হিন্দুধর্মের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ভারতীয় উপমহাদেশের একাধিক স্থানীয় ধর্মমত একত্রে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত।[১] ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, লৌহযুগ থেকে ঘটতে থাকা ভারতের ধর্মবিশ্বাসের নানা বিবর্তন এই ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই মতের উৎস আবার ব্রোঞ্জযুগীয় সিন্ধু সভ্যতা ও তৎপরবর্তী লৌহযুগীয় বৈদিক ধর্ম

খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর পর ধীরে ধীরে ভারতে বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটলে বৈদিক ধর্মের নবজাগরণের রূপে ধ্রুপদি হিন্দুধর্মের উত্থান ঘটে। সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসাবেদান্তহিন্দু দর্শনের এই ছয়টি প্রধান শাখার উদ্ভব ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে। প্রায় একই সময়ে ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে উদ্ভব ঘটে শৈবধর্মবৈষ্ণবধর্মের মতো একেশ্বরবাদী মতবাদগুলির।

ধ্রুপদি পৌরাণিক হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠালাভ করে মধ্যযুগে। আদি শংকরের অদ্বৈত বেদান্ত মতবাদও এই সময় প্রচারিত হয়। উক্ত মতবাদ বৈষ্ণব ও শৈব মতবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এবং স্মার্তধর্মের উত্থান ঘটায়। এর ফলে দর্শনের অবৈদান্তিক শাখাগুলির অবলুপ্তি ঘটে।

ভারতে মুসলমান শাসনকালে হিন্দুধর্ম ভক্তি আন্দোলনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের ফলস্রুতি অদ্যাবধি বিদ্যমান। আবার ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনকালে পাশ্চাত্য ভাবধারার অনুপ্রেরণায় হিন্দুধর্মে একাধিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই সকল ভাবধারার মধ্যে একটি উল্লেখ্যযোগ্য ভাবধারা ছিল স্পিরিটিজম (থিওজফি)। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতীয় প্রজাতন্ত্র একটি হিন্দুপ্রধান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র রূপে আত্মপ্রকাশ করে।

বিংশ শতাব্দীতে অনাবাসী ভারতীয়দের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় সংগঠিত হয়। অনাবাসী হিন্দুদের বৃহত্তম আবাসস্থল হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রযুক্তরাজ্য। ১৯৮০-এর দশকে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সত্ত্বারূপে আত্মপ্রকাশ করে। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতাসীন থাকে এবং ২০০৬ সালে দক্ষিণ ভারতে (কর্ণাটক রাজ্যে) প্রথম রাজ্য সরকার গঠন করে।

প্রাগৈতিহাসিক ধর্ম[সম্পাদনা]

ব্রোঞ্জযুগীয় সিন্ধু সভ্যতায় ভারতের প্রাগৈতিহাসিক ধর্মের নানা নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। এই সভ্যতার ধর্মবিশ্বাসে হিন্দুধর্মের অনুরূপ কিছু ধর্মীয় প্রথার সন্ধান মেলে। যেমন ধর্মীয় স্নান, শিবলিঙ্গের ন্যায় প্রতীকোপাসনা।[২][৩] একটি স্বস্তিক চিহ্নের সন্ধানও এখানে পাওয়া গেছে।

সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলিতে একাধিক পুরুষ ও নারীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। নারীমূর্তিগুলিকে "মাতৃকা দেবী"-র মূর্তি বলে উল্লেখ করা হলেও, অনেকেই এই বিশ্বাসের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন।[৪]

মহেঞ্জোদাড়োয় খননকার্য চালানোর সময় একটি সিলমোহরে "যোগী" বা "আদি-শিব" মূর্তি পাওয়া যায়।[৫] এই "পশুপতি"[৬][৭] সিলমোহরে একটি উপবিষ্ট পশুপরিবৃত দেবতার মূর্তি লক্ষিত হয়।[৮][৯][১০] কোনো কোনো গবেষক এই মূর্তিতে হাঁটু মুড়ে কোলের উপর হাত রেখে বসার ভঙ্গিটির সঙ্গে যোগভঙ্গিমার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। সিলমোহরটির আবিষ্কর্তা স্যার জন মার্শালও এটিকে শিবের এক আদিরূপ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা এই মূর্তির বসার ভঙ্গিটিকে বলেছেন "যোগভঙ্গিমা"।

বৈদিক যুগ[সম্পাদনা]

দেবনাগরীতে লিখিত ঋগ্বেদ (পদপাঠ) পাণ্ডুলিপি; ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে লিখিত।

বৈদিক ধর্ম ছিল প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের একটি বলিকেন্দ্রিক ধর্ম। এরা ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ ইরানীয় মালভূমি থেকে হিন্দুকুশ হয়ে ভারতে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিশে যায়।[১১]

হিন্দুধর্মের আদিতম ধর্মগ্রন্থ চার বেদঋক্, সাম, যজুঃঅথর্ব। এগুলির মধ্যে ঋগ্বেদ প্রাচীনতম। ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই গ্রন্থগুলি রচিত হয়। পল্লবগুপ্তযুগ পর্যন্ত এগুলি গুরুশিষ্য পরম্পরায় মৌখিক প্রথার মাধ্যমে প্রচলিত ছিল। এর পর থেকে মৌখিক প্রথার সঙ্গে সঙ্গে লিপিবদ্ধ করার প্রথাও চালু হয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Brodd, Jefferey (2003), World Religions, Winona, MN: Saint Mary's Press, আইএসবিএন 978-0-88489-725-5 
  2. (Basham 1967)
  3. Hindu History 
  4. Clark, Sharri R. The social lives of figurines: recontextualizing the third millennium BC terracotta figurines from Harappa, Pakistan. Harvard PhD 2007
  5. Flood (1996), pp. 28–29.
  6. Marshall, Sir John, Mohenjo Daro and the Indus Civilization, London 1931
  7. For translation of paśupati as "Lord of Animals" see: Michaels, p. 312.
  8. For a drawing of the seal see Figure 1 in: Flood (1996), p. 29.
  9. Singh, S.P., Rgvedic Base of the Pasupati Seal of Mohenjo-Daro, Puratattva 19: 19–26. 1989
  10. Kenoyer, Jonathan Mark. Ancient Cities of the Indus Valley Civilization. Karachi: Oxford University Press, 1998.
  11. Encyclopedia Britannica online edition s.v. "Vedic religion".

অতিরিক্ত পাঠ[সম্পাদনা]

  1. Majumdar, R. C.; H. C. Raychauduri, Kaukinkar Datta (1960), An Advanced History of India, Great Britain: Macmillan and Company Limited, আইএসবিএন 0-333-90298-X  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  2. Benjamin Walker Hindu World: An Encyclopedic Survey of Hinduism, (Two Volumes), Allen & Unwin, London, 1968; Praeger, New York, 1968; Munshiram Manohar Lal, New Delhi, 1983; Harper Collins, New Delhi, 1985; Rupa, New Delhi, 2005, ISBN 81-291-0670-1.
  3. Basham, A. L. (1967), The Wonder That was India 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:History of religions