পুলিন বিহারী দাশ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পুলিন বিহারী দাশ
Pulin Behari Das.jpg
পুলিন বিহারী দাশ
জন্ম (১৮৭৭-০১-২৪)জানুয়ারি ২৪, ১৮৭৭
ফরিদপুর, অবিভক্ত বঙ্গ, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু ১৭ আগস্ট ১৯৪৯ (বয়স ৭২ বৎসর)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
জাতীয়তা ভারতীয়
বংশোদ্ভূত সনাতন ধর্ম পালনকারী বাঙ্গালী
পেশা বিপ্লবী
ধর্ম সনাতন ধর্ম
পিতা-মাতা নব কুমার দাস

পুলিন বিহারী দাশ (১৮৭৭-১৯৪৯) ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিখ্যাত বিপ্লবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা অনুশলিন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা।

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

১৮৭৭ সালে শারিয়তপুর জেলার লনসিং গ্রামের শিক্ষিত স্বছল মধ্যবিত্ত দাস পরিবারে নব কুমার দাসের পুত্ররূপে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন পুলিন বিহারী দাশ[১]। পারিবারিক বেশ কিছু জমি জমা থাকা সত্ত্বেও ওনাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা চাকুরীজীবী ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন মাদারীপুরের সাব ডিভিসনাল কোর্টের উকিল এবং তাঁর খুল্লতাতরা ছিলেন যথাক্রমে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও মুন্সেফ। ১৮৯৪ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়ার হওয়ার পর ঢাকা কলেজএ ভর্তি হন এবং সেইখানে শিক্ষাগ্রহণ কালেই তিনি ঐ কলেজের গবেষণাগারের সাহায্যকারী তথা ব্যবহারিক শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে থাকেন। বাল্যকাল থেকেই পুলীনবিহারির শরীরচর্চার দিকে ছিল প্রবল ঝোঁক এবং বাস্তবিক তিনি একজন দক্ষ লাঠিয়ালও ছিলেন। কলকাতায় সরলা দেবীর আখড়ার সাফল্য দেখে তিনি টিকাটুলিতে ১৯০৩ সালে একটি নিজস্ব আখড়া চালু করেন। ১৯০৫ সালে তৎকালীন বিখ্যাত লাঠিয়াল মুর্তাজার কাছ থেকে লাঠিখেলা ও অসিক্রীড়ার কৌশলও রপ্ত করেছিলেন তিনি।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

নতুন সৃষ্ট দুই রাজ্য, পূর্ববঙ্গ ও আসামে ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিপিন চন্দ্র পাল ও প্রমথ নাথ মিত্রের সফর পুলিন বিহারির ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বিদেশী শাসন শৃঙ্খল থেকে ভারতমাতার মুক্তির জন্য প্রমথ নাথের উদাত্ত আহ্বানে[২] সাড়া দিয়ে পুলীনবিহারী দাস এগিয়ে আসেন এবং তাঁর উপর ঢাকায় অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠার ভার বর্তায়[২]। অবশেষে সেই বছরেরই অক্টোবর মাসে[৩] ৮০ জন যুবকবৃন্দ নিয়ে অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন অনুশীলন সমিতির। তিনি খুব ভালো সংগঠক ছিলেন আর তাই ওনার সাংগঠনিক দক্ষতার গুণে ঐ রাজ্যে অনুশীলন সমিতির পাঁচ শতাধিক শাখাও স্থাপিত হয়। এরপর তিনি সেই ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ন্যাশানাল স্কুল’ কিন্তু আদতে ওটি ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী দল তৈরির একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এইখানে প্রথমে ছাত্রদের লাঠি খেলা এবং কাঠের তরোয়ালের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। তারপর তাদের ছোরা ও একদম শেষে পিস্তল ও রিভলভারের সাহায্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য তিরী করা হতো।

ঢাকার পূর্বতন ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বাসিল কপ্লেস্টন অ্যালেনকে সরানোর এক জবরদস্ত পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। ১৯০৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর অ্যালেন যখন ইংল্যান্ডে ফেরার উদ্দেশে গোয়ালন্দ স্টেশনে পৌঁছলেন ,তখন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হলে তিনি একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। এর [৪]কিছু দিন পরেই চারশত জন দাঙ্গাবাজ মুসলিম হিন্দু বিরোধী ধ্বনি দিতে দিতে পুলিন বিহারীর বাড়িতে আক্রমণ করলে তিনি মাত্র কয়েকজন সঙ্গীদের নিয়ে সাহসিকতার সাথে ঐ দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলা করেন।

১৯০৮এর গোড়ার দিকে পুলিন বিহারী দাশ বরা ডাকাতি সংগঠিত করেন। দিনের আলোতে ঢাকা জেলার অধীনস্থ নবাবগঞ্জ থানার অন্তর্গত বরার জমিদার বাড়িতে একদল বিপ্লবীদের সাথে নিয়ে এক রোমাঞ্চকর ডাকাতি করেন এবং সেই লুণ্ঠিত অর্থ অস্ত্র শস্ত্র, গোলা বারুদ কেনার কাজে ব্যয়িত করেন।

সেই বছরেই ওনাকে ভূপেশ চন্দ্র নাগ, শ্যাম সুন্দর চক্রবর্তী, কৃষ্ণ কুমার মিত্র, সুবোধ মল্লিক, অশ্বিনী দত্ত সহযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মন্টোগোমারি কারাগারে নিক্ষিপ্ত করা হয় কিন্তু শত অত্যাচার, শত নিষ্পেষণ তাঁর বিপ্লবী সত্তাকে অবদমিত করে রাখতে পারেনি। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে জেলের অন্ধকার কুঠুরি থেকে বেরিয়ে আসার পর আবার তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এই সময়েই অনুশীলন সমিতির ঢাকা দল কলকাতা শাখাটিকে পরিচালনা করতে থাকে। যদিও প্রমথনাথ মিত্রের মৃত্যুর পর এই দুটি দল পৃথক হয়ে যায়।

১৯১০ সালের জুলাই মাসে ৪৬জন বিপ্লবী সহযোগে পুলিন বিহারী দাশকে ঢাকা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরও ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচারে পুলীনবাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া এবং সেলুলার জেলএ স্থানান্তর করা হয় যেখানে হেমচন্দ্র দাস, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, বিনায়ক সাভারকরএর মত বিখ্যাত বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে তিনি আসেন।

১৯১৮ সালে পুলিনের সাজা কিছুটা কমে এবং তাঁকে বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখা হয় এবং ১৯১৯ সালে তাঁকে পুরিপুরিভাবে মুক্তি দেওয়া হয় এবং মুক্তি পাওয়ার পর সমিতির কাজে আত্মনিয়োগ করার চেষ্টা করেন কিন্তু তখন তাঁর সেই সংগঠনকে সরকার নিষিদ্ধ করার ফলে তার সদস্যরা এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়েন। এরপর নাগপুর ও পরে কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনে অবশিষ্ট বিপ্লবীরা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন কিন্তু পুলিন বিহারী দাশ কখনও মোহনদাসের আদর্শের সাথে আপোস করতে চাননি এবং তাঁকে তাঁর নেতা বলে মানতে পারেননি। সেই সময় তাঁর সমিতির নিষিদ্ধকরণ হওয়ার ফলে ১৯২০ সালে ভারত সেবক সঙ্ঘ নামে আর একটি দল গঠন করেন। এরপর ব্যারিস্টার এস.আর.দাসের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘হক কথা’ এবং ‘স্বরাজ’ নামে দুটি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং সেখানে গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের সমালোচনা করেন। সমিতির কাজ গোপনে চললেও সমিতির সাথে তাঁর বিরোধ এরপর প্রকাশ্যে চলে আসে। এরপর সমিতির সাথে তিনি সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন এবং ভারত সেবক সঙ্ঘকে ভেঙ্গে দিয়ে ১৯২২ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ১৯২৮ সালে কলকাতার মেছুয়া বাজারে বঙ্গীয় ব্যয়াম সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এটা ছিল শারীরিক প্রশিক্ষণের একটি কেন্দ্র এবং কার্যত: একটি আখড়া যেখানে যুবকদের লাঠি চালনা, তলোয়ার চালনা ও কুস্তি শেখানো হত।

শেষ জীবন[সম্পাদনা]

তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর তিন পুত্র এবং দুই কন্যা ছিল। পরবর্তীকালে এক যোগীর সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর মধ্যে ত্যাগের বাসনা জাগ্রত হয়। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৭ই অগাস্ট ৭২ বৎসর বয়সে তাঁর এই সুদীর্ঘ কর্মবহুল জীবনে ছেদ পরে। ১৯২৮ সালে থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পুলীন বাবুর দ্বিতীয় পুত্র সৌরেন্দ্রর তত্ত্বাবধানে সেই বঙ্গীয় ব্যয়াম সমিতি সাফল্যের সাথে পরিচালিত হয়েছিল। বর্তমানে ওনার নাতিদ্বয় বিশ্বরঞ্জন ও মনীশরঞ্জন পুলীন বিহারি দাসের আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন। সেই সময়ে স্বামী সত্যানন্দ গিরি এবং তাঁর বন্ধুগণ তাঁর বাড়ির কাছেই একটি স্থানে মিলিত হতেন এবং সৎসঙ্গ করতেন[৫]

সম্মাননা[সম্পাদনা]

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ওনার সম্মানে পুলিন বিহারী দাশ স্মৃতি পদক নামে একটি পদক প্রচলন করেছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সেনগুপ্ত, এস. (ed.) (১৯৮৮). সমসদ বাংলা চরিতাভিধান (বাংলা), কলকাতা: সাহিত্য সমসদ, পৃষ্ঠা.২৮৮
  2. ২.০ ২.১ Political Agitators in India। পৃ: 67। 
  3. Sekhar Bandyopadhyay। From Plassey to Partition:A History of Modern India। Orient Blackswan। পৃ: 260। আইএসবিএন 81-250-2596-0 
  4. বাসিল কপ্লেস্টোন আলেন। ঢাকা। দ্য পাইওনিয়ার প্রেস। পৃ: 53। 
  5. যোগা নিকেতন। A Collection of Biographies of 4 Kriya Yoga Gurus by Swami Satyananda Giri। iUniverse। পৃ: 188। আইএসবিএন 978-0-595-38675-8