লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি
লাল খড়িতে ১৫১২-১৫১৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে আঁকা লিওনার্দোর আত্মপ্রতিকৃতি[১]
জন্মের নাম লেওনার্দো দি সের পিয়েরো
জন্ম (১৪৫২-০৪-১৫)এপ্রিল ১৫, ১৪৫২
ভিঞ্চি, বর্তমানে ফ্লোরেন্সের প্রদেশ, ইতালি
মৃত্যু মে ২, ১৫১৯(১৫১৯-০৫-০২) (৬৭ বছর)
এম্বোইজ, তুরিন (বর্তমানে ইন্দ্রে-এট-লোঁরে, ফ্রান্স)
জাতীয়তা ইতালিয়
ক্ষেত্র অনেক এবং চিত্রকলাবিজ্ঞানের বিবিধ ক্ষেত্র
আন্দোলন উচ্চ রেনেসাঁস
কাজ মোনা লিসা, দ্যা লাস্ট সাপার, ভিত্রুভিয়ান ম্যান
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির স্বাক্ষর

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (ইতালীয় Leonardo da Vinci লেওনার্দো দা ভিঞ্চি, পূর্ণ নাম Leonardo di ser Piero da Vinci লেওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি)(এই শব্দ সম্পর্কে উচ্চারণ ) (এপ্রিল ১৫, ১৪৫২ - মে ২, ১৫১৯) ইতালীয় রেনেসাঁসের কালজয়ী চিত্রশিল্পী। অবশ্য বহুমুখী প্রতিভাধর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অন্যান্য পরিচয়ও সুবিদিত- ভাস্কর, স্হপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেপথ্য জনক। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জন্ম ফ্লোরেন্সের অদূরবতী ভিঞ্চী নগরের এক গ্রামে, ১৪৫২ সালের ১৫শে এপ্রিল। তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার অন্যতম। তাঁর শৈল্পিক মেধার বিকাশ ঘটে খুব অল্প বয়সেই। আনুমানিক ১৪৬৯ সালে রেনেসাঁসের অপর বিশিষ্ট শিল্পী ও ভাস্কর আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিয়োর কাছে ছবি আঁকায় ভিঞ্চির শিক্ষানবিশ জীবনের সূচনা। এই শিক্ষাগুরুর অধীনেই তিনি ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষত চিত্রাঙ্কনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ১৪৭২ সালে তিনি চিত্রশিল্পীদের গীল্ডে ভর্তি হন এবং এই সময় থেকেই তাঁর চিত্রকর জীবনের সূচনা হয়।

লিওনার্দোর আঁকা মোনালিসা

১৪৭৮ সাল থেকে ১৫১৬-১৭ ও ১৫১৯ সাল অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রসারিত এবং বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত, এক দীর্ঘ ও অক্লান্ত কর্ম সাধনার জীবন তাঁর। গির্জারাজপ্রাসাদের দেয়ালে চিত্রাঙ্কন এবং রাজকীয় ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বেসামরিক এবং সামরিক প্রকৌশলী হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জ্ঞানের প্রয়োগ, অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, জীববিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিদ্যার মত বিচিত্র সব বিষয়ের ক্ষেত্রে তিনি গভীর অনুসন্ধিৎসা প্রদর্শন করেন এবং মৌলিক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন।

আনুমানিক ১৪৮২ সালে তিনি মিলান গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে তাঁর বিখ্যাত দেয়াল চিত্র দ্য লাস্ট সাপার অঙ্কন করেন। আনুমানিক ১৫০০ সালে তিনি ফ্লোরেন্স ফিরে আসেন এবং সামরিক বিভাগে প্রকৌশলী পদে নিয়োগ লাভ করেন। এই সময়েই তিনি তাঁর বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা অঙ্কন করেন। জীবনের শেষকাল তিনি ফ্রান্সে কাটান।

জীবনী[সম্পাদনা]

কৈশোর (১৪৫২-১৪৬৬)[সম্পাদনা]

লিওনার্দোর জন্ম হয়েছিল ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল রাত্রি ত্রিপ্রহরে। তুসকান এর পাহাড়ি এলাকা ভিঞ্চি তে, আর্নো নদীর ভাটি অঞ্চলে। তিনি ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক নোটারী পিয়েরে দ্য ভিঞ্চির এবং এক গ্রাম্য মহিলা ক্যাটরিনার অবৈধ সন্তান । তাঁর মা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত দাসী ছিলেন। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লিওনার্দোর নামে কোন বংশ পদবী ছিল না। “দ্য ভিঞ্চি” দিয়ে বোঝায় তিনি এসেছেন ভিঞ্চি নগরী থেকে। তাঁর পুরো নাম “লেওনার্দো দাই সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি” এর অর্থ হল পিয়েরোর পুত্র লিওনার্দো এবং সে জন্মেছে ভিঞ্চিতে।

লিওনার্দোর জীবনের প্রথম অংশ বিষয়ে খুবই অল্প জানা গিয়েছে। তাঁর জীবনের প্রথম ৫ বছর কেটেছে আনসিয়ানো-র একটি ছোট্ট গ্রামে। তারপর তিনি চলে যান ফ্রান্সিসকো তে তার পিতা,দাদা-দাদী ও চাচার সাথে থাকতে।তার পিতা অ্যালবিরা নামে এক ষোড়শী তরুণী কে বিয়ে করেছিল। সে লিওনার্দো কে অনেক স্নেহ করত। কিন্তু অল্প বয়সেই সে মৃত্যবরন করে। এর পরে কৈশোর জীবন বিষয়ে লিওনার্দো দুটি ঘটনার কথা লিপিব্ধ করে গিয়েছেন। প্রথম টি হল—একবার একটি ঘুড়ি হঠাৎ করে আকাশ থেকে নেমে তার দোলনার উপর দিয়ে যাবার সময় তার মুখে এর লেজের পালক বুলিয়ে যায়। লোকজন এই ঘটনাকে তার ভবিষ্যত জীবনের সফলতার লক্ষণ হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনা হল—তিনি ছোটবেলায় একবার এক পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটা গুহা আবিষ্কার করেছিলেন। গুহাটা ছিল অন্ধরার, আর তার মনে হচ্ছিল এর ভিতরে নিশ্চয় কোন অতিকায় দৈত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু তার অদম্য কৌতূহলের কারনে তিনি এই গুহায় কি আছে, তা খুঁজেও দেখেছিলেন।

ষোড়শ শতাব্দীর জীবনী লেখক ভাসারি রেঁনেসার চিত্রশিল্পীদের জীবনী লিখেছিলেন। লিওনার্দো কে নিয়ে তিনি তাঁর বর্ননায় বলেছেন-লিওনার্দো-র বাবা কে স্থানীয় একজন লোক বলেছিল তিনি যেন তার ছেলেকে একটি ছবি আঁকতে বলেন। লিওনার্দো এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে একটি ছবি এঁকেছিল। এতে ছিল একটি সাপের মুখ থেকে আগুন নির্গত হচ্ছে। ছবিটি এত সুন্দর হয়েছিল যে পিয়েরো তা স্থানীয় চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে তা বেশ ভাল দামে বিক্রি করেছিলেন। আর যে লোকটি তাঁকে এ ছবিটি আঁকিয়ে নিতে বলেছিল, তিনি তাকে একটি হৃদয়ের ছবি আঁকা ফলক উপহার দিয়েছিলেন।

ভ্যারিচ্চিও-র কাজে যোগদান (১৪৬৬-১৪৭৬)[সম্পাদনা]

ইতালির ফ্লোরেন্সে স্থাপিত লিওনার্দোর একটি মূর্তি

১৪৬৬ সালে লিওনার্দোর বয়স যখন ১৪, তখন তিনি ভ্যারিচ্চিও (Verrocchio)-র কাছে শিক্ষানবীশ হিসেবে যোগ দেন। ভ্যারিচ্চিও-র পুরো নাম “আন্দ্রে দাই সায়ন”, তিনি ছলেন সে সময়ের একজন সফল চিত্রকর। ভ্যারিচ্চিও-র কর্মস্থলে তৎকালীন গুণী মানুষদের সমাগম হত।আরও নামকরা যেসব শিল্পী ভ্যারিচ্চিও-র তত্ত্বাবধানে কাজ করত বা তার ওয়ার্কশপে যাতায়াত করত, তাদের মধে অন্যতম হলেন গিরল্যান্ডিও (Ghirlandaio), পেরুগন (Perugino), লরেঞ্জো দাই ক্রিডি (Lorenzo di Credi)।

এখানে কাজ করে লিওনার্দো হাতে কলমে প্রচুর কারিগরি জ্ঞানার্জন করেছিলেন। তার সুযোগ হয়েছিল কারুকার্য, রসায়ন, ধাতুবিদ্যা, ধাতু দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো, প্রাস্টার কাস্টিং, চামড়া দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো, গতিবিদ্যা এবং কাঠের কাজ ইত্যাদি শেখার। তিনি আরও শিখেছিলেন দৃষ্টিনন্দন নকশাকরা, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য তৈরি এবং মডেলিং। ভ্যারিচ্চিও-র ওয়ার্কশপে বেশিরভাগ কাজ করত তার অধস্তন কর্মচারীরা। ভাসারীর বর্ননানুসারে লিওনার্দো ভ্যারিচ্চিও কে তার “ব্যাপ্টিজম অব ক্রাইস্ট” ছবিটিতে সাহায্য করেছিলেন। ছবিটিতে দেখানো হয়েছে একটি দেবদূত যীশুর লাঠি ধরে আছে। ছবিটি ভ্যারিচ্চিও কে এতটাই অভিভূত করেছিল যে তিনি নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর কখনো তুলিই ধরবেন না, ছবিও আঁকবেন না। তবে খুব সম্ভবত ভাসারি ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করেছিলেন। সূক্ষ্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ ছবিটির যে সব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় তা হল- এটি বিশেষ পদ্ধতিতে তৈল রং দিয়ে আঁকা। ভ্যারিচ্চিও বেশ কয়েকটি কাজে লিওনার্দো মডেল হিসেবে ছিলেন। যেমন- “ডেভিড” চরিত্রে “দি বার্জেলো” ( Bargello) নামক ব্রোঞ্জ মূর্তিতে, “আর্চঅ্যাঞ্জেল মাইকেল” হিসেবে “টোবিস এন্ড অ্যাঞ্জেল“(Tobias and the Angel) এ।

১৪৭২ সালে ২০ বছর বয়সে লিওনার্দো “গিল্ড অব সেন্ট লুক” এর পরিচালক হবার য্যোগ্যতা অর্জন করেন। এটি চিকিৎসক এবং চিত্রকরদের একটি সংঘ্য। কিন্তু তার বাবা তাকে নিজেদের ওয়ার্কশপের কাজে লাগিয়ে দেন। ভ্যারিচ্চিওর সাথে চুক্তি অনুসারে তিনি তার সাথেও কাজ চালিয়ে যান। লিওনার্দোর নিজের হাতে তারিখ দেওয়া সবচেয়ে পুরানো ছবি হল আর্নোভ্যালি, তারিখটি হল ৫ই আগস্ট ১৪৭৩।

পেশাগত জীবন (১৪৭৬-১৫১৩)[সম্পাদনা]

আদালতের নথি থেকে দেখা যায় একবার লিওনার্দো সহ আরও ৩ জন যুবককে সমকামীতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তারা বেকসুর খালাসও পেয়েছিল। এরপর ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি কি করেছিলেন, কোথায় ছিলেন তার কিছুই জানা যায়নি। ধারণা করা হয় পরবর্তিতে ১৪৭৮ থেকে ১৪৮১ পর্যন্ত লিওনার্দো তার নিজের ওয়ার্কশপে কাজ করেছে। তিনি ১৪৭৮ সালে চ্যাপেল অব সেন্ট বার্নার্ড ও “অ্যাডোরেশন অব দি ম্যাগি” এবং ১৪৮১ সালে “মঙ্ক অব সান ডোনাটো এ স্কাপিটো” আঁকার দায়িত্ব পান।

ভাসারির মতে লিওনার্দো সে সময়ের সেরা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ১৪৮২ সালে তিনি ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি বীণা তৈরি করেছিলেন। লরেঞ্জো দ্য মেডিসি (Lorenzo de’ Medici) লিওনার্দো-র হাতে এই বীনা উপহার স্বরূপ মিলানের ডিউক লুদোভিকো এল মোরো (Ludovico il Moro) এর কাছে পাঠিয়েছিলেন শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার জন্য। এ সময় লিওনার্দো ডিউকের কাছে একটি চিঠি লিখেন, যাতে ছিল তার উদ্ভাবিত বিভন্ন চমকপ্রদ যন্ত্রের বর্ননা। তিনি এ চিঠিতে নিজের চিত্রশিল্পী পরিচয়ের কথাও লিখেছিলেন।

লিওনার্দো ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মিলানে কাজ করেছেন। এখানে তিনি ভার্জিন অব দ্যা রকস্ এবং দ্যা লাস্ট সাপার ছবি দুটি আঁকার দায়িত্ব পান। ১৪৯৩ থেকে ১৪৯৫ এর মধ্যে তার অধিনস্তদের মাঝে ক্যাটরিনা নামে এক মহিলার নাম পাওয়া যায়। ১৪৯৫ সালে এ মহিলাটি মারা যান। সে সময় তার শেষকৃত্যের খরচ দেখে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন লিওনার্দোর মা।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. This drawing in red chalk is widely (though not universally) accepted as an original self-portrait. The main reason for hesitation in accepting it as a portrait of Leonardo is that the subject is apparently of a greater age than Leonardo ever achieved. But it is possible that he drew this picture of himself deliberately aged, specifically for Raphael's portrait of him in The School of Athens.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সম্পর্কে আরও তথ্য পেতে হলে উইকিপিডিয়ার সহপ্রকল্পগুলোতে অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন:

Wiktionary-logo-en.svg সংজ্ঞা, উইকিঅভিধান হতে
Wikibooks-logo.svg পাঠ্যবই, উইকিবই হতে
Wikiquote-logo.svg উক্তি, উইকিউক্তি হতে
Wikisource-logo.svg রচনা সংকলন, উইকিউৎস হতে
Commons-logo.svg ছবি ও অন্যান্য মিডিয়া, কমন্স হতে
Wikivoyage-Logo-v3-icon.svg ভ্রমণ নির্দেশিকা, উইকিভয়েজ হতে
Wikinews-logo.png সংবাদ, উইকিসংবাদ হতে