আঁটপুর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আঁটপুর
আঁটপুর
স্থানাঙ্ক: ২২°২৮′ উত্তর ৮৮°১২′ পূর্ব / ২২.৪৬° উত্তর ৮৮.২° পূর্ব / 22.46; 88.2

আঁটপুর (ইংরেজি: Antpur) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার একটি গ্রাম । এটি তারকেশ্বর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । এটি এখানে অবস্থিত অনবদ্য টেরাকোটা মন্দিরের জন্য বিখ্যাত ।

ইতিহাস এবং গুরুত্ব[সম্পাদনা]

আঁটপুরের সবথেকে বিখ্যাত মন্দির হল রাধাগোবিন্দজিউ মন্দির । এটি প্রায় ১০০ ফুট উঁচু । বর্ধমান রাজের দেওয়ান কৃষ্ণরাম মিত্র এই মন্দিরটি গঠন করান । মন্দিরটি নির্মান সম্পূর্ণ হয় ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে (১৭০৮ শকাব্দে) । মন্দিরটির গায়ে অসাধারণ টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কারুকার্য আছে । মন্দিরের ভিতের ইঁটগুলি গঙ্গামাটি ও গঙ্গাজলে তৈরি । টেরাকোটার বিষয়গুলি নেওয়া হয়েছে ১৮টি পুরান, রামায়ন, মহাভারত, ভারতের ইতিহাস এবং মন্দির গড়ার সমসাময়িক বিষয় থেকে । মন্দিরটির চণ্ডীমণ্ডপ এবং দোলমঞ্চে কাঠের কারুকার্য আছে ।

আঁটপুর রাধাগোবিন্দজিউ মন্দির

এই মন্দিরটি যে সময়ে নির্মিত হয়েছিল সে সময়ে মুসলমান রাজত্ব হ্রাস পাচ্ছিল এবং ইউরোপিয়ানদের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল । এরকম বলা হয়ে থাকে যে কৃষ্ণরাম মিত্র হিন্দুদের উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য এই মন্দিরটি নির্মান করেছিলেন । এর আগে বিষ্ণুপুরেই টেরাকোটা মন্দিরের সবচেয়ে ভালো উদাহরনগুলি ছিল । কিন্তু এই মন্দির বিষ্ণুপুরের এই গুরুত্ব খর্ব করেছিল ।

মন্দিরটির গায়ের টেরাকোটাগুলিতে ভারতের ইতিহাস পুরান এবং সর্বধর্ম সমন্বয়কে সার্থকভাবে তুলে ধরা হয়েছে । তবে রাধাকৃষ্ণ, দুর্গা ও চণ্ডী, বেশি গুরুত্ব পেয়েছে । এছাড়া যুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্যও স্থান পেয়েছে । যুদ্ধের টেরাকোটা ভাস্কর্যগুলিতে অশ্বারোহী, গজারোহী এবং উটারোহী সৈন্যদের দেখা যায় । এছাড়া কামান এবং বন্দুক নিয়ে সৈন্যদের টেরাকোটাও দেখা যায় । হিন্দু পুরান ও ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন মুসলমান বাদশা, এবং ইউরোপিয়ানদেরও তুলে ধরা হয়েছে টেরাকোটার মাধ্যমে । [১] মন্দিরটি সিল্ক রুটের উপর অবস্থিত হওয়ায় বহু সংস্কৃতির ছাপ এর উপর পড়েছে । রাধাগোবিন্দজিউয়ের মন্দিরটি কালের প্রভাবে বর্তমানে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ । তবুও বেশিরভাগ টেরাকোটাই এখনো ভাল অবস্থায় আছে । নিরাপত্তার কারণে বর্তমানে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ বন্ধ রয়েছে ।

আঁটপুর রাধাগোবিন্দজিউ মন্দিরের পোড়ামাটির কারুকার্যে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা

রাধাগোবিন্দজিউয়ের মূল মন্দিরটি ছাড়াও এখানে রয়েছে আরো পাঁচটি শিবমন্দির । এগুলির নাম হল যথাক্রমে গঙ্গাধর, রামেশ্বর (বড়শিব), বাণেশ্বর, জলেশ্বর, ফুলেশ্বর এছাড়া রয়েছে দোলমঞ্চ । প্রত্যেকটি শিবমন্দিরের গায়েই টেরাকোটার কারুকার্য রয়েছে ।

খড়ের ছাউনির চণ্ডীমণ্ডপ

রাধাগোবিন্দজিউয়ের মূল মন্দিরের উত্তরদিকে রয়েছে খড়ের ছাউনির চণ্ডীমণ্ডপ । এটি অসাধারণ কাঠের কাজের অন্যতম নিদর্শন । এটি প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো এবং এর গায়ে কাঁঠাল কাঠের অসাধারণ কারুকার্য আছে । কৃষ্ণরাম মিত্রের পিতামহ কন্দর্প মিত্র এই চণ্ডীমণ্ডপে তাঁর গুরুদেবের সাথে মহামায়ার পূজা করেছিলেন ।

রাধাগোবিন্দজিউ মন্দিরের সামনে ঐতিহাসিক বকুল গাছ

এই পূজাবেদীতে এখনও শারদীয় পূজা এবং শ্যামাপূজা হয় । এই মন্দিরটির ঠিক সামনেই প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো একটি বকুল গাছ আছে । গাছটি বহু ইতিহাসের সাক্ষী ।

আঁটপুরে বাবুরাম ঘোষের (যিনি পরবর্তীকালে স্বামী প্রেমানন্দ বলে পরিচিত হন) গ্রামের বাড়ি ছিল । আঁটপুরেই স্বামী বিবেকানন্দ এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের আরো আটজন শিষ্য ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর তারিখে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন । আঁটপুরে স্বামী প্রেমানন্দের জন্মস্থানের উপর রামকৃষ্ণ-প্রেমানন্দ আশ্রম গড়ে উঠেছে ।[২]

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

আঁটপুরের গ্রাম্য অর্থনীতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এখানকার বিখ্যাত মন্দিরগুলি এবং রামকৃষ্ণ-প্রেমানন্দ আশ্রমের জন্য । এখানে প্রায়ই বহু মধ্যবিত্ত ভক্ত, পর্যটক এবং বিদেশীরা আসেন মন্দির দেখবার জন্য । নামে গ্রাম হলেও এটিকে আধা শহর বলা যায় ।

রাজবলহাট (আঁটপুর থেকে বাসে যেতে সময় নেয় ১৫ মিনিট) হ্যান্ডলুম শাড়ির জন্য বিখ্যাত । [১]

পরিবহন[সম্পাদনা]

কলকাতা, তারকেশ্বর বা হরিপাল থেকে সহজেই সড়কপথে আঁটপুর যাওয়া যায় । কলকাতা থেকে রেলপথে যাবার সহজ উপায় হল হাওড়া থেকে তারকেশ্বরের ট্রেন ধরে হরিপাল স্টেশনে নামা এরপর সেখান থেকে বাস । আগে আঁটপুরে একটি রেলস্টেশন ছিল । স্টেশনটি ছিল হাওড়া-আমতা-চাঁপাডাঙা-শিয়াখালা রুটের ন্যারোগেজ রেলপথের উপরে । রেলপথটি ছিল মার্টিন লাইট রেলওয়ে কম্পানির । এই কম্পানিটি ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল । ১৯৫০-এর দশকে কম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায় । এরপর থেকে আঁটপুরে পর্যটকদের আসার সংখ্যাও কমে যায় । [১][৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ দ্য টেলিগ্রাফ ২৪ জুলাই ২০০৫
  2. পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন বিভাগ
  3. দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন ২৪ জুলাই ২০০০