ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Bhupen-datta-1915.png

ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (জন্ম: ৪ সেপ্টেম্বর ১৮৮০ - মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬১) একজন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজতান্ত্রিক এবং গবেষক ।

প্রথম জীবন ও পরিবার[সম্পাদনা]

ভূপেন্দ্রনাথ কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন । তাঁর পিতা ছিলেন অ্যাটর্নী বিশ্বনাথ দত্ত এবং মা ছিলেন ভুবনেশ্বরী দেবী । তাঁর দুই দাদা ছিলেন নরেন্দ্রনাথ বা স্বামী বিবেকানন্দ এবং সাধক মহেন্দ্র ।

ভূপেন্দ্রনাথ কলকাতা মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউট থেকে এন্ট্রান্স পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাবার আগে তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শিবনাথ শাস্ত্রীর সাথে পরিচিত হয়ে হিন্দুসমাজের ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন ।

বৈপ্লবিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড[সম্পাদনা]

বৈপ্লবিক ধারায় ইংরেজকে ভারত থেকে তাড়ানোর জন্য তিনি ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ব্যারিস্টার পি মিত্রের নিখিল বঙ্গ বৈপ্লবিক সমিতিতে যোগ দেন । এখানে তিনি যতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, ভগিনী নিবেদিতা, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের সাহচর্য পান । মাৎসিনী এবং গ্যারিবল্ডির আদর্শ তাঁর প্রাথমিক বৈপ্লবিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল । তাঁর দাদা বিবেকানন্দের রচনাও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল ।

অরবিন্দ ঘোষের সহায়তায় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবীদের পত্রিকা সাপ্তাহিক যুগান্তরের সম্পাদক হন । দেশের বৈপ্লবিক চেতনা বাড়ানোর জন্য এই পত্রিকাটি ছাড়াও সোনার বাঙলা নামে একটি বেআইনী ইস্তাহার প্রকাশের জন্য ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় । মুক্তির পর তিনি সহকর্মীদের পরামর্শে ছদ্মবেশে আমেরিকা যাত্রা করেন । সেখানে তিনি ইন্ডিয়া হাউসে আশ্রয় পান ।

এরপর তিনি ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হন এবং দুই বছর পর ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন ।

তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার গদর পার্টি এবং সোশ্যালিস্ট ক্লাবের সংস্পর্শে এসে সমাজতন্ত্রবাদে বিশেষ জ্ঞানলাভ করেন । আমেরিকায় থাকাকলে শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে তাঁকে অর্থকষ্টে দিন কাটাতে হয়েছিল ।

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর বিপ্লবী আন্দোলনকে জোরদার করতে তিনিও অন্যান্য ভারতীয় বিপ্লবীদের মত বার্লিনে আসেন । ১৯১৬ থেকে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ঐতিহাসিক বার্লিন কমিটির সম্পাদক ছিলেন । ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ছদ্মবেশে দক্ষিণ ইউরোপ পৌছান । বার্লিন কমিটির অনুরোধে জার্মান সরকার তাঁকে গ্রিস থেকে বার্লিনে আনেন । তাঁর নেতৃত্বে বার্লিন কমিটি তাঁদের কর্মক্ষেত্র পশ্চিম এশিয়ায় বিস্তৃত করে । এই সমস্ত অঞ্চলে অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল কাজে যেসব বীর ভারতবাসী প্রাণ দিয়েছেন বা লিপ্ত ছিলেন তাঁদের তথ্যাদির প্রামানিক চিত্র তিনি তাঁর বইতে বর্ণনা করেছেন ।

বৈপ্লবিক আন্দোলনের সাথে সাথে তিনি সমাজতত্ত্ব এবং নৃতত্বের গবেষণা চালিয়ে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট উপাধি পান । ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে জার্মান অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটি এবং ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মান এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য ছিলেন । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের আহ্বানে বীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে তিনি মস্কোতে আসেন । এই অধিবেশনে মানবেন্দ্রনাথ রায় এবং বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত উপস্থিত ছিলেন । তিনি সোভিয়েট নেতা লেনিনের কাছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রদান করেন ।

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ভারতের শ্রমিক কৃষক আন্দোলনের একটি কর্মসূচী পাঠান । ১৯২৭-২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির এবং ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্য হন । ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসর করাচী অধিবেশনে শ্রমিক এবং কৃষকদের মৌলিক অধিকার নিয়ে একটি প্রস্তাব নেহেরুকে দিয়ে গ্রহণ করান । এছাড়াও তিনি বহু শ্রমিক এবং কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন । ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতের কৃষক আন্দোলনে যুক্ত থেকে বঙ্গীয় কৃষক সভার অন্যতম সভাপতি এবং দুবার অখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতি হন । আইন অমান্য আন্দোলনে কারাবরণ করেন ।

সাহিত্য প্রতিভা[সম্পাদনা]

সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ব, ইতিহাস, সাহিত্য, বৈষ্ণবশাস্ত্র, হিন্দু আর্যশাস্ত্র, মার্কসীয় দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল । বাংলা, ইংরেজি, জার্মান, হিন্দি, ইরানী প্রভৃতি ভাষায় তাঁর অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছে ।

তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:

  • অপ্রকাশিত রাজনীতিক ইতিহাস
  • যুগসমস্যা
  • তরুণের অভিযান
  • জাতিসংগঠন
  • যৌবনের সাধনা
  • সাহিত্যে প্রগতি
  • ভারতীয় সমাজপদ্ধতি (৩ খণ্ড)
  • আমার আমেরিকার অভিজ্ঞতা (৩ খণ্ড)
  • বৈষ্ণব সাহিত্যে সমাজতন্ত্র
  • বাংলার ইতিহাস
  • ডায়ালেক্টস অফ হিন্দু রিচুয়ালিজম
  • ডায়ালেক্টস অফ ল্যান্ড ইকোনমিকস অফ ইন্ডিয়া
  • বিবেকানন্দ দ্য সোসালিস্ট

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - প্রথম খণ্ড - সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান