রবীন্দ্রসংগীত
রবীন্দ্রসংগীত হল বিশিষ্ট বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ও সুরারোপিত গান। বাংলা সংগীতের জগতে এই গানগুলি এক বিশেষ স্থানের অধিকারী। রবীন্দ্রনাথের জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ও আমার সোনার বাংলা গানদুটি যথাক্রমে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় স্তোত্র বন্দে মাতরম্ রবীন্দ্রনাথেরই সুরারোপিত।
রবীন্দ্রনাথ রচিত মোট গানের সংখ্যা ১৯১৫।[১] রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতে উপনিষদ্, হিন্দু পুরাণ ও সংস্কৃত কাব্যনাটক, বৈষ্ণব ও বাউল দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্ট। সুরের দিক থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত (হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটকী উভয় প্রকারই), বাংলা লোকসংগীত, কীর্তন ও রামপ্রসাদী এবং পাশ্চাত্য ধ্রুপদি ও লোকসংগীতের "ত্রিবেণীসংগম" ঘটেছে রবীন্দ্রসংগীতে।[২] রবীন্দ্রনাথের সমুদয় গান তাঁর গীতবিতান গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। উক্ত গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে কবি গানগুলিকে "পূজা", "স্বদেশ", "প্রেম", "প্রকৃতি", "বিচিত্র" "আনুষ্ঠানিক", এই ছয়টি "পর্যায়ে" বিন্যস্ত করেছিলেন।[৩] কবির প্রয়াণের পর প্রথম দুটি খণ্ডে অগ্রন্থিত গানগুলি নিয়ে গীতবিতান সংকলনের তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। এই খণ্ডে গানগুলি "গীতিনাট্য", "নৃত্যনাট্য", "ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী", "নাট্যগীতি", "জাতীয় সংগীত", "পূজা ও প্রার্থনা", "আনুষ্ঠানিক", "প্রেম ও প্রকৃতি" ইত্যাদি পর্বে বিন্যস্ত হয়।[৪] ৬৪ খণ্ডে প্রকাশিত স্বরবিতান গ্রন্থে তাঁর সমুদয় গানের স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের পরিবারে সংগীতের চর্চা ছিল মজ্জাগত। পিতা দেবেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের দাদারা নিয়মিত সংগীতচর্চা করতেন। তবে কিশোর রবীন্দ্রনাথের সংগীতশিক্ষায় সর্বাধিক প্রভাব ছিল তাঁর "নতুনদাদা" জ্যোতিরিন্দ্রনাথের।[৫] তেরো বছর বয়সে লেখা "গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে" গানটি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের প্রথম রচিত গান। এরপর প্রায় সত্তর বছর ধরে তিনি অবিশ্রাম গীতিরচনা করেন। স্বরচিত গান ছাড়াও সুরারোপ করেন বৈদিক স্তোত্র, বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস ও অন্যান্যদের রচনায়। তাঁর শেষ গান "হে নূতন দেখা দিক আর-বার" ১৯৪১ সালে কবি তাঁর জীবনের শেষ জন্মদিন উপলক্ষ্যে রচনা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও ছিলেন সুগায়ক। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তিনি স্বরচিত গান গেয়ে শোনাতেন। কয়েকটি গান গ্রামাফোন ডিস্কে রেকর্ডও করেছিলেন। সংগীত প্রসঙ্গে একাধিক প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন কবি। সংগীতকে তিনি বিদ্যালয়-শিক্ষার পরিপূরক এক বিদ্যা মনে করতেন।[৬] রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর গানগুলি বাঙালি সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
পরিচ্ছেদসমূহ |
বৈশিষ্ট্য [সম্পাদনা]
তিনি কেবল গীতিকার বা সুরকার নন, তিনি সংগীতস্রষ্টা। রবীন্দ্রসংগীত কাব্য ও সুরের মধুর মিলনের অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বরচিত অধিকাংশ গানে সুরারোপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। "স্থায়ী", "অন্তরা", "সঞ্চারী" এবং "আভোগ" - এই চারটি রূপবন্ধের ক্রমিক সমন্বয়ে যে একটি গান সম্পূর্ণ হয়ে তা তিনি সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর এই উপলব্ধি সর্বভারতীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। তবে তিনি গানে "তান-বিস্তারের" অপরিহার্যতা অস্বীকার করে সংগীত রচনা করেছেন। তাঁর গানে বিস্তার ব্যতিরেকেই সুর শব্দকে ছাড়িয়ে বিশেষ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। সুরের বৈশিষ্ট্যেই তাঁর গান রবীন্দ্রসংগীত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে প্রচলিত তালে সুর বাঁধার সঙ্গে সঙ্গে অপ্রচলিত নানা তাল তিনি ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাছে আমরা পেয়েছি ১৫ মাত্রা, ১৭ মাত্রা, ১৮ মাত্রা, ১৯ মাত্রা ইত্যাদির বাংলা গান। "সঙ্গীতের মুক্তি" নামীয় প্রবন্ধটি তাঁর সংগীত চিন্তার দলিল।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ক-গায়িকা [সম্পাদনা]
রবীন্দ্রসঙ্গীত বাংলার সংস্কৃতির এক প্রধান স্তম্ভ। আক্ষরিক অর্থে শত শত বাঙালি গায়ক গায়িকা এই গান গেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন। কয়েকজন বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়কের নাম নিচে দেয়া হল।
- ইন্দুলেখা ঘোষ
- পঙ্কজ মল্লিক
- নলিনীকান্ত সরকার
- রাজেশ্বরী দত্ত
- মায়া সেন
- নীলিমা সেন
- অমিতা সেন
- আরতি মুখোপাধ্যায়
- চিত্রলেখা চৌধুরী
- বন্দনা সিংহ
- শৈলজারঞ্জন মজুমদার
- শান্তিদেব ঘোষ
- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
- কনক দাস
- কণিকা বন্দোপাধ্যায়
- অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়
- অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়
- দেবব্রত বিশ্বাস
- পাপিয়া সারোয়ার
- মনীষা মুরলী নায়ার
- মনোজ মুরলী নায়ার
- মালতি ঘোষাল
- মোহন সিংহ খাঙ্গুরা
- কে এল সায়গল
- সুবিনয় রায়
- চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়
- সুচিত্রা মিত্র
- সাগর সেন
- সুমিত্রা সেন
- ইন্দ্রাণী সেন
- শ্রাবণী সেন
- অর্ঘ্য সেন
- রুমা গুহঠাকুরতা
- রাজেশ্বর ভট্টাচার্য
- কলিম শরাফী
- কাদেরী কিবরিয়া
- রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা
- মিতা হক
- লোপামুদ্রা মিত্র
- স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত
- শিবাজী চট্টোপাধ্যায়
- শুভমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
- শ্রীকান্ত আচার্য
- শ্রীরাধা বন্দোপাধ্যায়
- সুপ্রতীক দাস
- ঋতু গুহ
- গীতা ঘটক
- রেণুকা দাসগুপ্তা
- জয়তী চক্রবর্তী
- কমলিনী মুখোপাধ্যায়
- অদিতি মহসিন
- অদিতি গুপ্তা
- দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়
- শাশা
- শ্রেয়া গুহঠাকুরদা
- মনোময় ভট্টাচার্য
- ইন্দ্রনীল সেন
- কিশোর কুমার
- অরুন্ধুতি হোমচউধুরি
আরও দেখুন [সম্পাদনা]
পাদটীকা [সম্পাদনা]
- ↑ গীতবিতানের জগৎ, সুভাষ চৌধুরী, প্যাপিরাস, কলকাতা, ২০০৬ সং, পৃ. ১৭১
- ↑ রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ১৪০৫ মুদ্রণ, পৃ. ২১, ৩৭-৩৮
- ↑ গীতবিতানের জগৎ, পৃ. ১২২
- ↑ গীতবিতানের জগৎ, পৃ. ১২৪
- ↑ রবীন্দ্রজীবনকথা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৪১৪, পৃ. ২০-২৩
- ↑ রবীন্দ্রনাথের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাদর্শে সঙ্গীত ও নৃত্য, শান্তিদেব ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৮৭, পৃ. ৯