বিধানচন্দ্র রায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বিধানচন্দ্র রায়
মহাকরণের সামনে বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতিমূর্তি
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
কার্যালয়ে
জানুয়ারি ১৪,১৯৪৮জুলাই ১, ১৯৬২
পূর্বসূরী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ
উত্তরসূরী প্রফুল্লচন্দ্র সেন
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম (১৮৮২-০৭-০১)জুলাই ১, ১৮৮২
পাটনা, বাংলা প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু জুলাই ১, ১৯৬২(১৯৬২-০৭-০১) (৮০ বছর)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস
ধর্ম ব্রাহ্ম

ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় (১ জুলাই, ১৮৮২১ জুলাই, ১৯৬২) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৪৮ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। চিকিৎসক হিসেবেও তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ড থেকে এফ.আর.সি.এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলে (বর্তমানে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ) শিক্ষকতা ও চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট সদস্য, রয়্যাল সোসাইটি অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনআমেরিকান সোসাইটি অফ চেস্ট ফিজিশিয়ানের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রভাবে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন। পরে কলকাতা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত হন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থীরূপে আইনসভায় নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে গ্রহণ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর চোদ্দো বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রভূত উন্নতি সম্ভব হয়েছিল। এই কারণে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার নামে অভিহিত করা হয়। ১৯৬১ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত হন। মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানে কলকাতার উপনগরী সল্টলেকের নামকরণ করা হয় বিধাননগর। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন (১ জুলাই) সারা ভারতে "চিকিৎসক দিবস" রূপে পালিত হয়।

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

১৮৮২ সালের ১ জুলাই বর্তমানে বিহার রাজ্যের অন্তর্গত পাটনার বাঁকিপুরে বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম। তিনি ছিলেন পিতা প্রকাশচন্দ্র রায় ও মা অঘোরকামিনী দেবীর ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ। অঘোরচন্দ্রের আদি নিবাস ছিল চব্বিশ পরগনার শ্রীপুর গ্রামে। সরকারি চাকুরিজীবি প্রকাশচন্দ্র ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

বিধানচন্দ্রের লেখাপড়ার সূচনা হয়েছিল এক গ্রাম্য পাঠশালায়। পরে পাটনার টি. কে. ঘোষ ইনস্টিটিউশন এবং তারপর পাটনা কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৮৯৭ সালে মাতৃবিয়োগের এক বছর পর প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাটনা কলেজে ভরতি হন। সেখান থেকে ১৮৯৭ সালে এফ.এ. এবং ১৯০১ সালে গণিতে সাম্মানিক সহ বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৯০১ সালে পাটনা কলেজ থেকে গণিতে অনার্স সহ বি.এ. পাশ করে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে এল এম এস এবং দু বছর পর মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে এম ডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইংল্যান্ড গিয়ে লন্ডনের বার্থেলেমিউ কেবল দু বছর সময়কালে একসাথে এম আর সি পি (লন্ডন)এবং এফ আর সি এস (ইংল্যান্ড) পরীক্ষায় সসম্মান উত্তীর্ণ হয়ে [১]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯১১ সালে বিধানচন্দ্র কলকাতায় ফিরে এসে ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে শারীরস্থানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ও ১৯১৯ সালে সরকারী চাকরী থেকে ইস্তফা দিয়ে কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিনের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। [১]

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

১৯২৩ সালে সর্বত্যাগী দেশবন্ধুর কাছে রাজনৈতিক দীক্ষা লাভ। কিছুদিনের মধ্যে আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। মহাত্মা গান্ধীর ডাকে কংগ্রেসে যোগদান।১৯৩১ সালে কারাবরণ করেন । দেশ স্বাধীন হবার পর উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল হবার জন্য তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর লোভনীয় প্রস্তাব সবিনয় ফিরিয়ে দেন। পশ্চিমবঙ্গের আইন সভার সদস্যগণ একবাক্যে তাঁকে দলনেতা নির্বাচন করলে সমস্যাকন্টকিত ভূমিখন্ডকে নবরূপ রূপায়ণকল্পে দায়িত্বপূর্ণ মুখ্যমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন(পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী)। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের প্রতিনিধিত্বে ১৯৪৮ সালের ১৪ই জানুয়ারি থেকে মৃত্যুকাল অবধি ১৪ বছর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের নবরূপকার[সম্পাদনা]

সময়টা ১৯৪৮ সাল। সদ্যখন্ডিত পূর্বপাকিস্তান থেকে ছিন্নমূল লক্ষ লক্ষ নরনারী শিশু নিঃসম্বল অবস্থায় শুধু প্রাণটুকু বাঁচাবার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়ছে সাতপুরুষের পদধূলিরঞ্জিত বাস্তুভূমি ছেড়ে। এই অক্লিষ্টকর্মা কর্মবীর তাদের দিয়েছিলেন মাথাগোঁজার ঠাঁই, একমুঠো খাবারের প্রতিশ্রুতি।উদ্বাস্তুর আগমনে রাজ্যে তখন খাদ্য ও বাসস্থানের সমস্যা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাচামাল পাটের যোগান বন্ধ । তিনি বহু পতিত জমি উদ্ধার করে এবং কিছু ধানের জমিতে পাটচাষের ব্যবস্থা করে লক্ষাধিক চটকলকর্মীর সম্ভাব্য বেকারি রুখলেন। শিল্পসমৃদ্ধ বাংলা গড়তে তাঁর ত্রুটিহীন পরকল্পনায় স্থাপিত হল দুর্গাপুর ইস্পাতনগরী , চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা । বাসস্থানের জন্য তৈরি হল কল্যাণী উপনগরী, লেক টাউন, লবণহ্রদ নগর । দুদ্ধ সরবরাহের জন্য গড়ে তুললেন হরিণঘাটা দুগ্ধপ্রকল্প। শিক্ষিত বেকারদের বিপুল পরিমাণে কর্মনিয়োগের জন্য সৃষ্টি করলেন কলকাতা রাষ্ট্রীয় সংস্থা।

শিক্ষাব্রতী[সম্পাদনা]

তিনি ১৯৪৩-৪৪ খ্রীঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছায় গড়ে উঠল রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ, পুরুলিয়া , রহড়া, নরেন্দ্রপুরে প্রাচীন ভারতীয় আদর্শে আশ্রমিক পরিবেশে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয় ।

সংস্কৃতিমনস্কতা[সম্পাদনা]

সত্যজিত রায়ের পথের পাঁচালীর মত আন্তর্জাতিক খ্যাতিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের ব্যয়ভার তাঁর সরকার বহন করে। বিশ্ববরেণ্য নৃত্যশিল্পী উদয়শংকরকে তিনি সরকারী তহবিল থেকে অনুদান দেন। কবিগুরুর জন্মশতবার্ষিকীতে রবীন্দ্ররচনাবলী প্রকাশের উদ্যোগ নেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৬২ সালের ১লা জুলাই বিধানচন্দ্র রায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম (ও মৃত্যু) দিন জুলাই ১ ভারতে চিকিৎসক দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রাক্তন ছাত্রদের ওয়েবসাইট,ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনী

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পূর্বসূরী
প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
জানুয়ারি ১৪,১৯৪৮জুলাই ১, ১৯৬২


উত্তরসূরী
প্রফুল্লচন্দ্র সেন