রাহুল সাংকৃত্যায়ন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রাহুল সাংকৃত্যায়ন

রাহুল সাংকৃত্যায়ন
জীবিকা লেখক, প্রাবন্ধিক, সমাজবিজ্ঞান, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, ইতিহাস, দর্শন, ব্যাকরণ, বিজ্ঞান, নাটক, রাজনীতি
জাতীয়তা ভারতীয়
নাগরিকত্ব ভারতীয়
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ১৯৫৮: সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার
১৯৬৩: পদ্মভূষণ

রাহুল সাংকৃত্যায়ন বা কেদারনাথ পাণ্ডে (১৮৯৩ - ১৯৬৩) ছিলেন ভারতের একজন বিখ্যাত ও জ্ঞানী পর্যটক। তিনি তার জীবনের ৪৫ বছর ব্যয় করেছেন বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে। তাকে মহাপন্ডিত উপাধি দেয়া হয়।

পরিচ্ছেদসমূহ

বাল্যজীবন [সম্পাদনা]

তার জন্ম ১৮৯৩ সালে, সনাতন হিন্দু ভূমিহার ব্রাহ্মণ পরিবারে। জন্মস্থান উত্তর প্রদেশের আজমগড়ের একটি ছোট্ট গ্রাম। তার আসল নাম ছিল কেদারনাথ পাণ্ডে। ছোটোবেলাতেই তিনি মাকে হারান। তার পিতা গোবর্ধণ পান্ডে ছিলেন একজন কৃষক। বাল্যে একটি গ্রাম্য পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন। আর এটিই ছিলো তার জীবনে একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এখানে তিনি উর্দুসংস্কৃতের উপর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন [সম্পাদনা]

জালিওয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকান্ড (১৯১৯) তাকে একজন শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী কর্মীতে রূপান্তরিত করে। এ সময় ইংরেজ বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাকে আটক করা হয় এবং তিন বছরের কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। এ সময়টিতে তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ সংস্কৃতে অনুবাদ করেন। পালি ও সিংহল ভাষা শিখে তিনি মূল বৌদ্ধ গ্রন্থগুলো পড়া শুরু করেন। এ সময় তিনি বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা আকৃষ্ট হন এবং নিজ নাম পরিবর্তন করে রাখেন রাহুল (বুদ্ধের পুত্রের নামানুসারে) সাংকৃত্যায়ন (আত্তীকরণ করে যে)।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি বিহারে চলে যান এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ (পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের প্রেসিডেন্ট)-এর সাথে কাজ করা শুরু করেন। তিনি গান্ধিজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং এসময় তিনি গান্ধীজী প্রণীত কর্মসূচীতে যোগদান করেন। যদিও তার কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলো না, তবুও তার অসাধারণ পান্ডিত্যের জন্য রাশিয়ায় থাকাকালীন লেনিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে শিক্ষকতার অনুরোধ করা হয়। তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। ভারতে এসে তিনি ডঃ কমলা নামক একজন ভারতীয় নেপালি মহিলা কে বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তান হয়, কন্যা জয়া ও পুত্র জিৎ। পরে শ্রীলংকায় (তৎকালীন সিংহল) বিদ্যালঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দার্জিলিংয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ভ্রমণ [সম্পাদনা]

রাহুল সাংকৃত্যায়নের ব্যক্তিগত জীবনের পুরোটাই কেটেছে ভ্রমণ করে। নয় বছর বয়সে তিনি পৃথিবী দেখার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। কয়েক বছর পর কিছুদিনের জন্য বাড়িতে ফিরে আসেন, এবং আবার বাড়ি ছাড়েন। এবারে তিনি একটি মঠে সংস্কৃত শিক্ষা গ্রহণ করেন। ভোজপুরী, মৈথিলী, নেপালি, রাজস্থানী প্রভৃতি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তিনি এমনকি ফটোগ্রাফিও শিখেছিলেন।

তিনি ভারতের সকল তীর্থ-ক্ষেত্রে ভ্রমণ শুরু করেন। তিনি মাদ্রাজে ছিলেন এবং তামিল ভাষা শিখেছিলেন। এছাড়াও অন্ধ্র প্রদেশ, ব্যাঙ্গালোর, হাম্পি, কর্ণাটক প্রভৃতি স্থানেও ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ করেই তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন। তিনি এমনকি তিব্বতের নিষিদ্ধ ভূমিতেও গিয়েছিলেন। কাশ্মীর, কার্গিল প্রভৃতি এলাকা দিয়ে পায়ে হেটে তিনি তিব্বতে প্রবেশ করেন। ১৩শ খৃষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজীর নালন্দা ও বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয় এর পাঠাগার পুড়িয়ে ফেলার পর ভারতে সেই অর্থে তেমন সংস্কৃত ভাষার কাজ খুঁজে পাওয়া যায় না। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মূল উদ্দেশ্য ছিলো হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃত পুঁথি উদ্ধার করা, মূলত যেগুলো ছিলো বৌদ্ধ ধর্মের উপর।

তিব্বত থেকে তিনি পালি ও সংস্কৃতের মূল্যবান পুথি, বই ও কিছু চিত্রকর্ম নিয়ে আসেন। এগুলো নালন্দা ও বিক্রমশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিয়ে যাওয়া বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ তিব্বতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাটনা জাদুঘরে এর একটি অংশ সংরক্ষিত আছে।

তিনি তিন বার তিব্বত গিয়েছিলেন, তিব্বতীয় ভাষা শিখেছিলেন। তিব্বত-হিন্দী অভিধাণ রচনা করেছিলেন, যার শুধুমাত্র প্রথম অংশ তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। তিনি এরপর শ্রীলংকা, জাপান, কোরিয়া, চায়না, রাশিয়া তেহরান, বালুচিস্তান প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।

লেখক জীবন [সম্পাদনা]

তিনি ২০ বছর থেকে লেখালেখি শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন তার দিনলিপি রাখতেন সংস্কৃত ভাষায়। এটি পরে তার আত্মজীবনী লিখতে কাজে লেগেছিলো। তিনি মূলত সংস্কৃতেই লেখালেখি করতেন। এছাড়াও হিন্দী ব্যবহার করতেন। তিনি ত্রিশটিরও বেশি ভাষা জানতেন। হিন্দী,সংস্কৃত, পালি, ভোজপুরী, উর্দু, ফারসি, আরবী, তামিল, তিব্বতী, সিংহলী, ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান প্রভৃতি ভাষা জানতেন। তিনি ছিলেন একজন ভারতবিশারদ। ভ্রমণ, সামাজিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের উপর তার অনেক গ্রন্থ আছে। এর মাঝে কিছু জীবনী ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থও আছে।

লেখক জীবনের পরের দিকে মৌলিক কাজ অব্যাহত থাকলেও গ্রন্থ সম্পাদনা, অভিধাণ সঙ্কলন ইত্যাদি তুলনামুলকাভাবে বেশি করেছেন। এ সময় তিনি সর্বহারা শ্রেণীর মহান নেতাদের জীবনী রচনায় মনোযোগ দেন।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ভোল্গা থেকে গঙ্গা। এটি রচনার পর ভারতের হিন্দীভাষী প্রায় সমস্ত অঞ্চল থেকে তাকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো।

পুরস্কার তালিকা [সম্পাদনা]

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী [সম্পাদনা]

  • মানব-সমাজ
  • কিন্নর দেশে
  • এশিয়ায় দুর্গম ভূখন্ডে
  • ইরান
  • আমার লাদাখ যাত্রা
  • ভোলগা থেকে গঙ্গা
  • মানসিক গোলামী

হিন্দী [সম্পাদনা]

উপন্যাস ও ছোটো গল্প [সম্পাদনা]

  • জাকির হুসেন
  • ভাগো নেহি দুনিয়া কো বাদলো (১৯৪৪)
  • মধুর স্বপ্ন (১৯৪৯)
  • বিস্মৃত যাত্রী (১৯৫৪)
  • বিস্মৃতি কি গর্ভ মে

আত্মজীবনী [সম্পাদনা]

জীবনী [সম্পাদনা]

ভোজপুরী [সম্পাদনা]

  • তিনটি নাটক (১৯৪২)
  • পাঁচটি নাটক (১৪৯৪২)

নেপালী [সম্পাদনা]

  • বৌদ্ধধ্রর্ম দর্শন (অনুবাদকর্ম)(১৯৮৪)

তিব্বতী [সম্পাদনা]

মৃত্যু [সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কায় তিনি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তার একটি মাইল্ড স্ট্রোক হয়। পরে তিনি স্মৃতিশক্তিও হারিয়ে ফেলেন। ১৯৬৩ সালের ১৪ই এপ্রিল দার্জিলিংয়ে রাহুল সাংকৃত্যায়ন মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]