সরোজিনী নাইডু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরোজিনী নাইডু
Mahatma & Sarojini Naidu 1930.JPG
ডান্ডি পদযাত্রায় গান্ধীজির সঙ্গে সরোজিনী নাইডু।
জন্ম সরোজিনী চট্টোপাধ্যায়
(১৮৭৯-০২-১৩)ফেব্রুয়ারি ১৩, ১৮৭৯
হায়দরাবাদ, হায়দরাবাদ রাজ্য, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু মার্চ ২, ১৯৪৯(১৯৪৯-০৩-০২) (৭০ বছর)
ইলাহাবাদ, উত্তরপ্রদেশ, ভারত
দম্পতি মুথ্যালা গোবিন্দরাজুলু নাইডু
সন্তান জয়সূর্য, পদ্মজা, রণধীর ও লীলামণি

সরোজিনী নাইডু (ফেব্রুয়ারি ১৩, ১৮৭৯ - মার্চ ২, ১৯৪৯) ছিলেন স্বনামধন্য ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিশিষ্ট বাগ্মী ও ইন্দো-অ্যাংলিয়ান কবি। তিনি ভারতীয় কোকিলা বা দ্য নাইটেঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া নামে পরিচিত। সরোজিনী নাইডু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বাধীন ভারতে তিনি উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের রাজ্যপালও হয়েছিলেন।

সরোজিনী নাইডু ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সক্রিয় যোদ্ধা। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তিনি যোগ দেন ডান্ডি পদযাত্রায়। গান্ধীজি, আব্বাস তয়েবজিকস্তুরবা গান্ধী গ্রেফতার হলে তিনি ধারাসন সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব দেন। তিনি ছিলেন এক বিশিষ্ট বাগ্মী এবং ইংরেজি ভাষার যশস্বী কবি।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

সরোজিনী নাইডুর জন্ম ভারতের হায়দরাবাদ শহরের একটি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ছিল অধুনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামে। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানী, দার্শনিকশিক্ষাবিদ অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ও কবি বরদাসুন্দরী দেবীর জ্যেষ্ঠা কন্যা।[১] অঘোরনাথ ছিলেন নিজাম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনি ও তাঁর বন্ধু মোল্লা আব্দুল কায়ুম ছিলেন হায়দরাবাদের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সদস্য। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেবার জন্য তাঁকে কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে পদচ্যুত করে হয়।

সরোজিনীর ভাই বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন এক বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী।[১] প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন বার্লিন কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। পরবর্তীকালে তিনি কমিউনিজমে আকৃষ্ট হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি দেন। মনে করা হয়, সেখানেই স্তালিনের নির্দেশে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।[২]

সরোজিনীর অপর ভাই হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক বিশিষ্ট নাট্যকার, কবিঅভিনেতা[১]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

বারো বছর বয়সে সরোজিনী মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় সমগ্র মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৮৯১ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা বন্ধ রেখে তিনি নানা বিষয় অধ্যয়ন করেন। ১৮৯৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথমে লন্ডনের কিংস কলেজ ও পরে কেমব্রিজের গার্টন কলেজে পড়াশোনা করেন।

সরোজিনী উর্দু, তেলুগু, ফার্সিবাংলা ভাষা শিখেছিলেন।[১] তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন পি. বি. শেলি

স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ[সম্পাদনা]

১৯৩১ সালে লন্ডন যাত্রার পূর্বে গান্ধীজির সঙ্গে সরোজিনী নাইডু
চার্লি চ্যাপলিন ও গান্ধীজির সঙ্গে সরোজিনী নাইডু

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরোজিনী যোগ দেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯০৩ সাল থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি গোপালকৃষ্ণ গোখলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহম্মদ আলি জিন্না, অ্যানি বেসান্ত, সি. পি. রামস্বামী আইয়ার, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন।

১৯১৫ সাল থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি ভারতের নানা স্থানে যুবকল্যাণ, শ্রমের গৌরব, নারীমুক্তি ও জাতীয়তাবাদ বিষয়ে বক্তৃতাদান করেন। ১৯১৬ সালে জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি চম্পারণে নীলচাষীদের হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯২৫ সালে তিনি কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি।

১৯১৯ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার রাওলাট আইন জারি করে সকল প্রকার রাজদ্রোহমূলক রচনা নিষিদ্ধ করে। এর প্রতিবাদে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করলে সরোজিনী সর্বপ্রথমেই আন্দোলনে যোগ দেন। পরে ব্রিটিশ সরকার এই আন্দোলনের উপর ব্যাপক দমননীতি প্রয়োগ করে।

১৯১৯ সালের জুলাই মাসে সরোজিনী ইংল্যান্ডে হোমরুল লিগের দূত মনোনীত হন। ১৯২০ সালের জুলাই মাসের তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করার পর ১ অগস্ট গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করেন। ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি পূর্ব আফ্রিকান ভারতীয় কংগ্রেসের দুই জাতীয় কংগ্রেস প্রতিনিধির অন্যতম রূপে নির্বাচিত হন।

১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি নিউ ইয়র্ক সফর করেন। এই সময় যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান আমেরিকানআমেরিইন্ডিয়ানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের নিন্দা করেন তিনি। ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ৫ মে গান্ধীজিকে গ্রেফতার করা হয়। এর অনতিকাল পরেই গ্রেফতার হন সরোজিনী। এই সময় কয়েক মাস তিনি কারারুদ্ধ থাকেন। ১৯৩১ সালের ৩১ জানুয়ারি, গান্ধীজির সঙ্গে সঙ্গে তাঁকেও মুক্তি দেওয়া হয়। সেই বছরেই পরে আবার তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। স্বাস্থ্যহানির কারণে অল্পদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান সরোজিনী। গান্ধীজি মুক্তি পান ১৯৩৩ সালে। ১৯৩১ সালে গান্ধীজি ও পণ্ডিত মালব্যের সঙ্গে তিনিও গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। ১৯৪২ সালের ২ অক্টোবর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেবার জন্য তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। এই সময় গান্ধীজির সঙ্গে ২১ মাস কারারুদ্ধ ছিলেন সরোজিনী। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সরোজিনী নাইডুর সম্পর্ক এতটাই অন্তরঙ্গ ছিল যে গান্ধীজিকে তিনি "মিকি মাউস" বলেও ডাকতেন।

১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে এশীয় সম্পর্ক সম্মেলনের স্টিয়ারিং কমিটির পৌরহিত্য করেন সরোজিনী নাইডু।

১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট স্বাধীনতার পর সরোজিনী নাইডু যুক্তপ্রদেশের (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যপাল নিযুক্ত হন।[১] তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল। ১৯৪৯ সালের ২ মার্চ কার্যকালেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর।

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

১৭ বছর বয়সে সরোজিনী ড. মুথ্যালা গোবিন্দরাজুলু নাইডুর প্রেমে পড়েন। ১৯ বছর বয়সে পড়াশোনা সমাপ্ত করে তাঁর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। উল্লেখ্য, সেই যুগে অসবর্ণ বিবাহ সমাজে নিষিদ্ধ ছিল। সরোজিনী ব্রাহ্মণ হলেও গোবিন্দরাজুলু ছিলেন অব্রাহ্মণ।[১] ১৮৯৮ সালে মাদ্রাজে ১৮৭২ সালের আইন অনুযায়ী তাঁদের বিবাহ হয়। তাঁদের চারটি সন্তান হয়েছিল: জয়সূর্য, পদ্মজা, রণধীর ও লীলামণি।[১] কন্যা পদ্মজা পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হন।

রচনাবলি[সম্পাদনা]

  • The Golden Threshold (১৯০৫)
  • The Bird of Time: Songs of Life, Death & the Spring (১৯১২)
  • The Broken Wing: Songs of Love, Death and the Spring (১৯১৭)
  • The Sceptred Flute: Songs of India (১৯৪৩)
  • The Feather of the Dawn (১৯৬১)
  • The Gift of India

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ ১.৪ ১.৫ ১.৬ India's Freedom Struggle: Sarojini Naidu
  2. Stalin's shooting lists.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]