স্বামী বিবেকানন্দ
| স্বামী বিবেকানন্দ | |
|---|---|
| হিন্দু ধর্মগুরু | |
| শিকাগো শহরে স্বামী বিবেকানন্দ, ১৮৯৩ | |
| জন্ম | জানুয়ারি ১২, ১৮৬৩ |
| জন্মস্থান | কলকাতা, বাংলা প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) |
| পূর্বাশ্রমের নাম | নরেন্দ্রনাথ দত্ত |
| মৃত্যু | জুলাই ৪, ১৯০২ (৩৯ বছর) |
| মৃত্যুস্থান | বেলুড় মঠ, হাওড়া, বাংলা প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) |
| গুরু | রামকৃষ্ণ পরমহংস |
| দর্শন | অদ্বৈত বেদান্ত, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, রাজযোগ ও ভক্তিযোগ |
| সম্মান | স্বামীজি |
| উক্তি | বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেইজন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।[১] |
| পাদটীকা | |
স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি, ১৮৬৩ – ৪ জুলাই, ১৯০২) (পূর্বাশ্রমের নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত[২]) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ হিন্দু ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য এবং রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা।[৩] স্বামী বিবেকানন্দ ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেদান্ত ও যোগশাস্ত্রের প্রচার ও প্রসারে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।[৩] ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে হিন্দুধর্মকে বিশ্বজনীন ধর্মের স্তরে উন্নীত করা তথা সর্বধর্মসমন্বয় চেতনার বিস্তারে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।[৪] আধুনিক ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন বিবেকানন্দ।[৫] তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি ১৮৯৩ সালে বিশ্বধর্ম মহাসভায়[২] "আমেরিকান ভ্রাতা ও ভগিনী"দের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত[৬][৭] তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতাটির মাধ্যমে পাশ্চাত্য সমাজে হিন্দুধর্মের পরিচিতি প্রদানে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
১৮৬৩ সালে কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম। তাঁর চিন্তা-চেতনার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর যুক্তিবাদী পিতা ও ধর্মপ্রাণা জননী। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মপিপাসা ও গভীর ঈশ্বরানুরাগ লক্ষিত হত। ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করেছেন এমন এক ব্যক্তির সন্ধানে বেরিয়ে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের সান্নিধ্যে আসেন এবং পরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে অদ্বৈত বেদান্তের শিক্ষা দেন। তাঁর কাছ থেকেই বিবেকানন্দ শেখেন যে সব ধর্মই সত্য এবং মানুষের সেবাই সর্বোৎকৃষ্ট ঈশ্বরোপাসনা। গুরুর মৃত্যুর পর সন্ন্যাস অবলম্বন করে তিনি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ পদব্রজে পর্যটন করেন। পরবর্তীকালে শিকাগো যাত্রা করে ১৮৯৩ সালের বিশ্বধর্ম মহাসভায় হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফোরাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংঘ তাঁর বাগ্মীতায় মুগ্ধ হয়ে বক্তৃতাদানের আমন্ত্রণ জানান। একাধিক সাধারণ ও ব্যক্তিগত সভায় ভাষণ দিয়ে তিনি আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও আরও কয়েকটি দেশে বেদান্ত, যোগশাস্ত্র ও হিন্দুধর্মকে সুপরিচিত করে তোলেন। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে তিনি স্থাপন করেন বেদান্ত সোসাইটি। ভারতে প্রত্যাবর্তন করে ১৮৯৩ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন নামে একটি মানবকল্যাণমূলক আধ্যাত্মিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামী বিবেকানন্দ ভারতে অন্যতম জাতি-স্রষ্টারূপে পরিগণিত হন। তাঁর শিক্ষা মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন প্রমুখ একাধিক জাতীয় নেতা ও দার্শনিককে প্রভাবিত করেছিল।[২][৫][৮]
পরিচ্ছেদসমূহ
|
জীবনী [সম্পাদনা]
বংশ-পরিচয় [সম্পাদনা]
বিবেকানন্দ বলেছিলেন, "আমার জ্ঞানের বিকাশের জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।"[৯]
স্বামী বিবেকানন্দ এক কায়স্থ দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই দত্ত-পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত দত্ত-ডেরিয়াটোনা বা দত্ত-ডেরেটোনা গ্রামে। দত্ত-পরিবার মুঘল আমল থেকে ওই গ্রামে বাস করছিলেন। তাঁরাই ওই গ্রামের জমিদার ছিলেন বলে অনুমিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দত্ত-পরিবারের রামনিধি দত্ত তাঁর ছেলে রামজীবন দত্ত ও নাতি রামসুন্দর দত্তকে নিয়ে গড়-গোবিন্দপুর (অধুনা কলকাতা ময়দান-ফোর্ট উইলিয়াম অঞ্চল) গ্রামে চলে আসেন। এখানে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু হলে এলাকার অন্যান্য বাসিন্দাদের সঙ্গে দত্তরাও চলে আসেন সুতানুটিতে (অধুনা উত্তর কলকাতা)। সেখানে তাঁরা প্রথমে মধু রায়ের গলিতে একটি বাড়ি তৈরি করেন। রামসুন্দরের বড়ো ছেলে রামমোহন দত্ত ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িটি নির্মাণ করেন। এই বাড়িতেই পরে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হয়। রামসুন্দরের বড়ো ছেলে দুর্গাপ্রসাদ ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ঠাকুরদা। তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে বিশ্বনাথ দত্তের জন্মের পরই সন্ন্যাস অবলম্বন করে গৃহত্যাগ করেছিলেন। বিশ্বনাথ দত্ত দুর্গাপ্রসাদের ছোট ভাই কালীপ্রসাদ কর্তৃক প্রতিপালিত হন। কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি হিসেবে তিনি সারা ভারতে সুনাম অর্জন করেছিলেন। বিশ্বনাথ দত্ত ইংরেজি, বাংলা, ফারসি, আরবি, উর্দু, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন। ইতিহাস পাঠে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি সুলোচনা (১৮৮০) ও শিষ্ঠাচার-পদ্ধতি (বাংলা ও হিন্দি ভাষায়, ১৮৮২) নামে দুটি বইও রচনা করেছিলেন। ধর্মবিষয়ে বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন উদার। বাইবেল ও দেওয়ান-ই-হাফিজ তাঁর প্রিয় বই ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবাবিবাহ আন্দোলনকেও তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন। দুর্গাপ্রসাদের সংসারত্যাগের পর কালীপ্রসাদের অমিতব্যয়িতায় দত্ত-পরিবারের আর্থিক সাচ্ছল্য নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু অ্যাটর্নিরূপে বিশ্বনাথ দত্তের সুদূর-প্রসারিত খ্যাতি সেই সাচ্ছল্য কিয়দংশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।[১০] তাঁর স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন সিমলার নন্দলাল বসু মেয়ে। তিনি বিশেষ ভক্তিমতী নারী ছিলেন। তাঁর প্রথম কয়েকটি সন্তানের মৃত্যু ও কন্যাসন্তানের জন্মের পর পুত্রসন্তান কামনায় তিনি তাঁর এক কাশীবাসিনী আত্মীয়াকে দিয়ে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরে নিত্য পূজা দেওয়ার ব্যবস্থা করান। এরপরই স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হওয়ায় তাঁর বিশ্বাস হয় যে, তিনি শিবের কৃপায় পুত্রলাভ করেছেন।[১১]
জন্ম ও বাল্যজীবন [সম্পাদনা]
১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি (বাংলা ১২৬৯ সালের ২৯ পৌষ), সোমবার, মকর সংক্রান্তির দিন সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে[১২] কলকাতার সিমলা অঞ্চলের ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে[১৩] স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম।[১১] তাঁর নামকরণ করা হয় নরেন্দ্রনাথ দত্ত।[১৪]
পিতার যুক্তিবাদী মন ও জননীর ধর্মীয় চেতনা স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তা ও ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।[৮] প্রথম জীবনেই পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের সহিত তাঁর পরিচিতি ঘটেছিল। এই কারণে অকাট্য প্রমাণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়া কোনো বক্তব্যই তিনি গ্রহণ করতেন না। অন্যদিকে অতি অল্পবয়সেই ধ্যান ও বৈরাগ্যের আধ্যাত্মিক আদর্শের প্রতি তাঁর মন আকৃষ্ট হয়।[৮]
নরেন্দ্রনাথের বাল্যশিক্ষার সূচনা ঘটে স্বগৃহেই। ১৮৭১ সালে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন এবং ১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা (এন্ট্রান্স) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।[১৫] দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ ও পাণ্ডিত্য।[১৬] বেদ, উপনিষদ, ভাগবত গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের প্রতিও তাঁর আগ্রহের কথা সুবিদিত। কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীত - শাস্ত্রীয় সংগীতের উভয় শাখাতেই তাঁর বিশেষ পারদর্শীতা ছিল। বাল্যকাল থেকেই খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম ও অন্যান্য সংগঠনমূলক কাজকর্মেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।[১৬] অতি অল্পবয়সেই বিভিন্ন কুসংস্কার এবং ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য বিচারের যুক্তিগ্রাহ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।[১৭]
নরেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক বিকাশে তাঁর মায়ের ভূমিকাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী জীবনে তিনি তাঁর মায়ের একটি কথা বারংবার উদ্ধৃত করতেন, সারা জীবন পবিত্র থাকো, নিজের সম্মান রক্ষা কোরো, অন্যের সম্মানে আঘাত কোরো না। কোমল হও, কিন্তু প্রয়োজনবোধে নিজের হৃদয়কে শক্ত রেখো[১৪] কথিত আছে, নরেন্দ্রনাথ ছিলেন ধ্যানসিদ্ধ; ঘুমের মধ্যে তিনি এক জ্যোতি দর্শন করতেন এবং ছোটবেলায় একবার ধ্যানের সময় বুদ্ধের দর্শন পেয়েছিলেন।[১৮]
কলেজে ও ব্রাহ্মসমাজে [সম্পাদনা]
১৮৮০ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম বর্ষের কলা বিভাগে ভর্তি হন নরেন্দ্রনাথ। পরের বছর তিনি চলে যান স্কটিশ চার্চ কলেজে। এই সময়েই তিনি অধ্যয়ন করেন পাশ্চাত্য যুক্তিবিজ্ঞান, পাশ্চাত্য দর্শন ও ইউরোপীয় জাতিসমূহের ইতিহাস।[১৭] ১৮৮১ সালে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৮৮৪ সালে ব্যাচেলর অফ আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন।[১৯][২০]
তাঁর অধ্যাপকদের মতে, নরেন্দ্রনাথ ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভাসম্পন্ন ছাত্র। স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টি তাঁর সম্পর্কে লেখেন, "নরেন্দ্র ছিল সত্যকারের প্রতিভাবান। আমি বহু দেশ ভ্রমণ করেছি; এই ছেলেটির মধ্যে মেধা ও সম্ভাবনার যে সাক্ষর দেখি তা আমি কারোর মধ্যে পাইনি, এমনকি জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দর্শন বিভাগীয় ছাত্রদের মধ্যেও না।" ("Narendra is really a genius. I have travelled far and wide but I have never come across a lad of his talents and possibilities, even in German universities, among philosophical students.")[২১] তিনি ছিলেন একজন শ্রুতিধর, অর্থাৎ অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী ব্যক্তি।[২২][২৩] কথিত আছে, তাঁর সঙ্গে এক আলোচনার পর ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার বলেছিলেন, "আমি ভাবতেও পারিনি, এই রকম একটি বাচ্চা ছেলে এত কিছু পড়েছে।"[২৪]
ছেলেবেলা থেকে আধ্যাত্মিকতা, ঈশ্বরোপলব্ধি ও সর্বোচ্চ অধ্যাত্ম সত্যের উপলব্ধির জন্য তাঁর ব্যাকুলতা দৃষ্ট হয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক ধ্যান-ধারণা নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সেযুগের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন ব্রাহ্মসমাজের সংস্পর্শে আসেন এবং ব্রাহ্মসমাজের একেশ্বরবাদ, অপৌত্তলিকতা ও সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার চেতনার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।[২৫] এই সময়ে ব্রাহ্মসমাজের দুই সর্বোচ্চ নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাঁদের কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন রাখেন। কিন্তু কোনো সদুত্তর পান না।[২৬][২৭]
কথিত আছে, নরেন্দ্রনাথ ডেভিড হিউম, ইমানুয়েল কান্ট, জোহান গটলিব ফিচ, বারুখ স্পিনোজা, গেয়র্গ ভিলহেল্ম হেগল, আর্থার সোফেনহয়্যার, ওগুস্ত কোঁত, হারবার্ট স্পেনসার, জন স্টুয়ার্ট মিল ও চার্লস ডারউইন প্রমুখের রচনাবলি অধ্যয়ন করেছিলেন।[২১][২৮] হারবার্ট স্পেনসারের বিবর্তনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি নিজের প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের জন্য স্পেনসারের এডুকেশন (Education) নামক গ্রন্থখানি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। কিছুকাল তাঁর সঙ্গে হারবার্ট স্পেনসারের পত্রালাপও হয়।[২৯][৩০] পাশ্চাত্য দার্শনিকদের রচনা অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতীয় সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ তথা বহু বাংলা গ্রন্থও অধ্যয়ন করেছিলেন।[২৮]
অধ্যক্ষ হেস্টি সাহিত্যের এক ক্লাসে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের দি এক্সকার্সন (The Excursion) কবিতাটির আলোচনাকালে কবির প্রাকৃতিক-ভাবতন্ময়তার (nature-mysticism) বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসের উল্লেখ করলে নরেন্দ্রনাথ প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের কথা জানতে পারেন।[৩১] কবিতায় ব্যবহৃত trance শব্দটির অর্থ বোঝাতে গিয়ে হেস্টি তাঁর ছাত্রদের বলেন যে এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ জানতে হলে তাদের দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যেতে হবে। এতে তাঁর কয়েকজন ছাত্র উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনে যান। তাঁদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম।[৩২][৩৩]
শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে [সম্পাদনা]
"ঠাকুরের ঐদিনকার অদ্ভুত স্পর্শে মুহূর্তমধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। স্তম্ভিত হইয়া সত্য সত্যই দেখিতে লাগিলাম, ঈশ্বর ভিন্ন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কিছুই আর নাই!... যখন প্রকৃতিস্থ হইলাম, তখন ভাবিলাম উহাই অদ্বৈতবিজ্ঞানের আভাস! তবে তো শাস্ত্রে ঐ বিষয়ে যাহা লেখা আছে, তাহা মিথ্যা নহে! তদবধি অদ্বৈততত্ত্বের উপরে আর কখনও সন্দিহান হইতে পারি নাই।"[৩৪][৩৫]
১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত নরেন্দ্রনাথের জীবনের ধারাটিকে পরিবর্তিত করে দেয়।[৩৬] এই সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "তাঁহাকে [রামকৃষ্ণ] একজন সাধারণ লোকের মতো বোধ হইল, কিছু অসাধারণত্ব দেখিলাম না। অতি সরল ভাষায় তিনি কথা কহিতেছিলেন, আমি ভাবিলাম, এ ব্যক্তি কি একজন বড় ধর্মাচার্য হইতে পারেন? আমি সারা জীবন অপরকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছি, তাঁহার নিকটে গিয়া তাঁহাকেও সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলাম, 'মহাশয়, আপনি কি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন?' তিনি উত্তর দিলেন- 'হাঁ।' 'মহাশয়, আপনি কি তাঁহার অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারেন?' 'হাঁ'। 'কি প্রমাণ? ' 'আমি তোমাকে যেমন আমার সম্মুখে দেখিতেছি, তাঁহাকেও ঠিক সেইরূপ দেখি, বরং আরও স্পষ্টতর, আরও উজ্জ্বলতররূপে দেখি।' আমি একেবারে মুগ্ধ হইলাম। [...] আমি দিনের পর দিন এই ব্যক্তির নিকট যাইতে লাগিলাম। [...] ধর্ম যে দেওয়া যাইতে পারে, তাহা আমি বাস্তবিক প্রত্যক্ষ করিলাম। একবার স্পর্শে, একবার দৃষ্টিতে একটা সমগ্র জীবন পরিবর্তিত হইতে পারে। আমি এইরূপ ব্যাপার বারবার হইতে দেখিয়াছি।"[৩৬][৩৭]
যদিও প্রথমে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে নিজের গুরু রূপে স্বীকার করতে সম্মত ছিলেন না। তিনি তাঁর ধ্যানধারণার বিরুদ্ধের প্রায়শই বিদ্রোহ প্রকাশ করতেন। তবু শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে বার বার তাঁর দর্শনে ছুটে যেতেন।[৩৮] প্রথম দিকে শ্রীরামকৃষ্ণের তুরীয় আনন্দের ভাব ও দর্শনকে কেবলমাত্র মনগড়া কল্পনা বলে মনে করতেন।[৮] [৩৯] ব্রাহ্মসমাজের সদস্য হিসেবে তিনি মূর্তিপূজা ও বহুদেববাদের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন কালীর উপাসক।[৪০] অদ্বৈত বেদান্ততত্ত্বকেও নরেন্দ্রনাথ নাস্তিকতা ও পাগলামি বলে উড়িয়ে দিতেন; এবং মাঝে মাঝেই তা নিয়ে উপহাস করতেন।[৩৯]
প্রথমদিকে শ্রীরামকৃষ্ণের ধ্যানধারণা গ্রহণ করতে না পারলেও নরেন্দ্রনাথ তা উড়িয়ে দিতে পারতেন না। কোনো মত গ্রহণ করার আগে তা যাচাই করে নেওয়াই ছিল নরেন্দ্রনাথের স্বভাব। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে পরীক্ষা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণও কোনোদিন তাঁকে যুক্তিবর্জনের পরামর্শ দেননি। তিনি ধৈর্য সহকারে নরেন্দ্রনাথের তর্ক ও পরীক্ষার সম্মুখীন হন এবং তাঁকে সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই সত্য পরীক্ষা করতে বলেন।[৩৮] পাঁচ বছর শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে থেকে নরেন্দ্রনাথ এক অশান্ত, বিভ্রান্ত, অধৈর্য যুবক থেকে এক পরিণত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন। ঈশ্বরোপলব্ধির জন্য তিনি সর্বস্ব ত্যাগে স্বীকৃত হন এবং শ্রীরামকৃষ্ণকে নিজের গুরু রূপে স্বীকার করে নিয়ে গুরুর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন।[৩৮]
১৮৮৫ সালে শ্রীরামকৃষ্ণ গলার ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এই সময় তাঁকে কলকাতার কাশীপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। জীবনের অন্তিম পর্বে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর গুরুভ্রাতাগণ তাঁর সেবাসুশ্রুষা করেছিলেন। এখানেই শ্রীরামকৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে তাঁদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা চলে। কথিত আছে, কাশীপুরেই বিবেকানন্দ নির্বিকল্প সমাধির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।[৪১] শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের শেষ পর্বে বিবেকানন্দ ও তাঁর কয়েকজন গুরুভ্রাতা গুরুর নিকট থেকে সন্ন্যাসীর গৈরিক বস্ত্র লাভ করেছিলেন। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম রামকৃষ্ণ সংঘ।[৪২] গুরুর নিকট থেকে বিবেকানন্দ এই শিক্ষাই পান যে মানবসেবাই সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ঈশ্বরোপাসনা।[৮][৪৩] কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব নিয়ে বিবেকানন্দের মনে সন্দেহের উদ্রেক হলে শ্রীরামকৃষ্ণ ঘোষণা করেছিলেন, "যে রাম, যে কৃষ্ণ, সে-ই ইদানীং এ শরীরে রামকৃষ্ণ... "[৪৪] শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর অবর্তমানে নিজের শিষ্যদের দেখাশোনার দায়িত্ব দেন বিবেকানন্দের উপর, এবং শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যরাও সবসময়ই বিবেকানন্দকে তাদের নেতা বলে স্বীকার করত।[৪৫] দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৮৮৬ সালের ১৬ অগস্ট অতিপ্রত্যুষে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে রামকৃষ্ণ পরমহংসের মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর শিষ্যদের মতে, এ ছিল তাঁর মহাসমাধি।[৪৫]
বরানগর মঠ [সম্পাদনা]
শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর তাঁর গৃহী শিষ্যদের আর্থিক সহায়তায় বিবেকানন্দের নেতৃত্বে তাঁর তরুণ সন্ন্যাসী শিষ্যরা বরানগরে এক পোড়ো বাড়িতে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ছিল রামকৃষ্ণ সংঘের সদস্যদের দ্বারা স্থাপিত প্রথম মঠ।[৩৬]
বরানগরের এই পোড়ো বাড়িটি মঠ স্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয় মূলত দুটি কারণে। প্রথমত বাড়িটির ভাড়া ছিল কম। দ্বিতীয়ত বাড়িটি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যেষ্টিস্থল কাশীপুর মহাশ্মশানের অত্যন্ত নিকটবর্তী ছিল। নরেন্দ্রনাথ ও মঠের অন্যান্য সদস্যরা এখানে জপধ্যান ও সাধন-ভজনে নিমগ্ন থাকতেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণ, শঙ্করাচার্য, রামানুজ ও যিশু খ্রিষ্ট প্রমুখ ধর্মগুরুদের দর্শন ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতেন।[৪৬] এই মঠের প্রথম দিনগুলির কথা বলতে গিয়ে নরেন্দ্রনাথ পরে বলেছিলেন, "বরাহনগর মঠে আমরা অনেক ধর্মাচরণ করেছি। রাত তিনটে নাগাদ ঘুম থেকে উঠে জপধ্যানে মগ্ন হতাম। সেই দিনগুলিতে বৈরাগ্য কি প্রবল ছিল! বাইরের জগৎ আছে কি নেই, সেকথা একবার মনেও হত না।"[৪৬] ১৮৮৭ সালের প্রথম দিকে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর আটজন গুরুভ্রাতা আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর নরেন্দ্রনাথ স্বামী বিবেকানন্দ নাম ধারণ করেছিলেন।[৪৭]
পরিব্রাজক বিবেকানন্দ [সম্পাদনা]
১৮৮৮ সালে পরিব্রাজক রূপে মঠ ত্যাগ করেন বিবেকানন্দ। পরিব্রাজক হিন্দু সন্ন্যাসীর এক ধর্মীয় জীবন – এই জীবনে তিনি স্বাধীনভাবে পর্যটন করে বেড়ান কোনো স্থায়ী বাসস্থান বা বন্ধন ছাড়াই।[৪৯] পরিব্রাজক জীবনে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গী ছিল একটি কমণ্ডলু, লাঠি, এবং তাঁর প্রিয় দুটি গ্রন্থ - ভগবদ্গীতা ও ইশানুসরণ।[৫০] পাঁচ বছর ধরে ভারতের সর্বত্র ভ্রমণ করেন বিবেকানন্দ – প্রত্যেক শিক্ষাকেন্দ্র দর্শন করেন এবং বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় ও সমাজব্যবস্থার সহিত সুপরিচিত হন।[৫১][৫২] সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্টের প্রতি তাঁর সহানুভূতি জন্মায় এবং তিনি জাতির উন্নতিকল্পে আত্মনিয়োগ করেন।[৫১][৫৩] এই সময় ভিক্ষোপজীবি হয়ে সারা ভারত পদব্রজেই পর্যটন করেন বিবেকানন্দ। কখনও সখনও তাঁর গুণমুগ্ধেরা তাঁকে ট্রেনের টিকিট কিনে দিতেন। ভারত পর্যটনের সময় তিনি বিভিন্ন পণ্ডিত, দেওয়ান, রাজা, এবং হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান এমনকি নিম্নবর্ণীয় পারিয়া ও সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গেও মেলামেশা ও একত্রবাস করেছিলেন।[৫৩]
উত্তর ভারত [সম্পাদনা]
১৮৮৮ সালে তিনি বারাণসী থেকে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। বারাণসীতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত হয় বিশিষ্ট বাঙালি লেখক ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিশিষ্ট সন্ত ত্রৈলঙ্গস্বামীর। এইখানেই বিশিষ্ট সংস্কৃত পণ্ডিত বাবু প্রেমদাস মিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে, যাঁর সঙ্গে পরবর্তীকালে একাধিক পত্রালাপে তিনি হিন্দু ধর্মশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।[৫৪] বারাণসীর পর তিনি একে একে যান অযোধ্যা, লখনউ, আগ্রা, বৃন্দাবন, হথরাস ও হৃষীকেশে। হথরাসে তাঁর সঙ্গে স্টেশন মাস্টার শরৎচন্দ্র গুপ্তের সাক্ষাত হয়, যিনি পরে বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সদানন্দ নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন বিবেকানন্দের প্রথম যুগের শিষ্য।[৫৫][৫৬] ১৮৮৮-৯০ মধ্যবর্তী সময়ে তিনি বৈদ্যনাথ ও এলাহাবাদ ভ্রমণ করেন। এলাহাবাদ থেকে গাজিপুরে গিয়ে তিনি পওহারি বাবার দর্শন করেন। পওহারি বাবা ছিলেন এক অদ্বৈতবাদী সন্ত, যিনি অধিকাংশ সময়েই ধ্যানমগ্ন থাকতেন।[৫৭] ১৮৮৮-৯০ সময়কালে ভগ্নস্বাস্থ্য এবং মঠের দুই আর্থিক সাহায্যদাতা বলরাম বসু ও সুরেশচন্দ্র মিত্রের মৃত্যুর পর মঠের আর্থিক ব্যবস্থার সুরাহাকল্পে তিনি কয়েকবার বরানগর মঠে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।[৫৬]
হিমালয় ভ্রমণ [সম্পাদনা]
১৮৯০ সালের জুলাই মাসে গুরুভ্রাতা স্বামী অখণ্ডানন্দের সঙ্গে তিনি পুনরায় পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর রূপে দেশভ্রমণে বের হন। মঠে ফেরেন একেবারে পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে।[৫৬][৫৮] প্রথমে তিনি যান নৈনিতাল, আলমোড়া, শ্রীনগর, দেরাদুন, ঋষিকেশ, হরিদ্বার এবং হিমালয়ে। কথিত আছে, এই সময় এক দিব্যদর্শনে তিনি বহির্জগৎ ও ক্ষুদ্রব্রহ্মাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্যে প্রদত্ত তাঁর জ্ঞানযোগ বক্তৃতামালায় এই বহির্জগৎ ও ক্ষুদ্রব্রহ্মাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। এই ভ্রমণের সময় তাঁর অন্যান্য গুরুভ্রাতা স্বামী ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দ, তুরীয়ানন্দ, অখণ্ডানন্দ ও অদ্বৈতানন্দের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। মীরাটে কিছুদিন একসঙ্গে তাঁরা জপধ্যান, প্রার্থনা ও শাস্ত্রপাঠে অতিবাহিত করেন। ১৮৯১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষদিকে অন্যান্য গুরুভ্রাতাদের ছেড়ে তিনি একাকী দিল্লির পথে অগ্রসর হন।[৫৮][৫৯]
রাজপুতানা [সম্পাদনা]
দিল্লির ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখার পর তিনি চলে যান রাজপুতানার ঐতিহাসিক রাজ্য আলোয়ারে। পরে তিনি যান জয়পুরে। সেখানে এক সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে অধ্যয়ন করেন পাণিনির অষ্টাধ্যয়ী। তাঁর পরের গন্তব্য ছিল আজমেঢ়। সেখানকার বিখ্যাত দরগা ও আকবরের প্রাসাদ দেখে তিনি চলে যান মাউন্ট আবুতে। মাউন্ট আবুতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় খেতরির মহারাজা অজিত সিংহের। পরে তিনি বিবেকানন্দের একনিষ্ঠ ভক্ত ও পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। তাঁর আমন্ত্রণে বিবেকানন্দ খেতরিতে আসেন। সেখানে রাজার সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। খেতরিতেই পণ্ডিত নারায়ণদাসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয় এবং তিনি পাণিনির সূত্রের মহাভাষ্য অধ্যয়ন করেন। খেতরিতে আড়াই মাস কাটানোর পর ১৮৯১ সালের অক্টোবরে তিনি রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হন।[৫৩][৬০]
পশ্চিম ভারত [সম্পাদনা]
পশ্চিমে যাত্রাপথে তিনি ভ্রমণ করেন আমেদাবাদ, ওয়াধওন ও লিম্বদি। আমেদাবাদে তিনি ইসলামি ও জৈন সংস্কৃতির পাঠ সমাপ্ত করেন।[৫৩] লিম্বদিতে ঠাকোর সাহেব জসওয়ান্ত সিংহের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, যিনি নিজে আমেরিকা ও ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেছিলেন। ঠাকোর সাহেবের থেকেই বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যে বেদান্ত প্রচারে যাওয়ার ধারণাটি প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি যান জুনাগড়, গিরনার, কচ্ছ, পোরবন্দর, দ্বারকা, পালিতানা ও বরোদা। পোরবন্দরে সন্ন্যাসজীবনের নিয়ম ভেঙে তিনি নয় মাস অবস্থান করেন পণ্ডিতদের থেকে দর্শন ও সংস্কৃত গ্রন্থাবলি অধ্যয়নের জন্য। এই সময় সভাপণ্ডিতের সঙ্গে একযোগে বেদ অনুবাদের কাজও করেন।[৫৩]
এরপর তিনি যান মহাবালেশ্বর এবং তারপর যান পুণায়। পুণা থেকে ১৮৯২ সালের জুন মাস নাগাদ তিনি খান্ডোয়া ও ইন্দোর ভ্রমণ করেন। কাথিয়াওয়াড়ে তিনি বিশ্বধর্ম মহাসভার কথা শোনেন। তাঁর অনুগামীরা তাঁকে সেই সভায় যোগদানের অনুরোধ করতে থাকেন। খান্ডোয়া থেকে তিনি বোম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ১৮৯২ সালের জুলাই মাসে তিনি বোম্বাই পৌঁছান। পুণার পথে ট্রেনে বাল গঙ্গাধর তিলকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।[৬১] পুণায় কিছুদিন তিলকের সঙ্গে অবস্থান করার পর[৬২] ১৮৯২ সালের অক্টোবরে স্বামী বিবেকানন্দ বেলগাঁও যাত্রা করেন। বেলগাঁওতে তিনি অধ্যাপক জি এস ভাটি ও সাব-ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার হরিপদ মিত্রের আতিথ্য গ্রহণ করেন। বেলগাঁও থেকে তিনি যান গোয়ার পাঞ্জিম ও মারগাঁওয়ে। গোয়ার প্রাচীনতম ধর্মতত্ত্ব কনভেন্ট-কলেজ রাচোল সেমিনারিতে তিন দিন অবস্থান করেন। এই কনভেন্ট-কলেজে সংরক্ষিত ছিল লাতিনে রচিত দুষ্প্রাপ্য ধর্মীয় সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত রচনাবলি। মনে করা হয়, এখানে তিনি খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে মূল্যবান জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।[৬৩] মারগাঁও থেকে বিবেকানন্দ রেলপথে যাত্রা করেন ধারওয়াড়ের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে আসেন মহীশূর রাজ্যের ব্যাঙ্গালোরে।[৬৪]
দক্ষিণ ভারত [সম্পাদনা]
বেঙ্গালুরুতে স্বামীজি মহীশূর রাজ্যের দেওয়ান স্যার কে. শেষাদ্রী আইয়ারের সাথে পরিচিত হন, এবং পরে তিনি মহীশূরের মহারাজা শ্রী চামারাজেন্দ্র ওয়াদিয়ারের অতিথি হিসেবে রাজপ্রাসাদে অবস্থান করেন। বিবরণ অনুসারে স্যার শেষাদ্রী স্বামীজির পান্ডিত্য বিষয়ে মন্তব্য করেন, "এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঐশ্বরিক শক্তি যা তার দেশের ইতিহাসে তাদের চিহ্ন রেখে যেতে নিয়তিনির্ধারিত ছিল।" মহারাজা স্বামীজিকে কোচিনের দেওয়ানের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে একটি পত্র এবং একটি রেলওয়ে টিকিট দেন।[৬৫]
বেঙ্গালুরু থেকে তিনি ভ্রমণ করেন ত্রিচুড়, কোদুনগ্যালোর, এরনাকুলাম। এরনাকুলামে ১৮৯২ সালের ডিসেম্বরের প্রথমভাগে তিনি নারায়ণ গুরুর সমসাময়িক ছত্তাম্পি স্বামীকালের দেখা পান।[৬৬] এরনাকুলাম থেকে তিনি ভ্রমণ করেন ত্রিভানদ্রাম, নাগেরকৈল এবং ১৮৯২ সালের বড়দিনের প্রাক্কালে পায়ে হেঁটে কন্যাকুমারী পৌঁছেন।[৬৭] বিবরণ অনুসারে স্বামীজি "ভারতীয় পাহাড়ের শেষ প্রান্তে" তিন দিন ধরে ধ্যান করেন যা পরে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।[৬৮] কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ "এক ভারতের স্বপ্ন" দেখেন, যাকে সচরাচর বলা হয়ে থাকে "১৮৯২ এর কন্যাকুমারী সঙ্কল্প"।[৬৯] তিনি লিখেছিলেন,
"ক্যামোরিন অন্তরীপে মা কুমারীর মন্দিরে বসে ভারতীয় পাহাড়ের শেষ প্রান্তে বসে - আমি এক পরিকল্পনা করি: আমরা এতগুলো সন্ন্যাসী ঘুরে বেড়াচ্ছি এবং মানুষকে অধিবিদ্যা/দর্শনশাস্ত্র শিখাচ্ছি - এ সব কিছুই পাগলামি। আমাদের গুরুদেব কি বলতেন না, 'খালি পেট ধর্মের জন্য ভাল নয়?' জাতি হিসেবে আমরা আমাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারিয়েছি এবং এটাই ভারতের সকল অনিষ্টের কারণ। আমাদের জনসাধারণকে জাগাতে হবে।"[৬৯][৭০]
কন্যাকুমারী থেকে তিনি যান মদূরাই যেখানে রামনাদের রাজা ভাস্কর সেতুপতির সাথে দেখা করে তিনি পরিচয়পত্র দেখান। রাজা স্বামীজির শিষ্য হন এবং তাকে শিকাগোতে ধর্ম সম্মেলনে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। মাধুরাই থেকে তিনি যান পন্ডিচেরীর রামেশ্বরম। সেখান থেকে যান মাদ্রাজ এবং এখানে তিনি তার সবচেয়ে অনুগত শিষ্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন যারা স্বামীজির আমেরিকা ভ্রমণের এবং পরে মাদ্রাজে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার তহবিল সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মাদ্রাজের শিষ্যদের এবং মহীশূর, রামনাদ, খেতরির রাজাদের, দেওয়ান এবং অন্যান্য অনুসারীদের সংগৃহীত অর্থের সাহায্য নিয়ে এবং খেতরির মহারাজার পরামর্শকৃত নাম বিবেকানন্দ ধারণ করে বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালের ৩১শে মে শিকাগোর উদ্দেশ্যে বোম্বে ত্যাগ করেন।
জাপান ভ্রমণ [সম্পাদনা]
তাঁর শিকাগো যাবার পথে বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালে জাপান ভ্রমণ করেন। প্রথমে তিনি বন্দর নগরী নাগাসাকি পৌঁছেন এবং তারপর কোবে যাবার জন্য একটি স্টীমারে চড়েন। এখান থেকে তিনি স্থল পথে তিন বড় শহর ওসাকা, কিয়োটো এবং টোকিও ভ্রমণ করে ইয়োকোহামা যান। তিনি জাপানীদের "পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জনগনের অন্যতম" বলে অভিহিত করেন এবং শুধুমাত্র তাদের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের পরিচ্ছন্নতার দ্বারাই চমৎকৃত হননি বরং তাদের কর্মচাঞ্চল্য, মনোভাব ও ভঙ্গি দেখেও চমৎকৃত হন যাদের সকল কিছু্কেই তাঁর মনে হয়েছিল "চিত্রবৎ বা ছবির মত"।[৭১]
এটি ছিল জাপানে দ্রুত সামরিক সংখ্যা/শক্তি বৃদ্ধির সময়কাল - চীন-জাপান যুদ্ধ এবং রাশিয়া-জাপান যুদ্ধের পূর্বসূচক। এ সকল প্রস্ত্তুতি বিবেকানন্দের মনোযোগ এড়ায়নি, যিনি লিখেছিলেন -"জাপানীরা এখন মনে হয় বর্তমান সময়ের প্রয়োজনানুসারে নিজেদের সম্পূর্ণ জাগিয়ে তুলেছে। তারা এখন তাদের নিজেদের কর্মকর্তাদের আবিষ্কৃত ও অতুলনীয় বলে কথিত বন্দুক/অস্ত্রসমূহ দ্বারা সজ্জিত এক সম্পূর্ণ সংগঠিত সামরিক বাহিনী। তাছাড়া তারা তাদের নৌ-বাহিনাকে অবিরামভাবে বর্ধিত করছে।" তাঁর পর্যবেক্ষণকৃত শিল্পে অগ্রগতি সম্পর্কে, "দিয়াশলাই কারখানাগুলো একেবারে দেখার মত, এবং তারা যা চায় তার সকল কিছুই তাদের নিজেদের দেশে তৈরী করতে প্রবণ।"[৭১]
জাপানের দ্রুত অগ্রগতির বিপরীতে ভারতের পরিস্থিতি তুলনা করে তিনি তাগিদ দেন তাঁর দেশের মানুষকে - "কুসংস্কার এবং নিপীড়নের শতাব্দীর সন্তান-সন্ততিদের" - তাদের সংকীর্ণ গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বিদেশের দিকে তাকাতে -
| “ | শুধু আমি চাই যে আমাদের যুবকেরা প্রতি বছর জাপান এবং চীন ভ্রমণ করুক। বিশেষ করে জাপানীদের নিকট ভারত তারপরও এমন এক স্বপ্নরাজ্য যার সবকিছুই উচ্চস্তরের এবং ভাল। এবং তোমরা, তোমরা কি?...তোমাদের সারা জীবন বাজে বকিতেছো, অনর্থক প্রলাপকারীরা, তোমরা কি? এসো, এ সকল মানুষকে দেখ এবং যাও আর লজ্জায় তোমাদের মুখ ঢাক। জড়বুদ্ধিসম্পন্ন জাতি, তোমরা তোমাদের প্রাসাদ হারাবে যদি তোমরা বাইরে আসো! শত শত বছর ধরে তোমাদের মাথার উপর দানা বাঁধা কুসংস্কারের ক্রমবর্ধমান বোঝা নিয়ে বসে আছো, শত শত বছর ধরে এ খাবার সে খাবারের স্পর্শযোগ্যতা বা স্পর্শ-অযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করে তোমাদের সকল শক্তি ক্ষয় করছো, যুগ যুগ ধরে অবিরাম সামাজিক পীড়নের দ্বারা তোমাদের সকল মানবিকতা নিষ্পেষিত - তোমরা কি? আর তোমরা এখন কি করছো?...তোমাদের হাতে বই নিয়ে সমুদ্রতীরে ভ্রমণ করছো - ইউরোপিয়ান মস্তিষ্ক-কর্মের অজীর্ণ পথভ্রষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ পুনরাবৃত্তি করছো, আর ত্রিশ রুপীর কেরানীর চাকরির জন্য সমস্ত আত্মা অবনত, অথবা বড়জোর একজন উকিল হওয়া - নবীন ভারতের উচ্চাকাঙ্খার শিখর - আর প্রত্যেক ছাত্রের সাথে তার পায়ে পায়ে ঘুরে একদল ক্ষুদার্ত ছেলেমেয়ের দল রুটি চাচ্ছে! তোমাদের, বইগুলোর, গাউনের, বিশ্ববিদ্যালয় ডিপ্লোমাগুলোর আর সব কিছুর ডোবার জন্য সমুদ্রে যথেষ্ট জল কি নেই?[৭১] | ” |
প্রথম পাশ্চাত্য ভ্রমণ [সম্পাদনা]
চীন, কানাডা হয়ে তিনি আমেরিকার শিকাগো পৌঁছেন ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে।[৭২] কিন্ত্তু তিনি এটা জানতে পেরে হতাশ হলেন যে কোন প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের প্রমাণ-পত্র/প্রশংসাপত্র ছাড়া কোন ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের সংস্পর্শে এলেন।[৭৩] তাঁকে হার্ভার্ডে আমন্ত্রণ জানানোর পর এবং ধর্মসভায় বক্তৃতাদানে তাঁর প্রশংসাপত্র না থাকা প্রসঙ্গে রাইটের উদ্ধৃতি, "আপনার কাছে প্রশংসাপত্র চাওয়াটা হচ্ছে স্বর্গে সূর্যের আলো দেয়ার অধিকার চাওয়ার মত অবস্থা।" রাইট তখন প্রতিনিধিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিকট এক চিঠিতে লিখলেন, "আমাদের সকল অধ্যাপক একত্রে যতটা শিক্ষিত ইনি তাদের থেকেও বেশি শিক্ষিত।" অধ্যাপকের ব্যাপারে বিবেকানন্দ নিজে লেখেন, "তিনি আমাকে ধর্মসভায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নির্বন্ধ সহকারে বোঝান, যেটি তিনি মনে করেছিলেন জাতির নিকট তাঁকে একটি পরিচিতি দেবে।"[৭৪]
বিশ্বধর্ম মহাসভা [সম্পাদনা]
ধর্মসভা ১৮৯৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন হয়। এ দিন বিবেকানন্দ তাঁর প্রথম সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি ভারত এবং হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন।[৭৫] প্রথমদিকে বিচলিত থাকলেও তিনি বিদ্যার দেবী সরস্বতীর নিকট মাথা নোয়ালেন এবং তার বক্তৃতা শুরু করলেন এভাবে, "আমেরিকার ভ্রাতা ও ভগিনীগণ!"[৭৩][৭৬] তাঁর এ সম্ভাষণে প্রায় সাত হাজারের মত দর্শক-শ্রোতা দুই মিনিট দাঁড়িয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানান। নীরবতা ফিরে আসার পর তিনি তার বক্তৃতা শুরু করলেন। "যে ধর্ম বিশ্বকে সহিষ্ণুতা ও মহাজাগতিক গ্রহণযোগ্যতা শিখিয়েছে সে ধর্মের সর্বাধিক প্রাচীন সন্ন্যাসীদের বৈদিক ক্রমানুসারে" তিনি জাতিসমূহের কনিষ্ঠতমকে অভিবাদন জানালেন।[৭৭] এবং তিনি গীতা থেকে এ সম্পর্কে দুটি উদাহরণমূলক পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন-"যেহেতু বিভিন্ন স্রোতধারাগুলির উৎসসমূহ বিভিন্ন জায়গায় থাকে, সেগুলির সবই সমুদ্রের জলে গিয়ে মিশে যায়, সুতরাং, হে প্রভু, বিভিন্ন প্রবণতার মধ্য দিয়ে মানুষ বিভিন্ন যে সকল পথে চলে, সেগুলো বিভিন্ন রকম বাঁকা বা সোজা মনে হলেও, সেগুলি প্রভুর দিকে ধাবিত হয়!" এবং "যে আকারের মধ্য দিয়েই হোক না কেন, যেই আমার নিকট আসে, আমি তাঁর নিকট পৌঁছাই; সকল মানুষই বিভিন্ন পথে চেষ্টা করছে যা অবশেষে আমার নিকট পৌঁছায়।"[৭৭] সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা হওয়া সত্ত্বেও এটি সভার আত্মা এবং এর বিশ্বজনীন চেতনা ধ্বনিত করে।[৭৭][৭৮]
সভার সভাপতি, ডঃ ব্যারোজ বলেন, "কমলা-সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মসমূহের মাতা ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং তাঁর শ্রোতাদের উপর সবচাইতে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করেছেন।"[৭৬] প্রেসে তিনি প্রচুর মনোযোগ আকর্ষণ করেন যাতে তিনি "ভারতের সাইক্লোন সন্ন্যাসী" হিসেবে অভিহিত হন। নিউ ইয়র্ক ক্রিটিক লিখেছিল, "ঐশ্বরিক অধিকারবলে তিনি একজন বক্তা এবং হলুদ ও কমলার চিত্রবৎ আধানে তাঁর শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার চেয়ে কম আগ্রহোদ্দীপক ছিল না ঐ সকল সমৃদ্ধ ও ছন্দোময়ভাবে উচ্চারিত শব্দসমূহ। নিউইয়র্ক হেরাল্ড লিখেছিল, "বিবেকানন্দ নিঃসন্দেহে ধর্মসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর বক্তৃতা শুনে আমরা অনুভব করি এ শিক্ষিত জাতির নিকট মিশনারি পাঠানো কি পরিমাণ বোকামি।"[৭৯] আমেরিকার পত্রিকাসমূহ স্বামী বিবেকানন্দকে "ধর্মসভার সবচেয়ে মহান ব্যক্তিত্ব" এবং "সভার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তি" হিসেবে প্রতিবেদন লেখে।[৮০]
তিনি সভায় আরো অনেকবার হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কিত বিষয়ে বলেন। সভা ১৮৯৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হয়। সভায় তাঁর সকল বক্তৃতার একটি সাধারন বিষয়বস্ত্তু ছিল - সর্বজনীনতা - অধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সহিষ্ণুতা।[৮১]
আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বক্তৃতাদান [সম্পাদনা]
শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধর্মসভা শেষ হবার পর বিবেকানন্দ পুরো দুই বছর পূর্ব ও কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে শিকাগো, ডেট্রয়েট, বোস্টন এবং নিউইয়র্কে বক্তৃতা দেন। ১৮৯৫ সালের বসন্তকালের মধ্যে তাঁর অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁর স্বাস্থ্য হয়ে পড়ে দুর্বল।[৮২] তাঁর বক্তৃতাদান সফর স্থগিত করার পর স্বামীজি বেদান্ত ও যোগের উপর বিনা মূল্যে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। ১৮৯৫ সালের জুন থেকে দুই মাসব্যপী তিনি থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড পার্কে তাঁর এক ডজন শিষ্যকে ব্যক্তি পর্যায়ে শিক্ষা দেয়ার জন্য ভাষণ দেন। বিবেকানন্দ এটিকে আমেরিকায় তাঁর প্রথম ভ্রমণের সবচেয়ে সুখী অংশ বলে বিবেচনা করতেন। তিনি পরে "নিউইয়র্ক বেদান্ত সোসাইটি" প্রতিষ্ঠা করেন।[৮২]
আমেরিকায় তাঁর প্রথম পরিদর্শনের সময় তিনি ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করেন দুইবার - ১৮৯৫ এবং ১৮৯৬ সালে। সেখানে তাঁর বক্তৃতাসমূহ সফল ছিল।[৮৩] এখানে তিনি সাক্ষাৎ পান এক আইরিশ মহিলা মিস মার্গারেট নোবলের যিনি পরে সিস্টার নিবেদিতা নামে পরিচিত হন।[৮২] ১৮৯৬ সালের মে মাসে তাঁর দ্বিতীয় ভ্রমণের সময় পিমলিকোতে এক গৃহে অবস্থানকালে স্বামীজি দেখা পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিখ্যাত ভারত বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স মুলারের যিনি পাশ্চাত্যে রামকৃষ্ণের প্রথম আত্মজীবনী লেখেন।[৭৮] ইংল্যান্ড থেকে তিনি অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশেও ভ্রমণ করেন। জার্মানীতে তিনি আরেক ভারত বিশেষজ্ঞ পল ডিউসেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন।[৮৪]
তিনি দুটি শিক্ষায়তনিক প্রস্তাবও পান, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য দর্শনের চেয়ার এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরণের প্রস্তাব। তিনি উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে পরিভ্রমণকারী সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি এই ধরণের কাজে স্থিত হতে পারবেন না।[৮২]
তিনি কতিপয় অকৃত্রিম শিষ্যকে আকৃষ্ট করেন। তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের মধ্যে ছিল জোসেফিন ম্যাকলিয়ড, মিস মুলার, মিস নোবল, ই.টি.স্টার্ডি, ক্যাপটেন এবং মিসেস সেভিয়ের-যারা অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জে জে গুডউইন-যিনি তাঁর স্টেনোগ্রাফার হন এবং তাঁর শিক্ষা ও বক্তৃতাসমূহ রেকর্ড করেন।[৮২][৮৪] হেল ফ্যামিলি আমেরিকাতে তাঁর উষ্ণতম আতিথ্যকর্তাদের অন্যতম ছিলেন।[৮৫] তাঁর শিষ্যগণ-ফ্রেঞ্চ মহিলা ম্যাডাম লুই হন স্বামী অভয়ানন্দ এবং মিস্টার লিয়ন ল্যান্ডসবার্গ হন স্বামী কৃপানন্দ। তিনি কতিপয় অন্যান্য শিষ্যকে ব্রহ্মচারীতে দীক্ষা দেন।[৮৬]
স্বামী বিবেকানন্দের ধারণাসমূহ বেশ কয়েকজন পন্ডিত ও বিখ্যাত চিন্তাবিদ কর্তৃক প্রশংসিত হয়-উইলিয়াম জেমস, জোসেফ রয়েস, সি.সি. এভারেট, হার্ভার্ড ধর্মশাস্ত্র বিদ্যালয়ের ডিন, রবার্ট জি ইনগারসোল, নিকোলা টেসলা, লর্ড কেলভিন এবং অধ্যাপক হারম্যান লুডউইক ফারডিন্যান্ড ভন হেলমহোলটজ।[৮] অন্যান্য ব্যক্তিত্ব যারা তাঁর কথাবার্তায় আকৃষ্ট হন তারা হলেন হ্যারিয়েট মনরো এবং এলা হুইলার উইলকক্স-দুজন বিখ্যাত আমেরিকান কবি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম জেমস; ব্রুকলিন এথিক্যাল এসোসিয়েশনের সভাপতি ডক্টর লুইজ জি জেনস; নরওয়ের পিয়ানোবাদক ওলে বুলের স্ত্রী সারা সি বুল; ফ্রান্সের অভিনেত্রী সারাহ বার্ণহারট এবং ফ্রান্সের অপেরা সঙ্গীতশিল্পী ম্যাডাম এমা ক্যালভি।[৮৭]
পশ্চিম থেকেও তিনি তাঁর ভারতীয় কাজে গতি আনেন। বিবেকানন্দ ভারতে অবস্থানরত তাঁর অনুসারী ও সন্ন্যাসী ভাইদের উপদেশ দিয়ে এবং অর্থ পাঠিয়ে বিরামহীনভাবে চিঠি লেখেন। পাশ্চাত্য থেকে পাঠানো তাঁর চিঠিসমূহ সে দিনগুলিতে সামাজিক কাজের জন্য তাঁর প্রচারাভিযানের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।[৮৮] তিনি ভারতে তাঁর নিকট শিষ্যদের বড় কিছু করার জন্য অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যান। তাদের নিকট পাঠানো তাঁর চিঠিসমূহে তাঁর সবচেয়ে কঠিন কিছু শব্দ ছিল।[৮৯] এ রকম একটি চিঠিতে তিনি স্বামী অক্ষরানন্দকে লিখেছিলেন, "খেতরী শহরের দরিদ্র ও নিচু শ্রেণীর ঘরে ঘরে যাও এবং তাদের ধর্মশিক্ষা দাও। ভূগোল এবং অন্যান্য বিষয়েও তাদের মৌখিক শিক্ষা দিও। অলসভাবে বসে থেকে, রাজকীয় খাবার খেয়ে আর "রামকৃষ্ণ, ও প্রভু!" বলে ভাল কিছু হবে না-যদি না তুমি দরিদ্রদের জন্য ভাল কিছু করতে পার।"[৯০][৯১] পরিণামস্বরুপ ১৮৯৫ সালে বেদান্ত শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দের সরবরাহকৃত অর্থে মাদ্রাজে "ব্রহ্মাবদীন" নামে এক সাময়িকপত্র প্রকাশ করা শুরু হয়েছিল।[৯২] পরবর্তীকালে (১৮৮৯) "ব্রহ্মাবদীনে" "দি ইমিটেশন অফ ক্রাইস্ট" এর প্রথম ছয় অধ্যায়ের বিবেকানন্দকৃত অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।[৯৩]
বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্য ক্যাপ্টেন এবং মিসেস সেভিয়ের ও জে জে গুডউইনকে নিয়ে ১৮৯৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে তারা ফ্রান্স ও ইটালী ভ্রমণ করেন এবং লিওনার্ডো ডা ভিঞ্চির দি লাস্ট সাপার দর্শন করে ১৮৯৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ভারতের উদ্দেশ্যে ন্যাপলস বন্দর ত্যাগ করেন।[৯৪] পরবর্তীতে মিস মুলার এবং সিস্টার নিবেদিতা ভারতে তাঁকে অনুসরণ করেন। সিস্টার নিবেদিতা তার বাকী জীবন ভারতীয় নারীদের শিক্ষায় এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে নিয়োজিত করেন।[৮২][৯৫]
ভারতে প্রত্যাবর্তন [সম্পাদনা]
কলম্বো থেকে আলমোড়া [সম্পাদনা]
বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারী কলম্বো পৌঁছান এবং এক পরমানন্দদায়ক অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন। এখানে তিনি প্রাচ্যে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য বক্তৃতা (ভারত, পবিত্র ভূমি) করেন। সেখান থেকে কলকাতায় তাঁর ভ্রমণ ছিল এক বিজয়ঘটিত অগ্রগতি। তিনি ভ্রমণ করেন কলম্বো থেকে পাম্বান, রামেস্বরম, রামনাদ, মাধুরাই, কুম্বাকোনাম এবং মাদ্রাজ এবং এ জায়গাগুলোতে বক্তৃতা দেন। জনগণ এবং রাজারা তাঁকে অত্যুৎসাহী অভ্যর্থনা জানান। পাম্বানে মিছিলে রামনাদের রাজা নিজে স্বামীজির ঘোড়ার গাড়ি টানেন। মাদ্রাজে যাওয়ার পথে কতিপয় জাগয়ায় যেখানে ট্রেন থামতো না সেখানে জনগণ রেললাইনে বসে ট্রেন থামাতো এবং স্বামীজির বক্তৃতা শোনার পরই ট্রেনকে যেতে দিত।[৯৬] মাদ্রাজ থেকে তিনি কলকাতায় তাঁর ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন এবং আলমোরা পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতা দেয়া চালিয়ে যান। যেখানে পাশ্চাত্যে তিনি ভারতের মহান আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কথা বলেছিলেন, সেখানে ভারতে ফিরে তাঁর 'কলম্বো থেকে আলমোরা' বক্তৃতা ছিল জনগণের জন্য নৈতিক অনুপ্রেরণা, বর্ণাশ্রম ভাইরাস দূরীকরণ, বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহদান, দেশের শিল্পায়ন, দারিদ্র দূরীকরণ, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। এ সমস্ত বক্তৃতাসমূহ কলম্বো থেকে আলমোরা বক্তৃতা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এ বক্তৃতাসমূহকে জাতীয়তাবাদী ঐকান্তিকতা ও আধ্যাত্মিক ভাবাদর্শের বলে বিবেচনা করা হয়।[৯৭] তাঁর বক্তৃতাসমূহ মহাত্মা গান্ধী, বিপিন চন্দ্র পাল এবং বালগঙ্গাধর তিলক সহ আরো অনেক ভারতীয় নেতাদের উপর প্রচুর প্রভাব বিস্তার করেছিল।[৯৮][৯৯]
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা [সম্পাদনা]
১৮৯৭ সালের ১লা মে কলকাতায় বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন ধর্ম প্রচারের জন্য সংগঠন "রামকৃষ্ণ মঠ" এবং সামাজিক কাজের জন্য সংগঠন "রামকৃষ্ণ মিশন"।[১০০] এটি ছিল শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, চিকিৎসা-সংক্রান্ত এবং দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার এক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনের প্রারম্ভ।[৭৮] রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শের ভিত্তি হচ্ছে কর্ম যোগ।[১০১][১০২] তাঁর দ্বারা দুটি মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার মধ্যে কলকাতার নিকট বেলুড়ের মঠটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের হেডকোয়ার্টার করা হয়েছিল এবং অন্যটি হিমালয়ের মায়াবতীতে আলমোরার নিকটে অদ্বৈত আশ্রম নামে পরিচিত এবং পরে তৃতীয় মঠটি মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ইংরেজীতে প্রবুদ্ধ ভারত ও বাংলায় উদ্বোধন নামে দুটি সাময়িকী চালু করা হয়েছিল।[১০৩] একই বছর মুর্শিদাবাদ জেলায় স্বামী দুর্ভিক্ষের জন্য অখন্ডানন্দ কর্তৃক ত্রাণ কাজ চালু করা হয়েছিল।[৭৮][১০০]
১৮৯৩ সালে পাশ্চাত্যে স্বামীজির প্রথম ভ্রমণের সময় যখন তারা একত্রে ইয়োকাহামা থেকে শিকাগো যাত্রা করেছিলেন তখন বিবেকানন্দ স্যার জামশেদজী টাটাকে একটি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আনুমানিক এ সময়ে স্বামীজি টাটার প্রতিষ্ঠিত "বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান" এর প্রধান হবার অনুরোধ সম্বলিত একটি চিঠি পান। কিন্ত্তু বিবেকানন্দ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে সেটি তাঁর আধ্যাত্মিক আগ্রহের সাথে সংঘাতপূর্ণ।[১০৪][১০৫]
তিনি পরে পুনঃসংস্কারকৃত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পক্ষের আর্য সমাজ ও গোঁড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পক্ষের সনাতনপন্থীদের মধ্যে ঐক্যতান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাঞ্জাব ভ্রমণ করেন। রাওয়ালপিন্ডীতে তিনি আর্য সমাজবাদী ও মুসলিমদের মধ্যকার সক্রিয় বিরোধ নির্মূল করার পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ দেন।[১০৬] তাঁর লাহোর ভ্রমণ স্মরণীয় তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতার জন্য এবং একজন গণিতের অধ্যাপক তীর্থ রাম গোস্বামীর সাথে তাঁর সম্পৃক্ততার জন্য যে অধ্যাপক পরে স্বামী রাম তীর্থ নামে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেন এবং ভারতে ও আমেরিকায় বেদান্ত প্রচার করেন।[১০০] তিনি দিল্লী এবং খেতরীসহ অন্যান্য জায়গায়ও ভ্রমণ করেন এবং ১৮৯৬ সালের জানুয়ারীতে কলকাতায় ফিরে আসেন। পরবর্তী কয়েক মাস তিনি মঠের কাজ সংহত করতে এবং শিষ্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অতিবাহিত করেন।
দ্বিতীয় পাশ্চাত্য ভ্রমণ [সম্পাদনা]
তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য সত্ত্বেও তিনি পুনরায় ১৮৯৯ সালের জুন মাসে পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।[১০৭] তাঁর সঙ্গী ছিলেন সিস্টার নিবেদিতা এবং স্বামী তুরিয়ানন্দ। তিনি স্বল্প সময় ইংল্যান্ডে অবস্থান করে তারপর আমেরিকায় যান। তাঁর এ ভ্রমণকালে তিনি সানফ্রান্সিসকো ও নিউইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এক সহৃদয় আমেরিকান ভক্তের নিকট থেকে পাওয়া ১৬০-একর জমিতে (০.৬৫ বর্গকি.মি.) ক্যালিফোর্ণিয়ায় শান্তি আশ্রমও প্রতিষ্ঠা করেন।[১০৮] পরে তিনি ১৯০০ সালে প্যারিসে ধর্ম মহাসভায় যোগ দেন।[১০৯] লিঙ্গ পূজা ও গীতার যথার্থতা সম্পর্কিত বিবেকানন্দের পান্ডিত্যপূর্ণ প্রকাশের জন্য প্যারিস বক্তৃতা স্মরণীয়। প্যারিস থেকে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি ভ্রমণ করেন ব্রিটানি, ভিয়েনা, ইস্তান্বুল, এথেন্স এবং মিশর। এ সময়ের বেশীর ভাগ অংশে তিনি ছিলেন বিখ্যাত চিন্তাবিদ জুলস বয়েসের অতিথি।[১০৮] তিনি ১৯০০ সালের ২৪শে অক্টোবর প্যারিস ত্যাগ করেন এবং একই সালের ৯ই ডিসেম্বর বেলুড় মঠে পৌঁছান।[১০৮]
শেষ জীবন [সম্পাদনা]
বিবেকানন্দ কিছু দিন মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রমে এবং পরে বেলুড় মঠে অতিবাহিত করেন। অতঃপর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বেলুড় মঠে অবস্থান করে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের কাজ এবং ইংল্যান্ড ও আমেরিকার কাজ দেখাশোনা করে অতিবাহিত করেন। গোয়ালিয়রের মহারাজাসহ এ বছরগুলিতে হাজার হাজার দর্শক তাঁকে দেখতে আসেন। ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে দেখতে আসেন লোকমান্য তিলকসহ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয়রা। জাপানের ধর্ম মহাসভায় যোগ দেয়ার জন্য তিনি ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্ত্তু তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য সেটি অসম্ভব করে তোলে। তাঁর শেষ দিনগুলিতে তিনি বোধগয়া ও বারাণসী তীর্থ করেন।[১১০]
তাঁর ভ্রমণসমূহ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতাদান, ব্যক্তিগত আলোচনা এবং চিঠিপত্রের আদান-প্রদান তাঁর স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি হাঁপানি, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য শারীরীক অসুখে ভুগছিলেন।[১১১] তাঁর দেহ ত্যাগের কিছুদিন পূর্বে তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ষপঞ্জি/পঞ্জিকা পড়তে দেখা যেত। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার তিনি দিন পূর্বে তাঁকে দাহ করার স্থান দেখিয়ে দেন-যে স্থানে বর্তমানে তাঁর স্মৃতিতে একটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কতিপয় লোকের কাছে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচবেন না।[১১১]
তাঁর দেহ ত্যাগ করার দিন তিনি বেলুড় মঠে সকালে কিছু ছাত্রকে শুক্লা-যজুর্বেদ শেখান।[১১২] তিনি ভ্রাতা-শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দের সাথে হাটেন এবং তাকে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্দেশনা দেন। বিবেকানন্দ ধ্যান করার সময় ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই রাত ৯টা ১০ মিনিটে দেহ ত্যাগ করেন। তাঁর শিষ্যদের মতে এটা ছিল মহাসমাধি।[১১৩] পরবর্তীতে তাঁর শিষ্যগণ লিপিবদ্ধ করেন যে তারা স্বামীজির নাসারন্ধ্র, তাঁর মুখ এবং চোখে "সামান্য রক্ত" লক্ষ্য করেছেন।[১১৪] ডাক্তাররা মন্তব্য করেন যে এটি হয়েছে তাঁর মস্তিষ্কে একটি রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে, কিন্ত্তু তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে পারেননি। তাঁর শিষ্যদের মতানুসারে ব্রহ্মরন্ধ্র-মস্তিষ্কের চূড়ার রন্ধ্র-অবশ্যই ফেটে থাকবে যখন তিনি মহাসমাধি অর্জন করেছিলেন। বিবেকানন্দ তাঁর চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বেচে না থাকার তাঁর নিজের ভবিষ্যৎবাণী পূরণ করেছিলেন।[১১২]
শিক্ষা ও দর্শন [সম্পাদনা]
স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন যে আদি শঙ্করের ভাষ্যের ভিত্তিতে বেদান্ত দর্শনে হিন্দু ধর্মের সারাংশ সবচেয়ে ভালভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিম্নলিখিতভাবে বেদান্তের শিক্ষাসমূহের সারসংক্ষেপ করেন,[১১৫]
- প্রত্যেক আত্মাই সম্ভাব্যরুপে ঐশ্বরিক/দেবসুলভ।[১১৫]
- লক্ষ্য হচ্ছে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা এ দেবত্বকে সুষ্পষ্টভাবে দেখানো।[১১৫]
- কর্ম, বা পূজা, বা মন নিয়ন্ত্রণ, বা দর্শন - একটির দ্বারা, বা অধিকের দ্বারা, বা এ সকলগুলির দ্বারা এটি কর - এবং মুক্ত হ্ও।[১১৫]
- এটি হচ্ছে ধর্মের সমগ্রতা। মতবাদ, বা গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি হচ্ছে গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।[১১৫]
- যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যাই করা হোক না কেন তার সবই অধার্মিক।
- জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না।
- শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ।
- ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ।
- মানুষের সেবা করা হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা।
বিবেকানন্দের মতানুসারে, রামকৃষ্ণ থেকে পাওয়া তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে "জীব হচ্ছে শিব"।[১১৬] এটি তাঁর মন্ত্রে পরিণত হয়, এবং দরিদ্র নারায়ণ সেবার ধারণা উদ্ভাবন করেন-(দরিদ্র) মানুষের মধ্যে এবং মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা। "যদি সত্যিই সকল ইন্দ্রিয়গোচর বস্ত্তু বা বিষয়ের নিমিত্তে ব্রহ্মের একতা থাকে, তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা অন্যদের থেকে আমাদের ভাল বা মন্দ বিবেচনা করব?" - এ প্রশ্ন তিনি নিজেকে করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এ পার্থক্য বা স্বাতন্ত্র্যসমূহ একতা/সমগ্রতার মধ্যস্থিত আলোর শূন্যতায় মিলিয়ে যায় যখন ভক্ত মোক্ষে পৌঁছেন। তখন এ একতা/সমগ্রতা সম্পর্কে অসচেতন "ব্যক্তিদের" জন্য সমবেদনা এবং তাদের সাহায্য করার দৃঢসংকল্প জাগ্রত হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তের সে শাখার অঙ্গীভূত বলে নিজেকে মনে করতেন যে শাখার মতে কেউই প্রকৃতভাবে মুক্ত হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের সকলেই মুক্ত হচ্ছি। এমনকি ব্যক্তিগত পাপমোচনের আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে, এবং শুধুমাত্র অন্যদের পাপমোচনের জন্য ক্লান্তিহীন কর্ম আলোকিত মানুষের প্রকৃত চিহ্ন। আত্মনো মোক্ষার্থম জগতহিতায় চ (নিজের পাপমোচনের জন্য এবং জগতের মঙ্গলের জন্য) - এ নীতিতে তিনি শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।[১১৭]
বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যদের পবিত্র, অস্বার্থপর হতে এবং শ্রদ্ধা/বিশ্বাস যাতে থাকে সে উপদেশ দেন। তিনি ব্রহ্মচর্য চর্চা করতে উপদেশ দেন। তাঁর শৈশবের বন্ধু প্রিয় নাথ সিনহার সাথে এক আলোচনায় তিনি তার দৈহিক ও মানসিক শক্তি এবং বাগ্মিতার উৎস/কারণ হিসেবে ব্রহ্মচর্য চর্চাকে অভিহিত করেন।[১১৮]
বিবেকানন্দ প্যারাসাইকোলজি এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের আবির্ভূত ক্ষেত্রকে সমর্থন করেননি (এর এক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর এ বক্তৃতায় মানুষ নিজেই তাঁর ভাগ্য নির্মাতা, সম্পূর্ণ কর্ম, ভলিউম ৮, নোটস অফ ক্লাস টকস এবং বক্তৃতাসমূহ) এ কারণে যে তাঁর মতে এ ধরণের কৌতুহল আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে সাহায্য করেনা বরং তা ব্যাহত করে।
প্রভাব [সম্পাদনা]
স্বামী বিবেকানন্দ আধুনিক হিন্দুধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনিই এই ধর্মটিকে ভারতে ও ভারতের বাইরে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছিলেন। যোগ, ধ্যান ও আত্মবিকাশের অন্যান্য যে ভারতীয় পদ্ধতিগুলি প্রচলিত, পাশ্চাত্য দুনিয়ায় সেগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে প্রধান কারণটিই হল স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মপ্রচার।[১১৯] অধ্যাপক অগেহানন্দ ভারতী এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, "...একালের হিন্দুরা বিবেকানন্দের কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করেন।"[১২০] বিবেকানন্দের মতে, হিন্দুধর্মের প্রতিটি সম্প্রদায়ের মতবিশ্বাস, এমনকি অন্যান্য ধর্মগুলির মতবিশ্বাসও বিভিন্ন পথে এই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলেছে।[১২১]
ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেকানন্দ জাতীয়তাবাদী আদর্শের মূল কথাগুলি বলে দিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কারক চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ভাষায়, "স্বামীর [বিবেকানন্দ] অকুতোভয় দেশাত্মবোধ সারা ভারত জুড়ে জাতীয় আন্দোলনকে এক নতুন রং দিয়েছিল। সেই যুগে ভারতের নতুন করে জেগে ওঠায় অন্য কোনো ব্যক্তির চেয়ে বিবেকানন্দের অবদান অনেক বেশি।[১২২] বিবেকানন্দ দেশের সর্বব্যাপী দারিদ্র্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এবং এই দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে জাতীয় জাগরণের কথা বলেছিলেন।[১২৩] তাঁর জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণা অনেক ভারতীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাকে প্রভাবিত করেছিল।
স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী বলেছিলেন, "বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মকে রক্ষা করেছিলেন, ভারতকে রক্ষা করেছিলেন।"[১২৪][১২৫] বিশিষ্ট স্বাধীনতা-যোদ্ধা সুভাষচন্দ্র বসুর মতে, বিবেকানন্দ হলেন "আধুনিক ভারতের নির্মাতা"।[১২৬][১২৭] মহাত্মা গান্ধীর মতে, বিবেকানন্দের প্রভাব দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা হাজারগুণ বৃদ্ধি করেছিল। স্বামী বিবেকানন্দ যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, একথা সর্বজনস্বীকৃত।[১২৮] তাঁর রচনাবলি সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, বাল গঙ্গাধর তিলক, বাঘা যতীন প্রমুখ অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীকে উদ্বুদ্ধ করে।
সুভাষচন্দ্র বসু বিবেকানন্দ সম্পর্কে বলেছিলেন,[১২৯] "সুগভীর, জটিল ও ঋদ্ধিসমন্বিত ব্যক্তিত্ব... ত্যাগে বেহিসেবী, কর্মে বিরামহীন, প্রেমে সীমাহীন, স্বামীজীর জ্ঞান ছিল যেমন গভীর তেমনই বহুমুখী। ভাবাবেগে উচ্ছ্বসিত স্বামীজী মানুষের ত্রুটিবিচ্যুতির নির্মম সমালোচক ছিলেন, অথচ সারল্য ছিল তাঁর শিশুর মতো। আমাদের জগতে এরূপ ব্যক্তিত্ব বাস্তবিকই বিরল।" অরবিন্দ ঘোষ বিবেকানন্দকে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু মানতেন। তিনি বলেন, "আর বিবেকানন্দ-মহাদেবের নয়নিঃসৃত এক দীপ্ত কটাক্ষ।-কিন্তু তাঁর পিছনে ছিল সেই ভগবত দৃষ্টি যা থেকে উদ্ভুত বিবেকানন্দ স্বয়ং, মহাদেব স্বয়ং, এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও বিশ্বাতীয় ওম্। ... বিবেকানন্দের প্রভাব এখনো বিপুলভাবে কাজ করে চলেছে আমরা দেখতে পাই-ঠিক জানি না কী রূপে, বলতে পারি না কোথায়, এমন কিছুতে যা এখনও স্পষ্ট নয় ; এমন কিছু যা সিংহপ্রতিম, বিরাট, সম্বোধিদীপ্ত ; যা সমুদ্রের জোয়ারের মতো প্রবেশ করছে ভারতের মর্মকেন্দ্রে এবং তা দেখে আমরা সোচ্ছ্বাসে বলে উঠি, ঐ দেখ, বিবেকানন্দ এখনো জেগে মাতৃমর্মে, মাতৃ-সন্তানদের মর্মলোকে।"[১৩০]
বেলুড় মঠে মহাত্মা গান্ধীকে বলতে শোনা গিয়েছিল যে, তাঁর সারা জীবনের উদ্দেশ্য ছিল বিবেকানন্দের ধারণাগুলিকে কাজে পরিণত করা।[১৩১] বিবেকানন্দের মৃত্যুর বহু বছর পরে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফরাসি নোবেল লরিয়েট রম্যাঁ রল্যাঁকে বলেছিলেন,[১৩২] "যদি তুমি ভারতকে জানতে চাও, বিবেকানন্দকে জানো। তাঁর মধ্যে সবকিছুই ইতিবাচক, নেতিবাচক কিছু নেই।" রল্যাঁ নিজে লিখেছিলেন,[১৩৩] "তাঁর কথাগুলি ছিল সঙ্গীতের মতো ; বীঠোফেনের মতো সেগুলোর বাক্যাংশের বিন্যাস, আর হ্যান্ডেলের কোরাসের মতো প্রাণ-মাতানো ছন্দ। তাঁর এইসব কথা ছড়িয়ে আছে ত্রিশ বছর আগে লেখা [এই কথাগুলি রল্যাঁ ১৯২৮ সালে লিখেছিলেন] বইগুলোর মধ্যে। কিন্তু তবুও যখনই আমি সেগুলো পড়ি, আমার সারা শরীর দিয়ে যেন চকিতে তড়িৎস্পর্শের মতো শিহরণ বয়ে যায়। তাহলে কথাগুলো যে-সময় এই বীরের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল, সেই মুহুর্তে সেগুলো কী শিহরণ, কী উন্মাদনারই না সৃষ্টি করেছিল।"
১৮৯৩ সালে জাপান থেকে শিকাগো যাওয়ার পথে বিবেকানন্দের সঙ্গে আলাপ হয় জামশেদজি টাটার। বিবেকানন্দের কথায় প্রভাবিত হয়ে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বর্তমানে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণা-প্রতিষ্ঠান।[১৩৪] বিদেশে বিবেকানন্দের সঙ্গে ম্যাক্সমুলারের আলাপ হয়। বিবেকানন্দের বৈদিক দর্শন শিক্ষার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা। ১৯৯৫ সালের ১১ নভেম্বর শিকাগোর নামজাদা রাস্তা মিশিগান অ্যাভিনিউ-এর একটি অংশের নাম রাখা হয় "স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ে"।[১৩৫]
ভারতে বিবেকানন্দের জন্মদিন ১২ জানুয়ারি উদযাপিত হয় জাতীয় যুব দিবস হিসেবে।[১৩৬]
রচনা [সম্পাদনা]
বিবেকানন্দ অনেকগুলি দর্শন-বিষয়ক বই লিখেছিলেন। মানবজাতিকে তিনি চার ভাগে ভাগ করেন—যাঁরা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেন, তাঁদের বলেন "কর্মী"; যাঁরা অন্তরের প্রেরণায় জীবনে কিছু একটা অর্জন করতে চান, তাঁদের বলেন "ভক্ত"; যাঁরা মনে গতিবিধি বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে কাজ করেন, তাঁদের তিনি বলেন "মরমিয়া" এবং যাঁরা যুক্তির মাধ্যমে সব কিছু বুঝে নিতে চান, তাঁদের বলেন "জ্ঞানী"। চারটি যোগের উপর রচিত তাঁর চারটি বই (কর্মীর জন্য কর্মযোগ, ভক্তের জন্য ভক্তিযোগ, মরমিয়ার জন্য রাজযোগ ও জ্ঞানীর জন্য জ্ঞানযোগ) হিন্দু বৈদিক দর্শনের উপর রচিত চারটি মৌলিক গ্রন্থ। এই বইগুলিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেওয়া তাঁর বক্তৃতাগুলি ধরা আছে। বিবেকানন্দ একজন সুগায়ক ও কবিও ছিলেন।[১৩৮] তিনি বেশ কিছু গান ও কবিতা লিখে যান। সেগুলির মধ্যে তাঁর নিজের প্রিয় ছিল মাতৃরূপা কালী কবিতাটি। তিনি সরস ভঙ্গিতে শিক্ষা দিতেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ সরল। বাংলা লেখার মাধ্যমে তিনি বিদ্যে জাহির না করে সহজ সরল ভাষায় কিভাবে বক্তব্য উপস্থাপনা করা যায়, তার পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন।
স্বামী বিবেকানন্দ রচিত বইপত্র [সম্পাদনা]
- ভাববার কথা
- পরিব্রাজক
- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য
- বর্তমান ভারত
-
- ইংরেজি থেকে বাংলায় অনূদিত মৌলিক বই
- কর্মযোগ
- জ্ঞানযোগ
- রাজযোগ
- ভক্তিযোগ
-
- বিবেকানন্দের লেখা চিঠিগুলো নিয়ে “ বিবেকানন্দ পত্রাবলী”
আরও দেখুন [সম্পাদনা]
- উপনিষদ
- বিবেকানন্দ কেন্দ্র
- মেরি লুই বার্ক
- ম্যাক্স মুলার
- বিবেকানন্দর ইলম
পাদটীকা [সম্পাদনা]
- ↑ স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৬১, পৃষ্ঠা ২১০
- ↑ ২.০ ২.১ ২.২ Jestice, Phyllis G. (2004). Holy People of the World. ABC-CLIO. পৃ: 899.
- ↑ ৩.০ ৩.১ Georg, Feuerstein (2002). The Yoga Tradition. Motilal Banarsidass. পৃ: 600.
- ↑ Clarke, Peter Bernard (2006). New Religions in Global Perspective. Routledge. পৃ: 209.
- ↑ ৫.০ ৫.১ Von Dehsen, Christian D. (1999). Philosophers and Religious Leaders. Greenwood Publishing Group. পৃ: 191.
- ↑ Vivekananda, Swami (11th September, 1893), Response to Welcome, Parliament of Religions, Chicago, http://en.wikisource.org/wiki/The_Complete_Works_of_Swami_Vivekananda/Volume_1/Addresses_at_The_Parliament_of_Religions/Response_to_Welcome
- ↑ Harshvardhan Dutt (2005). Immortal Speeches. পৃ: 121.
- ↑ ৮.০ ৮.১ ৮.২ ৮.৩ ৮.৪ ৮.৫ Nikhilananda 1964
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, p. 21
- ↑ যুগনায়ক বিবেকানন্দ (অধ্যায় "বংশ পরিচয়"), প্রথম খণ্ড, স্বামী গম্ভীরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃ. ১১-২৩
- ↑ ১১.০ ১১.১ Eastern and Western disciples 2006a, p. 11
- ↑ Mukhopadhyay, Manishankar (1996). Obishshashyo Vivekananda. Kalikātā: Sāhityama. পৃ: 19. http://www.nirmalsahityam.com। সংগৃহীত 16 August 2011.
- ↑ Sahoo, Srijata। "Ancestral Home Birthplace Of Vivekananda"। Datta Ancestral Home - Birthplace of Vivekananda। Government of India। সংগৃহীত 3 October 2011।
- ↑ ১৪.০ ১৪.১ Swami Chetanananda. "Swami Vivekananda". God lived with them. পৃ: 20.
- ↑ Banhatti 1995, p. 4
- ↑ ১৬.০ ১৬.১ Arrington, Robert L.; Tapan Kumar Chakrabarti (2001). "Swami Vivekananda". A Companion to the Philosophers. Blackwell Publishing. পৃ: 628.
- ↑ ১৭.০ ১৭.১ Early Years
- ↑ Biswas, Arun Kumar (1987). Buddha and Bodhisattva. Cosmo Publications. পৃ: 19.
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, p. 46
- ↑ Pangborn, Cyrus R.; Bardwell L. Smith (1976). "The Ramakrishna Math and Mission". Hinduism: New Essays in the History of Religions. Brill Archive. পৃ: 106. "Narendra, son of a Calcutta attorney, student of the intellectually most demanding subjects in arts and sciences at Scottish Church College."
- ↑ ২১.০ ২১.১ Dhar 1976, p. 53
- ↑ Swami Vivekananda By N.L. Gupta, p.2
- ↑ Dhar 1976, p. 59
- ↑ Dutta, Mahendranath. Dhirendranath Basu. ed. Sri Sri Ramakrishner Anudhyan (6th ed.). পৃ: 89.
- ↑ Bhuyan, P. R. (2003). Swami Vivekananda. Atlantic Publishers & Distributors. পৃ: 5.
- ↑ Swami Chetanananda. "Swami Vivekananda". God lived with them. পৃ: 22. "He asked the Brahmo Samaj leader, Devendranath Tagore, "Sir, have you seen God?", for which Devendranath had no answer and replied, "My boy, you have the eyes of a yogi. You should practise meditation.""
- ↑ Pangborn, Cyrus R.; Bardwell L. Smith (1976). "The Ramakrishna Math and Mission". Hinduism: New Essays in the History of Religions. Brill Archive. পৃ: 106. "He had tried the Brahmo Samaj in the hope that its leader—at that time, Keshab Chandra Sen—could lead him to the vision for which he yearned."
- ↑ ২৮.০ ২৮.১ Malagi, R.A.; M.K.Naik (2003). "Stirred Spirit: The Prose of Swami Vivekananda". Perspectives on Indian Prose in English. Abhinav Publications. পৃ: 36-37.
- ↑ Prabhananda 2003, p. 233
- ↑ Banhatti 1995, pp. 7-9 "Vivekananda is said to have offered, in a letter to Herbert Spencer, some criticism of the celebrated philosopher's speculations, which the aged stalwart is said to have appreciated."
- ↑ Joseph, Jaiboy (002-06-23)। "Master visionary" (in English)। The Hindu। http://www.hinduonnet.com/thehindu/mag/2002/06/23/stories/2002062300310400.htm। সংগৃহীত 2008-10-09।
- ↑ Mukherjee, Dr. Jayasree (May 2004)। "Sri Ramakrishna’s Impact on Contemporary Indian Society"। Prabuddha Bharatha। http://www.eng.vedanta.ru/library/prabuddha_bharata/sri_ramakrishna%27s_impact_on_contemporary_indian_society_may04.php। সংগৃহীত 2008-09-04।
- ↑ Swami Chetanananda. God lived with them. পৃ: 22. "Hastie said, 'I have known only one person, who has realized that blessed state, and he is Ramakrishna of Dakshineswar. You will understand it better if you visit this saint.'"
- ↑ "শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ", দ্বিতীয় ভাগ (ঠাকুরের দিব্যভাব ও নরেন্দ্রনাথ), স্বামী সারদানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৮৩
- ↑ Mannumel, Thomas. The Advaita of Vivekananda: A Philosophical Appraisal. পৃ: 17.
- ↑ ৩৬.০ ৩৬.১ ৩৬.২ Prabhananda 2003, p. 232
- ↑ Vivekananda, Swami. "My Master". The Complete Works of Swami Vivekananda. 4. Advaita Ashrama. পৃ: 178-179. http://en.wikisource.org/wiki/The_Complete_Works_of_Swami_Vivekananda/Volume_4/Lectures_and_Discourses/My_Master.
- ↑ ৩৮.০ ৩৮.১ ৩৮.২ Banhatti 1995, pp. 10-13
- ↑ ৩৯.০ ৩৯.১ Rolland, Romain (1929). "Naren the Beloved Disciple". The Life of Ramakrishna. পৃ: pp.169-193.
- ↑ Arora, V. K. (1968). "Communion with Brahmo Samaj". The social and political philosophy of Swami Vivekananda. Punthi Pustak. পৃ: p.4.
- ↑ Isherwood, Christopher (1976). Meditation and Its Methods According to Swami Vivekananda. Vedanta Press. পৃ: 20.
- ↑ Cyrus R. Pangborn. "The Ramakrishna Math and Mission". Hinduism: New Essays in the History of Religions. পৃ: 98.
- ↑ Isherwood, Christopher (1976). Meditation and Its Methods According to Swami Vivekananda. Vedanta Press. পৃ: 20. "He realized under the impact of his Master that all the living beings are the embodiments of the 'Divine Self'...Hence, service to God can be rendered only by service to man."
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, p. 183
- ↑ ৪৫.০ ৪৫.১ Rolland, Romain (1929). "The River Re-Enters the Sea". The Life of Ramakrishna. পৃ: 201–214.
- ↑ ৪৬.০ ৪৬.১ God lived with them, p.38
- ↑ God lived with them, p.39
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, p. 277
- ↑ Rolland 2008, p. 7
- ↑ Dhar 1976, p. 243
- ↑ ৫১.০ ৫১.১ Richards, Glyn (1996). "Vivekananda". A Source-Book of Modern Hinduism. Routledge. পৃ: 77-78.
- ↑ P. R. Bhuyan. Swami Vivekananda. পৃ: 12.
- ↑ ৫৩.০ ৫৩.১ ৫৩.২ ৫৩.৩ ৫৩.৪ Rolland 2008, pp. 16-25
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 214-216
- ↑ Rolland 2008, pp. 11-12
- ↑ ৫৬.০ ৫৬.১ ৫৬.২ Banhatti 1995, pp. 19-22
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 227-228
- ↑ ৫৮.০ ৫৮.১ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 243-261
- ↑ Rolland 2008, p. 15
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 262-287
- ↑ Rolland 2008, p. 25 "It was so at Poona in October, 1892 ; Tilak, the famous savant and Hindu political leader, took him at first for a wandering monk of no importance and began by being ironical; then, struck by his replies revealing his great mind and knowledge, he received him into his house for ten days without ever knowing his real name. It was only later, when the newspapers brought him from America the echoes of Vivekananda's triumph and a description of the conqueror, that he recognised the anonymous guest who had dwelt beneath his roof."
- ↑ Dhar 1976, p. 1434 "Tilak recoded his impressions as follows, 'When asked about his name he only said he was a Sanyasin ....There was absolutely no money with him. A deerskin, one of two clothes and a Kamandalu were his only possessions.'
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 288-320
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 321-346
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 323–325
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 327–329
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, pp. 339–342
- ↑ This view is supported by the evidence of two eyewitnesses. One of these was Ramasubba Iyer. In 1919, when Swami Virajananda, a disciple of the Swamiji, went on pilgrimage to Kanyakumari, Iyer told him that he had himself seen the Swami meditating on the rock for hours together, for three days consecutively ... Another eye-witness, Sadashivam Pillai, told that the Swami had remained on the rock for three nights and had seen him swim over to the rock. Next morning Pillai went to the rock with food for the Swami. There he found him meditating; and when Pillai asked him to return to the mainland, he refused. When he offered food to the Swami, the latter asked him not to disturb him. See, Eastern and Western disciples 2006a, pp. 344–346
- ↑ ৬৯.০ ৬৯.১ Agarwal, Satya P. (1998), The social role of the Gītā: how and why, Motilal Banarsidass, pp. 59, আইএসবিএন 9788120815247, http://books.google.com/?id=Gt0XdLly0i0C&pg=PA59
- ↑ Life and Philosophy of Swami Vivekananda, p.24
- ↑ ৭১.০ ৭১.১ ৭১.২ Paranjape, Makarand (2005), Penguin Swami Vivekananda Reader, Penguin India, pp. 246–248, আইএসবিএন 0143032542
- ↑ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, p. 15
- ↑ ৭৩.০ ৭৩.১ Minor, Robert Neil (1986), "Swami Vivekananda's use of the Bhagavad Gita", Modern Indian Interpreters of the Bhagavad Gita, SUNY Press, p. 133
- ↑ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, p. 16
- ↑ Banhatti 1995, p. 27 "Representatives from several countries, and all religions, were seated on the platform, including Mazoomdar of the Brahmo Samaj, Nagarkar of Prarthana Samaj, Gandhi representing the Jains, and Chakravarti and Mrs. Annie Besant representing Theosophy. None represeted Hinduism, as such, and that mantle fell on Vivekananda."
- ↑ ৭৬.০ ৭৬.১ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, p. 17
- ↑ ৭৭.০ ৭৭.১ ৭৭.২ McRae 1991
- ↑ ৭৮.০ ৭৮.১ ৭৮.২ ৭৮.৩ Prabhananda 2003, p. 234
- ↑ J. N. Farquhar, Modern Religious Movements in India, p. 202
- ↑ Sharma, Arvind, "Swami Vivekananda's Experiences", Neo-Hindu Views of Christianity, p. 87
- ↑ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, p. 18
- ↑ ৮২.০ ৮২.১ ৮২.২ ৮২.৩ ৮২.৪ ৮২.৫ Adjemian, Robert; Christopher Isherwood, "On Swami Vivekananda", The Wishing Tree, pp. 121–122
- ↑ Banhatti 1995, p. 30
- ↑ ৮৪.০ ৮৪.১ God lived with them, pp.49-50
- ↑ Life and Philosophy of Swami Vivekananda, p.27
- ↑ Burke, Marie Louise (1958), Swami Vivekananda in America: New Discoveries, p. 618
- ↑ God lived with them, p.47
- ↑ Kattackal, Jacob (1982), Religion and Ethics in Advaita, St. Thomas Apostolic Seminary, p. 219
- ↑ Majumdar, Ramesh Chandra (1963), Swami Vivekananda Centenary Memorial Volume, p. 577
- ↑ Burke, Marie Louise (1983), Swami Vivekananda in the West: New Discoveries, p. 417
- ↑ Sharma, Benishankar (1963), Swami Vivekananda: A Forgotten Chapter of His Life, Oxford Book & Stationary Co.,, p. 227
- ↑ Sheean, Vincent (2005), "Forerunners of Gandhi", Lead, Kindly Light: Gandhi and the Way to Peace, Kessinger Publishing, p. 345
- ↑ Sharma, Arvind, "Swami Vivekananda's Experiences", Neo-Hindu Views of Christianity, p. 83
- ↑ Life and Philosophy of Swami Vivekananda, pp.33-34
- ↑ A Comprehensive Biography of Swami Vivekananda, p.852
- ↑ "Return and Consolidation", Life and Philosophy of Swami Vivekananda, pp. 33–34
- ↑ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, p. 20
- ↑ P. R. Bhuyan, Swami Vivekananda, p. 27
- ↑ Gokhale, B. G. (Jan., 1964), "Swami Vivekananda and Indian Nationalism", Journal of Bible and Religion (Oxford University Press) 32 (1): 35–42, http://www.jstor.org/stable/1460427, "Vivekananda, Tilak, and Gandhi form parts of one continuous process. Many of Gandhi's ideas on Hinduism and spirituality come close to those of Vivekananda."
- ↑ ১০০.০ ১০০.১ ১০০.২ Banhatti 1995, pp. 34–35
- ↑ Thomas, Abraham Vazhayil (1974), Christians in Secular India, p. 44, "Vivekananda emphasized Karma Yoga, purposeful action in the world as the thing needful for the regeneration of the political, social and religious life of the Hindus."
- ↑ Miller, Timothy, "The Vedanta Movement and Self-Realization fellowship", America's Alternative Religions, p. 181, "Vivekananda was adamant that the social worker should never believe that she or he was actually improving the world, which is, after all, illusory. Service should be performed without attachment to the final results. In this manner, social service becomes karma yoga, the disciple of action, that ultimately brings spiritual benefits to the server, not to those being served."
- ↑ Kraemer, Hendrik, "Cultural response of Hindu India", World Cultures and World Religions, p. 151
- ↑ Prabhananda 2003, p. 235
- ↑ LULLA, ANIL BUDUR (September 3, 2007)। "IISc looks to Belur for seeds of birth"। The Telegraph।
- ↑ Eastern and Western disciples 2006a, p. 291
- ↑ Eastern and Western disciples 2006b, p. 450
- ↑ ১০৮.০ ১০৮.১ ১০৮.২ Banhatti 1995, pp. 41–42
- ↑ "The Paris Congress of the History of Religions", Complete Works of Swami Vivekananda, 4, Advaita Ashrama, http://en.wikisource.org/wiki/The_Complete_Works_of_Swami_Vivekananda/Volume_4/Translation:_Prose/The_Paris_Congress_of_the_History_of_Religions
- ↑ Banhatti 1995, pp. 43–44
- ↑ ১১১.০ ১১১.১ Banhatti 1995, pp. 45–46
- ↑ ১১২.০ ১১২.১ Eastern and Western disciples 2006b, pp. 645–662
- ↑ A.P. Sen (2006), "Editor's Introduction", The Indispensable Vivekananda, p. 27
- ↑ M.V. Kamnath (2005), "p.241", Philosophy of Life and Death
- ↑ ১১৫.০ ১১৫.১ ১১৫.২ ১১৫.৩ ১১৫.৪ Jackson, Carl T (1994), "The Founders", Vedanta for the West, Indiana University Press, pp. 33–34
- ↑ Y. Masih (1991), "Introduction to Religious Philosophy", Introduction to Religious Philosophy, Motilal Banarsidass, p. 68
- ↑ Agarwal, Satya P. (1998), The social role of the Gītā: how and why, Motilal Banarsidass, p. ix
- ↑ Priya Nath Sinha, "Conversations and Dialogues : VI - X Shri Priya Nath Sinha", Complete Works of Swami Vivekananda, 5, http://en.wikisource.org/wiki/The_Complete_Works_of_Swami_Vivekananda/Volume_5/Conversations_and_Dialogues_(Recorded_by_Disciples_-_Translated)/Volume_5/VI_-_X_Shri_Priya_Nath_Sinha
- ↑ Dutta 2003, p. 110
- ↑ Rambachan 1994, pp. 6–8
- ↑ Shattuck 1999, pp. 93–94
- ↑ Bharathi 1998b, p. 37
- ↑ Bharathi 1998b, pp. 37–38
- ↑ Shetty 2009, p. 517
- ↑ "Swami Vivekananda Influence"। Sports, Youth & Cultural Activities Department, Government of Gujarat। সংগৃহীত 16 June 2012।
- ↑ "Swami Vivekananda influence"। Sports, Youth & Cultural Activities Department, Government of Gujarat। সংগৃহীত 15 June 2012।
- ↑ "Article on Swami Vivekananda"। সংগৃহীত 13 September 2011।
- ↑ "Celebration of anniversaries in 2013" (in English)। UNESCO। সংগৃহীত 8 March 2012।
- ↑ DeLuca 2006, Praise for Swami Vivekananda
- ↑ aurobindo bharathi25-26"
- ↑ Campbell et al. 2002, p. 74
- ↑ "Article on Swami Vivekananda"। সংগৃহীত 20 August 2011।
- ↑ Nikhilananda 1953, Preface
- ↑ Kapur 2010, p. 142
- ↑ (প্রেস রিলিজ). Consulate General of India, Chicago. 13 July 1998.
- ↑ "National Youth Day"। National Portal of India। Government Of India। 10 January 2009। সংগৃহীত 5 October 2011।
- ↑ Chakrabarti, Mohit (1998). Swami Vivekananda, poetic visionary. New Delhi: M.D. Publications. পৃ: 80. আইএসবিএন 81-7533-075-9.
- ↑ Banhatti 1963, p. 276 "A singer, a painter, a wonderful master of language and a poet, Vivekananda was a complete artist."
জীবনীগ্রন্থ [সম্পাদনা]
- Banhatti, G.S. (1995). Life and Philosophy of Swami Vivekananda. Atlantic Publishers & Distributors. পৃ: 276. আইএসবিএন 9788171562916. http://books.google.com/books?id=jK5862eV7_EC&printsec=frontcover.
- Prabhananda, Swami (June 2003)। "Profiles of famous educators: Swami Vivekananda"। Prospects (Netherlands: Springer) XXXIII (2): 231-245। http://www.ibe.unesco.org/fileadmin/user_upload/archive/publications/ThinkersPdf/vivekane.pdf।
- McRae, John R. (1991)। "Oriental Verities on the American Frontier: The 1893 World's Parliament of Religions and the Thought of Masao Abe"। Buddhist-Christian Studies (University of Hawai'i Press) 11: 7-36। http://www.jstor.org/stable/1390252।
- Vivekananda, Swami (2001). Complete Works of Swami Vivekananda. 9 Volumes (Mayavati Memorial Edition ed.). Advaita Ashrama. আইএসবিএন 978-8185301754. http://www.ramakrishnavivekananda.info/vivekananda/complete_works.htm.
- Rolland, Romain (2008). The Life of Vivekananda and the Universal Gospel (24 ed.). Advaita Ashrama. পৃ: 328. আইএসবিএন 9788185301013. http://www.new.dli.ernet.in/scripts/FullindexDefault.htm?path1=/data_copy/upload/0078/360&first=1&last=438&barcode=6010010078355.
- Nikhilananda, Swami (April 1964)। "Swami Vivekananda Centenary"। Philosophy East and West (University of Hawai'i Press) 14 (1): 73-75। http://www.jstor.org/stable/1396757।
- Nikhilananda, Swami. Vivekananda: A Biography. আইএসবিএন 0-911206-25-6. http://www.vivekananda.net/PDFBooks/BiographybyNikhilananda.pdf.
- Eastern and Western disciples (July 2006a). Life of Swami Vivekananda. 1 (Sixth ed.). Advaita Ashrama. আইএসবিএন 81-7505-043-8. older edition
- Eastern and Western disciples (July 2006b). Life of Swami Vivekananda. 2 (Sixth ed.). Advaita Ashrama. আইএসবিএন 81-7505-044-6. older edition
- Sil, Narasingha. Swami Vivekananda: A Reassessment. আইএসবিএন 0-945636-97-0.
- Nivedita, Sister. The Master As I Saw Him. http://www.archive.org/details/masterasisawhimb00niveiala.
- Nivedita, Sister. Notes of Some Wanderings With the Swami Vivekananda. http://www.archive.org/details/notesofsome00viveuoft.
- Marie Louise Burke. Swami Vivekananda in the West: New Discoveries.
- Dhar, Shailendra Nath (1976). A Comprehensive Biography of Swami Vivekananda. Vivekananda Prakashan Kendra.
- Reminiscences of Swami Vivekananda. Advaita Ashrama. আইএসবিএন 81-85301-17-4.
- Vivekananda: The Great Spiritual Teacher by A Compilation. আইএসবিএন 81-7505-147-7.
- Chaturvedi Badrinath (2006). Swami Vivekananda The Living Vedanta. Penguin. আইএসবিএন 0143062093.
- Swami Jyotirmayananda (August 2000). Vivekananda -- His Gospel of Man-Making (5 ed.). http://www.vivekanandagospel.org.
বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা]
| উইকিউক্তিতে নিচের বিষয় সম্পর্কে সংগৃহীত উক্তি আছে:: স্বামী বিবেকানন্দ |
| উইকিমিডিয়া কমন্সে নিচের বিষয় সংক্রান্ত মিডিয়া রয়েছে: স্বামী বিবেকানন্দ |
- The Complete Works of Swami Vivekananda online
- The Life and Teachings of Swami Vivekananda
- Vivekananda's biography
- Summary of Swamiji's work In Marathi
| এই নিবন্ধটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এটিকে সমৃদ্ধ করে উইকিপিডিয়াকে সাহায্য করতে পারেন। |
|
||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||||||||||||||||
|
|||||||||||
- Articles containing explicitly cited English language text
- অসম্পূর্ণ
- রামকৃষ্ণ পরমহংস
- ঊনবিংশ শতাব্দীর দার্শনিক
- হিন্দু দার্শনিক
- হিন্দু ধর্মগুরু
- আধুনিক ভারতীয় দার্শনিক
- ভারতীয় ধর্মীয় নেতা
- কলকাতার ব্যক্তিত্ব
- প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতার প্রাক্তনী
- স্কটিশ চার্চ কলেজের প্রাক্তনী
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী
- রামকৃষ্ণ মিশন
- অদ্বৈতবাদী দার্শনিক
- হিন্দু ধর্মপ্রচারক
- ভারতীয় ধর্মপ্রচারক
- ভারতীয় হিন্দু
- ১৮৬৩-এ জন্ম
- ১৯০২-এ মৃত্যু
- রামকৃষ্ণ পরমহংসের সন্ন্যাসী শিষ্য
- ধর্ম গুরু
- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন
- ১৯শ-শতকের দার্শনিক