মধুপুর উপজেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মধুপুর
উপজেলা
মধুপুর বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
মধুপুর
মধুপুর
বাংলাদেশে মধুপুর উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৪°৩৭′০″ উত্তর ৯০°১′৫″ পূর্ব / ২৪.৬১৬৬৭° উত্তর ৯০.০১৮০৬° পূর্ব / 24.61667; 90.01806স্থানাঙ্ক: ২৪°৩৭′০″ উত্তর ৯০°১′৫″ পূর্ব / ২৪.৬১৬৬৭° উত্তর ৯০.০১৮০৬° পূর্ব / 24.61667; 90.01806 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগঢাকা বিভাগ
জেলাটাঙ্গাইল জেলা
আয়তন
 • মোট৩৭০.৪৭ কিমি (১৪৩.০৪ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০০১)[১]
 • মোট২,৫৯,৮৮৪
 • জনঘনত্ব৭০০/কিমি (১৮০০/বর্গমাইল)
সাক্ষরতার হারপুরুষ ৫৮.৭%, মহিলা-৫৪.৫%
 • মোট৫৬.৭% (২০১১)
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
পোস্ট কোড১৯৯৬ উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
প্রশাসনিক
বিভাগের কোড
৩০ ৯৩ ৫৭
ওয়েবসাইটপ্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট Edit this at Wikidata

মধুপুর উপজেলা বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা যা ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এটি ঢাকা বিভাগের অধীন টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে একটি এবং টাঙ্গাইল জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত। মধুপুর উপজেলার উত্তরে ময়মনসিংহ বিভাগের মুক্তাগাছা উপজেলাজামালপুর জেলা, দক্ষিণে ঘাটাইল উপজেলা, পশ্চিমে গোপালপুরধনবাড়ী উপজেলা এবং পূর্বে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা অবস্থিত। মধুপুরের উপর দিয়ে বংশী নদী প্রবাহিত হয়েছে।

মধুপুর কর্দম নামক অতিমাত্রায় বিচূর্ণিত ও জারিত লালচে বাদামি অবক্ষেপ দ্বারা গঠিত মধুপুর অঞ্চলটি ০.৯৭ থেকে ০.৯০ মিলিয়ন বছর পূর্বে এটি গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের তিনটি প্রধান ভূমিকম্পন বলয়ের মধ্যে মধুপুরে একটি বলয় রয়েছে যা মধুপুর ফল্ট নামে পরিচিত। এটি একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। মধুপুর উপজেলা আনারসের জন্য বাংলাদেশে বিখ্যাত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি আনারসের বাজার বসে মধুপুরে।[২] এছাড়া, বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম রাবার চাষের সূচনা হয় মধুপুর ও চট্টগ্রাম থেকে।

৪,২৪৪ বর্গ কিমি এলাকাজুড়ে অবস্থিত মধুপুর গড় বা শালবন এবং জীববৈচিত্র্যপূর্ণ সরক্ষিত মধুপুর জাতীয় উদ্যান এ উপজেলায় অবস্থিত। মধুপুর জঙ্গলে প্রায় ১৭৬ প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ ও ১৯০ প্রজাতির প্রাণি রয়েছে। এখানে একটি হরিণ প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে। গড় এলাকার আশেপাশে গারো সম্প্রদায় বসবাস করে। ২০১১ সালের হিসেব অনুযায়ী মধুপুর শহরের গড় সাক্ষরতার হার শতকরা ৫৬.৭ ভাগ (পুরুষ ৫৮.৭%, মহিলা-৫৪.৫%)।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৯৮ সালে মধুপুরে থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৮৩ সালে মধুপুর থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মধুপুরের সংসদীয় আসন টাঙ্গাইল-১। মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি জাতীয় সংসদে ১৩০ নং আসন হিসেবে চিহ্নিত।

পটভূমি[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: টাঙ্গাইল জেলা
মধুপুর জিরো পয়েন্ট ও বাস স্ট্যান্ড। আনারসের চত্বরটি এ অঞ্চলে আনারস চাষের গুরুত্ব বুঝিয়েছে।

ঐতিহাসিকদের মতে প্রাচীনকালে এ অঞ্চলটি আসামের কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল। মধ্যযুগে ১৪শ শতাব্দীর শেষভাবে অঞ্চলটি খেন্ রাজবংশের অন্তর্গত ছিল।[৩] পরবর্তীতে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কামতা রাজ্য জয় করার পর অঞ্চলটি মুসলমানদের দখলে চলে আসে। হোসেকামতা রাজ্যন শাহর পুত্র নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ পরবর্তীতে এ অঞ্চলটি শাসন করেন এবং সে সময় এটি নাসিরাবাদের (বর্তমান ময়মনসিংহ) অন্তর্ভূক্ত ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে নাসিরাবাদের নাম পরিবর্তন করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ রাখা হয়। ১৮৬৯ সালের ১লা ডিসেম্বর ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইলেকে আলাদা জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়[৪] এবং মধুপুর টাঙ্গাইল জেলায় অন্তর্ভূক্ত হয়। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে টাঙ্গাইল ১৯তম জেলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ব্রিটিশদের অধীন ১৮৯৮ সালে মধুপুরে থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মধুপরের নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না তবে জনশ্রুতি অনুসারে এ অঞ্চলটি অতীতে ঘন জঙ্গল ছিল। জঙ্গলে মৌমাছির চাক থেকে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করত। বেশি মধু পাওয়া যেতে বিধায় পরবর্তীতে এ অঞ্চলকে মধুপুর নামকরণ করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলটি রাজা ও জমিদাররা শসন করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে এ এলাকাটি জমিদারগণ শাসন করতেন। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ১৯৫০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হয়। এ আইন অনুসারে ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পর মধুপুর স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ হয়। ভারত ভাগের পর ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার মধুপুর বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে এবং ১৯৬০ সালে এখানে মধুপুর উদ্যান গঠন করে। ১৯৮২ সালে এ বনাঞ্চলকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।

ব্রিটিশ শাসনামলে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় মধুপুর জঙ্গল বিদ্রোহীদের অন্যতম আস্তানা ছিল। ১৭৮২ এ অঞ্চলের পুখুরিয়া নামক স্থানে বিদ্রোহীদের সাথে ব্রিটিশ বাহিনী সংঘর্ষ হয়। পরবর্তীতে মজনু শাহর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।[৫] বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী এলাকাটি দখল করে। ১৪ এপ্রিল থেকে মুক্তিবাহিনীর সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। মধুপুরের যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনসহ ৫ সেনা নিহত হন।[৬] ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর মধুপুরকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৮৩ সালে মধুপুর থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।

ভূগোল[সম্পাদনা]

মধুপুর গড় বা শালবন। এ বনে গজারি গাছের আধিক্য দেখা যায়।

মধুপুর উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান ২৪°৩৭′০০″ উত্তর ৯০°০১′৩০″ পূর্ব / ২৪.৬১৬৭° উত্তর ৯০.০২৫০° পূর্ব / 24.6167; 90.0250। এটি টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলার মহাসড়কের দুপাশে এবং টাঙ্গাইল জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত। এর মোট আয়তন ৩৭০,৪৭ বর্গ,কি:মি:। পুরো উপজেলাটি বনাঞ্চল বেষ্টিত পাহাড়ি জনপদ নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিকভাবে মধুপরের মাটি লাল। মধুপুর উপজেলার কেন্দ্র থেকে দক্ষিণে টাঙ্গাইল, পশ্চিমে জামালপুর এবং উত্তরে ময়মনসিংহ জেলা সদর অবস্থিত। প্রতিটি জেলা সদর মধুপুরের কেন্দ্র থেকে ৪৫ কি:মি দূরুত্বে অবস্থিত। এর উত্তরে ময়মনসিংহ বিভাগের মুক্তাগাছা উপজেলাজামালপুর জেলা, দক্ষিণে ঘাটাইল উপজেলা, পশ্চিমে গোপালপুরধনবাড়ী উপজেলা এবং পূর্বে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা অবস্থিত।

কেদারনাথ মজুমদার লিখিত ময়মনসিংহের বিবরণ গ্রন্থ অনুসারে মধুপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন লৌহ, কয়লাতেল মজুদ রয়েছে বলে মনে করা হয়। ১৮৭৭ সালে দীননাথ সেন মধুপুর গড়ের মাটি পরীক্ষা করে তিনিও লৌহ খনি থাকার কথা বলেন। পরবর্তীতে সরকারিভাবে এ বনাঞ্চলে বেশ কয়েকবার পরীক্ষা-নিরিক্ষা করা হয়।

মধুপুরের উপর দিয়ে বংশী নদী প্রবাহিত হয়েছে। এটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে মধুপুর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বানারঝিনাই নামে দুটি নদীর শাখার সাথে মিলিত হয়েছে। পরবর্তীতে সেটি কালিয়াকৈরে দুই ভাগ হয়ে একটি শাখা তুরাগ নামে মিরপুর দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে পতিত হয়েছে। অন্য শাখা সাভার হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পতিত হয়েছে।[৭] টাঙ্গাইল জেলার মাঝারি নদীসমূহের মধ্যে বংশী সবচেয়ে বড়। উৎপত্তিস্থল হতে সঙ্গমস্থল পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্যে ১০০ মাইল।[৮]

ভূ-প্রকৃতি[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: মধুপুর কর্দম
মধুপুর জাতীয় উদ্যান
মধুপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বংশী নদী।

ভূতাত্ত্বিকভাবে মধুপুর উপজেলাসহ আশেপাশের অঞ্চলের ভূমি মধুপুর কর্দম নামক অতিমাত্রায় বিচূর্ণিত ও জারিত লালচে বাদামি অবক্ষেপ দ্বারা গঠিত।[৯] এই অবক্ষেপটি নতুন প্লাইসটোসিন যুগে জলবায়ুগত কারণে সৃষ্ট ও এটি বিভক্ত কয়েকটি প্লাইসটোসিন সোপানের সমন্বয়ে গঠিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্লাইসটোসিন চত্বর। একই কর্দমের মধ্যে মধুপুর গড় অঞ্চলসহ লালমাই পাহাড়বরেন্দ্র ভূমি সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ময়নামতী সভ্যতাও এই অবক্ষেপের স্তরসমষ্টি বেষ্টিত অঞ্চলের অন্তর্গত।[৯] এ অঞ্চলের ভূমি সঞ্চয়ন সংলগ্ন প্লাবনভূমি থেকে সামান্য উঁচু যা হ্যালোইসাইট ও ইলাইটের সমন্বয়ে সৃষ্ট। এগুলো মিলে উত্তর-দক্ষিণে এটি প্রলম্বিত ভূভাগ গঠন করেছে যা স্মারক প্রত্নমৃত্তিকার অন্তর্গত। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ০.৯৭ থেকে ০.৯০ মিলিয়ন বছর পূর্বে এটি গঠিত হয়েছে।[৯] হাওর সৃষ্টির সাথে মধুপুর কর্দমের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়।[১০]

উত্তর-প্লাইসটোসিন যুগে এ অঞ্চলটিতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও বিভিন্নভাবে ক্ষয়ের কারণে বেশকিছু প্লাইসটোসিন সোপান আলাদা হয়ে গিয়েছে। পরে, এই সোপানগুলোই একটি অপরটির সাথে যুক্ত হয়ে ও খোলা স্থানে উর্বর পলিমাটিতে পূর্ণ হয়ে প্লাবনভূমির তৈরি হয়েছে।[১১] মধুপুর উপজেলার পুরো অঞ্চলে লাল রঙের মালভূমি সদৃশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টিলা রয়েছে যা স্থানীয় ভাষায় চালা বা চালা জমি নামে ডাকা হয়। টিলাগুলোর উচ্চতা ৯ থেকে ১৮.৫ মিটার পর্যন্ত।[১২] এরকম অসংখ্য ছোট টিলার মাঝে মাঝে কলো পললযুক্ত সমতল উর্বর ভূমি রয়েছে যা স্থানীয়ভাবে বাইদ নামে পরিচিত।[১২] এ সমতল ভূমিগুলোতেই মূলত চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ অঞ্চলের গড় উচ্চতা ১৫ মিটারেরও অধিক।[১২]

এ অঞ্চলের মাটি অ্যালুমিনা (১৯.৯৫% থেকে ২১.০৭%) ও লৌহ অক্সাইডে (৮.১২% থেকে ৯.৮২%) সমৃদ্ধ।[১৩] এছাড়াও এতে যৌগ পদার্থ, দ্রবণীয় লবণ ও উদ্ভিজ্জ পদার্থ রয়েছে।[১৩] এর প্রসারণ ক্ষমতা হলোসিন যুগের মাটির চেয়ে সামান্য বেশি।[১৩] মধুপুরে মূলত তিন ধরনের মৃত্তিকা বেশি দেখা যায়: গাঢ়-লাল বাদামি রঙের সোপান-মৃত্তিকা, অম্লীয় অববাহিকা এঁটেল মাটি ও অগভীর লাল-বাদামি সোপান-মৃত্তিকা।[১৪]

বাংলাদেশের তিনটি প্রধান ভূমিকম্পন বলয়ের মধ্যে মধুপুরে একটি বলয় রয়েছে যা মধুপুর ফল্ট নামে পরিচিত।[১৫] ২০০৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী দেশের ভূকম্পন বলয়সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।[১৫] এটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।[১৬] ১৯১০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূমিকম্পন বিষয়ক গবেষণায় অনুসারে মধুপুর ফল্টটি পাইস্টোসিন বা মহাহিম যুগে শক্তিশালী ভূকম্পনের ফলে মধুপুর গড় অঞ্চলে তৈরি হয়। ভূগোলবিদ মর্গান এবং ম্যাকিটায়ারের মতে, এই ভূকম্পনের ফলেই মধুপুর গড় ও এর আশেপাশের উঁচু ভূমি গঠিত হয়েছে।[১৭][১৮] এই বলয়ের মধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের জন্য মধুপুরে একটি ভূকম্পমাপক টাওয়ার পরিচালনা করা হয়।[১৫]

মধুপুর উপজেলার তাপমাত্র গ্রীষ্মকালে ২৮ °সে থেকে ৩২ °সে-এর মধ্যে এবং শীতকালে ২০ °সে-এর মধ্যে থাকে।[১৯] তবে, অনেক সময় শীতের প্রকোপ বেশি হলে ১০ °সে হতে পারে। এ অঞ্চলে বার্ষিক ১,০০০ মিমি থেকে ১,৫০০ মিমি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি দেখা দেয়।[১৯] অপর্যাপ্ত মৌসুমি বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা ও এইসাথে ভূগর্ভস্থ পানির অত্যাধিক ব্যবহার এবং জলাশয় ভড়াটের ফলে খরার সূত্রপাতও ঘটে। ২০০৮ সালের ২০ মার্চ ঢাকা ও মানিকগঞ্জে মৃদু ভূমিকম্প হয়। ৩.৮ মাত্রা এই কম্পন মধুপুর চ্যুতি থেকে উৎপন্ন হয়।[২০]

প্রশাসন[সম্পাদনা]

মধুপুর উপজেলা মোট ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো, আলোকদিয়া, আরণখোলা, আউশনাড়া, গোলাবাড়ী, মির্জাবাড়ী, শোলাকুড়ি, মহিষমারা, ফুলবাগচালা, বেরীবাইদ, কুড়ালিয়া এবং কুড়াগাছা। ১৮৯৮ সালে মুধুপরে থানা স্থাপনের পর ১৯৮৩ সালে এটিকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ধনবাড়ী উপজেলা, মধুপুর উপজেলার অধীন ছিল। ২০০৬ সালের ১১ জুলাই মধুপুর উপজেলাকে বিভক্ত করে মধুপুর ও ধনবাড়ী নামে দুটি পৃথক উপজেলার সৃষ্টি হয়। এ সময় মধুপুর উপজেলাকে ৬টি ইউনিয়ন এবং ১টি পৌরসভায় ভাগ করা হয়।[২১] ইউনিয়ন ছয়টি হল, আলোকদিয়া, আরণখোলা, আউশনাড়া, গোলাবাড়ী, মির্জাবাড়ীশোলাকুড়ি। ২০১৬ সালের শুরুতে এই ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটিকে ভেঙ্গে আরও নতুন ইউনিয়ন গঠিত হয়। আউশনারা ইউনিয়নকে পৃথক করে আউশনারা, মহিষমারাকুড়ালিয়া, অরণখোলা ইউনিয়নকে পৃথক করে অরণখোলা, বেরীবাইদকুড়াগাছা এবং শোলাকুড়ী ইউনিয়নকে পৃথক করে শোলাকুড়ী ও ফুলবাগচালা নামে নতুন ইউনিয়ন তৈরি হয়।[২২]

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ১৯৯৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর তৎকালীন মধুপুর ইউনিয়নকে তৃতীয় শ্রেণীর (গ-শ্রেণী) পৌরসভায় রূপান্তরিত করে। ১৯৯৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রথম পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সরকার শহিদুল ইসলাম মধুপুর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি ২০০৪ সালের ১৪ই মে দ্বিতীয়বার ও ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে মাসুদ পারভেজ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পৌরসভাটি বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রথম শ্রেণীর (ক-শ্রেণী) পৌরসভা হিসেবে স্বীকৃত।

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মধুপুরের সংসদীয় আসন টাঙ্গাইল-১। মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি জাতীয় সংসদে ১৩০ নং আসন হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর অনুষ্ঠিত ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই মধুপুরের সংসদীয় আসনটি তৈরি করা হয়। প্রথম নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আব্দুস সাত্তার। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের নিজামুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে সতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার আনোয়ারুল হক, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের আবুল হাসান চৌধুরী, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ তারিখে বিএনপির আব্দুস সালাম তালুকদার, জুন ১৯৯৬ তারিখে আওয়ামী লীগের আবুল হাসান চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ আসন থেকে নির্বাচিত হন।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

মধুপুরের আনারস বাগান।

মধুপুর মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। শালবন বেষ্ঠিত এ অঞ্চলটি আনরসের জন্য বাংলাদেশে বিখ্যাত। এছাড়াও এখানে কলা, কাঁঠাল, আম, হলুদ এবং ধান বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। ২০০১ সালের ভূমিজরিপ অনুসারে মধুপুরের ৬৪.৪০ শতাংশ বসবাসকারীর কৃষিভূমির মালিকানা রয়েছে। মধুপুরের প্রধান কৃষিজ ফসল হল ধান, গম, হলুদ, আখ, পাট, আলু, আদা, তুলা, পান, কাসাভা ও শাকসবজি। কাঁঠাল, আম, আনারস, কলা, পেঁপে, লিচুজলপাই ফল সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়।[২৩] উপজেলার অনেক ইউনিয়নে গবাদি পশু পালন, মৎস খামার ও নার্সারি রয়েছে।

বন অধিদপ্তর ১৯৫২ মালয়েশিয়াশ্রীলঙ্কা থেকে রাবার বীজের নমুনা এনে বাংলাদেশে রাবার উৎপাদনের পরীক্ষা চালায়। সর্বপ্রথম পরীক্ষামূলকভাবে তখন চট্টগ্রাম ও মধুপুর অঞ্চলে রাবার বীজ রোপণ করা হয়।[২৪] মধুপুর বনাঞ্চলের পীরগাছা নামক স্থানে ১৯৮৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন রাবার বাগন প্রতিষ্ঠা করে বণিজ্যিকভাবে রাবার উৎপাদন শুরু করে। প্রধান তিনটি রাবার বাগান হলো: পীরগাছা রাবার বাগান, চাঁদপুর রাবার বাগান ও কমলাপুর রাবার বাগান। প্রতি বছর গড়ে এ তিনটি বাগান থেকে মোট উৎপাদিত রাবারের বাজারমূল্য ষাট কোটি টাকা। ২০০৩ সালে এখানে বাংলাদেশ সরকার ভেষজ ওষুধের কাঁচামালের যোগান দিতে ভেষজ উদ্ভিদের খামার নির্মাণ করে। এছাড়া, সুগন্ধি তৈরির কাঁচামাল যোগন দিতে আমের বাগান গড়ে উঠছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধানের উন্নত বীজ সরবরাহ করার জন্য এখানে ১৯৬১ সালের ১৬ই অক্টোবর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রায় ৫১৭ একর জমি নিয়ে বিএডিসির কৃষি গবেষণা ও বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকাটি গঠিত। বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের জন্য অসংখ্য বাগান গড়ে উঠেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে মধুপুরে মধু চাষও বেশ জনপ্রিয়।

পীরগাছা রাবার বাগান। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাবার বাগানগুলোর একটি মধুপুরে অবস্থিত।

মধুপুর উপজেলার আবহাওয়া আনারস চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।[২৫] তাই রাবার, কলা, আম ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ফসলের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় আনারস। জায়ান্টকিউ ও হানিকুইন বা জলডুগি নামে দুই জাতের আনারস বেশি দেখা যায়।[২৫][২৬] বাংলাদেশে কৃষি বিভাগের তথ্যানুসারে ২০১৮ সালে মধুপুরের ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ করা হয়।[২৬] মধুপুরের জলছত্রে, বর্ষাকালে আনারসের মৌসুমে বাংলাদেশে পাইকারি আনারসের সবচেয়ে বড় বাজার বসে।[২][২৭] এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে ঢাকায় প্রতিদিন ১০০ ট্রাক আনারস সরবরাহ করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে মধুপুরের আনারস ইউরোপেও রপ্তানি করা হচ্ছে।[২২][২৮] ২০১৮ মৌসুমে মধুপুর উপজেলায় ২০৯,৫১২ মেট্রিকটন আনারস উৎপাদিত হয়েছে।[২] মধুপুরের প্রায় সব ইউনিয়নেই আনারসের চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি চাষ হয় অরণখোলা, শোলাকুঁড়ি, আউশনাড়া ইউনিয়নে। আনারস বাজারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাজার হলো, জলছত্র, গারোবাজার, মধুপুর বাজার ও ২৫ মাইল বাজার।[২৯]

মধুপুর উপজেলার বিভিন্ন শিল্প ও কলকারখানা, কুটির ও তাঁতশিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্পকারখানাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, তাঁতকল, চালকল, লেদ ও ওয়েল্ডিং কারখানা, ফ্লাওয়ারমিল, বেকারি। কুটিরশিল্পের মধ্যে রয়েছে তাঁত, স্বর্ণ, লৌহশিল্প, বাঁশের তৈজসপত্র ও সেলাই কাজ। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আনারস, কাঁঠাল, রেশম, ক্যাসাভা, তাঁত, তুলা ও মধু। এছাড়া সেগুন, মেহেগনি, আকাশমণি কাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন বনজ উপাদান হয় ও স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়।

জীব বৈচিত্র‍্য[সম্পাদনা]

বানর, মধুপুর জাতীয় উদ্যান।

বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনাঞ্চল মধুপুর উপজেলায় থাকার কারণে এ উপজেলা জীব বৈচিত্রের দিক দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ।[৩০] গড় এলাকায় ১৯০ প্রজাতির প্রাণি রয়েছে।[৩১] উদ্যানে ২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪০ প্রজাতির পাখি ও ২৯ প্রাতির সরিসৃপ পাওয়া যায়।[৩১] উল্লেখযোগ্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে, মুখপোড়া হনুমান, লালমুখ বানর, মায়া হরিণ, শজারু, বুনো শুকর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে রয়েছে মেঘ হু, মাছরাঙা, খয়ড়া গোছা পেঁচা, বনমোরগ প্রভৃতি। এছাড়া, পূর্বে মধুপুর জঙ্গলে হাতি, বাঘ, চিতা ও ময়ূরের মত প্রাণীর বিচরণ ছিল।[৩১] ১৮৬৮ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত মধুপুর গড় থেকে ৪১৩টি হাতি শিকার করা হয়।[৩২]

মধুপুর জঙ্গলে প্রায় ১৭৬ প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ রয়েছে। এরমধ্যে ৭৩ প্রজাতির বৃক্ষ, ২২ প্রজাতির গুল্ম, ২৭ প্রজাতির ক্লাইম্বার, ৮ প্রজাতির ঘাস, ১ প্রজাতির পামগাছ ও ৪৫ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। এছাড়া, বনবিভাগের উদ্যোগে বেশকিছু বিদেশি প্রজাতির উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে।[৩১] মধুপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গজারি গাছ, উদ্যানেও মূলত এই গাছটিই বেশি দেখা যায় যার ফলে এটি শালবন হিসেবে পরিচিত। উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে শাল, মহুয়া, বহেড়া, আমলকী, হলুদ, আমড়া, জিগা, ভাদি, অশ্বত্থ, বট, সর্পগন্ধা, শতমূলী, জায়না, বিধা, হাড়গোজা, বেহুলা ইত্যাদি।[৩০] এছাড়া, আম, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা প্রভৃতি ফলজ উদ্ভিদ পুরো উপজেলাজুড়েই পাওয়া যায়।

মধুপুর গড়ে অর্কিড জাতীয় ফুল।

মধুপুর বনটি ১৯৬২ সালে বনবিভাগের আওতায় আসার পর এ বনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন অনুসারে, জীববৈচিত্র সংরক্ষণের উদ্দেশ্য ১৯৮২ সালে এ বনের ৮৪৩৬৬ হেক্টর জায়গাকে সরকার জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে যা মধুপুর জাতীয় উদ্যানে নামে পরিচিত। এ উদ্যানে লহড়িয়া বনবিট কার্যালয়ের পাশে হরিণের জন্য একটি প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে।[৩০]

ভাষা সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

আদিকাল থেকেই বৃহত্তর ময়মনসিংহের পাহাড়ী এ অঞ্চলটিতে মুসলিম, হিন্দু, গারো সম্প্রদায়, কচি, বামনসহ বিভিন্ন জাতির বসবাস। তাই ভাষা ও সংস্কৃতি বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। মধুপুর উপজেলার প্রধান ভাষা বাংলা। তবে গারো সম্প্রদায়ের লোকজন গারো ভাষায় কথা বলে। গারো ভাষার আঞ্চলিক আবেং উপভাষাটি এখানে বেশি ব্যবহার দেখা যায়। তবে এ ভাষার লিখিত কোনো বর্ণমালা নেই। মধুপরে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায় তাদের নিজ নিজ রীতি-নীতি মনে চলে। বাংলাদেশের অন্য অনেক অঞ্চলের মত বিয়ের অনুষ্ঠানে ডুলি এবং পালকির প্রচলন ছিল। পূর্বে মধুপুরে অতিথি আপ্যায়নের পর বস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী উপঢৌকনস্বরূপ দেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা
মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এ উপজেলার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

২০১১ সালের হিসেব অনুযায়ী মধুপুর শহরের গড় সাক্ষরতার হার শতকরা ৫৬.৭ ভাগ (পুরুষ ৫৮.৭%, মহিলা-৫৪.৫%)।[৩৩] ১৯৩৯ সালের ২ জানুয়ারি মধুপুরে নাটোরের রাণী ভবানীর পৃষ্ঠপোষকতায় রাণী ভবানী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। উপজেলায় একটি মহিলা কলেজসহ মোট ৭টি মহাবিদ্যালয়, ২টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৪টি উচ্চ বিদ্যালয়, ২টি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ৩নি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ফাজিল পর্যায়ে ৬টি সিনিয়র মাদ্রাসা, আলিম পর্যায়ে ১টি সিনিয়র মাদ্রাসা, ১৩টি দাখিল মাদ্রাসা, ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৭টি স্বল্পব্যয়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৭টি নিবন্ধিত এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে।[৩৪] উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মধুপুর কলেজ, রাণী ভবানী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, আলোকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রভৃতি। এ উপজেলার ইউনিয়নগুলোর মধ্যে, আলোকদিয়া ইউনিয়নের শিক্ষার হার প্রায় ৮৫% ও শোলাকুড়ি ইউনিয়নের ৪৮%।

মধুপুর কলেজ, এ উপজেলার একমাত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভূক্ত কলেজ।

মধুপুর উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের অন্য সব শহরের মতই। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধানত পাঁচটি ধাপ রয়েছে: প্রাথমিক (১ থেকে ৫), নিম্ন মাধ্যমিক (৬ থেকে ৮), মাধ্যমিক (৯ থেকে ১০), উচ্চ মাধ্যমিক (১১ থেকে ১২) এবং উচ্চ শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষা সাধারণত ৫ বছর মেয়াদী হয় এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় সমাপনী পরীক্ষার মাধ্যমে শেষ হয়, ৩ বছর মেয়াদী নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা সাধারণত নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), ২ বছর মেয়াদী মাধ্যমিক শিক্ষা মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি), ২ বছর মেয়াদী উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সাধারণত উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার মাধ্যমে শেষ হয়।

মূলত বাংলা ভাষায় পাঠদান করা হয় তবে ইংরেজি ব্যাপকভাবে পাঠদান ও ব্যবহৃত হয়। অনেক মুসলমান পরিবার তাদের সন্তানদের বিশেষায়িত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন মাদ্রাসাতে প্রেরণ করেন। মাদ্রাসাগুলোতেও প্রায় একই ধরনের ধাপ উত্তীর্ণ হতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর কোন শিক্ষার্থী সাধারণত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। মধুপুরে উচ্চ মাধ্যমিকের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য শুধুমাত্র মধুপুর কলেজ রয়েছে যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিএ ও এমএ ডিগ্রি প্রদান করে।

স্বাস্থ্য[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: বাংলাদেশে স্বাস্থ্য

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হার তুলনামূলক কম হলেও এটি মূলত দারিদ্র্যতার সাথে সম্পর্কিত হওয়ায়, এর উন্নতির সাথে সাথে বর্তমানে স্বাস্থ্য সেবাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধুপুর অঞ্চলে অপুষ্টি, পরিবেশগত স্যানিটেশন সমস্যা, ডায়াবেটিস, সংক্রামক রোগ প্রভৃতি বেশি দেখা যায়। উপজেলায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি সরকারি হাসপাতালের সাথে সাথে ৪টি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। ৪টি উপ-স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও ৮০টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক রয়েছে।[৩৫]

১৯৫১ সালে জলছত্রতে বেলজিয়ামের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডেমিয়েন ফাউন্ডেশন ৯৫ শয্যাবিশিষ্ট যক্ষা ও কুষ্ঠ রোগীদের জন্য বিশেষায়িত একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে যা ‘জলছত্র হাসপাতাল’ নামে পরিচিত।[৩৬] হাসপাতালটি শুরু থেকেই বিনামূল্যে সেবা দিয়ে থাকে। নিউজিল্যান্ডের নাগরিক এন্ড্রিক বেকার উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে মধুপুর গড় এলাকায় কাইলাকুড়ি নামক স্থানে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।[৩৭][৩৮] যেখানে মূলত দরিদ্রদের প্রায় বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। বেকারের ‍মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জেসন-মারিন্ডি দম্পতি এই হাসপাতালটি পরিচালনা করেন।[৩৯] এছাড়াও জলছত্র নামক স্থানে বেশ কিছু বেসরকারি মিশন বিভিন্নভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে।

১৯৭৭ সালে জাপানি এনকেফালাইটিসনামে মশাবাহিত ভাইরাসঘটিত রোগ সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ধরা পরে মধুপুরে।[৪০] মিশনারি পরিচালিত একটি হাসপাতালে গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানা যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের আর কোথাও এটির কথা শোনা যায়নি।[৪০] এছাড়া এ অঞ্চলে বিশেষ করে জঙ্গলের দিকে মানুষ ও প্রানীদেহে এঁটেল পোকা সংক্রান্ত বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।[৪১]

যোগাযোগ ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

মধুপরকে তিন জেলার মিলনস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মধুপুর জিরো পয়েন্ট থেকে দক্ষিণে টাঙ্গাইল, উত্তরে জামালপুর ও পূর্বে ময়মনসিংহ জেলা সদরের সাথে সংযোগকারী তিনটি সড়ক রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় মহাসড়ক এন৪ (জয়দেবপুর (এন৩, আর৩১০) - কাড্ডা (এন১০৫) - টাঙ্গাইল (এন৪০৪) - এলেঙ্গা (এন৪০৫) - মধুপুর (এন৪০১) - জামালপুর) মধুপুরকে জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে জামালপুরের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। মধুপুর জিরো পয়েন্ট থেকে এন৪০১ (মধুপুর - খাগদাহার (এন৩০৯) - ময়মনসিংহ (এন৩)) সড়কটি ময়মনসিংহের সাথে যুক্ত হয়েছে। মধুপুর থেকে ঢাকাগামী অধিকাংশ বাস মহাখালী বাস টার্মিনালে এসে থামে। মধুপুরো জিরো পয়েন্ট থেকে টাঙ্গাইল জেলা সদরের দূরুত্ব ৫০ কিলোমিটার, ময়মনসিংহের দূরত্ব ৪৭ কিলোমিটার, রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ১৩৭ কিলোমিটার।

২০০১ সালের হিসেব অনুযায়ী এ উপজেলায় ১৪০ কিলোমিটার পাকারাস্তা, ১৯০ কিলোমিটার কাঁচারাস্তা ও ৯ নটিক্যাল মাইল নৌপথ রয়েছে।[৪২] মধুপুর বাস স্ট্যান্ড থেকেই মূলত বিভিন্ন গন্তব্য বাস ছেড়ে যায়। এ উপজেলায় কোন রেললাইন বা ট্রেন যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। যদিও নৌপথ রয়েছে তবে নৌযাতায়াতের ব্যবস্থাও নেই। পূর্বে ছোট ছোট নৌকা বংশী নদী দিয়ে চলাচল করলেও নাব্যতা কমে যাওয়ায় তা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

উল্লেখযোগ্য স্থান[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন ২০১৪)। "এক নজরে"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. Independent, The (৪ ডিসে ২০১৮)। "Bumper pineapple production in Madhupur"Bumper pineapple production in Madhupur | theindependentbd.com। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসে ২০১৮ 
  3. (Sarkar 1992:44)
  4. D. Shamsul Haque Mia (মার্চ ১৯৯৯)। Education in Tangail। Tangail Forum। পৃষ্ঠা 26–27। 
  5. "ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  6. "মধুপুর উপজেলা"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  7. টাঙ্গাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  8. কোম্পানী আমলে ঢাকা, জেমস টেলর, পৃঃ ৭
  9. "মধুপুর কর্দম"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  10. "হাওর"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  11. "প্লাইসটোসিন সোপান"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  12. "ভূ-প্রকৃতি"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  13. "ইটের মাটি"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  14. "কৃষি প্রতিবেশ এলাকা"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  15. "মধুপুর ফল্টে কম্পন হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজধানী"ইত্তেফাক। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  16. "বাংলাদেশে দু'টি ফল্ট তিনটি প্লেট বাউন্ডারিতে ভূমিকম্পের আশঙ্কা"নয়া দিগন্ত। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  17. টাঙ্গাইল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার-১৯৮৩
  18. "মধুপুরে ভূমিকম্পের ফাটল রেখা"জনকণ্ঠ (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  19. "মধুপুর গড়"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  20. "ভূমিকম্প"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  21. ইউনিয়নের তালিকা - dctangail.gov.bd[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  22. "মধুপুরে মধুর আশ্বাস"মানবজমিন। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-১১-৩০ 
  23. "কাঁঠাল"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  24. "রাবার শিল্প"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  25. "জলছত্র-আনারসের হাট"বণিক বার্তা :: Bonikbarta.net | A Business News and Entertainment Daily from Bangladesh.। ৯ জানু ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসে ২০১৮ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  26. "মধুপুরের আনারস - 21.08.2018"DW.COM। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসে ২০১৮ 
  27. https://bangla.bdnews24.com/media_bn/article1522163.bdnews
  28. "ইউরোপে যাচ্ছে টাঙ্গাইলের 'জলডুগি'"jjdin। ২৭ জুলাই ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসে ২০১৮ 
  29. "মধুপুরের আনারস এখন ইউরোপে"মানবজমিন। সংগ্রহের তারিখ ৪ ডিসে ২০১৮ 
  30. "বংশী-নদীর-পাড়ে-মধুপুর-শালবন"এনটিভি। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  31. "মধুপুর জাতীয় উদ্যান"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  32. "খেদা"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  33. "Tangail Table C-06 : Distribution of Population aged 7 years and above by Literacy, Sex, Residence and Community" (PDF)bbs.gov.bd (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৪-১১-১৩ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০২-২৫ 
  34. "মধুপুর উপজেলা"madhupur.tangail.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  35. "পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ"মধুপুর উপজেলা (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  36. "মধুপুর পৌরসভা"মধুপুর পৌরসভার ওয়েবসাইট। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  37. "এগিয়ে চলবে ডাক্তার ভাইয়ের স্বপ্নযাত্রা"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  38. "মধুপুর পাহাড়ে ব্যতিক্রমী হাসপাতাল, গরিবের চিকিৎসা"জনকণ্ঠ (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  39. "নতুন ডাক্তার ভাই"কালের কণ্ঠ। সংগ্রহের তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  40. "স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  41. "এঁটেল"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  42. "মধুপুর উপজেলা"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৯ 
  43. পাভেল পার্থ। "মধুপুর শালবনে রক্তের দাগ শুকোবে না?"দৈনিক সমকাল। ঢাকা। ২৩ আগস্ট ২০১১ তারিখে মূল (ওয়েব) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ এপ্রিল ১৩, ২০১০ 

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]