বিশ্বামিত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মেনকা কর্তৃক বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ; রাজা রবি বর্মা অঙ্কিত চিত্র।

বিশ্বামিত্র (ইংরেজীতে Viśwamitra): পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত গাধিরাজের পুত্র ও জনৈক মুনি। বাল্মিকী মুনির রামায়ণের বালকাণ্ড অধ্যায়ে বিশ্বামিত্রের কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। মহাভারতের আদি পর্বে মেনকা’র সাথে বিশ্বামিত্রের সম্পর্কের ফলে শকুন্তলা’র জন্মকাহিনী বিবৃত আছে। বিশ্বামিত্র প্রবল প্রতাপে কয়েক হাজার বছর পৃথিবী শাসন করেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

জন্ম কাহিনী [সম্পাদনা]

মহর্ষি বিশ্বামিত্র ছিলেন প্রাচীন ভারতে একজন রাজা। তিনি কৌশিক নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি যোদ্ধা এবং ব্রহ্মার ‍মানসপুত্র প্রজাপতি কুশ নামীয় রাজার প্রপৌত্র ও খুবই ধার্মিক কুশান্যভ রাজার পুত্র গাধি’র সন্তান ছিলেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র। বাল্মিকী’র রামায়ণের বাল কাণ্ডের ৫১ চরণে এ বিষয়ে লেখা রয়েছে।

রাজ্য শাসন [সম্পাদনা]

গাধিরাজের মৃত্যুর পর বিশ্বামিত্র রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন এবং বীর বিক্রমে রাজ্যশাসন করতে থাকেন। তিনি অতুল ঐশ্বর্য্রও বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এছাড়াও, তার শতাধিক পুত্র ও অসংখ্য সৈন্য ছিল।

বশিষ্ঠের সাথে ঝগড়া [সম্পাদনা]

বিশ্বামিত্র কোন একদিন এক অক্ষৌহিণী সেনা (১০৯৩৫০ পদাতিক, ৬৫৬১০ অশ্ব, ২১৮৭০ হস্তী এবং ২১৮৭০ রথ) ও পুত্রদেরকে সাথে নিয়ে মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে উপস্থিত হলে মুনি কামধেনু নন্দিনী (আরেক নাম শবলা)র সাহায্যে উপস্থিত সকলকে পূর্ণ তৃপ্তিসহকারে ভোজন করান। একটি সাধারণ আশ্রমে এতো বিপুলসংখ্যক লোকের খাদ্য সরবরাহের বিষয়ে বিশ্বামিত্র আগ্রহী হয়ে কামধেনুর অবিশ্বাস্য গুণাবলী জেনে বশিষ্ঠের কাছে তা প্রার্থনা করেন। বশিষ্ঠ জানান যে, নন্দিনী হচ্ছে ইন্দ্রের কামধেনুর কন্যা, এর সাহায্যে যখন যা চাওয়া হয তাই পাওয়া যায়। বিশ্বামিত্র সবলাকে নিতে চাইলে বশিষ্ঠ কামধেনুকে দান করতে অস্বীকার করেন এবং উভয়ের মধ্যে তুমুল বাদানুবাদ ও তীব্র বিবাদের সৃষ্টি হয়। বিশ্বামিত্র তার সুদক্ষ সৈনিকদের সহায়তায় বলপূর্বক কামধেনুকে কেড়ে নিতে উদ্যত হলে ঋষিবর শবলার সাহায্যে অসংখ্য সৈন্য সৃষ্টি করে রাজার সমূদয় সৈন্যদল ধ্বংস করে ফেলেন। এছাড়াও, অন্যান্য রাজপুত্র বশিষ্ঠকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসলে মহর্ষি ব্রহ্মতেজে বিশ্বামিত্রের শতপুত্রকে দগ্ধ করে ফেলেন।

তপস্যায় মনোনিবেশ [সম্পাদনা]

বিশ্বামিত্র এরূপে সৈন্যবিহীন অবস্থায় ও শতপুত্রশোকে কাতর হয়ে নিজ রাজধানীতে ফিরে এসে অবশিষ্ট এক পুত্রের কাঁধে রাজ্যের শাসনভার প্রদান করে বনে গমন করেন ও মহাদেবের কঠোর তপস্যায় মনোনিবেশ করেন। মহাদেব বিশ্বামিত্রের তপস্যায় অতি সন্তুষ্ট হয়ে বর প্রদানে উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র তার নিকট মন্ত্রসহ সাঙ্গোপাঙ্গ ধনুর্বেদ সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে নেন। পরে তিনি মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে পুণরায় গমন করে তপোবন নষ্ট করে ফেলেন এবং পরে ঋষিবরের উপর পুণরায় অস্ত্রবর্ষণ করেন। কিন্তু বশিষ্ঠদেব ব্রহ্মদণ্ড হাতে নিয়ে বিশ্বামিত্রের সমস্ত অস্ত্রের মোকাবেলা করেন। এরূপে হতমান ও হতদর্প হয়ে বিশ্বামিত্র অস্ত্রবলের চেয়ে ব্রহ্মবলের শ্রেষ্ঠত্ব উপলদ্ধি করেন এবং নিজে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। সেজন্য তিনি পত্নীসহ দক্ষিণে গমন করে কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন। এ সময়ে তার আরো তিন পুত্রের জন্ম হয়। অনেক অনেক বছর পরে ব্রহ্মা স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বিশ্বামিত্রকে রাজর্ষিত্ব প্রদান করেন।

মেনকা’র সাথে বাস ও শকুন্তলা’র জন্ম [সম্পাদনা]

বিশ্বামিত্রের দীর্ঘকালের কঠোর তপস্যায় পরিতুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তার কাছে আসেন ও ঋষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু তাতেও বিশ্বামিত্র পরিতুষ্ট না হয়ে পুণরায় উগ্র তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হন। এ সময়ে ইন্দ্রের নির্দেশে অপ্সরারূপী মেনকা পুষ্করতীর্থে স্নান করতে গেলে ঋষিবর তার রূপে বিমোহিত হন এবং তার সহবাসে দশ বৎসর যাপন করেন। মেনকা’র গর্ভে শকুন্তলা নাম্নী কন্যার জন্ম হয়। দশ বৎসর পরে চৈতন্য ফিরে পাওয়ায় বিশ্বামিত্র মেনকাকে বিদায় দিয়ে অতি বিষণ্নচিত্তে উত্তরদিকে গমন করেন এবং হিমাচলে কৌশিকী নদীর তীরে পুণরায় কঠোর তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হন।

অপ্সরাঃ রম্ভাকে শাপ ও ব্রাহ্মণত্ব লাভ [সম্পাদনা]

দীর্ঘকাল পরে ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে মহর্ষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু ব্রহ্মা তাকে বললেন, ‘তোমার সিদ্ধিলাভের বহু বিলম্ব আছে, কারণ তুমি এখনও ইন্দ্রিয় জয় করতে পার নাই’। এ কথা শুনে মহর্ষি পুণরায় উগ্র তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন। এ সময়ে বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ করার লক্ষ্যে দেবরাজের আদেশে অপ্সরাঃ রম্ভা সমাগতা হলে মহর্ষি তাকে শাপ প্রদানে দীর্ঘকালের নিমিত্ত পাষাণাকারে পরিণত করেন। পরন্তু ক্রোধের কারণে তপঃফল নষ্ট হওয়ায় বিশ্বামিত্র পূর্বদিকে গিয়ে তপস্যা করতে লাগলেন। বহুবর্ষ পরে ব্রহ্মা উপস্থিত হয়ে তাকে ব্রাহ্মণত্ব প্রদান করেন। বিশ্বামিত্র ব্রহ্মর্ষিত্ব সাধে করে দীর্ঘ পরমায়ুঃ, চতুর্বেধ এবং ওঙ্কার লাভ করে মনোরথ-সিদ্ধি হওয়ায় আনন্দ-সাগরে নিমগ্ন হলেন। অতঃপর বশিষ্ঠের সাথে তার মৈত্রীয় সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

পৌরাণিক উপকথাসমূহ [সম্পাদনা]

রাজর্ষি বিশ্বামিত্র সম্পর্কে সনাতন ধর্মে বিভিন্ন পৌরাণিক উপাখ্যান ও নানা ধরণের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

রাজা ত্রিশঙ্কুকে স্বর্গারোহণের চেষ্টা [সম্পাদনা]

একদিন গর্বিত রাজা হিসেবে ত্রিশঙ্কু তার গুরু বশিষ্ঠকে স্ব-শরীরে স্বর্গে প্রেরণ করতে বলেন। কিন্তু তার গুরু বশিষ্ঠ ও তৎপুত্রগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিশ্বামিত্রের শরণাপন্ন হলে রাজর্ষি তার ইষ্ট-সিদ্ধির লক্ষ্যে এক যজ্ঞ করেন এবং যজ্ঞফলে তাকে স্ব-শরীরে স্বর্গে আসছেন দেখে ইন্দ্র তাকে ফেরৎ পাঠান। দেবাদেশে ত্রিশঙ্কু মর্ত্যাভিমুখে নামছেন দেখে বিশ্বামিত্র নিজ তপোবলে তাকে শূণ্যে ভাসমান রেখে দ্বিতীয় ব্রহ্মাণ্ড রচনায় নিযুক্ত হলেন। তিনি দক্ষিণদিকে নক্ষত্রপুঞ্জের সৃষ্টি করে অপর দেবগণের সৃষ্টি করতে উদ্যোগী হলে দেবতারা তার নিকট উপস্থিত হন এবং নবসৃষ্ট নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে ত্রিশঙ্কু’র অবস্থান নির্দিষ্ট করে বিশ্বামিত্রকে নিরস্ত করেন।

শুনঃশেফকে রক্ষা [সম্পাদনা]

দক্ষিণে তপোবিঘ্ন ঘটায় বিশ্বামিত্র পশ্চিমে গিয়ে পুস্করতীরস্থ বনে তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। এ সময়ে অযোধ্যার রাজা অম্বরীষ একটি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করোছিলেন। ইন্দ্র সেই যজ্ঞের পশু হরণ করায় পুরোহিত রাজাকে একটি নরবলি দিয়ে যজ্ঞবিঘ্নের প্রায়শ্চিত্ত করতে বলেন। অম্বরীষ উপযুক্ত নরের সন্ধানে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করে অবশেষে ঋচীক ঋষির মধ্যমপুত্র শুনঃশেফকে খুঁজে পান এবং তাকে সাথে করে নিয়ে রাত হয়ে যাওয়ায় রাতযাপনের লক্ষ্যে বিশ্বামিত্রের আশ্রমে উপনীত হন। শুন‍ঃশেফ বিশ্বামিত্রের শরণাপন্ন হয়ে প্রাণভিক্ষা চাইলে বিশ্বামিত্র তাকে অগ্নির স্তব শেখান। সেই স্তবের প্রভাবে শুনঃশেফ অগ্নি থেকে প্রাণরক্ষা করতে সমর্থ হন।

রাজা হরিশ্চন্দ্রের রাজ্য অধিকার [সম্পাদনা]

একসময় সুরসভায় বশিষ্ঠ মুনি রাজা হরিশ্চন্দ্রের অশেষ সুখ্যাতি করায় বিশ্বামিত্র তার পরীক্ষা গ্রহণে কৃতসংকল্প হয়ে ছলে-বলে-কৌশলে তার সমস্ত রাজ্যের অধিকার লাভ করেন এবং পরে দক্ষিণার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। অবশেষে হরিশ্চন্দ্র মহির্ষী শৈব্যা ও পুত্র রোহিতাশ্বকে নিয়ে দক্ষিণার অর্থের সন্ধানে বের হন এবং বারাণসীতে মহির্ষী ও পুত্রকে দাসরূপে এক ব্রাহ্মণগৃহে নিযুক্ত করেন এবং নিজে শ্মশানরক্ষক চণ্ডালের নিকট দাসরূপে নিজেকে বিকিয়ে বিশ্বামিত্রকে প্রয়োজনীয় দক্ষিণা প্রদান করেন। পরে রোহিতাশ্ব সর্পাঘাতে মৃত্যুমুখে পতিত হলে শৈব্যা কাঁদতে কাঁদতে মৃতপুত্র বক্ষে নিয়ে সেই শ্মশানে উপস্থিত হন। হরিশ্চন্দ্র মহির্ষীকে চিনতে পেরে অতি করুণস্বরে বিলাপ করতে লাগলেন। এমন সময়ে বিশ্বামিত্র সেখানে উপস্থিত হন এবং হরিশ্চন্দ্রের অশেষ গুণকীর্তন করে রোহিতাশ্বকে পুণরায় জীবন দানসহ সমস্ত রাজ্য ফেরত দেন।

রাম-লক্ষ্মণকে নিয়ে মিথিলায় গমন [সম্পাদনা]

ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র ধনুর্বেদ সংকলন করে মানবসমাজে প্রচার করেন। রাক্ষসদিগের উপদ্রব নিবারণকল্পে বিশ্বামিত্র বিষ্ণু’র ৭ম অবতার হিসেবে রাম-লক্ষ্মণকে নিজের আশ্রমে নিয়ে যান এবং পথে তাদেরকে বলা ও অতিবলা মন্ত্র দান করেন। তারপর রাম তাড়কা, মরীচাসুবহুকে বধ করে ঋষিপ্রবরের যজ্ঞ নির্বিঘ্ন করলে বিশ্বামিত্র দুই ভাইকে নিয়ে মিথিলা অভিমুখে যাত্রা করেন এবং পথে গৌতম ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হয়ে রামের সাহায্যে অহল্যার শাপ বিমোচন করান। পরে তারই সহায়তায় মিথিলায় স্বয়ংবর সভায় গেলে রাজকুমারী সীতা রামের গলায় মালা পড়ান ও সেখানেই বিবাহকার্য সম্পাদিত হয়।

গায়ত্রী মন্ত্র রচয়িতা [সম্পাদনা]

ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র প্রসিদ্ধ গায়ত্রী মন্ত্র রচয়িতা। তিনিই ধনুর্বেদ সংকলন করে মানবসমাজে প্রচার করেন। এটি এমন ধরণের মন্ত্র যা সকল ধরণের প্রার্থনায় উচ্চারিত হয় এবং তিনটি বেদে (যথা- ঋকবেদ, যজুঃবেদ এবং সামবেদে) মন্ত্রটির উপস্থিতি দেখা যায়। বেদে পরিস্কারভাবে বর্ণিত আছে যে, যে কেউই স্বাধীনভাবে মন্ত্রটি উচ্চারিত করতে পারেন এবং মানসিক ও আত্মিকভাবে লাভবান হতে পারেন। মন্ত্রটি হলোঃ-

অউম ভূর্বু ভঃ স

তৎ সবিতুর্বরেণ্যং

ভর্গো দেবস্য ধিমহী

দিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ অউম।

(সরলার্থ: আমরা সেই পরম সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করছি - যিনি যুদ্ধের শক্তিদায়ক, যিনি সমস্ত জ্ঞানের উৎসস্থল, যিনি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকাস্বরূপ; তিনি যেন আমাদেরকে প্রভূত বিচার বুদ্ধি শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা দেন।)


আরো দেখুন [সম্পাদনা]


তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]