ধ্যান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ধ্যান শব্দটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বা মনঃসংযোগ জাতীয় ক্রিয়াকে বোঝাতে ব্যবহার হয়। যেমন অন্তর্দৃষ্টি লাভের চেষ্টা, কোন বিশেষ বস্তু বা ব্যক্তিকে স্মরণ, মনকে চিন্তাশূন্য করার চেষ্টা, ধর্মীয় অনুশাসনের সম্বন্ধে গভীর চিন্তা, মনকে "মুক্ত" করে কোন কল্পিত বা ঐশী শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া, হঠযোগের কয়েকটি আসন, হিন্দু পুরাণে "তপস্যা" ইত্যাদি।


ধ্যান বা মেডিটেশন অনেক রকম হয়। প্রায় সব ধর্মেই কোন না কোন ভাবে ধ্যান করার কথা বলা আছে।

মেডিটেশন হলো আত্মমুক্তির পথ। প্রতিনিয়ত আমরা যেসব অজস্র দুশ্চিন্তায় ভুগি, সেসব থেকে মুক্তির অন্যতম পথ হলো মেডিটেশন। মেডিটেশন হলো ধ্যানাবস্থা, জীবন বদলের পথ। মেডিটেশন করার জন্য আপনাকে হতে হবে ধ্যানস্থ। আত্মস্থ করতে হবে কিছু কলাকৌশল। আর এ ধ্যানস্থ হওয়ার জন্য জানতে হবে কিছু মৌলিক উপায়।

মেডিটেশনের মাধ্যমে যে কেউ চাইলে তাঁর মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যার মাধ্যমে আপনি অধিকার করতে পারবেন সুস্বাস্থ্য, জীবন বদলের রাস্তা, তথা যেকোনো কাজে সফলতা। আমরা প্রতিনিয়ত যা চিন্তা করি, যা মনের গভীরে অবলোকন করি, তাই আমাদের কাজে প্রকাশ পায়। আর আমরা বেশির ভাগ সময়ই যে ব্যর্থ হই তার পেছনে কাজ করে আমাদের হতাশ মনোভব। মেডিটেশনের মাধ্যমে এই হতাশ মনোভব পরিবর্তন হয় ইতিবাচক মনোভাবে। আর তাই ধ্যানচর্চা করলে আমরা আমাদের মনের গভীরে অবলোকন করে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করতে পারি। যার ফলে আমরা আমাদের কাজে সফলতা লাভ করতে পারি।

কিছু সুশৃঙ্খল কার্যপদ্ধতির মাধ্যমে মেডিটেশন পরিচালিত হয়ে থাকে। যার অনেক ধাপ আছে। কে না জানে, সুশৃঙ্খল জীবনই সুন্দর পরিশীলিত জীবন। আর তাই মেডিটেশনের চর্চার মাধ্যমে আমরা লাভ করতে পারি সুন্দর জীবন। মেডিটেশন করার জন্য আমাদের প্রথমে জানতে হবে ধ্যানাবস্থা সৃষ্টির উপায়, এর পরিবেশ ও এর কথা। মেডিটেশন এমন একটি উপায়, যেখানে আপনাকে ধ্যানাবস্থা তৈরির জন্য প্রথমে কল্পনা করতে শেখানো হবে কিভাবে তৈরি করা যাবে মনের বাড়ি এবং আলফা স্টেশন।

[সম্পাদনা] মনের বাড়ি

মেডিটেশন করে আমরা যে আনন্দ পেয়ে থাকি তাকে বাংলাদেশে কোয়ান্টম মেথডের উদ্ভাবক শহীদ আল বোখারী মহাজাতক তুলনা করেছেন নিজের বাড়ি ফেরার আনন্দের সঙ্গে। আর তাই তিনি এর নাম দিয়েছেন মনের বাড়ি। ধ্যানমগ্ন হওয়ার মাধ্যমেই মন তার নিজের বাড়িতে প্রবেশ করে। আর মন তার নিজের বাড়িতে যখন সব চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে অবস্থান করে, তখনই সে তার সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার সর্বোত্তম প্রয়োগে সক্ষম হয়। আর তাই সাফল্যের পথে প্রো-অ্যাকটিভ হওয়ার জন্য মনের শক্তিকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে হলে আপনাকে প্রথমেই মনের জন্য একটি মনোরম ও প্রশান্তিময় বাড়ি বানাতে হবে। যেখানে আপনি দিন-রাত যখন খুশি চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চলে যেতে পারবেন এবং নিজের ও মানবতার কল্যাণে মনের শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবেন।

[সম্পাদনা] আলফা স্টেশন

মহাজাতক শহীদ আল বোখারীর মতে, আলফা স্টেশন এমন একটি সুন্দর স্থান, যেখানে আছে ঘন বন, ঝরনা, লেক, সুন্দর বাগান ও একটি ওয়েটিংরুম। প্রথমবার মেডিটেশনের সময় আলফা স্টেশনে এগুলো কল্পনায় বানিয়ে নিতে হবে। মনের বাড়ি আপনার পছন্দমতো যেকোনো প্রশান্তিময় প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থাপন করা যেতে পারে। যেমন : নদী, লেকের পাড়, দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি বা পার্কের মধ্যে, কোনো পাহাড়ের চূড়ায়, হ্রদের মাঝে, কোনো ঝরনা, জলপ্রপাত বা সমুদ্র সৈকতে বা কোনো গভীর বনে বা সমুদ্রের তলদেশে। যেখানেই আপনি মনের বাড়ি বানান না কেন, পরিবেশ এমন হতে হবে, যেন তা সব সময় আপনাকে প্রশান্তি এনে দেয়। এই বাড়িতে অনেক রুম থাকবে। আর থাকবে খুব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। সৌন্দর্য ও আনন্দ যেন সব সময় ঘিরে থাকে আপনার বাড়িকে। আপনার সবচেয়ে পছন্দের বাড়িকে মনের বাড়ি বানাবেন। এর ড্রইংরুম হবে বেশ বড়সড়। ডানদিকে একটি বারান্দা দিয়ে যাবেন আরেকটি বড় রুমে। আপনার নিরাময় কক্ষ বা হিলিং স্টেশন হিসেবে এ রুমটি কাজ করবে। এ ছাড়া আপনার মনের বাড়িতে গবেষণা কক্ষ, রেওয়াজ কক্ষ, অভিনয় কক্ষ, মঞ্চ, ইবাদত কক্ষ ইত্যাদি তৈরি করবেন। মনের বাড়িতে যখনই যাবেন, তখনই সেটি ইচ্ছামতো পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারবেন। তো মেডিটেশনে বসার জন্য আপনার কল্পনাশক্তিকে জাগ্রত করুন। পদ্মাসনে বসুন অথবা চিত হয়ে শুয়ে দুই হাত পাশে ছড়িয়ে হাতের তালু ওপরের দিকে রেখে আর দুই পার মাঝখানে চার আঙুল পরিমাণ জায়গা রেখে শুয়ে পড়ুন আর তৈরি করতে শিখুন মনের বাড়ি এবং আলফা স্টেশন।

[সম্পাদনা] শিথিলায়ন প্রক্রিয়া

  • প্রথমেই একটি নিরিবিলি ঘর বেছে নিতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে এ সময় কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না। দরজা ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। টেলিফোন অথবা মোবাইল অন্য কোনো ঘরে রাখুন। যাতে মোবাইল অথবা টেলিফোনে কেউ আপনাকে বিরক্ত করতে না পারে। দরজা বন্ধ করলেও ঘরের ভেতর যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢুকতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর পোশাক একটু ঢিলা পরতে চেষ্টা করুন। অনুশীলন শুরুর আগে দুই-এক দিনের মধ্যে ঘটেছিল এমন কোনো আনন্দদায়ক ঘটনা বা কোনো সুখানুভূতির কথা চিন্তা করতে হবে। সে ঘটনা যত তুচ্ছই হোক না কেন কিছু যায় আসে না। অনুভূতিটাই গুরুত্বপূর্ণ।
  • শক্ত কোনো কিছুর ওপর শুয়ে দুুই হাত দুই পাশে হাতের তালু ওপরের দিকে দিয়ে দু'পায়ের মাঝখানে অন্তত চার আঙুল ফাঁক রেখে করতে পারেন। আর যদি বসে করতে চান তাহলেও শক্ত কোনো কিছুর ওপর বসে সুখাসনে বা পদ্মাসনে বসুন, হাতের আঙুল থাকবে হাঁটুর ওপর। সুখাসনে বসলে ডান হাত থাকবে বাম হাতের ওপর ঠিক নাভির নিচ বরাবর। চেয়ারে বসলে জুতো-মোজা খুলে প্যান্টের বেল্ট একটু ঢিলে করে নিন। চেয়ারে এমনভাবে বসবেন যাতে পায়ের পাতা ও আঙুল মাটি স্পর্শ করে এবং হাতের তালু থাকে হাঁটুর ওপর। মেরুদণ্ড ও ঘাড় থাকবে সোজা।
  • হালকাভাবে চোখ বন্ধ করুন। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি কোনো কিছু দেখা থেকে বিরত থাকছেন।
  • নাক দিয়ে লম্বা দম নিন। আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে দম ছাড়ুন। দম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার পেটের উপরিভাগ ফুলবে, আবার দম ছাড়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে পেটের উপরিভাগ চুপসে যাবে। এক, দুই, তিন এভাবে গুনে গুনে ছয় থেকে ১০ বার দম নিন। দম দেওয়ার চেয়ে দম ছাড়তে সামান্য বেশি সময় নিন। ভাবতে থাকুন প্রকৃতি থেকে অফুরন্ত প্রাণশক্তি আমার দেহে প্রবেশ করছে। আর দম ছাড়তে ছাড়তে ভাবুন, শরীরের সব দূষিত পদার্থ বাতাসের সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ছয় থেকে ১০ বার দম নেওয়ার পর দম স্বাভাবিক হতে দিন।
  • চোখ বন্ধাবস্থাতেই মনের চোখ দিয়ে প্রথমে মাথার তালু, কপাল, চোখ, চোখের পাতা, ঠোঁট ও জিহ্বা, চোয়াল, মুখমণ্ডল, গলা, ঘাড়, কাঁধ, ডান হাত, বাম হাত, বুক, পিঠ, মেরুদণ্ড, পেট, কোমর, নিতম্ব, উরু, হাঁটু, পা, গোড়ালি ও পায়ের পাতায় মনোযোগ দিন। যেখানে মনোযোগ দেবেন সেখানে একটু গরম গরম ভাব লাগবে অথবা শিরশির করবে। আপনি অনুভব করবেন প্রতিটি অঙ্গে রক্ত চলাচল বেড়ে যাচ্ছে। পেশি শিথিল হয়ে ভারী হয়ে আসছে।
  • ধীরে ধীরে ভাবতে থাকুন আপনার সব অঙ্গ শিথিল হয়ে আসছে। এবার আবার পাঁচবার নাক দিয়ে দম নিয়ে (৪ নম্বরে বর্ণিত উপায়ে) শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে দিন।
  • এবার অনুভব করুন বাতাস কিভাবে ফুসফুসের প্রতিটি কোষ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এভাবে অনুভব করতে করতে অনুভব করুন আপনার শরীর ভারী হয়ে আসছে।
  • এবার অনুভব করুন আপনার প্রতিটি অঙ্গের ওজন নিয়ে। কাঁধ, বুক, নিতম্ব, হাত, পায়ের ওজন বেড়ে গেছে তা খেয়াল করুন। অনুভব করুন তা ভারী হতে হতে জড় পদার্থ বালুকণায় পরিণত হয়েছে।
নিজস্ব হাতিয়ারসমূহ
নামস্থান

বিকল্পসমূহ
কার্যক্রম
পরিভ্রমন
মুদ্রণ/এক্সপোর্ট
সরঞ্জাম
অন্যান্য ভাষাসমূহ