কালী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কালী
Shyama Shakespeare Sarani Arnab Dutta 2010.JPG
কলকাতার একটি সার্বজনীন কালীপূজা মণ্ডপে পূজিত কালীমূর্তি
বঙ্গদেশ, মৃত্যু, ধ্বংস
দেবনাগরী काली
সংস্কৃত লিপ্যন্তর Kālī
সম্পর্কিত দেবী , মহাবিদ্যা , মাতৃকা
‌আবাস শ্মশান
মন্ত্র ওঁ ক্রীং কাল্যই নমঃ,
ওঁ কপালিন্যই নমঃ,
ওঁ হ্রিং শ্রিং ক্রিং
পরমেশ্বরি কালিকে স্বাহা
গায়ত্রীːকালিকায়ৈ বিদ্মহে শ্মশানবাসিন্যৈ ধীমহি। তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ।
অস্ত্র খড়্গ
সঙ্গী শিব
Mount শৃগাল (শিবা)

কালী বা কালিকা হলেন একজন হিন্দু দেবী। তাঁর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। প্রধানত শাক্ত ধর্মাবলম্বীরা কালীর পূজা করেন। তন্ত্রশাস্ত্রের মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশ জন দেবীর মধ্যে প্রথম দেবী। শাক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদিকারণ মনে করে। বাঙালি হিন্দু সমাজে দেবী কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়।

পুরাণতন্ত্র গ্রন্থগুলিতে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে তাঁর মূর্তিতে চারটি হাতে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড, বর ও অভয়মুদ্রা; গলায় মানুষের মুণ্ড দিয়ে গাঁথা মালা; বিরাট জিভ, কালো গায়ের রং, এলোকেশ দেখা যায় এবং তাঁকে তাঁর স্বামী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ব্রহ্মযামল মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।[১] কালীর বিভিন্ন রূপভেদ আছে। যেমন – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন মন্দিরে "ব্রহ্মময়ী", "ভবতারিণী", "আনন্দময়ী", "করুণাময়ী" ইত্যাদি নামে কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা ও পূজা করা হয়।[২] আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। এছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা ও জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় প্রতি অমাবস্যা এবং প্রতি মঙ্গলবারশনিবারে কালীপূজা হয়ে থাকে।

কালী দেবীর উপাসকরা হিন্দু বাঙালি সমাজে বিশেষ সম্মান পেয়ে থাকেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। কালীকে বিষয়বস্তু করে রচিত "শ্যামাসংগীত" বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কালী সাধকেরা এবং কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বিশিষ্ট কবিরা অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত লিখেছেন। "মৃত্যুরূপা কালী" হল দেবী কালীকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত দীর্ঘকবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামে একটি কালী-বিষয়ক বইও রচনা করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় অনেক কালীমন্দির আছে। তাই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে কালীকে "কলকাত্তাওয়ালি" (কলকাতানিবাসী) বলা হয়। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীমন্দিরটি হল কালীঘাট মন্দির। এটি একটি সতীপীঠ। এছাড়া দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি, আদ্যাপীঠ, ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি, ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি ইত্যাদি কলকাতা অঞ্চলের বিখ্যাত কয়েকটি কালী মন্দির। এছাড়া লালনার সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ময়দা কালীবাড়ি, উত্তর চব্বিশ পরগনার হালিশহরের রামপ্রসাদী কালী মন্দির ইত্যাদি পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কয়েকটি কালীমন্দির। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের অধুনা ধ্বংসপ্রাপ্ত রমনা কালীমন্দির ছিল খুবই প্রাচীন একটি কালীমন্দির। ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির নতুন দিল্লি কালীবাড়ি একটি ঐতিহ্যপূর্ণ কালীমন্দির।

ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ, যার অর্থ “কৃষ্ণ, ঘোর বর্ণ” (পাণিনি ৪।১।৪২)। মহাভারত অনুসারে, এটি দুর্গার একটি রূপ (মহাভারত, ৪।১৯৫)। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী একটি দানবীর নাম (হরিবংশ, ১১৫৫২)।

‘কাল’, যার অর্থ ‘নির্ধারিত সময়’, তা প্রসঙ্গক্রমে ‘মৃত্যু’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এর সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু লৌকিক ব্যুৎপত্তির দৌলতে এরা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে গেছে। মহাভারত-এ এক দেবীর উল্লেখ আছে যিনি হত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন। তাঁর নাম কালরাত্রি বা কালী। সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, এই শব্দটি নাম হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে আবার ‘কৃষ্ণবর্ণা’ বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। [৩]

রূপভেদ[সম্পাদনা]

তন্ত্র ও পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের কথা পাওয়া যায়। তোড়ল তন্ত্র মতে কালী অষ্টধা বা অষ্টবিধ। যথা – দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালী। মহাকাল সংহিতা অনুসারে আবার কালী নববিধা। এই তালিকা থেকেই পাওয়া যায় কালকালী, কামকলাকালী, ধনদাকালী ও চণ্ডিকাকালীর নাম।

অষ্টধা কালী[সম্পাদনা]

দক্ষিণাকালী[সম্পাদনা]

দক্ষিণাকালীর কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামে আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী।[৪]

তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।[৫]

সিদ্ধকালী[সম্পাদনা]

সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর বামপদ শিবের বুকে ও বামপদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত।[৫]

গুহ্যকালী[সম্পাদনা]

গুহ্যকালী বা আকালী, দক্ষিণ কলকাতার একটি কালীপূজা মণ্ডপে, ২০০৮

গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা।[৬]

মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের।[৫]

মহাকালী[সম্পাদনা]

তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ,চক্র,গদা,ধনুক,বাণ,পরিঘ,শূল,ভূসুণ্ডি,নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।

মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর প্রথম চরিত্র শ্রী শ্রী মহাকালীর ধ্যানমন্ত্র এইরূপ

ওঁ খড়্গং চক্রগদেষুচাপপরিঘান শূলং ভুসূণ্ডিং শিরঃ| শঙ্খং সন্দধতীং করৈস্ত্রিনয়নাং সর্বাঙ্গভূষাবৃতাম্ || নীলাশ্মদ্যুতিমাস্যপাদদশকাং সেবে মহাকালিকাম্ | যামস্তৌচ্ছয়িতে হরৌ কমলজো হন্তুং মধুং কৈটভম্ ||

[৫]

ভদ্রকালী[সম্পাদনা]

ভদ্রকালী, ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দ।
চিত্রকলা; বাসোহলি, হিমাচল প্রদেশ, ভারত,
বর্তমানে এলএসিএমএ-তে রক্ষিত

ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গাসরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম।

গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।[৫]

চামুণ্ডাকালী[সম্পাদনা]

চামুণ্ডা কালী, দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর-চেতলা অঞ্চলের আলিপুর সাধারণ সমিতির মণ্ডপে, ২০০৮।

চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণমার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমীমহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।[৫]

শ্মশানকালী[সম্পাদনা]

কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:[৭]

শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।

শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ।[৮][৯] তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন।[১০]

কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।[১১]

শ্রীকালী[সম্পাদনা]

গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।

কালীপূজা[সম্পাদনা]

গৃহে বা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীপ্রতিমার নিত্যপূজা হয়। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ তিথিতেও কালীপূজার বিধান আছে। আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা, মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে রটন্তী কালীপূজা এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে ফলহারিনী কালীপূজা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও শনি ও মঙ্গলবারে, অন্যান্য অমাবস্যায় বা বিশেষ কোনো কামনাপূরণের উদ্দেশ্যেও কালীর পূজা করা হয়। দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই উৎসব সাড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। তবে এই পূজা প্রাচীন নয়। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে কাশীনাথ রচিত শ্যামাসপর্যাবিধি গ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।[১২] কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে শাস্তির ভীতিপ্রদর্শন করে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন। সেই থেকে নদিয়ায় কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থব্যয় করে কালীপূজার আয়োজন করতেন।[১৩]

মন্দির[সম্পাদনা]

নতুন দিল্লি কালীবাড়ি[সম্পাদনা]

নতুন দিল্লি কালীবাড়ি হল ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি শহরের একটি হিন্দু মন্দির। এটি হিন্দু দেবী কালীর মন্দির এবং দিল্লির বাঙালিদের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে। এটি মন্দির মার্গে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরের (বিড়লা মন্দির) কাছে অবস্থিত। ১৯৩০-এর দশকে দিল্লিতে বাঙালি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি কালীমন্দির স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। কালীঘাট মন্দিরের আদলে একটি মন্দির নির্মিত হয়। ১৯৩৫ সালে মন্দির কমিটি গঠিত হয়। সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন এই কমিটির প্রথম সভাপতি।[১৪] স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায় প্রথম মন্দির ভবনটি উদ্বোধন করেছিলেন। এই মন্দিরে একটি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।

চিত্রমালা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. “‘ব্রহ্মযামলে’ আছে – কালিকা বঙ্গদেশে চ; অর্থাৎ, বঙ্গে দেবী কালিকা বা কালী নামে পূজিতা হন।” (সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৯১, পৃ. ১১০)
  2. সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৯১, পৃ. ১১০
  3. Mahābhārata 10.8.64-69, cited in Coburn, Thomas; Devī-Māhātmya — Crystallization of the Goddess Tradition; Motilal Banarsidass, Delhi, 1984; ISBN 81-208-0557-7 pages 111–112.
  4. দক্ষিণাকালীর ধ্যান, স্তবকবচমালা ও ধ্যানমালা, পণ্ডিত বামদেব ভট্টাচার্য সম্পাদিত, অক্ষয় লাইব্রেরি, কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৮৮
  5. ৫.০ ৫.১ ৫.২ ৫.৩ ৫.৪ ৫.৫ কোন কালী কেমন, কার পুজোয় কী ফল; সঞ্জয় ভুঁইয়া; বর্তমান রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৯
  6. গুহ্যকালীর ধ্যান, স্তবকবচমালা ও ধ্যানমালা, পণ্ডিত বামদেব ভট্টাচার্য সম্পাদিত, অক্ষয় লাইব্রেরি, কলকাতা, পৃষ্ঠা ২৮৮
  7. বৃহৎ তন্ত্রসার, প্রথম খণ্ড, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, বসুমতী সাহিত্য মন্দির, কলকাতা, ১৯৯৭, পৃ. ৩৭৪
  8. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; X নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  9. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; Z নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  10. Smashan Kali
  11. শ্রীশ্রীদুর্গা: তত্ত্বে ও কাহিনীতে, স্বামী অচ্যুতানন্দ, দেব সাহিত্য কুটীর প্রাঃ লিঃ, ২০০৭, পৃ. ১১৩
  12. “স্বর্গত চিন্তাহরণ চক্রবর্তী মহাশয় লিখিয়াছেন যে ১৬৯৯ শকাব্দে (=১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে) কাশীনাথ-রচিত ‘শ্যামাসপর্যাবিধি’তে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ আছে। এই উপলক্ষ্যে পূজার প্রমাণস্বরূপ উক্ত গ্রন্থে পুরাণ ও তন্ত্রের বচন উদ্ধৃত হইয়াছে।” (সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৯১, পৃ. ১১৪)
  13. সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৯১, পৃ. ১১৪-১৫
  14. http://www.newdelhikalibari.com/untold.jsp

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

বাংলা
  • সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯১
ইংরেজি
  • Shanmukha Anantha Natha and Shri Ma Kristina Baird, Divine Initiation Shri Kali Publications (2001) ISBN 0-9582324-0-7 - Has a chapter on Mahadevi with a commentary on the Devi Mahatmyam from the Markandeya Purana.
  • Swami Jagadiswarananda, tr., Devi Mahatmyam Chennai, Ramakrishna Math. ISBN 81-7120-139-3
  • Elizabeth Usha Harding, Kali: The Black Goddess of Dakshineswar ISBN 0-89254-025-7
  • Devadatta Kali, In Praise of The Goddess, The Devimahatmyam and Its Meaning ISBN 0-89254-080-X
  • David Kinsley, Hindu Goddesses: Vision of the Divine Feminine in the Hindu Religious Traditions ISBN 81-208-0379-5
  • Rachel Fell McDermott, Encountering Kali: In the Margins, at the Center, in the West (ISBN 0-520-23240-2)
  • Ajit Mookerjee, Kali: The Feminine Force ISBN 0-89281-212-5
  • Swami Satyananda Saraswati, Kali Puja ISBN 1-887472-64-9
  • Ramprasad Sen, Grace and Mercy in Her Wild Hair: Selected Poems to the Mother Goddess ISBN 0-934252-94-7
  • Sir John Woodroffe (aka Arthur Avalon)Hymns to the Goddess and Hymn to Kali ISBN 81-85988-16-1
  • Robert E. Svoboda, Aghora, at the left hand of God ISBN 0-914732-21-8
  • Lex Hixon, Mother of the Universe: Visions of the Goddess and Tantric Hymns of Enlightenment ISBN 0-8356-0702-X
  • Neela Bhattacharya Saxena, In the Beginning is Desire: Tracing Kali's Footprints in Indian Literature ISBN 81-87981-61-X
  • The Goddess Kali of Kolkata (ISBN 81-7476-514-X) by Shoma A. Chatterji
  • Encountering The Goddess: A Translation of the Devi-Mahatmya and a Study of Its Interpretation (ISBN 0-7914-0446-3) by Thomas B. Coburn
  • Dictionary of Hindu Lore and Legend (ISBN 0-500-51088-1) by Anna Dallapiccola
  • Kali: The Black Goddess of Dakshineswar (ISBN 0-89254-025-7) by Elizabeth Usha Harding
  • In Praise of The Goddess: The Devimahatmyam and Its Meaning (ISBN 0-89254-080-X) by Devadatta Kali
  • Hindu Goddesses: Vision of the Divine Feminine in the Hindu Religious Traditions (ISBN 81-208-0379-5) by David Kinsley
  • Tantric Visions of the Divine Feminine (ISBN 0-520-20499-9) by David Kinsley
  • Offering Flowers, Feeding Skulls: Popular Goddess Worship in West Bengal (ISBN 0-19-516791-0) by June McDaniel
  • Encountering Kali: In the Margins, at the Center, in the West (ISBN 0-520-23240-2) by Rachel Fell McDermott
  • Mother of My Heart, Daughter of My Dreams: Kali and Uma in the Devotional Poetry of Bengal (ISBN 0-19-513435-4) by Rachel Fell McDermott
  • Kali: The Feminine Force (ISBN 0-89281-212-5) by Ajit Mookerjee
  • Seeking Mahadevi: Constructing the Identities of the Hindu Great Goddess (ISBN 0-7914-5008-2) Edited by Tracy Pintchman
  • The Rise of the Goddess in the Hindu Tradition (ISBN 0-7914-2112-0) by Tracy Pintchman
  • Shakti and Shâkta, Arthur Avalon (Sir John Woodroffe), Oxford Press/Ganesha & Co., 1918
  • Sri Ramakrishna (The Great Master), Swami Saradananda, Ramakrishna Math,1952
  • Devi Mahatmyam, Swami Jagadiswarananda, Ramakrishna Math, 1953
  • The Art of Tantra, Philip Rawson, Thames & Hudson, 1973
  • Hindu Gods & Goddesses, Swami Harshananda, Ramakrishna Math, 1981
  • Sri Ramakrishna: The Spiritual Glow, Kamalpada Hati, P.K. Pramanik, Orient Book Co., 1985
  • Hindu Goddesses, David R. Kinsley, University of California Press, 1988
  • Kali (The Black Goddess of Dakshineswar) Elizabeth U. Harding, Nicolas Hays, 1993
  • Impact of Tantra on Religion & Art, T. N. Mishra, D.K. Print World, 1997
  • Indian Art (revised), Roy C. Craven, Thames & Hudson, 1997
  • A Dictionary of Buddhist & Hindu Iconography (Illustrated), Frederick W. Bunce, D.K. Print World, 1997
  • Tantra (The Path of Ecstasy), Georg Feuerstein, Shambhala, 1998
  • Oxford Concise Dictionary of World Religions, John Bowker, Oxford Press, 2000
  • Tantra in Practice, David Gordon White, Princeton Press, 2000
  • Encountering Kali (In the margins, at the center, in the west), Rachel Fell McDermott, Berkeley : University of California Press, 2003

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

কালী সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে হলে উইকিপিডিয়ার সহপ্রকল্পগুলোতে অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন:

Wiktionary-logo-en.svg সংজ্ঞা, উইকিঅভিধান হতে
Wikibooks-logo.svg পাঠ্যবই, উইকিবই হতে
Wikiquote-logo.svg উক্তি, উইকিউক্তি হতে
Wikisource-logo.svg রচনা সংকলন, উইকিউৎস হতে
Commons-logo.svg ছবি ও অন্যান্য মিডিয়া, কমন্স হতে
Wikivoyage-Logo-v3-icon.svg ভ্রমণ নির্দেশিকা, উইকিভয়েজ হতে
Wikinews-logo.png সংবাদ, উইকিসংবাদ হতে