বাংলা লিপি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বাংলা লিপি
Bangla Lipi.svg
ধরন শব্দিয় বর্ণমালা লিপি
ভাষাসমূহ বাংলা, অসমীয়া, মণিপুরি, সিলেটি
সময়কাল খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে বর্তমান[১]
উদ্ভবের পদ্ধতি
সহোদ পদ্ধতি তিব্বতি লিপি
আইএসও ১৫৯২৪ Beng, 325
পরিচালনা Left-to-right
ইউনিকোড উপনাম বাঙালি
ইউনিকোড সীমা U+0980 থেকে U+09FF পর্যন্ত
টীকা: এ পাতায় আইপিএ স্বরবিষয়ক চিহ্ন থাকতে পারে।

বাংলা লিপি হল একটি লিখন পদ্ধতি যেটা ব্যবহৃত করা হয় বাংলা, অসমীয়া (অসমীয়া লিপি), মণিপুরিসিলেটি ভাষায়। বাংলা লিপির গঠন তুলনামূলকভাবে কম আয়তাকার ও বেশী সর্পিল। বাংলা লিপিটি সিদ্ধং লিপি থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে করা হয়। অসমীয়া ও অন্যান্য ভাষায় বাংলা লিপির যে সংস্করণগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলোতে কিছু ছোটখাটো পার্থক্য রয়েছে৷ যেমন: (বাংলা ; অসমীয়া ) এবং (অসমীয়া ; কোন বাংলা প্রতিলিপি নেই)। বাংলা লিপি হল বিশ্বের ৬ষ্ঠ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লিখন পদ্ধতি

বাংলা অক্ষর[সম্পাদনা]

স্বরবর্ণ[সম্পাদনা]

ক ব্যঞ্জনবর্ণের পরে আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ স্বরবর্ণের ব্যবহার

বাংলা লিপিতে বর্তমানে ১১টি স্বরবর্ণ অক্ষর আছে যা ৭টি প্রধান স্বর উচ্চারণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

  • বাংলা লিপিতে ই এবং উ উচ্চারণের জন্য ২টি করে বর্ণ ব্যবহৃত হয়। সংস্কৃত ভাষা থেকে প্রভাবিত বলে সংস্কৃত ভাষার মতনই বাংলা লিপিতে এবং উচ্চারণের জন্য উচ্চারণের তারতম্যের ভিত্তিতে হ্রস্ব ( এবং ) এবং দীর্ঘ ( এবং ) এই দুই রকম বর্ণ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আধুনিক বাংলা উচ্চারণে হ্রস্ব আর দীর্ঘ উচ্চারণে কোনো পার্থক্য নেই।
  • যখন কোনো স্বরবর্ণ শব্দ বা শব্দাংশের প্রথমে বসে অথবা অন্য কোন স্বরবর্ণের পরে বসে, তখন তাকে আলাদা বর্ণ হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু কোনো স্বরবর্ণ কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের পরে বসলে, তখন নির্দিষ্ট চিহ্ন (বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন) দিয়ে একে প্রকাশ করা হয়। এই চিহ্নকে কার বলা হয়। যেমন, ব্যঞ্জনবর্ণের পরে স্বরবর্ণ বসলে তখন চিহ্ন বা এ-কার ব্যবহৃত হয়ে কে লেখা হয়।
  • এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম হল স্বরবর্ণ। এই বর্ণের কোনো চিহ্ন নেই কারণ এটি পূর্বনির্ধারিত সহজাত স্বরবর্ণ।
  • ব্যঞ্জনবর্ণের পরে বা কোনো স্বরবর্ণ না থাকলে ব্যঞ্জনবর্ণটির সাথে হসন্ত চিহ্ন (্) ব্যবহার করা হয়, যেমন ক্

নিম্নে আধুনিক বাংলা স্বরবর্ণের তালিকা ও উচ্চারন প্রণালী দেখানো হল। এই ১১টি স্বরবর্ণ ছাড়াও , এবং এই তিনটি স্বরবর্ণ পূর্বে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এদের ব্যবহার করা হয় না, এবং "অ" হচ্ছে সম্পূর্ণ ভাবে স্বতন্ত্র স্বরবর্ণ এবং পুরো বাংলা লিপির পূর্বনির্ধারিত সহজাত স্বরবর্ণ, তাই তার বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন নেই।

স্বরবর্ণ
স্বরবর্ণের
স্বতন্ত্র
আকার
স্বরবর্ণের
বৈশিষ্ট্যসূচক
চিহ্ন
-
ি
স্বরবর্ণ
স্বরবর্ণের
স্বতন্ত্র
আকার
স্বরবর্ণের
বৈশিষ্ট্যসূচক
চিহ্ন

ব্যঞ্জনবর্ণ[সম্পাদনা]

এলোমেলো ভাবে বাংলা লিপির অক্ষরগুলি দেখানো হয়েছে
  • আধুনিক বাংলা উচ্চারণে কিচ্ছু ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যে উচ্চারণে পার্থক্য রইল না, যেমন "ন" (দন্ত্য ন), "ণ" (মূর্ধন্য ণ) আর "ঞ" (ঞীয়/ইঙ)।
  • "শ" (তালব্য শ) আর "ষ" (মূর্ধন্য ষ) আধুনিক বাংলা উচ্চারণে একই রকম উচ্চারণ করা। "স" (দন্ত্য স) -র উচ্চারণ শব্দের উপর নির্ভর করে।
  • অর্ধ-স্বরবর্ণ: "ঙ" (উঙ/উম/উঁঅ) শব্দের প্রথমে আসতে পারে না। তেমনই "য়" (অন্তঃস্থ অ) শব্দের প্রথমে আসতে পারে না।
  • "ড়" (ডএ শূন্য ড়) আর "ঢ়" (ঢএ শূন্য ঢ়), মনে করা হয় কমপক্ষে ব্যবহৃত এবং প্রায় অপ্রচলিত ব্যঞ্জনবর্ণ।
  • "য" (অন্তঃস্থ য) আর "জ" (বর্গীয় জ), -র মধ্যের উচ্চারণে পার্থক্য আছে, তা'ও অনেক বার পার্থক্য না'ও বোঝা যেতে পারে।
ব্যঞ্জনবর্ণ
য় ড় ঢ়

সংশোধক বর্ণ[সম্পাদনা]

সংশোধক
চিহ্ন চিহ্নের নাম কাজ
হসন্ত ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত হলে পূর্বনির্ধারিত সহজাত স্বর "অ" উচ্চারিত হয় না
খণ্ড ত "ত" এর খণ্ড রূপ
অনুঃস্বর "ঙ" এর খণ্ড রূপ
বিসর্গ "হ্" এর আরেকটি রূপ, এছাড়া সংক্ষেপের জন্যেও ব্যবহৃত
চন্দ্রবিন্দু সানুনাসিক স্বর

সংখ্যা[সম্পাদনা]

সংখ্যা
বাংলা সংখ্যা পদ্ধতি

বিরামচিহ্ন ও অন্যান্য ব্যবহৃত চিহ্ন[সম্পাদনা]

বিরামচিহ্ন ও অন্যান্য ব্যবহৃত চিহ্ন
চিহ্ন চিহ্নের নাম
দাড়ি
টাকা
, কমা
 ; যতিচিহ্নবিশেষ / সেমিকোলন
 : কোলন
 ? প্রশ্নচিহ্ন
 ! বিস্ময়বোধক চিহ্ন
- ড্যাশ / হাইফেন
" উদ্ধৃতি চিহ্ন
... উপবৃত্ত
/ স্ল্যাশ চিহ্ন
[ ] ( ) { } ⟨ ⟩ বন্ধনী
° তাপাঙ্ক / ডিগ্রী
 % শতাংশ চিহ্ন
~ টিল্ড চিহ্ন

যুক্তাক্ষর[সম্পাদনা]

কোনো স্বরবর্ণ দ্বারা পৃথক না থাকলে সর্বাধিক চারটি ব্যঞ্জনবর্ণ পরস্পর যুক্ত হয়ে যুক্তাক্ষর তৈরী করতে পারে। সাধারণতঃ প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্তাক্ষরের ওপরের দিকে বা বাম দিকে দেখা যায়। যুক্তাক্ষরে অনেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী ব্যঞ্জনবর্ণ সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে মূল ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে তার কোনো সাদৃশ্য থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ অবস্থায় ব্যঞ্জনবর্ণের যা উচ্চারণ, যুক্তাক্ষরে ব্যবহৃত হলে তার উচ্চারণের পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমন এবং এর মিলনের ফলে তৈরী জ্ঞ যুক্তাক্ষরের উচ্চারণ জিণ না হয়ে হয় গ্গ

ন্দ্র (ন + দ + র)

নিলীন রূপ[সম্পাদনা]

  • উচুনিচু: ক্ক, গ্ন, গ্ল, ন্ন, প্ন, প্প, ল্ল, ইত্যাদি...
  • বফলা: গ্ব, ণ্ব, দ্ব, ল্ব, শ্ব
  • পাশাপাশি: দ্দ, ন্দ, ব্দ, ব্জ, প্ট, শ্চ, শ্ছ, ইত্যাদি...

আনুমানিক রূপ[সম্পাদনা]

  • পাশাপাশি: দ্গ
  • বফলা: ধ্ব, ব্ব, হ্ব

সঙ্কুচিত রূপ[সম্পাদনা]

  • পাশাপাশি: ঙ্ক্ষ, ঙ্খ, ঙ্ঘ, ঙ্ম, চ্চ, চ্ছ, চ্ঞ, ড্ড, ব্ব
  • উচুনিচু: ত্ন, ত্ম, ত্ব
  • "ম", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: ম্ন, ম্প, ম্ফ, ম্ব, ম্ভ, ম্ম, ম্ল
  • "ষ", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: ষ্ক, ষ্ট, ষ্ঠ, ষ্প, ষ্ফ, ষ্ম
  • "স", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: স্ক, স্খ, স্ট, স্ত, স্থ, স্ন, স্প, স্ফ, স্ব, স্ম, স্ল

সংক্ষিপ্ত রূপ[সম্পাদনা]

  • "জ", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: জ্জ, জ্ঞ, জ্ব
  • "ঞ", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: ঞ্চ, ঞ্ছ, ঞ্জ, ঞ্ঝ
  • "ণ" ও "প", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: ণ্ঠ, ণ্ড, প্ত, প্স, প্ট, ণ্ট, ণ্ঢ
  • "ত" ও , আকৃতি পরিবর্তন: ত্ত, ত্থ, ত্র, ভ্র
  • "থ", উচুনিচু এবং পাশাপাশি: ন্থ, স্থ, ম্থ
  • "ম", উচুনিচুতে নিচে (নিজের উপরের আকার প্রায় হারিয়ে দেয়): ক্ম, গ্ম, ঙ্ম, ট্ম, ণ্ম, ত্ম, দ্ম, ন্ম, ম্ম, শ্ম, ষ্ম, স্ম
  • "স", উচুনিচুতে নিচে (নিজের উপরের আকার হারিয়ে দেয়): ক্স

বৈকল্পিক রূপ[সম্পাদনা]

  • "ঙ", আকৃতি পরিবর্তন: ঙ্ক, ঙ্গ
  • "ধ", আকৃতি পরিবর্তন করে আর "ঝ"-র মতন রূপ নেয়: গ্ধ, দ্ধ, ন্ধ, ব্ধ
  • রেফ: র্ক, র্খ, র্গ, র্ঘ, ইত্যাদি...
  • রফলা: খ্র, গ্র, ঘ্র, ব্র, জ্র, ট্র, ঠ্র, ড্র, ম্র, স্র, ইত্যাদি...
    • রফলা যুক্ত হলে আকৃতি পরিবর্তন হয়: ক্র, ত্র, ভ্র
  • যফলা: ক্য, খ্য, গ্য, ঘ্য, দ্য, ন্য, শ্য, ষ্য, স্য, হ্য, ইত্যাদি...

ব্যতিক্রমসমূহ[সম্পাদনা]

  • "ক", "ত"-র মতন রূপ নেয়: ক্র, ক্ত
  • "চ", "ব"-র মতন রূপ নেয়: ঞ্চ
  • "ট"+"ট" (নিজের নিচে একটি বক্ররেখা তৈরি করে): ট্ট
  • "ষ"+"ণ" -তে "ণ" নিজেকে ২বার বক্র করে: ষ্ণ
  • "হ"+"ন" -তে "ন" নিজেকে বক্রের মতন করে নেয়: হ্ন
  • "হ"+"ম" (আকৃতি পরিবর্তন): হ্ম

ব্যতিক্রমী ব্যঞ্জনবর্ণ-স্বরবর্ণ সমন্বয়[সম্পাদনা]

    • "গ" আর "শ" -র সঙ্গে "উ" যুক্ত হলে "ও"- র মতন নিচে বক্র তৈরি করে: গু, শু
    • "ত"-তে "উ-কার" -র সঙ্গে যুক্তাক্ষর "প", "ন" বা "স"। তখন "তু", "ও"- র মতন নিচে বক্র তৈরি করে: ন্তু, স্তু, প্তু
    • ব্যঞ্জনের ডানে বক্র তৈরি করে: রু, গ্রু, ত্রু, থ্রু, দ্রু, ধ্রু, ব্রু, ভ্রু, শ্রু
    • "হ"-র সঙ্গে উপরে বক্র তৈরি করে: হু
    • যুক্ত হলে ডানে ঘাই তৈরি করে: রূ, গ্রূ, থ্রূ, দ্রূ, ধ্রূ, ভ্রূ, শ্রূ
    • "হ" -র সঙ্গে যুক্ত হলে ডানে ঘাই তৈরি করে: হৃ

কিচ্ছু উদাহরণ: স+ত +র=স্ত্র, ম+প+র=ম্প্র, জ+জ+ব=জ্জ্ব, ক্ষ+ম=ক্ষ্ম

  • তাত্ত্বিকভাবে, চার-ব্যঞ্জনবর্ণের যুক্তাক্ষর তৈরি করা যেতে পারে, যেমন র+স+ট+র=র্স্ট্র, কিন্তু বাস্তবীয় শব্দে পাওয়া যায় না।

রোমানীকরণ[সম্পাদনা]

বাংলার রোমানীকরণ হল বাংলা লিপিটিকে রোমান লিপিতে উচ্চারণ মতে অনুবাদ করা। বাংলা ভাষার জন্যে অনেক রকম রোমানীকরণ পদ্ধতি প্রস্তাবিত করা আছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনোটাই সরকারি ভাবে স্বীকৃত নয় বা ব্যবহারে কোনো উর্দি নেই।

ইউনিকোড[সম্পাদনা]

১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে ইউনিকোড স্ট্যান্ডার্ডে বাংলা লিপিকে যোগ করা হয়। ইউনিকোডে বাংলা লিপির অবস্থান U+0980 থেকে U+09FF পর্যন্ত।

বাংলা
বাংলা ইউনিকোড তালিকা (PDF)
  0 1 2 3 4 5 6 7 8 9 A B C D E F
U+098x
U+099x
U+09Ax
U+09Bx ি
U+09Cx
U+09Dx
U+09Ex
U+09Fx
Notes
১.^ ইউনিকোড সংস্করণ ৭.০ অনুসারে
২.^ ধূসর এলাকা অনির্ধারিত জায়গা ইঙ্গিত করে।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. প্রাচীন লিপিগুলি (ইংরেজি'তে)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]