যজুর্বেদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

যজুর্বেদ (সংস্কৃত: यजुर्वेद) বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় লিখিত প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ। যজুঃ শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে যজ্ঞার্থক "যজ" ধাতু থেকে। “যজুঃ” মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে আহুতি প্রদান প্রভৃতি কর্ম অনুষ্ঠিত হয়। যজুর্বেদকে বেদের কর্মকাণ্ড বলা হয়। যজুর্বেদের পুরোহিতের নাম তাই “অধ্বর্যু”, যার উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ অধ্বর থেকে যা যজ্ঞ এর অপর নাম। যজ্ঞকে রূপদান করেন বলে এর নাম অধ্বর্যু। যজুঃ, অর্থাৎ যজ্ঞীয় সূত্রসমূহের বেদ, অর্থাৎ জ্ঞানের সংহিতা বা সংকলন, অধ্বর্যু পুরোহিতের জন্য নির্দিষ্ট বলেই নাম হয়েছে যজুর্বেদ সংহিতা। যজুঃ মন্ত্র বলতে গদ্যাত্মক মন্ত্রকে বোঝায়, যদিও এটি গদ্য-পদ্য মিশ্রিত।

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

যজুর্বেদের বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়। সেগুলি হল – অধ্বর্যুবেদ,কর্মবেদ ও অধ্বর্যববেদ। এই বেদে কৃষ্ণযজুর্বেদ এবং শুক্লযজুর্বেদ নামক পরস্পরের থেকে বেশ পৃথক দুটি মুখ্য সংহিতা সংরক্ষিত হয়েছে।

কৃষ্ণযজুর্বেদ[সম্পাদনা]

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বৈশম্পায়নের প্রিয় শিষ্য মহাজ্ঞানী যাজ্ঞ্যবল্ক্য গুরুর সঙ্গে বিবাদ করে লব্ধ জ্ঞান বমি করে দিলে তাঁর সহাধ্যায়ী ঋষিগণ তিত্তিরি পাখির আকারে তা গ্রহণ করেন বলেই এই বিদ্যার নাম তৈত্তিরীয়সংহিতা। আবার মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের সংমিশ্রণ (কৃষ্ণ) থাকায় এই বেদের নাম কৃষ্ণযজুর্বেদ। কৃষ্ণযজুর্বেদের অন্তর্গত সংহিতা চারটি। যেমন –

  • কাঠক : কঠসম্প্রদায়ের পাঠপ্রণালী
  • কপিষ্ঠল : কাঠকের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে, এর অংশমাত্র বর্তমান।
  • মৈত্রায়ণী : মৈত্রায়ণীয় সম্প্রদায়ের পাঠপ্রণালী
  • তৈত্তিরীয় : তৈত্তিরীয় সম্প্রদায়ের পাঠপ্রণালী। একে আপস্তম্ব সংহিতাও বলে।

কৃষ্ণযজুর্বেদ বা তৈত্তিরীয় সংহিতায় সাতটি কাণ্ডে মোট ৪৪টি প্রপাঠক, ৬৪৪টি অনুবাক এবং ২০,১৮৪টি মন্ত্র আছে। মন্ত্রের মধ্যে অধ্বর্যু, যজমান ও হোতার পঠনীয় মন্ত্র আছে। উদ্দিষ্ট দেবতাগণের নামানুসারে সেই গ্রন্থে কাণ্ডগুলির বিভাগ দেখানো হয়েছে। এই সংহিতায় প্রথমেই দর্শপূর্ণমাস ইষ্টির বিষয় বর্ণিত হয়েছে। “দর্শ”-র অর্থ অমাবস্যা এবং “পূর্ণমাস”-এর অর্থ হল পূর্ণিমা। অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে যে যজ্ঞ হয় হয় তার নাম “দর্শপূর্ণমাস”।

শুক্লযজুর্বেদ[সম্পাদনা]

যাজ্ঞবল্ক্য সূর্যের কাছে নতুন করে বেদজ্ঞান শিক্ষা করেন। তাই শুক্লযজুর্বেদ নাম হয়। আর কৃষ্ণ যা মিশ্রণের বিপরীত শুক্ল। এতে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের মিশ্রণ নেই। তা ছাড়া সূর্য বাজীর বা ঘোড়ার রূপ ধারণ করে বেদের মন্ত্র উপদেশ দেন বলে এই বেদের অপর নাম বাজসনেয়ী বা বাজসনেয় সংহিতা। এই যজুর্বেদের সম্প্রদায় ভেদে কাণ্ব এবং মাধ্যন্দিন নামে দুটি শাখা আছে। এই দুটি পাঠপ্রণালীর পরস্পর পার্থক্য নামমাত্র। শুক্লযজুর্বেদ বা যাজ্ঞসনেয়ী সংহিতা মোট ৪০টি অধ্যায়, ৩০৩টি অনুবাক এবং ১৯৭৫টি মন্ত্র আছে। ৪০টি অধ্যায়ে দর্শপূর্ণমাস থেকে আরম্ভ করে অগ্নিহোত্র হোম, চাতুর্মাস্যাদি যাগ, সোমযাগ, অগ্নিচয়ন, অশ্বমেধাদি যাগ প্রভৃতির বর্ণনা বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

যজুর্বেদই প্রথম সংস্কৃত গদ্যের ব্যবহার করা হয়েছে। এই বেদ ক্রিয়ামূলক বলে দেবস্তুতিগুলি পূর্ণাঙ্গ সূক্তে না-থেকে গদ্যে লেখা। এই বেদে মোট ১৯০০ ঋকমন্ত্র ও অবশিষ্ট যজুর্মন্ত্র সন্নিবিষ্ট হয়েছে। বাক্যের সংখ্যা ১৯,৪৮৮। এখানে শ্রৌতযজ্ঞের অধ্বর্যুর করণীয় কর্মের খুঁটিনাটির বর্ণনা, কিছু কিছু ঐন্দ্রজালিক ও অভিচারিক প্রক্রিয়ামূলক মন্ত্র আছে । এই বেদের মন্ত্রে দ্রব্যাদিকে দেবভাবে ভাবিত করে তাদের স্তুতি করা হয়েছে। মন্ত্রগুলি অতি সংক্ষিপ্ত, কখনো-কখনো একটি শব্দ বর্ণাত্মক বা মন্ত্রাংশ, যেমন – স্বাহা, স্বধা, ওঁ

গুরুত্ব[সম্পাদনা]

যজুর্বেদের যুগে ঋত্বিকদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। ভক্তির চেয়ে যজ্ঞানুষ্ঠান সর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়। শুক্লযজুর্বেদের ষোড়শ অধ্যায়ে রুদ্রদেবতা একাধারে ভয়ংকর ও কল্যাণকর সংহারক ও পালক। তিনি আর্য, অনার্য ও অন্ত্যজ জাতির দেবতা হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণযজুর্বেদকে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের জনক বলা হয়। যজুর্বেদের সাহিত্যিক মূল্য না-থাকলেও ধর্ম সম্বন্ধে গবেষণায়, মন্ত্র ও প্রার্থনাদির উৎপত্তি, তাৎপর্য এবং ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের আলোচনায় এই বেদের চর্চা অপরিহার্য। এই বেদে বর্ণিত ‘পিণ্ডপিতৃযজ্ঞ’ পরবর্তীকালে পিতৃশ্রাদ্ধাদিরূপে পরিণত হয়েছে।

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Devi Chand, The Yajurveda. Sanskrit text with English translation. Third thoroughly revised and enlarged edition (1980).
  • Ralph Thomas Hotchkin Griffith, The Texts of the White Yajurveda. Translated with a Popular Commentary (1899).
  • The Sanhitâ of the Black Yajur Veda with the Commentary of Mâdhava ‘Achârya, Calcutta (Bibl. Indica, 10 volumes, 1854–1899)
  • Kumar, Pushpendra, Taittiriya Brahmanam (Krsnam Yajurveda), 3 vols., Delhi (1998).

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]