মহুয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মহুয়া
Madhuca longifolia
Mahuwa trees in Chhattisgarh.jpg
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: Plantae
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণী: Magnoliopsida
বর্গ: Ericales
পরিবার: Sapotaceae
গণ: Madhuca
প্রজাতি: M. longifolia
দ্বিপদী নাম
Madhuca longifolia
(J.Konig) J.F.Macbr.

মহুয়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Madhuca longifolia অথবা "Madhuka indica")। মহুয়া মধ্যম থেকে বৃহৎ আকারের একটি বৃক্ষ। এটি Sapotaccae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে মহুয়ার আরেকটি প্রজাতি M. indica।

গঠন[সম্পাদনা]

এটি মধ্যম থেকে বৃহৎ আকারের একটি বৃক্ষ। পাতা ডিম্বাকার। বৃন্ত ছোট। ফুলগুলো রসাল এবং স্বাদ অম্লমধুর। ফুলের নির্যাসে মাদকতা আছে। এর ধূসর রঙের ছাল প্রায় আধা ইঞ্চি পুরু। বসন্তের শেষে সুপারির মতো আকারের ফল হয়। জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্য এর পরিপক্ব হয়।[১]

বিবরণ[সম্পাদনা]

মহুয়া ফুল

এই বৃক্ষ ২০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট হতে পারে। এর গুঁড়ি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং শীর্ষদেশ গোলাকার ও বিস্তৃত। এই বৃক্ষের শিকড়গুলি ছড়ানো এবং তার বেশি অংশ মাটির উপরিভাগে থাকে। এই বৃক্ষের ছাল ১.২ সেন্টিমিটারের মতো পুরু, প্রায় মসৃণ, ধূসর থেকে বাদামী রংয়ের হয় এবং এর গায়ে লম্বালম্বিভাবে ফাটল থাকে। এর কাঠ শক্ত থেকে অতি শক্ত হয় এবং বিস্তৃত অংশে কোমল কাঠ থাকে। সারবান কাঠের রং লালচে বাদামী। এর প্রতি ঘন ফুট কাঠের গড় ওজন ২৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এই গাছের শাখার শীর্ষদেশে ৭.৫ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা বর্শাকৃতির গুচ্ছবদ্ধ পাতা জন্মায়। এর ফুলগুলি মাংসল, হালকা ধূসর রংয়ের এবং গাছে যখন সম্পূর্ণ ফুল ফোটে তখন ফুল থেকে আকর্ষণীয় মিষ্টি সুগন্ধ বের হয়। এর ফল ডিম্বাকৃতির। জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এর পরিপক্ক বীজ পাওয়া যায়। মহুয়ার গাছ বাড়ে খুব ধীরে এবং চতুর্থ বছরের শেষের দিকে এর গড় উচ্চতা দাঁড়ায় ০.৯ থেকে ১.২ মিটার। একটি ৩০ বছরের পূর্ণ বয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা হয় প্রায় ৯.১৯ মিটার এবং পরিধি ০.৫ মিটার।

আঞ্চলিক নাম[সম্পাদনা]

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখা ফুল, ফল ও গাছপালার মধ্যে মহুয়াকে বর্ণনায় এনেছেন। স্থানভেদে একে মহুলা, মধুকা, মোহা, মোভা, মহুভা , মাদকম ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে দেশের বৃহত্তম বনাঞ্চল শালবন অঞ্চলে। [২]

উৎপত্তি[সম্পাদনা]

মহুয়া মধ্যভারতের আদি বাসিন্দা। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। শুষ্ক অঞ্চলের গাছ হলেও আর্দ্র কোমল আবহাওয়াতেও বেশ ভালো জন্মায়। শীতে সব পাতা ঝরে যায়।[১][৩]

প্রাপ্তিস্থান[সম্পাদনা]

ল্যাটিফোলিয়া (latifolia) প্রজাতির মহুয়া বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিবছর এর পাতা ঝরে যায়। এই গাছ বহু ধরনের মাটিতে জন্মে, তবে বেলে মাটিতে ভালো জন্মে। ভারতীয় নদী অববাহিকার পলিমাটিতে এই গাছ বেশ ভালো জন্মে। শালবনে এই গাছ শক্ত মাটিতে, এমনকি কিছুটা চুনা মাটিতেও জন্মাতে দেখা যায়। বাংলাদেশে এই গাছ বেশির ভাগ দিনাজপুর ও মধুপুর অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়। দেশের অন্যান্য অংশেও এর চাষ হয়। এই গাছের আলোর প্রয়োজনীয়তা খুব বেশি এবং ছায়াতে এর বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এই গাছ খরা প্রতিরোধক।

রোপন[সম্পাদনা]

আবাদি বৃক্ষ হিসেবে মহুয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গাছ এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এর মূল্য যথেষ্ট। এই ধরনের গাছ সড়কের ধারে, খালের তীরে প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে বিশেষ করে উপজাতীয় এলাকায় লাগানো যায়। এর কাঠ টিম্বার হিসেবে এবং মন্ড ও কাগজ তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়।

ঔষধি গুণ[সম্পাদনা]

ভেষজ গুণে মহুয়া অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য মহুয়া গাছের বীজের তেল ঠান্ডা ব্যথা উপশমে, ছাল অর্শ রোগে, পাতা পুরনো ক্ষত,ঠান্ডাজনিত সমস্যাসহ বহু রোগে প্রয়োগের উল্লেখ করেছেন। [২]মহুয়ার পাতা, বাকল, ফুলের নির্যাস ও তেলের বীজ নানা রোগের চিকিত্সায় বহুকাল থেকে ব্যবহূত হয়ে আসছে। মৌসুমি সর্দি কাশি, অগ্নিমান্দ্য, আন্ত্রিক রোগ, অর্শ, বাত-ব্যথা, মাথার ব্যথা—এসবের নিরাময়। তা ছাড়া পুরোনো ক্ষত ও কীট দংশনেও বিষ-ব্যথানাশক। সাঁওতালেরা মশার যন্ত্রণা, কীটপতঙ্গের দংশনের ক্ষেত্রে মহুয়া বীজের তেল ব্যবহার করে থাকে।[১] এছাড়া কৃমির চিকিৎসায় মহুয়া বীজের তেল ব্যবহার করা হয়।

ব্যবহার[সম্পাদনা]

লোক কথায় আছে, শাল বনে ভল্লুকের দল মহুয়া গাছের গন্ধে উন্মত্ত হতো। ক্ষীর বৃক্ষ মহুয়ার কাটা স্থানে সাদা দুধ নিঃসৃত হয়, কাণ্ড থেকে ছাল সংগ্রহ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা লালচে বাদামি রঙের আবির তৈরি করে পূজো আচারে ব্যবহার করেন। [২] মহুয়ার বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়। এর কাঠ অনেক শক্ত। নির্যাস আদিবাসী, বিশেষত সাঁওতালদের প্রিয় পানীয়।[১]

অন্যান্য ব্যবহার[সম্পাদনা]

মহুয়া ফুলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, খনিজ দ্রব্য, ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম রয়েছে। এই ফুল চালের সাথে রান্না করলে এর পুষ্টিমান বৃদ্ধি পায়। আখের পরেই মহুয়া ফুল মদ ও সিরকা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এটা গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এর ফুল ও ফল উপজাতীয় লোকেরা ঐতিহ্যবাহী খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। এর বীচিতে ২০% থেকে ৫০% ফ্যাটি অয়েল থাকে, যা সাবান প্রস্ত্ততের কাজে ব্যবহার করা যায়। মহুয়া বীজের খৈল সার হিসেবে প্রয়োগ করা যায়। অনেকের ধারণা যে, মহুয়া খৈল পোড়ানোর ধোঁয়া সাপ ও পোকামাকড় তাড়াতে পারে। উপজাতীয় লোকেরা মাছ মারার জন্য এবং সর্পদংশনের চিকিৎসার জন্য মহুয়া খৈল ব্যবহার করে। মহুয়ার তৈল প্রলেপ, ত্বকের রোগ নিরাময়, বাত, মাথাব্যথা, জোলাপ, অর্শ রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর বীচি থেকে আঠা পাওয়া যায়। এর তুষ সক্রিয় কার্বন তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়।


চিত্রমালা[সম্পাদনা]

[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. মন মাতানো মহুয়া ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৮-০৫-১৪ তারিখে,আশীষ-উর-রহমান, দৈনিক প্রথম আলো। ঢাকা থেকে প্রকাশের তারিখ: ০৩-০৪-২০১৩ খ্রিস্টাব্দ।
  2. মনোনেশ দাস (২০২২-০৩-২৪)। "মুক্তাগাছায় কমছে মহুয়া গাছ"DhakaTimes24। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-১৪ 
  3. দ্বিজেন শর্মা লেখক; বাংলা একাডেমী ; ফুলগুলি যেন কথা; মে, ১৯৮৮; পৃষ্ঠা-৩৪, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৪১২-৭

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]