বাংলা সন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(বঙ্গাব্দ থেকে ঘুরে এসেছে)

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ বাংলাদেশ এবং ভারত বর্ষের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌরপঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিন গণনা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। এই সময়টাই এক সৌর বছর। গ্রেগরিয়ান সনের মতো বাংলা সনেও মোট ১২ মাস। এগুলো হল ‌ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুনচৈত্র। আকাশে রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়ে থাকে। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ সৌরপঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামত্রিপুরা অঞ্চলে এই বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়। বাংলা সন শুরু হয় পহেলা বৈশাখ বা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে যে দিনটি ইংরেজি বর্ষপঞ্জির ১৪/১৫ এপ্রিল (ভারতে) এবং ১৪ এপ্রিল (বাংলাদেশে)।

বাংলা সন সব সময়ই গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির চেয়ে ৫৯৩ বছর কম। বাংলা বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী আজ ১৩ শ্রাবণ, ১৪২১ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে দু'টি মত চালু আছে৷ প্রথম মত অনুযায়ী - প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খৃষ্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন৷ সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে শশাঙ্ক বঙ্গদেশের রাজচক্রবর্তী রাজা ছিলেন৷ আধুনিক ভারতের বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার অধিকাংশ এলাকা তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ অনুমান করা হয় যে, জুলিয়ান ক্যালেণ্ডারের বৃহস্পতিবার ১৮ মার্চ ৫৯৪ এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডারের শনিবার ২০ মার্চ ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল৷

দ্বিতীয় মত অনুসারে, ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরর চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এজাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে[১] হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ওমর ফতুল্লাহ্‌ শিরাজির সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত সৌর বর্ষপঞ্জীর অনুকরণে[২] ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।[৩]

মাস[সম্পাদনা]

বঙ্গাব্দ
বাংলা বর্ষপঞ্জী
মাস
Month
কাল/ঋতু
বৈশাখ
এপ্রিল-মে
গ্রীষ্ম
জ্যৈষ্ঠ
মে-জুন
আষাঢ়
জুন-জুলাই
বর্ষা
শ্রাবণ
জুলাই-আগস্ট
ভাদ্র
আগস্ট-সেপ্টেম্বর
শরৎ
আশ্বিন
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর
কার্তিক
অক্টোবর-নভেম্বর
হেমন্ত
অগ্রহায়ণ
নভেম্বর-ডিসেম্বর
পৌষ
ডিসেম্বর-জানুয়ারি
শীত
মাঘ
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি
ফাল্গুন
ফেব্রুয়ারি-মার্চ
বসন্ত
চৈত্র
মার্চ-এপ্রিল

বঙ্গাব্দের বারো মাসের নামকরণ করা হযেছে নক্ষত্রমন্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। এই নাম সমূহ গৃহীত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ "সূর্যসিদ্ধান্ত" থেকে।বাংলা মাসের এই নামগুলি হচ্ছে -

  • বৈশাখ - বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • জ্যৈষ্ঠ - জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • আষাঢ় - উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • শ্রাবণ - শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • ভাদ্র -উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • আশ্বিন - অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • কার্তিক - কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • অগ্রহায়ণ(মার্গশীর্ষ) - মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • পৌষ - পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • মাঘ - মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • ফাল্গুন - উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে
  • চৈত্র - চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে

সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহী-র মাসের নামগুলি প্রচলিত ছিল পারসি ভাষায়, যথা: ফারওয়াদিন, আর্দি, ভিহিসু, খোরদাদ, তির, আমারদাদ, শাহরিযার, আবান, আযুর, দাই, বহম এবং ইসক্নদার মিজ।

দিন[সম্পাদনা]

বাংলা সন অন্যান্য সনের মতোই সাত দিনকে গ্রহণ করেছে এবং এ দিনের নামগুলো অন্যান্য সনের মতোই তারকামন্ডলীর উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে।

বাংলা সনে দিনের শুরু ও শেষ হয় সূর্যোদয়ে । ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির শুরু হয় যেমন মধ্যরাত হতে।

সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জী[সম্পাদনা]

৫৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বরাহমিহির পঞ্চসিদ্ধান্তিকা নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। গ্রন্থটি পাঁচটি খণ্ডে সমাপ্ত। এই গ্রন্থটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের সংক্ষিপ্তসার বলে অভিহিত করা হয়। পঞ্চসিদ্ধান্তিকার পাঁচটি খণ্ডের নাম– এই সিদ্ধান্তগুলো হলো– সূর্যসিদ্ধান্ত, বশিষ্ঠসিদ্ধান্ত, পৌলিশ সিদ্ধান্ত, রোমক সিদ্ধান্ত ও ব্রহ্ম সিদ্ধান্ত। প্রাচীন ভারতে দিন, মাস, বৎসর গণনার ক্ষেত্রে 'সূর্যসিদ্ধান্ত' একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বরাহমিহিরের পরে ব্রহ্মগুপ্ত নামক অপর একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী (জন্ম ৫৯৮) একটি সিদ্ধান্ত রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থটির নাম ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত। এই গ্রন্থটি খলিফা আল-মনসুরের আদেশে সিন্দহিন্দ নামে আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে সৌর-মাস নির্ধারিত হয়, সূর্যের গতিপথের উপর ভিত্তি করে। সূর্যের ভিন্ন অবস্থান নির্ণয় করা হয় আকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের বিচারে। প্রাচীন কালের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের বার্ষিক অবস্থান অনুসারে আকাশকে ১২টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। এর একটি ভাগকে তাঁরা নাম দিয়েছিলেন রাশি। আর ১২টি রাশির সমন্বয়ে যে পূর্ণ আবর্তন চক্র সম্পন্ন হয়, তার নাম দেওয়া হয়েছে রাশিচক্র। এই রাশিগুলোর নাম হলো– মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। সূর্যের বার্ষিক অবস্থানের বিচারে, সূর্য কোনো না কোন রাশির ভিতরে অবস্থান করে। এই বিচারে সূর্য পরিক্রমা অনুসারে, সূর্য যখন একটি রাশি থেকে অন্য রাশিতে যায়, তখন তাকে সংক্রান্তি বলা হয়। এই বিচারে এক বছরে ১২টি সংক্রান্তি পাওয়া যায়। একেকটি সংক্রান্তিকে একেকটি মাসের শেষ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।[৪] যেদিন রাত্রি ১২টার মধ্যে সূর্য্য ০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে প্রবেশ করে তার পরদিনই ১ বৈশাখ (পয়লা বৈশাখ) হয়। যেদিন রাত্রি ১২টার মধ্যে সংক্রান্তি হয় তার পরদিনই মাসের প্রথম দিন।[৫] মূলত একটি সংক্রান্তির পরের দিন থেকে অপর সংক্রান্ত পর্যন্ত সময়কে এক সৌর মাস বলা হয়। লক্ষ্য করা যায় সূর্য পরিক্রমণ অনুসারে সূর্য প্রতিটি রাশি অতিক্রম করতে একই সময় নেয় না। এক্ষেত্রে মাসভেদে সূর্যের একেকটি রাশি অতিক্রম করতে সময় লাগতে পারে, ২৯, ৩০, ৩১ বা ৩২ দিন। সেই কারণে প্রতি বছর বিভিন্ন মাসের দিনসংখ্যা সমান হয় না। এই সনাতন বর্ষপঞ্জী অনুসারে বছর ঋতুভিত্তিক থাকে না। একেকটি মাস ক্রমশঃ মূল ঋতু থেকে পিছিয়ে যেতে থাকে।[৪]

ভারতে প্রচলিত সূর্যসিদ্ধান্তভিত্তিক সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জী অনুসারে বঙ্গাব্দের মাসসমূহ এবং তাদের দৈর্ঘ্য :

ক্রম নাম দিনসংখ্যা যে রাশিতে সূর্য অবস্থিত
বৈশাখ ৩০ / ৩১ মেষ
জ্যৈষ্ঠ ৩১ / ৩২ বৃষ
আষাঢ় ৩১ / ৩২ মিথুন
শ্রাবণ ৩১ / ৩২ কর্কট
ভাদ্র ৩১ / ৩২ সিংহ
আশ্বিন ৩০ / ৩১ কন্যা
কার্তিক ২৯ / ৩০ তুলা
অগ্রহায়ণ ২৯ / ৩০ বৃশ্চিক
পৌষ ২৯ / ৩০ ধনু
১০ মাঘ ২৯ / ৩০ মকর
১১ ফাল্গুন ২৯ / ৩০ কুম্ভ
১২ চৈত্র ৩০ / ৩১ মীন

সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জী অনুসারে বাংলা মাস নির্ণয়ের একটি নমুনা ছক নিচে দেওয়া হল:[৬]

সুত্র বিগত সংক্রান্তি তারিখ ও সময় আগামী মাসের প্রথম দিন আগামী মাসের নাম
সংক্রান্তি সময় ১৪ এপ্রিল ২০০৭
দুপুর ২:৩২:৪২
১৫ এপ্রিল ২০০৭ বৈশাখ
সংক্রান্তি সময়
+৩০.৯৩০৮১
১৫ মে ২০০৭
দুপুর ১২:৫৩:০৪
১৬ মে ২০০৭ জ্যৈষ্ঠ
সংক্রান্তি সময়
+৬২.৩৫৩৬৪
১৫ জুন ২০০৭
রাত্রি ১১:০১:৫৬
১৬ জুন ২০০৭ আষাঢ়
সংক্রান্তি সময়
+৯৩.৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯
১৭ জুলাই ২০০৭
দুপুর ২:৩২:৪২
১৮ জুলাই ২০০৭ শ্রাবণ
সংক্রান্তি সময়
+১২৫.৪৭৬৩৬
১৮ অগস্ট ২০০৭
রাত্রি ১:৫৮:৪০
১৯ অগস্ট ২০০৭ ভাদ্র
সংক্রান্তি সময়
+১৫৬.৪৮৯৩৩
১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭
রাত্রি ২:১৭:২০
১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭ আশ্বিন
সংক্রান্তি সময়
+১৮৬.৯২৪০৫
১৮ অক্টোবর ২০০৭
দুপুর ১২:৪৩:২০
১৯ অক্টোবর ২০০৭ কার্তিক
সংক্রান্তি সময়
+২১৬.৩১৭৯৯৯৯
১৬ নভেম্বর ২০০৭
রাত্রি ১০:১০:৩৭
১৭ নভেম্বর ২০০৭ অগ্রহায়ণ
সংক্রান্তি সময়
+২৪৬.৩১৫৩৯৯৯
১৬ ডিসেম্বর ২০০৭
রাত্রি ১০:০৬:৫৩
১৭ ডিসেম্বর ২০০৭ পৌষ
সংক্রান্তি সময়
+২৭৫.১৪২৮৮
১৪ জানুয়ারি ২০০৮
বিকেল ৫:৫৮:২৭
১৫ জানুয়ারি ২০০৮ মাঘ
সংক্রান্তি সময়
+৩০৫.০৯৪২৮
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
বিকেল ৪:৪৮:২৮
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ফাল্গুন
সংক্রান্তি সময়
+৩৩৪.৯১১৪৫
১৪ মার্চ ২০০৮
দুপুর ১২:২৫:১১
১৫ মার্চ ২০০৮ চৈত্র
সংক্রান্তি সময়
+৩৬৫.২৫৮৭৫৬
১৩ এপ্রিল ২০০৮
রাত্রি ৮:৪৫:১৯
১৪ এপ্রিল ২০০৮ পরবর্তী বছরের বৈশাখ

সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জী[সম্পাদনা]

বাংলা একাডেমী কর্তৃক বাংলা সন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ সালে। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ'র নেতৃত্বে এ কমিটি বিভিন্ন বাংলা মাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করে সেগুলো হতে উত্তরণের প্রস্তাবনা প্রদান করেন। বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির মতোই ৩৬৫ দিনের। যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে। এ প্রদক্ষিণের মোট সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট এবং ৪৭ সেকেন্ড। এই ব্যবধান ঘোচাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়। ব্যতিক্রম হচ্ছে সে শতাব্দীতে যে শতাব্দীকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যায় না বা বিভাজ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা সনে এই অতিরিক্ত দিনকে আত্মীকরণ করা হয়নি। বাংলা মাস অন্যান্য সনের মাসের মতোই বিভিন্ন পরিসরের হয়ে থাকে। এই সমস্যাগুলোকে দূর করার জন্য ডঃ মুহম্মদ শহীদূল্লাহ কমিটি বাংলা একাডেমীর কাছে কতকগুলো প্রস্তাব পেশ করে। এগুলো হচ্ছেঃ-

  • বছরের প্রথম পাঁচ মাস অর্থাৎ বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের;
  • বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস;
  • প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের।

বাংলা একাডেমী সরকারীভাবে এই সংশোধিত বাংলা মাসের হিসাব গ্রহণ করে। যদিও ভারতের পশ্চিম বাংলায় পুরনো বাংলা সনের প্রচলনই থেকে গেছে।

বাংলাদেশে সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জী অনুসারে বঙ্গাব্দের মাসসমূহ এবং তাদের দৈর্ঘ্য :

ক্রম নাম দিনসংখ্যা গ্রেগোরিয়ান তারিখ অনুসারে মাসের দৈর্ঘ্য
বৈশাখ ৩১ ১৪ এপ্রিল - ১৪ মে
জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৫ মে - ১৪ জুন
আষাঢ় ৩১ ১৫ জুন - ১৫ জুলাই
শ্রাবণ ৩১ ১৬ জুলাই - ১৫ অগস্ট
ভাদ্র ৩১ ১৬ অগস্ট - ১৫ সেপ্টেম্বর
আশ্বিন ৩০ ১৬ সেপ্টেম্বর - ১৫ অক্টোবর
কার্তিক ৩০ ১৬ অক্টোবর - ১৪ নভেম্বর
অগ্রহায়ণ ৩০ ১৫ নভেম্বর - ১৪ ডিসেম্বর
পৌষ ৩০ ১৫ ডিসেম্বর - ১৩ জানুয়ারি
১০ মাঘ ৩০ ১৪ জানুয়ারি - ১২ ফেব্রুয়ারি
১১ ফাল্গুন ৩০ / ৩১ ১৩ ফেব্রুয়ারি - ১৪ মার্চ
১২ চৈত্র ৩০ ১৫ মার্চ - ১৩ এপ্রিল

বঙ্গাব্দের সংস্কারকৃত ও পূর্বতন সংস্করণ[সম্পাদনা]

১৪১৯ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জী এবং সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জীর পার্থক্য চিহ্নিত হয়েছে।

পহেলা বৈশাখ, বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন। বাংলাদেশে বাংলা একাডেমী কর্তৃক সংশোধিত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে এদিন উদযাপন করা হয় প্রতি বছরের এপ্রিল ১৪ তারিখে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে তা উদযাপন করা হয় সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে। এটি পাশ্চ্যাতের বর্ষপঞ্জির মতো নির্দিষ্ট নয়। ভারতের বাঙালিরা নতুন বছর উদযাপন করে এপ্রিল ১৪/১৫ তারিখে।

ভারতের সমস্ত বঙ্গভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে সনাতন নিরয়ণ (জ্যোর্তিমণ্ডলে তারার অবস্থানের প্রেক্ষিতে গণিত, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর প্রকৃত সময়ই নিরয়ণ বর্ষপঞ্জী। অর্থাৎ নিরয়ণ বর্ষপঞ্জীর দৈর্ঘ্য হল ৩৬৫.২৫৬৩৬০২ সৌর দিবস যা ক্রান্তীয় সায়ন বর্ষপঞ্জি থেকে ২০ মিনিট ২৪ সেকেন্ড দীর্ঘ।) বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বর্ষপঞ্জী ক্রান্তীয় বা সায়ন বর্ষপঞ্জী (যেমন সংস্কারকৃত বাংলা সন এবং গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জী) থেকে ভিন্ন। এই উভয় ধরণের বর্ষপঞ্জির মধ্যে সময়ের যে গাণিতিক পার্থক্য রয়েছে তার কারণেই বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের নতুন বর্ষ শুরুতে দিনের পার্থক্য হয়। এই সময়ের পার্থক্যের কারণে নিরয়ণ সৌর বর্ষপঞ্জিতে মাসের দৈর্ঘ্যে পার্থক্য রয়েছে।

অধিবর্ষ (লীপ ইয়ার)[সম্পাদনা]

সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে ফাল্গুন (যা ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি শুরু হয়) মাস প্রতি চতুর্থ বর্ষে ৩১ দিনের হয়। মিল রাখবার উদ্দেশ্যে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সাথে সাথেই বাংলা লীপ ইয়ার হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, ফাল্গুন ১৪১৮ ছিল বাংলা অধিবর্ষের (লীপ ইয়ার) মাস যা পড়েছে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জীর অধিবর্ষ ২০১২-র ফেব্রুয়ারী মাসে। ভারতের বঙ্গভাষী অঞ্চলসমূহে প্রাচীন সূর্যসিদ্ধান্তভিত্তিক নিরয়ণ বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বর্ষপঞ্জির মাসগুলো নির্ধারিত হয় সূর্যের প্রকৃত আবর্তনকে ভিত্তি করে। এই বর্ষপঞ্জিতে বর্ষ সংখ্যা হতে সাত বিয়োজন করে তা ৩৯ দিয়ে ভাগ করতে হয়। যদি ভাগশেষ শূন্য হয় বা ৪ দিয়ে বিভাজ্য হয় তাহলে সে বর্ষটিকে অধিবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ৩৬৬ দিনের এই বর্ষের চৈত্র মাস ৩১ দিনের হয়। প্রতি ৩৭ বছরে ১০ টি অধিবর্ষ হয়।

ব্যবহার[সম্পাদনা]

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঋতু বৈচিত্রকে ধারন করবার কারণে বাংলা সনের জনপ্রিয়তা এসেছে । দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পূর্বাঞ্চলের জলবায়ুকে ষঢ়ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বসন্ত, গ্রীষ্ম, হেমন্ত এবং শীত ঋতুর সাথে বর্ষাশরৎ ঋতু। বাংলা সনের মাসগুলোর উপর ভিত্তি করেই এই ঋতু বিভাজন করা হয়েছে।

বাঙালি সংস্কুতিতে বাংলা সনের ব্যবহার এখন আর পূর্বের পর্যায়ে নেই। নাগরিক জীবন যাপনের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় এর ব্যবহার এখন কেবল কৃষিজীবীদের মধ্যেই সীমাবব্ধ হয়ে পড়েছে। কৃষিজীবীরা এখনো বীজতলা তৈরী, বীজ বপন, ফসলের যত্ন, ফসল তোলা ইত্যাদি যাবতীয় কাজে বাংলা মাসের ব্যাপক ব্যবহার করেন।

ব্যবসায় ব্যবস্থায় পূর্বের সেই বাংলা সন ভিত্তিক হিসাব ব্যবস্থা এখন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি নির্ভর হয়ে পড়েছে। যার ফলে ব্যবসায়ের হিসাবের খাতা এখন রাষ্ট্রের আইনে যাকে সহজভাবে গ্রহণ করে সে পদ্ধতিতে রাখা হয়। ষাট বা সত্তুর দশকেও যে হালখাতা দেখা যেতো উৎসবের মতো করে, তা দিনে দিনে ফিকে হতে হতে প্রায় মিলিয়ে যেতে বসেছে।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাংলায় (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ) পূজা এখনো বাংলা বর্ষপঞ্জি নির্ভর। হিন্দু সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সামজিক অনুষ্ঠানগুলো, যেমন বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, অন্নপ্রাশন, সাধভক্ষণ, জামাই ষষ্ঠী, ভাই ফোঁটা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিন নির্বাচনে বাংলা মাসের দিনকেই গুরুত্ব দেয়া হয়।

উৎসব পার্বন যেমন পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি এগুলোও বাংলা মাস নির্ভর। শহুরে মানুষরা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সাম্প্রতিক কালে পহেলা বৈশাখকে একটি সার্বজনীন ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের রূপ দিতে সচেষ্ট এবং অনেকখানি সফলও বলা যায়। পারস্যের নওরোজের মতো বাংলা নববর্ষও সার্বজনীন উৎসবের মর্যাদায় এগিয়ে যাচ্ছে।

সহযোগী বর্ষপঞ্জী[সম্পাদনা]

বঙ্গাব্দ গণিত হয় হিন্দু সৌর পঞ্জিকানুসারে, যেটি আবার সূর্য সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। হিন্দু সৌর পঞ্জি শুরু হয় মধ্য এপ্রিলে । বাংলাদেশের (বাংলাদেশে সংশোধিত বঙ্গাব্দানুসারে নববর্ষ পালিত হয) বাইরে পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, কেরল,মণিপুর, নেপাল, ওড়িশা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরায় এই বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনকেই নতুন বর্ষের শুরু হিসেবে উদযাপন করা হয়। নববর্ষ আবার “মেষ সংক্রান্তি” হিসেবেও পরিচিত।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বৈশাখ : গ্রাম বাংলার সাংস্কৃতিক আশ্রয়, বাংলা নিউজ ২৪ ডট কম
  2. বাংলা বর্ষপঞ্জি (Bangla Calender)
  3. http://www.quraneralo.com/history-of-bangla-newyear/
  4. ৪.০ ৪.১ http://www.onushilon.org.bd/yearbook/bangabdo.htm
  5. The Indian calendar: with tables for the conversion of Hindu and Muhammadan, By Robert Sewell, Śaṅkara Bālakr̥shṇa Dīkshita, Robert Gustav Schram পৃষ্ঠা ১২
  6. http://usingha.com/?p=27

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Bengali calendar