরাচর দেখা যায় সেটি পরিবারসমন্বিতা বা সপরিবার দুর্গার মূর্তি। এই মূর্তির মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী; তাঁর ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষ্মী ও নিচে গণেশ; বামপাশে উপরে দেবী সরস্বতী ও নিচে কার্তিকেয়।কলকাতায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার ১৬১০ সালে এই সপরিবার দুর্গার প্রচলন করেন । তাঁরা কার্তিকেয়র রূপ দেন জমিদারপুত্রের, যা তৎপূর্ব ছিল সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের আদলে যুদ্ধের দেবতা রূপে । এছাড়াও বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-সংলগ্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গা এক বিশেষ মূর্তি দেখা যায়। সেখানে দেবীর ডানপাশে উপরে গণেশ ও নিচে লক্ষ্মী, বামে উপরে কার্তিকেয় ও নিচে সরস্বতী এবং কাঠামোর উপরে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বৃষভবাহন শিব ও দুইপাশে দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া অবস্থান করেন। কলকাতার কোনও কোনও বাড়িতে দুর্গোৎসবে লক্ষ্মী ও গণেশকে সরস্বতী ও কার্তিকেয়ের সঙ্গে স্থান বিনিময় করতে দেখা যায়। আবার কোথাও কোথায় দুর্গাকে শিবের কোলে বসে থাকতেও দেখা যায়। এগুলি ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রকমের স্বতন্ত্র মূর্তিও চোখে পড়ে। তবে দুর্গার রূপকল্পনা বা কাঠামোবিন্যাসে যতই বৈচিত্র থাকুক, বাংলায় দুর্গোৎসবে প্রায় সর্বত্রই দেবী দুর্গা সপরিবারে পূজিতা হন। এই প্রসঙ্গে স্বামী প্রমেয়ানন্দের উক্তিটি স্মরণীয়ঃ

...ধনদাত্রী লক্ষ্মী, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী, শৌর্য-বীর্যের প্রতীক কার্তিকেয়, সিদ্ধিদাতা গণেশ ও তাঁদের বাহন-সকলের মূর্তিসহ মহামহিমময়ী দুর্গামূর্তির পরিকল্পনা ও পূজা বাংলার নিজস্ব।[১২]

দুর্গা[সম্পাদনা]

হিন্দু শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ নামটির ব্যাখ্যা নিম্নোক্তরূপে প্রদত্ত হয়েছে :


দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।

উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।।[১৩]


- ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও অ-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম অনুসারে, “দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা” – অর্থাৎ, দুর্গ নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে অভিহিতা। [১৪] আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে এই দেবীই ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ’ বা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি।[১৫]

সিংহ[সম্পাদনা]

দুর্গার বাহন মহাসিংহ, বাগবাজার সর্বজনীন, কলকাতা, ২০১০
লোকশিল্পের আদলে নির্মিত বাহন মহাসিংহ, হাতিবাগান নবীন পল্লি, কলকাতা, ২০১০।

দুর্গার বাহন সিংহ। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে সিংহকে "মহাসিংহ", "বাহনকেশরী", "ধূতসট" ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে।[১৬] দুর্গাপূজার সময় সিংহকেও বিশেষভাবে পূজা করা হয়। দেবীপুরাণ-এ উল্লিখিত সিংহের ধ্যানে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিষ্ণু, শিব, দুর্গা প্রমুখ দেবদেবীরা অবস্থান করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[১৭] অপর একটি ধ্যান মন্ত্রে সিংহকে বিষ্ণুর একটি রূপ বলা হয়েছে।[১৮] কালীবিলাস তন্ত্র-এ দুর্গার বাহনকে বলা হয়েছে বিষ্ণুরূপী সিংহ।[১৯] কালিকাপুরাণ অনুসারে, দুর্গার বাহন হওয়ার জন্য শিব শবদেহ, ব্রহ্মা রক্তপদ্ম ও বিষ্ণ সিংহের মূর্তি ধারণ করেছিলেন।[২০]

মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে, হিমালয় দুর্গাকে সিংহ দেন। শিবপুরাণ অনুসারে, শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গাকে সিংহ দেন।[২১] পদ্মপুরাণ-এ আছে, দুর্গার ক্রোধ থেকে সিংহের জন্ম হয়।[২২] দেবীপুরাণ অনুযায়ী, বিষ্ণু দুর্গার বাহন সিংহকে নির্মাণ করেছিলেন এবং সেই সিংহে সকল দেবতার অধিষ্ঠান হয়েছিল।[২৩]

সিংহ রজোগুণের এক প্রচণ্ড শক্তির উচ্ছ্বাসের প্রতীক। স্বামী নির্মলানন্দ বলেছেন,

সত্ত্বগুণের অনুগত হলে সেই শক্তি লোকস্থিতির সহায়ক হয়ে ওঠে। ... (সিংহ) আসুরিকতা ও পাশবিকতার উচ্ছেদ সাধনপূর্বক দেবীর লোকস্থিতিমূলক পূণ্য কর্মের সহায়কারী।[২৪]

এছাড়াও সিংহ মানুষের পশুত্ববিজয়েরও প্রতীক। স্বামী প্রমেয়ানন্দ লিখেছেন,

প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে পশুশক্তি। পুরুষকার ও সাধন-ভজনের দ্বারা মানুষ যখন যথার্থ মনুষ্যত্বে উপনীত হয় তখন তার পশুভাব কেটে গিয়ে দেবভাব জাগ্রত হয়। আর তখনই সে প্রকৃত শরণাগত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে, সার্থক জীবনের অধিকারী হয়। দেবীর চরণতলে সিংহ সেই ভাবেরই প্রতীক।[২৫]

মহিষাসুর[সম্পাদনা]

বেহালার ২৯ পল্লির থিম পূজামণ্ডপে দেবীপ্রতিমায় বাঁকুড়া জেলার লোকশিল্পের ছোঁয়া, ২০০৭

মহিষাসুর অসুর, অর্থাৎ দেবদ্রোহী। তাই দেবীপ্রতিমায় দেবীর পদতলে দলিত এই অসুর ‘সু’ এবং ‘কু’-এর মধ্যকার চিরকালীন দ্বন্দে অশুভ শক্তির উপর শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। স্বামী প্রমেয়ানন্দের ভাষায়,

সাধকের পক্ষে অসুর অবিদ্যা। বিদ্যারূপিণী মা অবিদ্যা বিনাশ করে মহামুক্তির বিধান করেন। সাধারণ মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, ভয়-ভীতি, আপদ-বিপদ – এ-সকলই আসুরিক শক্তির কার্য। পরমকরুণাময়ী মা নিরন্তর অসুর বিনাশ করে সন্তানের কল্যাণ বিধান করছেন।[২৬]

তবে অসুর হলেও দুর্গোৎসবে মহিষাসুরেরও পূজার চল আছে। কালিকা পুরাণ অনুসারে, মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে নিজের মৃত্যুদৃশ্য স্বপ্নে দেখে ভীত মহিষাসুর ভদ্রকালীকে তুষ্ট করেছিলেন। ভদ্রকালী তাঁকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি না দিলেও তাঁর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বরদান করতে ইচ্ছুক হন। মহিষাসুর দেবতাদের যজ্ঞভাগ বর চাইলে দেবী সেই বর দিতে অস্বীকৃত হন; কিন্তু মহিষাসুরকে এই বর দেন যে যেখানেই দেবী পূজিতা হবেন, সেখানেই তাঁর চরণতলে মহিষাসুরেরও স্থান হবে।[২৭]

গণেশ[সম্পাদনা]

গণেশ কার্যসিদ্ধির দেবতা। হিন্দু পুরাণের নিয়ম অনুসারে, অন্যান্য দেবতার আগে গণেশের পূজা করতে হয়। গণেশের পূজা আগে না করে অন্য কোনো দেবতার পূজা করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। স্বামী প্রমেয়ানন্দ লিখেছেন,

গণশক্তি যেখানে ঐক্যবদ্ধ সেখানে কর্মের সকল প্রকার বাধাবিঘ্ন দূরীভূত হয়। দেবাসুর-যুদ্ধে দেবতারা যতবারই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসুরদের সঙ্গে লড়াই করেছেন ততবারই তাঁরা জয়ী হয়েছেন। গণেশের আর এক নাম বিঘ্নেশ, অর্থাৎ বিঘ্ননাশকারী। বিঘ্নেশ প্রসন্ন থাকলে সিদ্ধি নিশ্চিত।[২৮]
বেহালার একটি পূজামণ্ডপে সনাতন বাঙালি ভাস্কর্যে সপরিবার দুর্গা, ২০০৭

মুষিক[সম্পাদনা]

গণেশের বাহন মূষিক বা ইঁদুর। ইঁদুর মায়া ও অষ্টপাশ ছেদনের প্রতীক। ব্রহ্মর্ষি শ্রীসত্যদেবের ভাষায়,

অথর্বশীর্ষের সায়নভাষ্যে উক্ত হইয়াছে মুষ্ণাতি অপহরতি কর্মফলানি ইতি মূষিকঃ। জীবের কর্মফলসমূহ অজ্ঞাতসারে অপহরণ করে বলিয়া ইহার নাম মূষিক। প্রবল প্রতিবন্ধকস্বরূপ কর্মফল বিদ্যমান থাকিতে সিদ্ধিলাভ হয় না। তাই, কর্মফল হরণের উপর সিদ্ধি প্রতিষ্ঠিত।[২৯]

লক্ষ্মী[সম্পাদনা]

লক্ষ্মী শ্রী, সমৃদ্ধি, বিকাশ ও অভ্যুদয়ের প্রতীক। শুধু ধনৈশ্বর্যই নয়, লক্ষ্মী চরিত্রধনেরও প্রতীক। স্বামী নির্মলানন্দের ভাষায়,

ধন, জ্ঞান ও শীল – তিনেরই মহনীয় বিকাশ দেবী লক্ষ্মীর চরিত্রমাহাত্ম্যে। সর্বাত্মক বিকাশের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বলেই তিনি কমলা। কমল বা পদ্মের ন্যায়ই তিনি সুন্দরী; তদীয় নেত্রদ্বয় পদ্মের ন্যায় আয়ত। তাঁর শুভ করে প্রস্ফুটিত পদ্মকুসুম; পদ্মবনেই তাঁর বসতি। [৩০]

মহানামব্রত ব্রহ্মচারী অন্যদিকে সমুদ্রমন্থনে সমুদ্ভূতা দেবী লক্ষ্মীর মূর্তিতত্ত্বের অপর এক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন,

যাঁহারা বিচক্ষণ তাঁহারা ভূমি-প্রকৃতি কর্ষণ করিয়া শস্যধন আহরণ করেন, বন-প্রকৃতি অনুসন্ধান করিয়া ধন আহরণ করেন। খনি প্রকৃতি খনন করিয়া স্বর্ণধন সংগ্রহ করেন। এই সকলই সাগরমন্থন। ... এই সকল সাগর-মন্থনে ধনাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীর আবির্ভাব।[৩১]

পেচক[সম্পাদনা]

মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের দুর্গাপ্রতিমায় নারীজাগরণের বার্তা, চালচিত্রে বাংলা তথা ভারতের মহীয়সী নারীগণ, ২০০৭

লক্ষ্মীর বাহন পেচক বা প্যাঁচা। রূপে ও গুণে অতুলনীয় এই দেবীর এমন কিম্ভূত বাহন কেন, সে নিয়ে বেশ কয়েকটি মত প্রচলিত। প্রথমেই স্মরণে রাখা কর্তব্য, হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও পেচককে লক্ষ্মীর বাহনের মর্যাদা দান করা হয়নি। এই বিশ্বাস একান্তই বাঙালি লোকবিশ্বাস।

প্যাঁচা দিবান্ধ। মনে করা হয়, যাঁরা দিবান্ধ অর্থাৎ তত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞ, তাঁরাই পেচকধর্মী। মানুষ যতকাল পেচকধর্মী থাকে ততদিনই ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করে সে।[৩২] মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর মতে,

পেচক মুক্তিকামী সাধককে বলে, সকলে যখন ঘুমায় তুমি আমার মতো জাগিয়া থাকো। আর সকলে যখন জাগ্রত তখন তুমি আমার মতো ঘুমাইতে শিখ, তবেই সাধনে সিদ্ধি। কৈবল্যধন লাভ।

পরমার্থধনাভিলাষী সাধক পেঁচার মতো রাত্রি জাগিয়া সাধন করে। লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্জনে থাকে। লক্ষ্মীমার বাহন রূপে আসন লইয়া পেচকের যে ভাষণ তাহা বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন প্রকার সাধকের উপাদেয় সম্পদ।[৩৩]

সরস্বতী[সম্পাদনা]

দক্ষিণ কলকাতার ম্যাডক্স স্কোয়ারের দুর্গাপূজা, ২০০৫

সরস্বতী বাণীরূপিণী বাগদেবী; তিনি জ্ঞানশক্তির প্রতীক।

দেবীর হাতে পুস্তক ও বীণা। পুস্তক বেদ শব্দব্রহ্ম। বীণা সুরছন্দের প্রতীক নাদব্রহ্ম। শুদ্ধ সত্ত্বগুণের পূর্তি, তাই সর্বশুক্লা। শ্বেতবর্ণটি প্রকাশাত্মক। সরস্বতী শুদ্ধ জ্ঞানময়ী প্রকাশস্বরূপা। জ্ঞানের সাধক হইতে হইলে সাধককে হইতে হইবে দেহে মনে প্রাণে শুভ্র-শুচি।[৩৪]

হংস[সম্পাদনা]

সরস্বতীর বাহন হংস। হংস হিন্দুদের নিকট একটি পবিত্র প্রতীক।

সরস্বতী-ব্রহ্মবিদ্যা। যে সাধক দিবারাত্র অজপা মন্ত্রে সিদ্ধ তিনিই হংসধর্মী। মানুষ সুস্থ শরীরে দিবারাত্র মধ্যে একুশ হাজার ছয়শত ‘হংস’ এই অজপা মন্ত্রজপরূপে শ্বাস-প্রশ্বাস করিয়া থাকে। মানুষ যতদিন এই স্বাভাবিক জপ উপলব্ধি করিতে না পারে, ততদিন ‘হংসধর্মী’ হইতে পারে না; সুতরাং ব্রহ্মবিদ্যারও সন্ধান পায় না।[৩৫]

কার্তিকেয়[সম্পাদনা]

দুর্গাপূজার সময় পূজিত কার্তিক মূর্তি।
বেহালার জিতেন্দ্র স্মৃতি সংঘের জৌলুশপূর্ণ দেবীপ্রতিমা, ২০০৭

দেবসেনাপতি কার্তিকেয় বা কার্তিক সৌন্দর্য ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক।

যুদ্ধে শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন একান্ত প্রয়োজনীয়। তাই সাধক-জীবনে এবং ব্যবহারিক জীবনে কার্তিকেয়কে প্রসন্ন করতে পারলে শৌর্য-বীর্য আমাদের করতলগত হয়...[৩৬]

ময়ূর[সম্পাদনা]

কার্তিকেয়ের বাহন ময়ূর। সৌন্দর্য ও শৌর্য – কার্তিকেয়ের এই দুই বৈশিষ্ট্যই তাঁর বাহন ময়ূরের মধ্যে বিদ্যমান।

শিব[সম্পাদনা]

অন্যান্য মূর্তি[সম্পাদনা]

আচার ও অনুষ্ঠানসমূহ[সম্পাদনা]

চণ্ডীপাঠ[সম্পাদনা]

মহালয়া[সম্পাদনা]

দুর্গাষষ্ঠী[সম্পাদনা]

কল্পারম্ভ[সম্পাদনা]

বোধন[সম্পাদনা]

আমন্ত্রণ ও অধিবাস[সম্পাদনা]

সপ্তমীপূজা[সম্পাদনা]

নবপত্রিকা[সম্পাদনা]

মহাস্নান[সম্পাদনা]

দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হল মহাস্নান। মহাসপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের পর মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। মহাষ্টমী ও মহানবমীর দিনও পূজার মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়।[৩৭] দুর্গাপ্রতিমার সামনে একটি দর্পণ বা আয়না রেখে সেই দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার প্রতিবিম্বে বিভিন্ন জিনিস দিয়ে স্নান করানো হয়।[৩৮] মহাস্নানের সময় শুদ্ধজল, নদীর জল, শঙ্খজল, গঙ্গাজল, উষ্ণ জল, সুগন্ধি জল, পঞ্চগব্য, কুশ ঘাসের দ্বারা ছেটানো জল, ফুলে দ্বারা ছেটানো জল, ফলের জল, মধু, দুধ, নারকেলের জল, আখের রস, তিল তেল, বিষ্ণু তেল, শিশিরের জল, রাজদ্বারের মাটি, চৌমাথার মাটি, বৃষশৃঙ্গমৃত্তিকা, গজদন্তমৃত্তিকা, বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা, নদীর দুই তীরের মাটি, গঙ্গামাটি, সব তীর্থের মাটি, সাগরের জল, ঔষধি মেশানো জল, বৃষ্টিজল, সরস্বতী নদীর জল, পদ্মের রেণু মেশানো জল, ঝরনার জল ইত্যাদি দিয়ে দুর্গাকে স্নান করানো হয়।[৩৭] মহাস্নানের প্রতীকী তাৎপর্য সম্পর্কে স্বামী ত্যাগিবরানন্দ লিখেছেন,

এই সকল ক্রিয়ানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাজের কৃষিসম্পদ, খনিজসম্পদ, বনজসম্পদ, জলজসম্পদ, প্রাণীজসম্পদ, ভূমিসম্পদ প্রভৃতি রক্ষা করার জন্য সাধারণ মানসে বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়। নৈতিকতা স্থাপনে সর্বভূতে দেবীরই অধিষ্ঠানস্বরূপ পতিতোধ্বারের ভাবটিও ফুটে ওঠে এই মহাস্নানে। এমনকী চাষা-ভূষা, মুচি-মেথর থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ, মালি, কুম্ভকার, তন্তুবায়, নরসুন্দর, ঋষি, দাস প্রভৃতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ বিশ্ব সংহতি ও বিশ্বের কাছে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়ের সমন্বয়বার্তা প্রেরণ করে। এককথায় সার্বিক সমাজলক্যাণ চিন্তা ফুটে ওঠে এই মহাস্নানে।[৩৮]

অষ্টমীপূজা[সম্পাদনা]

কুমারী পূজা[সম্পাদনা]

কুমারী পূজা হলো তন্ত্রশাস্ত্রমতে অনধিক ষোলো বছরের অরজঃস্বলা কুমারী মেযে়র পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে।

বর্তমানে কুমারী পূজার প্রচলন কমে গেছে। বাংলাদেশে সূদূর অতীত থেকেই কুমারী পূজার প্রচলন ছিলো এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায় কুমারীপূজাপ্রযে়াগ গ্রন্থের পুথি থেকে।বর্তমানে বাংলাদেশে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, সিলেট, হবিগঞ্জদিনাজপুর জেলা শহরে প্রতিষ্ঠিত রামকৃ্ষ্ণ মিশনে কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। প্রতিবছর দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয় তবে মতান্তরে নবমী পূজার দিনও এ পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

সন্ধিপূজা[সম্পাদনা]

দূর্গাপূজার একটি বিশেষ অধ্যায় হল সন্ধিপূজা । দূর্গাপূজার অষ্টমীর দিন হয় এই বিশেষ পূজা , এই পূজার সময়কাল ৪৮ মিনিট। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় এই পূজা। যেহেতু অষ্টমী ও নবমী তিথির সংযোগ স্থলে এই পূজা হয় তাই এই পূজার নাম সন্ধিপূজা অর্থ্যাৎ সন্ধি-কালিন পূজা। এই পূজা দূর্গাপূজার একটি বিশেষ অঙ্গ, এইসময় দেবী দূর্গাকে চামুন্ডা রূপে পূজা করা হয়ে থাকে। এই পূজা সম্পন্ন হয় তান্ত্রিক মতে। এই পূজায় দেবীকে ষোলটি উপাচার নিবেদন করা হয়, হয় পশুবলি সেই বলিকৃত পশুর স্মাংস-রুধি (মাংস ও রক্ত) এবং কারণ (মদ) প্রদান করা হয় দেবীর উদ্দেশ্যে।

নবমীপূজা[সম্পাদনা]

দশমীপূজা[সম্পাদনা]

বিসর্জন ও বিজয়া দশমী কৃত্য[সম্পাদনা]

অপরাজিতা পূজা[সম্পাদনা]

অপরাজিতা পূজা দুর্গাপূজার একটি অঙ্গ। দুর্গার অপর নাম অপরাজিতা। তবে এই দেবীর মূর্তি অন্যরকম। ইনি চতুর্ভূজা; হাতে শঙ্খ, চক্র, বর ও অভয়মুদ্রা; গায়ের রং নীল; ত্রিনয়না ও মাথায় চন্দ্রকলা।[৩৯] বিজয়াদশমীর দিন বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপের ঈশানকোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে অপরাজিতার লতা রেখে এই দেবীর পূজা করা হয়। হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, ইনি "...বৈষ্ণবী শক্তি বিষ্ণুমায়া লক্ষ্মী ও শিবশিক্তি শিবানীর মিশ্রণে কল্পিতা।"[৪০]

পূজা উদযাপন[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ[সম্পাদনা]

কলকাতায় দুর্গাপূজায় আলোকমালায় সজ্জিত রাস্তা।
বর্ধমানের একটি দুর্গাপ্রতিমা

শরৎকালীন দুর্গাপূজা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হিন্দু উৎসব। বাংলা পঞ্জিকার আশ্বিন বা কার্তিক মাসে (সেপ্টেমর-অক্টোবর মাসে) এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের একটি দুর্গাপ্রতিমা

কৃত্তিবাস ওঝারামায়ণে রাবণ বধের জন্য রামের দুর্গাপূজার পৌরাণিক কাহিনিটি উল্লেখিত হয়েছে। দুর্গার পূজা বসন্তকালের উৎসব হলেও, রাম শরৎকালে তাঁর পূজা করেছিলেন। এই পূজা অকালবোধন নামে পরিচিত।[৪১] তাই বাসন্তী পূজা এখনও প্রচলিত থাকলেও, শারদীয়া দুর্গাপূজাই মহাসমারোহে পালিত হয়।

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত দুর্গাপূজা পালিত হয়। বাঙালিরা এই উৎসবকে হিমালয়ে দেবী দুর্গার বাপের বাড়ি ফেরার অনুষ্ঠান হিসেবেই দেখে। বাঙালি সমাজে এই পূজা উপলক্ষে নতুন পোষাক পরার চল রয়েছে। পূজার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শনও বাঙালিদের একটি বিশেষ প্রথা।[৪২]

কলকাতা[সম্পাদনা]

সর্বজনীন পূজা[সম্পাদনা]

কলকাতার প্রধান সর্বজনীন দুর্গাপূজা সমিতিগুলি হল:[৪৩][৪৪]

উত্তর কলকাতা
দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিট পল্লি সমিতি, পাথুরিয়াঘাটা ৫ পল্লির দুর্গোৎসব, শোভাবাজার সর্বজনীন, শোভাবাজার বেনিয়াটোলা সর্বজনীন, নিমতলা সর্বজনীন, হাটখোলা গোঁসাইপাড়া সর্বজনীন, আহিরিটোলা সর্বজনীন, কুমোরটুলি সর্বজনীন, কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীন, বাগবাজার সর্বজনীন, সিঁথি ইউথ অ্যাথলেটিক ক্লাব, টালা বারোয়ারি, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, মানিকতলা চালতাবাগান লোহাপট্টি সর্বজনীন দুর্গোৎসব, বৃন্দাবন মাতৃমন্দির, নলিন সরকার স্ট্রিট, হাতিবাগান নবীন পল্লি, লালাবাগান নবাঙ্কুর, কাশী বোস লেন সর্বজনীন, শিকদারবাগান সর্বজনীন, হাতিবাগান সর্বজনীন, জগৎ মুখার্জি পার্ক।
পূর্ব কলকাতা
তেলেঙ্গাবাগান, শুঁড়ির বাগান, করবাগান, পল্লিশ্রী, উল্টোডাঙা সংগ্রামী, শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব, লেকটাউন অধিবাসীবৃন্দ, নতুনপল্লি প্রদীপ সংঘ, লেকটাউন নেতাজি স্পোর্টিং, বাঙ্গুর অ্যাভিনিউ প্রতিরোধ বাহিনী, দমদম মল পল্লি, তরুণ দল, দমদম পার্ক ভারতচক্র, দমদম পার্ক তরুণ সংঘ, দমদম পার্ক যুবকবৃন্দ, প্রফুল্লকানন, মিতালি কাঁকুড়গাছি, বেলেঘাটা ৩৩ পল্লি, বেলেঘাটা প্রগতি সংঘ, পূর্ব কলকাতা সর্বজনীন।
বিধাননগর
এফডি ব্লক, লাবনী, আইএ ব্লক, জিসি ব্লক, এইচবি ব্লক, করুণাময়ী জি ব্লক, সিজি ব্লক, একে ব্লক, বিকে ব্লক, বিজি ব্লক, বিজে ব্লক, সিজে ব্লক, দিগন্তিকা, এআই পার্ট ১, এআই পার্ট ২, বিই ইস্ট।
মধ্য কলকাতা
কড়েয়া পার্কসার্কাস সর্বজনীন, পার্কসার্কাস বেনিয়াপুকুর, আদি ৫৭/৫৮ পল্লি, শহিদ স্মৃতি সংঘ, এন্টালি মর্নিং অ্যাথলেটিক ক্লাব, এন্টালি উদয়ন সংঘ, এন্টালি মাতৃভূমি, তালতলা সর্বজনীন, ওয়েলিংটন স্কোয়ার নাগরিক কল্যাণ কমিটি, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, মধ্য কলকাতা উত্তরণ, মহম্মদ আলি পার্ক, কলেজ স্কোয়ার, কানাই ধর লেন অধিবাসীবৃন্দ, শিয়ালদহ রেলওয়ে অ্যাথলেটিক ক্লাব, ৩৬ নং ওয়ার্ড সর্বজনীন, বেলেঘাটা সন্ধানী, বেলেঘাটা যুবকবৃন্দ, বেলিয়াঘাটা ৩৩নং অধিবাসীবৃন্দ।
দক্ষিণ কলকাতা
একডালিয়া এভারগ্রিন, সিংহী পার্ক সর্বজনীন, হিন্দুস্তান পার্ক সর্বজনীন, বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন, সমাজসেবী সংঘ, ত্রিধারা সম্মিলনী, দেশপ্রিয় পার্ক সর্বজনীন, ম্যাডক্স স্কোয়ার, পদ্মপুকুর বারোয়ারি সমিতি, বাদামতলা আষাঢ় সংঘ, ৬৬ পল্লি, ৬৪ পল্লি, ৬৮ পল্লি, অবসর, সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা, রূপচাঁদ মুখার্জি লেন, অগ্রদূত ও উদয় সংঘ, মুদিয়ালি, সুহৃদ সংঘ, চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন, সাউথ এন্ড পার্ক সর্বজনীন, বাবুবাগান, ৯৫ পল্লি, সেলিমপুর পল্লি, যোধপুর পার্ক শারদীয়া উৎসব কমিটি, শহিদনগর সর্বজনীন, সেলিমপুর ক্লাব, সন্তোষপুর লেকপল্লি, যাত্রা শুরু সংঘ, গড়িয়া মিতালি সংঘ, সূর্যনগর সর্বজনীন, নাকতলা উদয়ন সংঘ, ২৫ পল্লি, খিদিরপুর পল্লি শারদীয়া, নিউ আলিপুর সুরুচি সংঘ, সাহাপুর কলোনি কমিটি পশ্চিম, শিবমন্দির সর্বজনীন, চেতলা অগ্রণী ক্লাব, বালিগঞ্জ পূর্বপল্লি, বোসপুকুর শীতলামন্দির, বোসপুকুর তালবাগান, রাজডাঙা নবউদয় সংঘ, লেকগার্ডেনস পিপলস অ্যাসোসিয়েশন, চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি লেন সর্বজনীন, বাঁশদ্রোণী রায়নগর উন্নয়ন সমিতি।
বেহালা
২৯ পল্লি, চন্দনা যুব সংঘ, আদর্শ পল্লি, বেহালা নূতন দল, সবেদাবাগান দুর্গোৎসব, বড়িশা তরুণতীর্থ, বড়িশা যুবকবৃন্দ, বড়িশা ক্লাব, উদয়ন পল্লি, বন্ধুশ্রী, ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাংক পার্ক সর্বজনীন, ঠাকুরপুকুর জনকল্যাণ সমিতি, আচার্য প্রফুল্ল সংঘ, ম্যান্টন সবুজসাথী, দেবদারু ফটক, বেহালা ক্লাব, নস্করপুর সর্বজনীন, মুকুল সংঘ।

অন্যান্য স্থান[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্ম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায়। হিন্দুদের বৃহত্তম উৎসব হওয়ার জন্য তাই বাংলাদেশেও গ্রাম ও শহরে কয়েক হাজার দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়। বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূজার তিন দিন ছুটি থাকে। বিজয়াদশমী বাংলাদেশের সরকারি ছুটির দিন।[৪৫]

বহির্বঙ্গে[সম্পাদনা]

মঠ ও মন্দিরের পূজা[সম্পাদনা]

কালীঘাট মন্দির[সম্পাদনা]

কালীঘাট মন্দিরের কালী প্রতিমা। এই প্রতিমাটিই দুর্গাপূজার সময় চামুণ্ডা দুর্গা রূপে পূজিত হয়।

কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজা কবে শুরু হয়েছিল, তা জানা যায় না। এই পূজার বিশেষত্ব হল, এখানে দুর্গাপ্রতিমা আনা হয় না। মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপিত দেবী কালীর মূর্তিকেই দুর্গার মন্ত্রে চামুণ্ডা দুর্গা রূপে পূজা করা হয়। পূজা হয় কালিকা পুরাণ মতে। দুর্গাষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় মন্দির চত্বরের মনসাতলায় বেল গাছ পুঁতে সেখানে বোধন হয়। মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নানের মাধ্যমে পূজা শুরু হয়। কালীঘাট মন্দিরে কালী মূর্তির দুই পাশে দুটি নবপত্রিকা রাখা হয়।[৪৬] মূর্তির ডানদিকের নবপত্রিকাটি সেবায়েতদের পক্ষ থেকে এবং বাঁদিকেরটি সেবায়েতদের গুরুদের পক্ষ থেকে বসানো হয়। মহাষ্টমী ও মহানবমী তিথিতে কুমারী পূজা করা হয়। মহানবমীতে বলিদান হয়। এই দিনে বলিদান মন্দিরের পুরোহিত ছাড়া কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না। মন্দিরের সব দরজা বন্ধ করে বলি দেওয়া হয়। দুর্গাপূজার সময় কালীঘাট মন্দিরে বিশেষ ভোগের ব্যবস্থা করা হয়। মহানবমীর রাতে পান্তা ভাত দিয়ে ভোগ দেওয়ার রীতি আছে। বিজয়াদশমীর দিন সিঁদুরখেলা হয়। এই সময় মন্দিরে পুরুষদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। এই দিনই নবপত্রিকা বিসর্জনের মাধ্যমে মন্দিরের দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে বহু মানুষ কালীঘাট মন্দিরে আসেন ও পূজা দেন। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে এই সময় মন্দিরের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ পুলিশ বাহিনী নিয়োগ করা হয়।[৪৭]

বেলুড় মঠ[সম্পাদনা]

বেলুড় মঠের দুর্গাপ্রতিমা

রামকৃষ্ণ মঠমিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠের অন্যতম প্রধান উৎসব হল শারদীয়া দুর্গাপূজা। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। সারদা দেবী এই দুর্গাপূজার সময় মঠে উপস্থিত ছিলেন।[৪৮] সারদা দেবী এর পরেও কয়েক বার বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা দেখতে এসেছিলেন।[৪৯] বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার সময় কলকাতার কুমারটুলি থেকে প্রতিমা আনানো হত। এখন মঠ প্রাঙ্গনেই প্রতিমা তৈরি হয়।[৫০] পূজা হয় বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ মতে। এই পূজার একটি বৈশিষ্ট্য হল, পূজার সঙ্কল্প এখনও সারদা দেবীর নামেই হয়ে থাকে। ১৯০১ সাল থেকেই কুমারী পূজা বেলুড় মঠের দুর্গাপূজার একটি অঙ্গ।[৫০]

বেলুড় মঠের দুর্গাপূজার সূচনা হয় জন্মাষ্টমীর দিন। এই দিন কাঠামো পূজা হয়। এরপর মূর্তি নির্মিত হলে, দুর্গাষষ্ঠীর আগের দিন স্থানীয় জগন্নাথ মন্দির থেকে শালগ্রাম শিলা আনা হয়। এরপর দুর্গাষষ্ঠী থেকে বিজয়াদশমী পর্যন্ত সাধারণ শাস্ত্রবিধি অনুসারে পূজা হয়। বিজয়াদশমীর দিন সন্ধ্যায় মঠের ঘাটেই গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন হয়।[৫১] বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা দেখার জন্য প্রতিদিন প্রচুর জনসমাগম হয়। সরকারি ও বেসরকারি পরিবহণ সংস্থাগুলি এই উপলক্ষ্যে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ যানবাহনের ব্যবস্থা করে। বেলুড় মঠ ছাড়াও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অন্যান্য শাখাকেন্দ্রেও পরে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে।

বিষ্ণুপুর মৃন্ময়ী মন্দির[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির রাজ্যের একটি অন্যতম প্রধান দুর্গামন্দির। এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে।[৫২] এখানে দুর্গার দশভূজা মূর্তি "মৃন্ময়ী" নামে পূজিত হয়। মৃন্ময়ী মল্লভূমের রাজপরিবারের কুলদেবী। মৃন্ময়ী মন্দিরের শারদীয়া দুর্গাপূজা ১৮ বা ১৯ দিন ধরে চলে। মহালয়ার আগের নবমীতে জীমূতবাহন পূজা হয়। ওই দিন "বিল্ববরণ" নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। দুর্গাপূজার সময় তিনটি বিশেষ পট রাজবাড়ি মন্দিরে আনা হয়। এগুলির নাম হল বড় ঠাকুরানি, মাইতো ঠাকুরানি ও ছোটো ঠাকুরানি বা পটেশ্বরী। জিতাষ্টমীর পরদিন বড় ঠাকুরানি নামের পটটি মন্দিরে আনা হয়। দুর্গাষষ্ঠীর আগের চতুর্থীর দিন মাইতো ঠাকুরানি নামের পটটি মন্দিরে এনে পূজা করে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মহাসপ্তমীর দিন মাইতো ঠাকুরানি ও ছোটো ঠাকুরানিকে এক সঙ্গে মন্দিরে আনা হয়। ছোটো ঠাকুরানির পটটি সোনার তৈরি। মহাসপ্তমী থেকে যথানিয়মে পূজা হয়। তবে এই পূজায় পশুবলি দেওয়া হয় না। মহাষ্টমীর দিন রাজবাড়ি থেকে রাজবাড়ির গৃহদেবী বিশালাক্ষীর অষ্টাদশভূজা অষ্টধাতুর মূর্তিটি মন্দিরে আনা হয়। সন্ধিপূজার সময় তোপধ্বনি করা হয়। মহানবমীর দিন রাতে খচ্চরবাহিনী পূজা নামে একটি বিশেষ পূজা হয়। এই পূজা দুজন পুরোহিত ছাড়া আর কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না। মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীর দিন একান্ন পীঠশক্তির বিশেষ পূজা এই মন্দিরের দুর্গাপূজার একটি বৈশিষ্ট্য। দশমীর দিন ঘটবিসর্জন, দীপদান, অপরাজিতা পূজা ও রামচন্দ্র পূজা হয়। দ্বাদশীর দিন মাঝরাতে রাবণকাটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূজা শেষ হয়।[৫৩]

নতুন দিল্লি কালীবাড়ি[সম্পাদনা]

নতুন দিল্লি কালীবাড়ির দুর্গাপূজা দিল্লি শহরের সবচেয়ে পুরনো দুর্গাপূজাগুলির একটি। পূজাটি শুরু হয়েছিল ১৯২৫ সালে। সেই সময় পূজা হত বার্ড রোডের (অধুনা বাংলা সাহিব রোড) আদি মন্দিরে। স্থানীয় বাঙালি অধিবাসীরা পূজার সময় মন্দিরে আসেন। ১৯৩১ সালে নতুন মন্দিরটি তৈরি হলে সেখানেই দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু হয়।[৫৪][৫৫] কালীবাড়ির পূজা হয় সাবেকি রীতি অনুযায়ী। দুর্গাপ্রতিমাটি হয় একচালার প্রতিমা এবং শোলার সাজবিশিষ্ট। ১৯৩৬ সাল থেকে পূজার ব্যাপারে কিছু নির্দিষ্ট আচার মেনে চলা হচ্ছে। পূজা উপলক্ষে রবীন্দ্রসংগীত ও আবৃত্তির প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। কলকাতার শিল্পীরা মণ্ডপ তৈরি করে।[৫৬][৫৭]

কাশ্মীরি গেটের অন্য পূজাটি পরিচালিত হয় দিল্লি দুর্গাপূজা সমিতির দ্বারা। এটি ১৯১০ সাল থেকে চলে আসছে। তিমারপুর অ্যান্ড সিভিল লাইনস পূজা সমিতির পূজাটি তিমারপুরে চলছে ১৯১৪ সাল থেকে।[৫৮]

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির[সম্পাদনা]

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্গাপ্রতিমা।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির দেশের প্রধান মন্দির। এই মন্দিরটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত। এটি একটি দুর্গামন্দির এবং এখানেও মহাসমারোহে শারদীয়া দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়। পূজার সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা, সাংসদ ও বিখ্যাত ব্যাক্তিরা এই মন্দির পরিদর্শনে আসেন। দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও এই মন্দির দর্শনে আসে। পূজায় ভোগ খাওয়ানো হয়। বিজয়াদশমীতে পার্শ্ববর্তী প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজয়া সম্মেলনী হয়। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট শিল্পীরা উপস্থিত থাকেন।

সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

কুমারটুলি[সম্পাদনা]

কুমারটুলিতে নির্মীয়মান দুর্গাপ্রতিমা
কুমারটুলি থেকে দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য

কলকাতার কুমারটুলি অঞ্চলটি মাটির দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের জন্য বিখ্যাত। কুমারটুলি থেকে শুধু কলকাতা বা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেই নয়, আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশেও দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। বিদেশে সরবরাহের জন্য মাটি ছাড়া অন্যান্য উপাদানেও দুর্গাপ্রতিমা বানানো হয়। ১৯৮৯ সালে কুমারটুলির শিল্পী অমরনাথ ঘোষ শোলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়ানাইজেরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। এছাড়া ফাইবার গ্লাসের দুর্গাপ্রতিমাও অন্যান্য দেশে সরবরাহ করা হয়।[৫৯]

২০০৬ সালের হিসেব অনুসারে, কুমারটুলি থেকে মোট ১২,৩০০টি দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। এই অঞ্চল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের ৯০টি দেশে দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। বিদেশে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করে দেওয়ার জন্য কুমারটুলিতে বেশ কিছু এজেন্ট কাজ করে।[৬০] তবে কুমারটুলির প্রতিমাশিল্পীদের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। মোহনবাঁশি রুদ্রপাল, সনাতন রুদ্রপাল, প্রদীপ রুদ্রপাল, রাখাল পাল, গণেশ পাল, অলোক সেন, কার্তিক পাল, কেনা পাল প্রমুখ শিল্পীরা কুমারটুলির প্রধান প্রতিমাশিল্পী। কলকাতার অধিকাংশ পূজার প্রতিমা এঁরাই বানান। মিনতি পাল, সোমা পাল, কাঞ্চি পাল, চাঁপারানি পাল, চায়না পাল প্রমুখ মহিলা শিল্পীরাও আজকাল প্রতিমা তৈরি করছেন।.[৬১] কুমারটুলির শিল্পীদের দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। বিশিষ্ট প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল এই পূজার প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। [৫৯]

জনপ্রিয় মাধ্যমে দুর্গাপূজা[সম্পাদনা]

মহিষাসুরমর্দিনী[সম্পাদনা]

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় সূত্রধর ও পাঠক।

মহিষাসুরমর্দিনী মহালয়ার দিন ভোরবেলা সম্প্রচারিত একটি বিশেষ বেতার অনুষ্ঠান। এটি ১৯৩২ সাল থেকে আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হচ্ছে।[৬২] এই অনুষ্ঠানে শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে নির্বাচিত কিছু স্তোত্র,[৬৩] আগমনী গান ও বাংলা ভক্তিগীতি সহ শ্রীশ্রীচণ্ডীর দুটি গল্প শ্রুতিনাটকের আকারে শোনানো হয়। সর্বভারতীয় শ্রোতাদের জন্য অনুষ্ঠানটির হিন্দি সংস্করণ একই সময় সম্প্রচারিত হয়।[৬৪] এটি মোট দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠান। প্রথম দিকে এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হত। ১৯৬০-এর দশক থেকে অনুষ্ঠানটির রেকর্ড সম্প্রচারিত হয়। অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয়।[৬৫][৬৬][৬৭] আকাশবাণীর পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানটি ক্যাসেট ও সিডি আকারেও প্রকাশ করা হয়েছে।[৬৮]

এই অনুষ্ঠানে চণ্ডীপাঠ সহ অন্যান্য পাঠগুলি করেছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর পাঠ এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, ১৯৭৬ সালে এই অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতা উত্তমকুমারকে দিয়ে অন্য একটি অনুষ্ঠান করাতে গেলে শ্রোতারা নতুন অনুষ্ঠানটির প্রতি বিরূপ হন। ফলে পুরনো অনুষ্ঠানটির সম্প্রচারই চলতে থাকে।[৬৯] অনুষ্ঠানটির গান রচনা করেছিলেন বাণীকুমার এবং সুরারোপ করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক[৬৫] গানগুলি গেয়েছিলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষ প্রমুখ বিশিষ্ট শিল্পীরা।[৭০]

চিত্রকক্ষ[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • শ্রীশ্রীচণ্ডী, অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ স্বামী জগদীশ্বরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৬২ সংস্করণ
  • পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯
  • নতুন বাংলার মুখ পত্রিকা, শারদোৎসব সংখ্যা ১৪১৪ বঙ্গাব্দ (২০০৭)
  • পৌরাণিকা : বিশ্বকোষ হিন্দুধর্ম (প্রথম খণ্ড অ-ন), অমলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮৫ সংস্করণ
  • নিবন্ধ বাংলাদেশে দুর্গাপুজো, ইমদাদুল হক মিলন, বর্তমান (রবিবারের ক্রোড়পত্র), ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
  • মা দুর্গার কাঠামো, মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, মহাউদ্ধারণ মঠ, কলকাতা
  • দেবদেবী ও তাঁদের বাহন, স্বামী নির্মলানন্দ, প্রণব মঠ, কলকাতা
  • সাধন-সমর, ব্রহ্মর্ষি শ্রীসত্যদেব, সাধন-সমর কার্যালয়, কলকাতা

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. [১]- ২৪ আওয়ার মিউজিয়াম ডট অর্গ ডট ইউকে থেকে
  2. ২.০ ২.১ "Akaal Bodhan Article" 
  3. "Akaal Bodhan Article"। সংগৃহীত 2 October 2011 
  4. হিন্দুদের দেবদেবী, তৃতীয় খণ্ড, হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, ফার্মা কেএলএম প্রাঃ লিঃ, পৃ. ২২৭
  5. প্রবন্ধ শব্দাঞ্জলিতে দুর্গাপূজা, হরিপদ ভৌমিক, নতুন বাংলার মুখ পত্রিকা, আশ্বিন ১৪১৪, অক্টোবর ২০০৭, পৃ. ১৬৩ দ্রঃ
  6. ইনি পৌরাণিক চরিত্র, সংহিতাকার নন
  7. প্রবন্ধ শব্দাঞ্জলিতে দুর্গাপূজা, হরিপদ ভৌমিক, নতুন বাংলার মুখ পত্রিকা, আশ্বিন ১৪১৪, অক্টোবর ২০০৭, পৃ. ১৬৩-৬৪ দ্রঃ
  8. ৮.০ ৮.১ শ্রীশ্রীচণ্ডী, প্রথম অধ্যায়
  9. শ্রীশ্রীচণ্ডী, অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ স্বামী জগদীশ্বরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৬২ সংস্করণের ১০৭ পৃষ্ঠার পাদটীকাটি দ্রষ্টব্য
  10. শ্রীশ্রীচণ্ডী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়
  11. রামায়ণ কৃত্তিবাস বিরচিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ও ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখিত ভূমিকা সম্বলিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৫৭ সংস্করণ
  12. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪
  13. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪ থেকে উদ্ধৃত
  14. শব্দকল্পদ্রুম ৩।১৬৬৬; পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪ থেকে উদ্ধৃত
  15. শ্রীশ্রীচণ্ডী ৪।৩
  16. শ্রীশ্রীচণ্ডী, ২।৫১
  17. "দেবীবাহন সিংহের ধ্যান", শ্রীশ্রীচণ্ডী, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ অনূদিত ও সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃ. ৪৯
  18. কালিকাপুরাণোক্ত শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা পদ্ধতি, প্রবীরকুমার চট্টোপাধ্যায় কাব্যতীর্থ, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা, পৃ. ১০০
  19. কালীবিলাস তন্ত্র, ১৮।৩০
  20. কালিকাপুরাণ, ৫৮।৬৫-৬৭
  21. শিবপুরাণ, বায়বীয় সংহিতা, ২১।১০
  22. পদ্মপুরাণ, সৃষ্টিখণ্ড, ৪৪।৭৮
  23. দেবীপুরাণ, ৭।৪৫।৫০
  24. দেবদেবী ও তাঁদের বাহন, স্বামী নির্মলানন্দ, প্রণব মঠ, কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৪
  25. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫
  26. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৫
  27. মহিষাসুর, সঞ্জয় ভুঁইয়া, বর্তমান পত্রিকা (বর্তমান রবিবার), ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দ্রঃ
  28. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৭
  29. সাধন-সমর, ব্রহ্মর্ষি শ্রীসত্যদেব, সাধন-সমর কার্যালয়, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১৭৫-৭৬
  30. দেবদেবী ও তাঁদের বাহন, স্বামী নির্মলানন্দ, প্রণব মঠ, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১৫৫
  31. মা দুর্গার কাঠামো, মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, মহাউদ্ধারণ মঠ, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৬
  32. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৬
  33. মা দুর্গার কাঠামো, মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, মহাউদ্ধারণ মঠ, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৭
  34. মা দুর্গার কাঠামো, মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, মহাউদ্ধারণ মঠ, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১১
  35. সাধন-সমর, ব্রহ্মর্ষি শ্রীসত্যদেব, সাধন-সমর কার্যালয়, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১৭৬
  36. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৯
  37. ৩৭.০ ৩৭.১ কালিকাপুরাণোক্ত শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা পদ্ধতি, প্রবীরকুমার চট্টোপাধ্যায় কাব্যতীর্থ, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৭২, ১০৮, ১২৭
  38. ৩৮.০ ৩৮.১ "দুর্গাপূজা কোন পদ্ধতিতে হয়", স্বামী ত্যাগিবরানন্দ, সাপ্তাহিক বর্তমান, ১২ অক্টোবর, ২০১৩ সংখ্যা, পৃ. ১৫
  39. কালিকাপুরাণোক্ত শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা পদ্ধতি, প্রবীরকুমার চট্টোপাধ্যায় কাব্যতীর্থ, পারুল প্রকাশনী, কলকাতা, পৃ. ২০২
  40. হিন্দুদের দেবদেবী, তৃতীয় খণ্ড, হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, ফার্মা কেএলএম প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, পৃ. ২৪১
  41. "Durga-puja.org"। Durga-puja.org। 2012-10-06। সংগৃহীত 2013-06-25 
  42. "Durga The Divine Mother"। সংগৃহীত 2 October 2011 
  43. "ঠাকুর দেখবেন কীভাবে?", সাপ্তাহিক বর্তমান, ৫ অক্টোবর, ২০১৩, পৃ. ৩০-৪৪
  44. "ঠাকুর দেখবেন কীভাবে?", সাপ্তাহিক বর্তমান, ১২ অক্টোবর, ২০১৩, পৃ. ২৭-৪২
  45. BDNews24.com: Durga Puja 13–17 Oct (2010)[অকার্যকর সংযোগ]
  46. দুর্গাপূজায় একটি নবপত্রিকা পূজার নিয়ম।
  47. কালীক্ষেত্র কালীঘাট, সুমন গুপ্ত, দীপ প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ৬২-৬৪
  48. বেলুড় মঠে স্বামীজীর দুর্গাপূজা, স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২০১০, পৃ. ৬-৭
  49. বেলুড় মঠে স্বামীজীর দুর্গাপূজা, স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২০১০, পৃ. ২৫
  50. ৫০.০ ৫০.১ বেলুড় মঠে স্বামীজীর দুর্গাপূজা, স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২০১০, পৃ. ১৫
  51. বেলুড় মঠে স্বামীজীর দুর্গাপূজা, স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২০১০, পৃ. ২৮-৩০
  52. মল্লভূম বিষ্ণুপুর, মনোরঞ্জন চন্দ্র, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৪, পৃ. ১০৪
  53. মল্লভূম বিষ্ণুপুর, মনোরঞ্জন চন্দ্র, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৪, পৃ. ১০৮-১১০
  54. "Kali Bari website to help old bond with the new"Hindustan Times। February 21, 2011। 
  55. "Delhi's old timers remember as another Durga Puja dawns"Monsters and Critics। Oct 16, 2007। 
  56. "Tradition fuses with modernity"The Times of India। Oct 3, 2011। 
  57. "Festive spirit pervades the Capital"The Hindu। Oct 15, 2007। 
  58. "How community pujas came about"India Today। September 25, 2009। 
  59. ৫৯.০ ৫৯.১ Chaliha, Jaya, and Gupta, Bunny, Durga Puja in Calcutta, p.336, Calcutta, the Living City, Vol II, edited by Sukanta Chaudhuri, 1990/2005, p.2, Oxford University Press, ISBN 0-19-563697-X.
  60. Home Chowdhury, Amlan। "Kumartuli, Potters Town"। littleindia.com। সংগৃহীত 2007-07-15 
  61. Sahoo, Srilat Saha। "Durga Puja – the festival of peace and harmony"Press Release। Press Information Bureau, Government of India। সংগৃহীত 2007-07-15 
  62. "The voice carries on"http://www.business-standard.com। সংগৃহীত 2012-09-21 
  63. "durga_puja : Mahalaya"। www.netglimse.com। সংগৃহীত 2009-06-13 
  64. "Mahalaya: Invoking the Mother Goddess"। hinduism.about.com। সংগৃহীত 2009-06-13 
  65. ৬৫.০ ৬৫.১ "Biography of Pankaj Kumar Mullick - the versatile musical genius"। www.pankajmullick.org। সংগৃহীত 2009-06-13 [অকার্যকর সংযোগ]
  66. Mahalaya ushers in the Puja spirit The Times of India, TNN 19 September 2009.
  67. Morning Raga Indian Express, PiyasreeDasgupta, Sep 18, 2009.
  68. "Mahisasura Mardini by Birendra Krishna Bhadra (AIR Recording) – Details of tracks and artists"। QuiQinQ। সংগৃহীত 2012-10-21 
  69. Timeless Tunes Indian Express, Sep 29, 2008.
  70. "Mahalaya : Durga Puja mahalaya : Durga Puja"। www.bangalinet.com। সংগৃহীত 2009-06-13 

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]