সাবীয় জাতি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সাবীয় রাজ্য

مَمْلَكَة سَبَأ (আরবিতে)
১২০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে–২৭৫ খ্রিস্টাব্দ
রাজধানীসিরওয়াহ
মা’রিব, সানা
প্রচলিত ভাষাসাবাইক
ধর্ম
ইসলাম-পূর্ব আরবীয় ধর্ম
সরকারধর্মশাসন (গোড়ার দিকে)
রাজতন্ত্র (পরবর্তীতে)[১]
মোকাররিব 
• ৭০০–৬৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
কারিবি-ইলু
• ৬২০–৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
কারিবিল ওয়াতার
• ৬০–২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
ইলাসারোস
ঐতিহাসিক যুগলৌহ যুগ থেকে ধ্রুপদী সভ্যতা
• প্রতিষ্ঠা
১২০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে
• বিলুপ্ত
২৭৫ খ্রিস্টাব্দ
উত্তরসূরী
হিমিয়ার রাজ্য

সাবায়ি বা সাবীয় (সাবীয়: 𐩪𐩨𐩱, S¹Bʾ; আরবি: ٱلسَّبَئِيُّوْن, আস-সাবাইয়ুন; হিব্রু: סבאים) হলো দক্ষিণ আরবের প্রাচীন মানুষ। তারা প্রাচীন দক্ষিণ আরবীয় ভাষাসমূহের একটি ভাষা সাবীয়তে কথা বলে।[২] তারা সাবা (আরবি: سَـبَـأ) রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল,[৩][৪] যা বাইবেলে উল্লেখিত ভূমি শেবা[৫][৬][৭] এবং "দক্ষিণ আরবীয় রাজ্যের মধ্যে প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ"।[৮]

সাবার ভিত্তি প্রতিষ্ঠার সময় নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেনেথ কিচেনের মতে রাজ্যটি খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ২৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে স্থায়ী ছিল এবং এর রাজধানী ছিল মা’রিব।[৯] অন্যদিকে ইস্রায়েল ফিনকেলস্টাইন এবং নেইল আশের সিলবারম্যান বলেন যে "সাবীয় রাজ্য কেবলমাত্র খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে প্রসার লাভ করেছিল" এবং সুলায়মান এবং শেবার রানীর গল্প "সপ্তম শতাব্দীর এক অবিচ্ছিন্ন অংশ"।[১০] রাজত্ব দাবি করে বেশ কয়েকটি ইয়েমেনীয় রাজবংশের মধ্যে দীর্ঘ কিন্তু বিক্ষিপ্ত গৃহযুদ্ধের পরে এই রাজ্যটির পতন হয়েছিল;[১১][১২] এটি থেকে হিমিয়ার রাজ্য বিজয়ী হিসাবে উত্থিত হয়।

হিব্রু বাইবেলে সাবীয়দের সম্পর্কে বেশ কয়েক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে। কুরআনে[১৩] এগুলিকে 'সাবা'[৩][৪] অথবা তুব্বার সম্প্রদায় হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে (আরবি: قَـوْم تُـبَّـع‎, প্রতিবর্ণী. Qawm Tubbaʿ‎)।[১৪][১৫]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আল-বাইদা (প্রাচীন নাশকুম, সাবা রাজ্য) - তে প্রাপ্ত "ব্রোঞ্জ মানব", খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ–পঞ্চম শতাব্দী, লুভ্‌র জাদুঘর

সাবীয় রাজ্যের উৎপত্তির ইতিহাস অজ্ঞাত। কেনেথ কিচেনের মতে রাজ্যটি খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দ অবধি ছিল,[১৬] অন্যদিকে ইস্রায়েল ফিনকেলস্টাইন এবং নেইল আশের সিলবারম্যান বলেন যে "সাবীয় রাজ্য কেবলমাত্র খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে প্রসার লাভ করেছিল"।[১৭] মূলত, সাবীয়রা সায়হাদ মরুভূমির কিনারার "সম্প্রদায়" শাবদের অন্যতম ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম দিকে, এই উপজাতি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নেতারা ('মিল্ক) দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে শাবদের একটি বিশাল কমনওয়েলথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল এবং "এমকেআরবি এসবি' "সাবীয়দের মুকাররিব" উপাধি গ্রহণ করেছিল।[১৮]

বেশ কিছু কারণে খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দের শেষ দিকে সাবীয় রাষ্ট্র ও সভ্যতার উল্লেখযোগ্য অবক্ষয় ঘটে।[১৯] সাবা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে হিমিয়ার রাজ্য দ্বারা অধিকৃত হয়; তবে সাবা রাজাদের প্রথম হিমিয়ার রাজ্য এবং ধু রায়দানের মধ্যে বিভেদের পরে মধ্য সাবীয় রাজ্য দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমদিকে আবির্ভূত হয়েছিল,[২০] উল্লেখ্য যে মধ্য সাবীয় রাজ্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়ে প্রাচীন সাবীয় রাজ্য থেকে আলাদা ছিল।[২১] শেষ পর্যন্ত তৃতীয় শতাব্দীর শেষদিকে হিমিয়াররা সাবীয় রাজ্য জয় করে নেয় এবং সেই সময় রাজধানী ছিল মা’রিবমধ্যযুগীয় আরব ভৌগলিকগণ চিহ্নিত করেন যে এটি সায়হাদ নামে মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত, এর বর্তমান নাম রামলাত আল-সাবাতায়িন

সাবীয় জাতি দক্ষিণ আরবের সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। এই সম্প্রদায়ের প্রত্যেকেরই প্রাচীন ইয়েমেনে আঞ্চলিক রাজ্য ছিল, উত্তরে ওয়াদি আল-জাওফ এ মিনীয়দের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের সাবীয়রা, উচ্চভূমি থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত; তাদের পূর্বদিকে কাতাবীয়রা এবং তাদের পূর্বদিকে হাদরামিতরা ছিল। একই সময়কার অন্যান্য ইয়েমেনীয় রাজ্যের মতো সাবীয়রাও অত্যন্ত লাভজনক মশলার ব্যবসা, বিশেষত লোবান এবং গন্ধরস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল।[২২] তারা প্রাচীন দক্ষিণ আরবি লিপির অনেক শিলালিপি বা মুসনাদ এবং সেই সাথে সম্পর্কিত টানা হাতের লেখা যবুর লিপির অসংখ্য নথি রেখে গিয়েছে।

ধর্মীয় প্রথা[সম্পাদনা]

শিলালিপিতে তীর্থযাত্রার সময় ধর্মীয় রীতি-নীতি প্রদর্শন করা হয়েছে

মুসলিম লেখক মুহাম্মদ শুকরি আল-আলুসি তাঁর বুলুঘ আল-আরব ফি আহওয়াল আল-আরব এ ইসলামে তাদের ধর্মীয় অনুশীলনের তুলনা করেছেন:[২৩]

প্রাক-ইসলামিক যুগে আরবরা কিছু বিষয় অনুশীলন করত যা ইসলামী শরীয়তে অন্তর্ভুক্ত আছে। উদাহরণস্বরূপ, তারা কোন মা এবং তার মেয়ে উভয়কেই বিয়ে করেনি। তারা একই সাথে দুই বোনকে বিয়ে করা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ বলে মনে করতো। এছাড়াও যদি কেউ তার সৎ মাকে বিয়ে করতো তাকে তিরস্কার করতো এবং তাকে ধাইজান বলে অভিহিত করতো। তারা মূখ্য হজ্ব ও গৌণ উমরা পালন করার জন্য কাবায় তীর্থযাত্রা করত, কাবা শরীফের চারপাশে তাওয়াফ করত, সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার দৌড়াতো, পাথর নিক্ষেপ করতো এবং যৌন মিলনের পরে নিজেরা গোসল করতো। তারা গড়গড়া করতো, তাদের নাকের ভিতর পর্যন্ত পানি দ্বারা পরিষ্কার করতো, তাদের নখ কাটতো, সমস্ত গুপ্ত লোম কেটে পরিষ্কার করতো এবং খৎনা করার ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতো। অনুরূপভাবে তারা চোরের ডান হাত কেটে ফেলতো এবং ব্যভিচারীদের পাথর ছুঁড়ে মারতো।

নাস্তিক শাহরাস্তিনের মতে, সাবীয়রা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও বোধগম্য উভয় জগতকেই গ্রহণ করে তবে তারা ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে চলে না, বরং তাদের উপাসনা আধ্যাত্মিক সত্তা কেন্দ্রিক।[২৪]

ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ[সম্পাদনা]

কুরআন[সম্পাদনা]

বর্তমান ইয়েমেনের সারাওয়াত পর্বতমালার ভিতরে অবস্থিত সাবার সাবেক রাজধানী মা’রিবের ঐতিহাসিক বাঁধের ধ্বংসাবশেষ

কুরআনে ২৭তম[২৫] এবং ৩৪তম[২৬] সূরায় দু্ইবার সাবা'র নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে সূরার নাম অনুসারে এই অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়েছে। পূর্ববর্তীটি সুলায়মান এবং শেবার রানীর প্রসঙ্গে এই অঞ্চলটিকে বোঝায়, যদিও পরেরটি সাইল আল-আরিমকে (বাঁধের বন্যা) বোঝায়, যেখানে ঐতিহাসিক বাঁধটি বন্যার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। "কওম তুব্বা" ("তুব্বার লোক") বাক্যাংশটি, যা ৪৪তম[২৭] এবং ৫০তম[২৮] সূরায় উল্লেখ আছে, "তুব্বা" হিমায়ারিতদের মতো সাবার রাজাদের উপাধি ছিল।[২৯]

বাইবেল[সম্পাদনা]

বাইবেলের বই জব, জোয়েল, এজেকিয়েল এবং ইশাইয়াহতে সাবীয় জাতির উল্লেখ রয়েছে। জবের বইতে তাদের জবের পশুপাল এবং চাকরদের হত্যা করার কথা উল্লেখ আছে।[৩০] ইশাইয়াহতে তাদের "দৈহিক গঠন লম্বা" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।[৩১]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Houtsma, Martijn Theodoor (১৯৯৩)। E.J. Brill's First Encyclopaedia of Islam, 1913-1936v5। Leiden: BRILL। পৃষ্ঠা 292। আইএসবিএন 978-90-04-09791-9ওসিএলসি 258059170 
  2. Stuart Munro-Hay, Aksum: An African Civilization of Late Antiquity, 1991.
  3. কুরআন 27:6–93
  4. কুরআন 34:15–18
  5. Robert D. Burrowes (২০১০)। Historical Dictionary of Yemen। Rowman & Littlefield। পৃষ্ঠা 319। আইএসবিএন 0810855283 
  6. St. John Simpson (২০০২)। Queen of Sheba: treasures from ancient Yemen। British Museum Press। পৃষ্ঠা 8। আইএসবিএন 0714111511 
  7. Kenneth Anderson Kitchen (২০০৩)। On the Reliability of the Old Testamentসীমিত পরীক্ষা সাপেক্ষে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার, সাধারণত সদস্যতা প্রয়োজন। Wm. B. Eerdmans Publishing। পৃষ্ঠা 116আইএসবিএন 0802849601 
  8. "The kingdoms of ancient South Arabia"। Britishmuseum.org। মে ৪, ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০২-২২ 
  9. Kenneth A. Kitchen The World of "Ancient Arabia" Series. Documentation for Ancient Arabia. Part I. Chronological Framework and Historical Sources p.110
  10. Israel Finkelstein; Neil Asher Silberman, David and Solomon: In Search of the Bible's Sacred Kings and the Roots of the Western Tradition, পৃষ্ঠা 171 
  11. D. H. Muller (১৮৯৩), Himyarische Inschriften (জার্মান ভাষায়), Mordtmann, পৃষ্ঠা 53 
  12. Javad Ali, The Articulate in the History of Arabs before Islam, Volume 2, p. 420
  13. Brannon M. Wheeler (২০০২)। Prophets in the Quran: An Introduction to the Quran and Muslim Exegesis। Continuum International Publishing Group। পৃষ্ঠা 166। আইএসবিএন 0-8264-4956-5 
  14. কুরআন 44:37 (অনুবাদ করেছেন ইউসুফ আলী)
  15. কুরআন 50:12–14
  16. Kenneth A. Kitchen : The World of "Ancient Arabia Series. Documentation for Ancient Arabia. Part I. Chronological Framework and Historical Sources, p.110
  17. Israel Finkelstein, Neil Asher Silberman, David and Solomon: In Search of the Bible's Sacred Kings and the Roots of the Western Tradition, p. 171
  18. Andrey Korotayev. Pre-Islamic Yemen. Wiesbaden: Harrassowitz Verlag, 1996. আইএসবিএন ৩-৪৪৭-০৩৬৭৯-৬. P. 2-3.
  19. Andrey Korotayev. Ancient Yemen. Oxford: Oxford University Press, 1995. আইএসবিএন ০-১৯-৯২২২৩৭-১. P. 98.
  20. Andrey Korotayev. Pre-Islamic Yemen. Wiesbaden: Harrassowitz Verlag, 1996. আইএসবিএন ৩-৪৪৭-০৩৬৭৯-৬.
  21. KOROTAYEV, A. (1994). Middle Sabaic BN Z: clan group, or head of clan?. Journal of semitic studies, 39(2), 207-219.
  22. "Yemen | Facts, History & News"InfoPlease 
  23. al-Alusi, Muhammad Shukri। Bulugh al-'Arab fi Ahwal al-'Arab, Vol. 2। পৃষ্ঠা 122। 
  24. Walbridge, John. “Explaining Away the Greek Gods in Islam.” Journal of the History of Ideas, vol. 59, no. 3, 1998, pp. 389–403. JSTOR, www.jstor.org/stable/3653893.
  25. কুরআন 27:15–44
  26. কুরআন 34:15–17
  27. কুরআন 44:37 (অনুবাদ করেছেন ইউসুফ আলী)
  28. কুরআন 50:12–14
  29. Brannon M. Wheeler (২০০২)। Prophets in the Quran: An Introduction to the Quran and Muslim Exegesis। Continuum International Publishing Group। পৃষ্ঠা 166। আইএসবিএন 0-8264-4956-5 
  30. Job 1:14-15
  31. Isaiah 45:14

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]