রাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রাম
Lord Rama with arrows.jpg
ধনুর্বাণধারী রাম
দেবনাগরী राम
তামিল লিপি ராமா
সম্পর্কিত বিষ্ণুর অবতার
‌আবাস বৈকুণ্ঠ, অযোধ্যা
মন্ত্র রাং রামায় নমঃ
অস্ত্র ধনুক ও বাণ
সঙ্গী সীতা

রাম (সংস্কৃত: राम) হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার[১] হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলিতে তাঁকে অযোধ্যার রাজা বলা হয়েছে। সপ্তম অবতার রাম ও অষ্টম অবতার কৃষ্ণ হলেন বিষ্ণুর অবতারগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুধর্মে তিনি একজন জনপ্রিয় দেবতা। ভারতনেপাল রাষ্ট্রে তাঁর পূজার বহুল প্রচলন দেখা যায়। হিন্দুধর্মের রাম উপাসনা-কেন্দ্রিক সম্প্রদায়গুলিতে রামকে বিষ্ণুর অবতার না বলে সর্বোচ্চ ঈশ্বর হিসেবে মান্য করার প্রবণতা দেখা যায়। রাম সূর্যবংশে (ইক্ষবাকু বংশ বা পরবর্তীকালে উক্ত বংশের রাজা রঘুর নামানুসারে রঘুবংশ নামে পরিচিত) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রামের একটি বিশেষ মূর্তিতে তাঁর পাশে তাঁর ভাই লক্ষ্মণ, স্ত্রী সীতা ও ভক্ত হনুমানকে দেখা যায়। এই মূর্তিকে বলা হয় "রাম পরিবার "। হিন্দু মন্দিরে এই "রাম পরিবার" মূর্তির পূজাই বেশি হতে দেখা যায়।[২][৩]

হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব সম্প্রদায় ও বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থগুলিতে যেসব জনপ্রিয় দেবতার কথা পাওয়া যায়, তার অন্যতম হলেন রাম। সারা দক্ষিণদক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় রাম জনপ্রিয় দেবতা।[৪] লোকবিশ্বাস অনুসারে, রামের জন্মস্থান হল ভারতের অযোধ্যা শহর। সেখানে "রামলালা" বা শিশু রামের মূর্তিও পূজা হয়। রাম-সংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনির প্রধান উৎস হল ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ[৫]

অযোধ্যার রাজা দশরথ ও তাঁর প্রধান স্ত্রী কৌশল্যার জ্যেষ্ঠপুত্র হলেন রাম। হিন্দুরা রামকে বলেন "মর্যাদা পুরুষোত্তম" (অর্থাৎ, "শ্রেষ্ঠ পুরুষ" বা "আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিপতি" বা "গুণাধীশ")।[৬] তিনি সীতার স্বামী। সীতাকে হিন্দুরা লক্ষ্মীর অবতার মনে করেন। হিন্দুদের দৃষ্টিতে তিনি নারীর আদর্শ।[৬][৭]

রামের জীবনকথাকে হিন্দুরা ধর্মনিষ্ঠার আদর্শ হিসেবে মান্য করেন। তাঁকে আদর্শ মানুষ মনে করা হয়। পিতার সম্মানরক্ষার্থে তিনি সিংহাসনের দাবি ত্যাগ করে চোদ্দো বছরের জন্য বনে গিয়েছিলেন।[৮] তাঁর স্ত্রী সীতা ও ভাই লক্ষ্মণও তাঁর বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারবেন না বলে তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে চোদ্দো বছর বনে কাটিয়েছিলেন। বনবাসকালে লঙ্কার রাজা রাবণ সীতাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর রাম রাবণের বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে রাবণ পরাজিত হন। রাম সীতাকে উদ্ধার করে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। সেখানে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়। পরে তিনি একজন সম্রাটে পরিণত হন।[৮] তাঁর রাজ্যে প্রজারা সুখে, শান্তিতে বাস করত এবং রাজ্যের সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার অব্যাহত ছিল। এই জন্য রামের শাসনের অনুসরণে সুশাসিত রাজ্যকে "রামরাজ্য" বলার প্রবণতা চালু হয়।

রামায়ণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, রামের সীতা-অনুসন্ধান ও যুদ্ধজয়ের ক্ষেত্রে রামের প্রতি সীতার চরম প্রেম ও সতীত্বের প্রতি গুরুত্ব আরোপ। রাবণের বন্দিনী হওয়া সত্ত্বেও সীতার পবিত্রতা রক্ষিত হয়েছিল। অন্যদিকে, রামের ছোটো তিন ভাই লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্নভরতও পবিত্রতা, ভ্রাতৃপ্রেম ও শক্তির আদর্শ।[৮] কোনো কোনো মতে, তাঁরাও "মর্যাদা পুরুষোত্তম" ও সপ্তম অবতারের অংশ। রামের পবিত্রতা কিষ্কিন্ধ্যার বানরহনুমানকে আকৃষ্ট করেছিল। এঁরাই তাঁকে সীতা উদ্ধারে সাহায্য করেন।[৮] রামের গল্প ভারতীয় উপমহাদেশদক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিশেষ জনপ্রিয়। হিন্দুধর্মে রাম অন্তহীন প্রেম,[৯] সাহস, শক্তি, ভক্তি, কর্তব্য ও মূল্যবোধের দেবতা।

ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

ব্যক্তিনাম হিসেবে "রাম" শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে (১০।৯৩।১৪):[১০] দুঃসীম প্রথবনের স্তব গাই, বেণ ও রামের স্তব গাই, বিশিষ্ট অসুরদের স্তব গাই, রাজন্যবর্গের স্তব গাই। রাম শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ হল "রামী", রাত্রির একটি বিশেষণ। বেদে দুই জন রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথম জন হলেন "মার্গবেয়" বা "ঔপতশ্বিনী" রাম এবং দ্বিতীয় জন হলেন "জামদগ্ন্য" রাম। উত্তর-বৈদিক যুগে তিন জন রামের কথা জানা যায়,

  1. বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম। ইনি দশরথের পুত্র এবং রঘুবংশে জাত।
  2. বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম। ইনি "জামদগ্ন্য" বা "ভার্গব" রাম নামে পরিচিত। ইনি অমর।
  3. কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও বিষ্ণুর অষ্টম অবতার বলরাম

বিষ্ণু সহস্রনাম স্তোত্রে বিষ্ণুর ৩৯৪তম নামটি হল রাম। আদি শঙ্করের টীকা অনুসারে (রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী তপস্যানন্দের অনুবাদ) "রাম" শব্দের দুটি অর্থ আছে: যোগীরা যাঁর সঙ্গে রমণ (ধ্যান) করে আনন্দ পান, সেই পরব্রহ্ম বা সেই বিষ্ণু যিনি দশরথের পুত্ররূপে অবতার গ্রহণ করেছিলেন।[১১]

রামের অন্যান্য নামগুলি হল "রামবিজয়" (জাভানিজ ভাষা), ফ্রেয়াহ রাম (খমের ভাষা), ফ্রা রাম (লাও ভাষা ও থাই ভাষা), মেগাত সেরি রাম (মালয় ভাষা), রাকা বানতুগান (মারানাও ভাষা) ও রামার (তামিল ভাষা)।

সাহিত্যিক উৎস[সম্পাদনা]

বাল্মীকি

রাম-সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যানের প্রধান উৎস ঋষি বাল্মীকি রচিত রামায়ণ মহাকাব্য। এছাড়া বিষ্ণু পুরাণ-এ বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের উল্লেখ আছে। ভাগবত পুরাণ-এর নবম স্কন্ধের দশম ও একাদশ অধ্যায়ের রামের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া মহাভারত-এও রামের উপাখ্যান উল্লিখিত হয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রামায়ণের নানা পাঠান্তর প্রচলিত আছে। যদিও সংস্কৃতে লেখা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও রামায়ণের কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্বের অনুগামীরা মনে করেন, মূল-রামায়ণ নামে একটি রামায়ণ বাল্মীকি রামায়ণেরও আগে লেখা হয়েছিল। সেই রামায়ণকে তাঁরা বাল্মীকি রামায়ণের চেয়েও বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন। সংস্কৃত ভাষায় অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ রামায়ণ হল অধ্যাত্ম রামায়ণ। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর গুজরাতি কবি ভট্টির লেখা সংস্কৃত কাব্য ভট্টিকাব্য রামায়ণের কাহিনির পুনর্কথনের পাশাপাশি পাণিনির ব্যাকরণ গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ীপ্রাকৃত ভাষাশৈলী নিয়ে আলোচনা করেছে।[১২] ভারতের অধিকাংশ প্রধান ভাষায় নিজস্ব রামায়ণ রয়েছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্বাদশ শতাব্দীর তামিল কবি কম্বরের লেখা রামাবতারম্, পঞ্চদশ শতাব্দীর বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝার লেখা শ্রীরাম পাঁচালি ও ষোড়শ শতাব্দীর হিন্দি কবি তুলসীদাসের লেখা রামচরিতমানস। আধুনিক রামায়ণ গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কুভেম্পুর কন্নড় রামায়ণ শ্রীরামদর্শনম্, বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণের তেলুগু রামায়ণ রামায়ণ কল্পবৃক্ষম্। এই দুই গ্রন্থই জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্ত। ভারতের স্থানীয় ভাষায় রচিত রামায়ণগুলির মধ্যে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।[১৩]

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও রামায়ণের বিভিন্ন পাঠান্তর দেখা যায়। এই সব পাঠান্তরে স্থানীয় ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্থানীয় ভাষাগুলির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠেছে। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের কাকাউইন রামায়ণ, বালি দ্বীপের রামকবচ, মালয়েশিয়ার হিকায়ত সেরি রাম, ফিলিপিনসের মারাদিয়া লাওয়ানাথাইল্যান্ডের রামকিয়েন (বা ফ্রা রাম) এই জাতীয় গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ব্যাংককের ওয়াট ফ্রা কায়েউ মন্দিরে রামায়ণের ছবি দেখা যায়। মায়ানমারের জাতীয় মহাকাব্য হল ইয়ামা জাতদাও হল রামায়ণের ব্রহ্মদেশীয় সংস্করণ। এই গ্রন্থে রামকে ইয়ামা নামে অভিহিত করা হয়েছে। কম্বোডিয়ার রেয়ামকেরে রামের নাম ফ্রেয়াহ রাম। লাওসের ফ্রা লাক ফ্রা লাম গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধকে রামের অবতার বলা হয়েছে।

ঐতিহাসিক যুগ[সম্পাদনা]

ঐতিহাসিক এইচ. ডি. শঙ্কলিয়ার মতে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রামায়ণ রচিত হয়।[১৪] এ. এল. ব্যাশামের মতে অবশ্য রাম খ্রিস্টীয় অষ্টম বা সপ্তম শতাব্দীর এক ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন।[১৫]

অন্যান্য ভারতীয় ধর্মে রামচন্দ্র[সম্পাদনা]

বৌদ্ধধর্ম[সম্পাদনা]

বৌদ্ধধর্মানুসারে একবার বোধিসত্ত্ব শ্রীরামচন্দ্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জাতকের কাহিনিতে তাই রামচন্দ্রের উল্লেখ আছে। বৌদ্ধধর্মে রামচন্দ্রকে পরম ধার্মিক এবং আদর্শ নৃপতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

শিখ ধর্ম[সম্পাদনা]

শিখ ধর্মের ধর্মগ্রন্থ আদিগ্রন্থ বা শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব-এ অযোদ্ধার নৃপতি পরম ধার্মিক রাজা রামচন্দ্রের কাহিনী ও রামায়ণের যুদ্ধের কাহিনী বর্নিত আছে।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Ganguly, S. (2003)। "The Crisis of Indian Secularism"Journal of Democracy 14 (4): 11–25। ডিওআই:10.1353/jod.2003.0076। সংগৃহীত 2008-04-12 
  2. http://www.hindutemplede.com/index.php?option=com_content&view=article&id=59
  3. http://translate.google.com/#hi/en/%E0%A4%AA%E0%A4%B0%E0%A4%BF%E0%A4%B5%E0%A4%BE%E0%A4%B0
  4. Dimock Jr, E.C. (1963)। "Doctrine and Practice among the Vaisnavas of Bengal"। History of Religions 3 (1): 106–127। জেএসটিওআর 1062079ডিওআই:10.1086/462474 
  5. Rosen, S. (1994)। Vaisnavism: Contemporary Scholars Discuss the Gaudiya Tradition। Motilal Banarsidass Publ.। 
  6. ৬.০ ৬.১ Hess, L. (2001)। "Rejecting Sita: Indian Responses to the Ideal Man's Cruel Treatment of His Ideal Wife"Journal of the American Academy of Religion 67 (1): 1–32। ডিওআই:10.1093/jaarel/67.1.1পিএমআইডি 21994992। সংগৃহীত 2008-04-12 
  7. Kanungo, H.। "The Distinct Speciality of Lord Jagannath"Orissa Review। সংগৃহীত 2008-04-12 
  8. ৮.০ ৮.১ ৮.২ ৮.৩ Griffith, R.T.H. (1870–1874)। The Rámáyana of Válmíki। London: Trübner & Co.; Benares: E. J. Lazarus and Co.। 
  9. Goswami, S.D. (2001)। Vaisnava Compassion। La Crosse, Florida: GN Press। 
  10. Hale, Wash Edward (1986)। Ásura- in early Vedic religionআইএসবিএন 978-81-208-0061-8 
  11. "श्रीविष्णुसहस्रनामस्तोत्रम् (Shri Vishnu sahasranama)|note search with string 'राम'" 
  12. Fallon, Oliver. 2009. Bhatti’s Poem: The Death of Rávana (Bhaṭṭikāvya). New York: Clay Sanskrit Library [১]. ISBN 978-0-8147-2778-2 | ISBN 0-8147-2778-6 |
  13. The Oral Tradition and the many "Ramayanas", Moynihan @Maxwell, Maxwell School of Syracuse University's South Asian Center
  14. See Sankalia, H.D., Ramayana: Myth or Reality, New Delhi, 1963
  15. Basham, A.L., The Wonder that was India, London, 1956, p 303

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]