দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি
Kolkatatemple.jpg
নাম দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি
স্রষ্টা রানি রাসমণি
নির্মাণকাল ১৮৫৫
প্রধান দেবতা ভবতারিণী কালী
স্থাপত্য নবরত্ন মন্দির, বঙ্গীয় স্থাপত্যশৈলী
স্থান দক্ষিণেশ্বর, কামারহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি কলকাতার অদূরে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত একটি কালীমন্দির। এটি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কামারহাটি শহরের অন্তঃপাতী দক্ষিণেশ্বরে অবস্থিত। ১৮৫৫ সালে প্রসিদ্ধ মানবদরদি জমিদার রানি রাসমণি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।[১] এই মন্দিরে দেবী কালীকে "ভবতারিণী" নামে পূজা করা হয়।[১] ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট যোগী রামকৃষ্ণ পরমহংস এই মন্দিরে কালীসাধনা করতেন।

কথিত আছে, রানি রাসমণি দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।[১] মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে রামকৃষ্ণ পরমহংসের দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায় রানিকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। রামকুমারই ছিলেন মন্দিরের প্রথম প্রধান পুরোহিত।[১] ১৮৫৭-৫৮ সালে কিশোর রামকৃষ্ণ পরমহংস এই মন্দিরের পূজার ভার গ্রহণ করেন।[১] পরবর্তীকালে তিনি এই মন্দিরকেই তাঁর সাধনক্ষেত্ররূপে বেছে নেন।

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি চত্বরে কালীমন্দির ছাড়াও একাধিক দেবদেবীর মন্দির ও অন্যান্য ধর্মস্থল অবস্থিত। মূল মন্দিরটি নবরত্ন মন্দির। এটি টালিগঞ্জের রামনাথ মণ্ডল নির্মিত নবরত্ন মন্দিরের আদর্শে নির্মিত।[১] মূল মন্দির ছাড়াও রয়েছে "দ্বাদশ শিবমন্দির" নামে পরিচিত বারোটি আটচালা শিবমন্দির। মন্দিরের উত্তরে রয়েছে "শ্রীশ্রীরাধাকান্ত মন্দির" নামে পরিচিত রাধাকৃষ্ণ মন্দির এবং মন্দিরের দক্ষিণে রয়েছে নাটমন্দির।[১] মন্দির চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে রামকৃষ্ণ পরমহংসের বাসগৃহ।[১] মূল মন্দির চত্বরের বাইরে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর পরিবারবর্গের স্মৃতিবিজড়িত আরও কয়েকটি স্থান রয়েছে, যা আজ পুণ্যার্থীদের কাছে ধর্মস্থানরূপে বিবেচিত হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৬৫ সালের তোলা ছবিতে দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি

১৮৪৭ সালে ধনী বিধবা জমিদারনি রানি রাসমণি দেবী অন্নপূর্ণাকে পূজার মানসে কাশীতে তীর্থযাত্রার আয়োজন করেন। ২৪টি নৌকায় আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী ও রসদ নিয়ে তিনি রওয়ানা হন। কিংবদন্তি অনুসারে যাত্রার পূর্বরাত্রে রানি দেবী কালীর স্বপ্নদর্শন পান। দেবী তাঁকে বলেন, [২]

কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি নয়নাভিরাম মন্দিরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা কর। সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই আমি পূজা গ্রহণ করব।
রামকৃষ্ণ পরমহংস ১৮৫৫ সালে এই মন্দিরে আসেন তাঁর দাদা প্রধান পুরোহত রামকুমারের সহযোগীরূপে এবং রামকুমারের মৃত্যুর পর তিনি দাদার স্থলাভিষিক্ত হন

এই স্বপ্নের পর রানি অবিলম্বে গঙ্গাতীরে জমি ক্রয় করেন এবং মন্দির নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৮৪৭ সালে এই বিরাট মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয়; শেষ হয় ১৮৫৫ সালে।

মন্দিরের ২০ একরের প্লটটি জন হেস্টি নামে এক ইংরেজের কাছ থেকে কেনা হয়। লোকমুখে জায়গাটি পরিচিত ছিল সাহেবান বাগিচা নামে। এর একটি অংশ ছিল কচ্ছপাকার মুসলমান গোরস্থান। তাই তন্ত্রমতে স্থানটি শক্তি উপাসনার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।[৩] আটবছরে নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই মন্দির নির্মিত হয়। ১৮৫৫ সালের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন মহাসমারোহে মন্দিরে মূর্তিপ্রতিষ্ঠা করা হয়। পূর্বে মন্দিরের আরাধ্যাকে মাতা ভবতারিনি কালিকা নামে অভিহিত করা হয়েছিল। রামকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রধান পুরোহিত পদে বৃত হন, তাঁর ছোটোভাই গদাধর বা গদাই (পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ পরমহংস) তাঁর সহযোগী হন। পরে তাঁর ভাগনে হৃদয়ও তাঁকে সহায়তা করতে থাকেন।[৪]

মন্দিরের আরাধ্যা দেবী ভবতারিণী কালী, পদতলে শিব

পরের বছরই রামকুমার দেহরক্ষা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর সহধর্মিনী সারদা দেবী মন্দির চত্বরের বাইরে নহবতখানায় অবস্থান করতে থাকেন। এই নহবতখানা এখন সারদা দেবীর মন্দির।

এই সময় থেকে ১৮৮৬ পর্যন্ত প্রায় তিরিশ বছর শ্রীরামকৃষ্ণ এই মন্দিরে অবস্থান করেন। তাঁর অবস্থানের কারণে পরবর্তীকালে এই মন্দির পরিণত হয় একটি তীর্থক্ষেত্রে।

স্থাপত্য[সম্পাদনা]

মন্দিরটি বঙ্গীয় স্থাপত্যশৈলীর নবরত্ন স্থাপত্যধারায় নির্মিত। মূল মন্দিরটি তিন তলা। উপরের দুটি তলে এর নয়টি চূড়া বণ্টিত হয়েছে। মন্দির দক্ষিণমুখী। একটি উত্তোলিত দালানের উপর গর্ভগৃহটি স্থাপিত। এই দালানটি ৪৬ বর্গফুট প্রসারিত ও ১০০ ফুট উঁচু।[৫]

গর্ভগৃহে (স্যাঙ্কটাম স্যাঙ্কটোরিয়াম) শিবের বক্ষোপরে ভবতারিণী নামে পরিচিত কালীমূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত। এই মূর্তিদ্বয় একটি রুপোর সহস্রদল পদ্মের উপর স্থাপিত।

উত্তোলিত দালানের উপর নির্মিত দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির গর্ভগৃহ

মূল মন্দিরের কাছে যে বারোটি একই প্রকার দেখতে পূর্বমুখী শিবমন্দির রয়েছে সেগুলি আটচালা স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। গঙ্গার একটি ঘাটে দুই ধারে এই মন্দিরগুলি দণ্ডায়মান। মন্দির চত্বরের উত্তর-পূর্বে রয়েছে বিষ্ণুমন্দির বা রাধাকান্ত মন্দির। এই মন্দিরে একটি রুপোর সিংহাসনে সাড়ে একুশ ইঞ্চির কৃষ্ণ ও ষোলো ইঞ্চির রাধামূর্তি প্রতিষ্ঠিত।

চিত্রকক্ষ[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ ১.৪ ১.৫ ১.৬ ১.৭ পশ্চিমবঙ্গের কালী ও কালীক্ষেত্র, দীপ্তিময় রায়, মণ্ডল বুক হাউস, কলকাতা, ১৪১৪ মুদ্রণ, পৃ. ১০৭-১৩
  2. Rosen, Steven (2006)। Essential Hinduism। Greenwood Publishing Group। পৃ: 201–202। 
  3. Prabhananda 2003
  4. Mehrotra 2008 p.11
  5. Dakshineswar Temple Banglapedia.

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

উইকিভ্রমণে Dakshineswar সম্পর্কিত ভ্রমণ নির্দেশিকা রয়েছে।

টেমপ্লেট:পশ্চিমবঙ্গের মন্দির

স্থানাঙ্ক: ২২°৩৯′১৮″ উত্তর ৮৮°২১′২৮″ পূর্ব / ২২.৬৫৫০০° উত্তর ৮৮.৩৫৭৭৮° পূর্ব / 22.65500; 88.35778