দেবীভাগবত পুরাণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মহিষাসুরমর্দিনী, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত
মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা, প্রাচীন মন্দিরগাত্রে উৎকীর্ণ

দেবীভাগবত পুরাণ (সংস্কৃত: देवी भागवतपुराण) হিন্দু শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এই গ্রন্থ শ্রীমদ দেবীভাগবতম্ বা দেবীভাগবতম্ নামেও পরিচিত। শাক্তধর্মে এই গ্রন্থের স্থান দেবীমাহাত্ম্যম্ গ্রন্থের পরেই।[১] দেবীভাগবত পুরাণ একটি উপপুরাণ হলেও অনেক পণ্ডিত এটিকে মহাপুরাণ বলে উল্লেখ করেছেন। মূল গ্রন্থেও একে মহাপুরাণ বলা হয়েছে।[২] "বঙ্গীয় শাক্তসম্প্রদায় দেবীভাগবত নামান্তরে শ্রীভাগবত মহাপুরাণকে প্রকৃত ভাগবত পুরাণ বলে দাবী করেন এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মূল ভাগবত পুরাণকে উপপুরাণের পর্যায়ে গণ্য করেন।"[৩] তবে এই মতের সপক্ষে বিশেষ যুক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায় না।[৪]

আনুমানিক খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে বঙ্গদেশের স্মার্ত শাক্ত সম্প্রদায় এই পুরাণ রচনা করেন।[৩] স্বামী বিজ্ঞানানন্দের মতে, খ্রিষ্টীয় নবম-একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই পুরাণ রচিত হয়।[৪] ১২টি স্কন্দ, ৩১৮টি পরিচ্ছেদ এবং প্রায় ১২,০০০ শ্লোকে বিন্যস্ত[৫] এই পুরাণের উদ্দেশ্য "তন্ত্রমতে আরাধ্যা মণিদ্বীপবাসিনী পাশাঙ্কুশধারিণী বরাভয়প্রদায়িনী পরব্রহ্মস্বরূপিণী কুমারী মহামায়া মহাশক্তির মাহাত্ম্যবর্ণনা"।[৩] ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, "আলোচ্য পুরাণে বর্ণিত শক্তিসাধনায় বেদবাহ্য তন্ত্রের প্রভাব স্পষ্ট নয়, পুরাণকার শ্রুতি, স্মৃতি ও তান্ত্রিক ধর্মের সমন্বয়সাধনের চেষ্টা করেছেন।"[৩]

অনেকে এই পুরাণকে বেদব্যাস কৃত মহাপুরাণ মনে করেন।[৫] গ্রন্থকারের উক্তি থেকে জানা যায়, ব্যাস অষ্টাদশ পুরাণ রচনার পর মহাভারত রচনা করেন এবং পুরাণের অনেক কাহিনি মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন।[৩]

ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, দেবীভাগবত পুরাণের সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু হল: "ব্রহ্মাবিষ্ণু অপেক্ষা দেবীর অধিক মাহাত্ম্য, ব্যাসপুত্র শুকের সংসারের প্রতি উদাসীনতা, শুককে ব্যাসলিখিত দেবীভাগবত পাঠের নির্দেশ, রাজা জনকের কাছে শুকের আগমন, জনক কর্তৃক চতুরাশ্রম পালনের প্রয়োজনীয়তার উপদেশ, মহালক্ষ্মী, সরস্বতীমহাকালীরূপে সাত্ত্বিক-রাজস-তামস গুণের আশ্রয়ে নির্গুণা নিত্যা, যোগমায়ার আবির্ভাব, শিব কর্তৃক দেবীর প্রশংসা, দেবীযজ্ঞ, বিষ্ণুর বামনাবতার, দেবীর আরাধনা, কুমারী-পূজা, রামায়ণসার, বাসুদেব-দেবকী ও পাণ্ডবদের কাহিনী, চ্যবন ও প্রহ্লাদের আখ্যান, বিষ্ণুর অবতার-কাহিনী (নরনারায়ণ, দত্তাত্রেয়, পরশুরাম, রাম, বামন, নৃসিংহ, কৃষ্ণ, অর্জুন প্রভৃতি), দেবী কর্তৃক মহিষাসুরশুম্ভনিশুম্ভ বধ, হরিশ্চন্দ্র কাহিনী, চ্যবন-সুকন্যা কাহিনী, বিষ্ণুর মুখে শিব ও সতী সম্পর্কে নানা উপাখ্যান, পরমা প্রকৃতি থেকে রাধা, লক্ষ্মী, দুর্গা, সরস্বতী, সাবিত্রী, কালী, গঙ্গা, ষষ্ঠী, মঙ্গলচণ্ডী, তুলসী, মনসা প্রভৃতির উদ্ভব, রাধাকৃষ্ণ-তত্ত্ব, কলিযুগের বৈশিষ্ট্য, সদাচার, নবরাত্রব্রত (দুর্গাপূজা), ১০৮ পীঠস্থান, মঙ্গলচণ্ডীর পূজা, রাম কর্তৃক দুর্গার অকালবোধন, পঞ্চযজ্ঞ, হোম, সমাজধর্ম, শিল্প প্রভৃতি।"[৩]

প্রথম স্কন্দে ২০টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম তিনটি অধ্যায়ে ঋষি শৌনক সূতকে ব্যাসকৃত অষ্টাদশ পুরাণ অধ্যয়নের জন্য অভিনন্দিত করেছেন এবং তাঁর অনুরোধে সূত দেবীভাগবত পুরাণ পাঠ শুরু করছেন। ৪র্থ থেকে ১৯শ অধ্যায়ে শুকদেবের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। শেষ অধ্যায়ে শান্তনুসত্যবতীর বিবাহ থেকে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডুবিদুরের জন্ম পর্যন্ত মহাভারতের কাহিনি বিবৃত হয়েছে।[৫] দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম স্কন্দ যথাক্রমে ১২, ৩০, ২৫, ৩৫, ৩১ ও ৪০টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। সপ্তম স্কন্দের শেষ নয়টি অধ্যায় (৩১-৪০) দেবীগীতা নামে পরিচিত। এটি পার্বতী ও তাঁর পিতা হিমবানের সংলাপ। এই অংশের আলোচ্য বিষয় দেবীর বিশ্বরূপ, উপনিষদের বিভিন্ন অংশ, অষ্টাঙ্গযোগ, জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ ও ভক্তিযোগের ব্যাখ্যা, দেবীর বিভিন্ন মন্দিরের অবস্থান এবং দেবীপূজার রীতিনীতি। অষ্টম, নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ স্কন্দ যথাক্রমে ২৪, ৫০, ১৩, ২৪ ও ১৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত।

পঞ্চম স্কন্দের ২য় থেকে ১৮শ অধ্যায়ে দেবী কর্তৃক মহিষাসুর বধের বর্ণনা রয়েছে। এই বর্ণনা দেবীমাহাত্ম্যম্ তথা মার্কণ্ডেয় পুরাণে বর্ণিত মহিষাসুর বধের বর্ণনারই বিস্তারিত রূপ। বাংলায় বাৎসরিক দুর্গাপূজার পৌরাণিক প্রেক্ষাপট এই উপাখ্যান।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. The Triumph of the Goddess - The Canonical Models and Theological Visions of the Devi-Bhagavata PuraNa, Brwon Mackenzie. ISBN 0-7914-0363-7
  2. "Thus ends the eighth chapter of the first Skandha in the Mahapurana Srimad Devi Bhagavatam of 18,000 verses by Maharsi Veda Vyasa" Srimad Devi Bhagavatam at Astrojyoti
  3. ৩.০ ৩.১ ৩.২ ৩.৩ ৩.৪ ৩.৫ "সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস", ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা, ২০০০ (২০০৯ মুদ্রণ), পৃ. ১২২-২৩
  4. ৪.০ ৪.১ "দেবীভাগবত", কল্যাণী দত্ত, ভারতকোষ চতুর্থ খণ্ড, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৯৭০, পৃ. ৮৯-৯০
  5. ৫.০ ৫.১ ৫.২ Shastri, P. (1995). Introduction to the Puranas, New Delhi: Rashtriya Sanskrit Sansthan, pp.132-38

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]