মধু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
এক শিশি মধু
মৌচাক ভেঙে মধু বের করার দৃশ্য

মধু হল এক প্রকারের মিষ্টি ও ঘন তরল পদার্থ, যা মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গ ফুলের নির্যাস হতে তৈরি করে[১] এবং মৌচাকে সংরক্ষণ করে।[২] এটি উচ্চ ঔষধিগুণ সম্পন্ন একটি ভেষজ তরল ; এটি সুপেয়। বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুতিতে এর ব্যবহারে চিনির চেয়ে এর অনেক সুবিধা রয়েছে। এর বিশিষ্ট গন্ধের জন্য অনেকে চিনির চাইতে মধুকেই পছন্দ করে থাকেন। বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধু স্বাদ, রং, হালকা সুগন্ধ এবং ঔষধিগুণাবলীর জন্য প্রসিদ্ধ। সুন্দরবনের বেশীরভাগ মধু কেওড়া গাছের ফুল থেকে উৎপন্ন। সুন্দরবনের মাওয়ালী সম্প্রদায়ের লোকেরা মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে এবং তা বিক্রয় করে জীবন নির্বাহ করে। মধুর অন্য একটি গুণ হল এটি কখন নষ্ট হয় না৷ হাজার বছরেও মধু গুণাগুণ নষ্ট হয় না।[৩][৪]

ভৌত বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের জাতীয় মধু বোর্ডের সংজ্ঞা অনুযায়ী "মধু হল একটি বিশুদ্ধ পদার্থ যাতে পানি বা অন্য কোন মিষ্টকারক পদার্থ মিশ্রিত করা হয় নাই।"[৫] মধু চিনির চাইতে অনেক গুণ মিষ্টি। তরল মধু নষ্ট হয় না, কারণ এতে চিনির উচ্চ ঘনত্বের কারণে প্লাজমোলাইসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। প্রাকৃতিক বায়ুবাহিত ইস্ট মধুতে সক্রিয় হতে পারে না, কারণ মধুতে পানির পরিমাণ খুব অল্প। প্রাকৃতিক, অপ্রক্রিয়াজাত মধুতে মাত্র ১৪% হতে ১৮% আর্দ্রর্তা থাকে। আর্দ্রর্তার মাত্রা ১৮% এর নিচে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ মধুতে কোন জীবাণু বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। পাস্তুরাইয্‌ড মধুতে মধুর প্রাকৃতিক ঔষধি গুণাবলী হ্রাস পায়।

মানুকা হানি[সম্পাদনা]

নিউজিল্যান্ডের মানুকা হানি বাজারে প্রাপ্য অন্য সকল মধুর চেয়ে বেশী ঔষধিগুণ সম্পন্ন গণ্য করা হয়। মানুকা নামক একপ্রকার ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদের ফুল থেকে উৎপন্ন মধু "মানুকা হানি" নামে পরিচিত।[৬]

ব্যবহার[সম্পাদনা]

প্রাচীন গ্রিসের খেলোয়াড়েরা মধু খেযে মাঠে নামতো ; কারণ মধুতে রয়েছে উচ্চমাত্রার ফ্রুক্টোজগ্লুকোজ[৭][৮] যা যকৃতে গ্রাইকোজেনের রিজার্ভ গড়ে তোলে। রাতে ঘুমানোর আগে মধু খেলে মস্তিষ্কের ক্রিয়াক্ষমতা ভালো থাকে। নিয়মিত মধু পানে রোগ-বালাই হ্রাস পায় কেননা মধু মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ঠাণ্ডায় মধু ভালো কাজ করে ; পেনসিলভেনিয়া স্টেট কলেজের পরীক্ষায় দেখা গেছে বাজারে যত ঔষধ পাওয়া যায় তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এক চামচ মধু। মধুর ভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা উচ্চ। মধু হজমে সাহায্য করে। পেটরোগা মানুষদের জন্য মধু বিশেষ উপকারী।[৯] প্রাচীন কাল তেকে গ্রিস ও মিশরে ক্ষত সারাইয়ে মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২০০৭-এ সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে অধিকাংশ ক্ষত ও জখমের উপশমে মধু ডাক্তারী ড্রেসিং-এর চেয়েও বেশি কার্যকর। অগ্নিদগ্ধ ত্বকের জন্যও মধু খুব উপকারী।[১০]

মালয়েশিয়ার তুয়ালাং মধু (Tualang honey) স্ট্যাফ (Staph) রোধে এবং পেপটিক আলসার ও এইচ পিলরি (H. pylori)  ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস করতে পারে। [১]

খাঁটি মধু চেনার উপায়[১১][সম্পাদনা]

খাঁটি এবং ভেজাল মধু নিয়ে আমাদের মাঝে আছে নানা ধরণের কথাবার্তা। কিন্তু আমরা কখনো জানতে চাইনা, খাঁটি এবং ভেজাল মধু চেনার যে পদ্ধতি গুলো আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে তা আসলেই সঠিক কি না? কিংবা সেইগুলা আসলেই সাইন্টিফিক কি না? নাকি সেইগুলা কুসংস্কার? এই সব প্রশ্নের উত্তর আজকে আমরা জানবো দুই জন মধু গবেষকের কাছ থেকে।

তার আগে আমাদের মাঝে যে ভুল তথ্য আছে সেই গুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাকঃ

  1. পানিতে ঢেলে দিলে যদি সাথে সাথে পানির তলায় জমে তাহলে আসল।
  2. আগুন ধরিয়ে দিলে যদি পুড়ে যায় তাহলে আসল।
  3. বুড়া আঙুলের মাথায় দিলে যদি একটা একটা বিন্দুর মতো স্থির হয়ে থাকে তাহলে সেটা আসল।

এ ছাড়াও আরো কিছু সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ‘বৈজ্ঞানিক’ পদ্ধতির কথা আমরা শুনতে পাইঃ

  • পিঁপড়া মধু খেলে সেটা আসল।
  • মধুতে পিপড়া না ধরলে সেটা আসল।
  • ফ্রিজে রেখে দিলে জমে না গেলে সেটা আসল।
  • শীতকালে জমে গেলে তবেই সেটা আসল।

এই ধরণের প্রশ্নের একদম সঠিক উত্তর পেতে আমরা এখন ড. যাকারি হুয়াং এবং ড. লুস এলফেইন এর মতামত দেখবোঃ

385.994x385.994পিক্সেল

কেন্দ্র|থাম্ব|512.997x512.997পিক্সেল

513.991x513.991পিক্সেল

আসলে সাধারন মানুষের খাঁটি মধু চেনার কোনো উপায় নাইঃ

কারণ, মধুর সান্দ্রতা নির্ভর করে মধুর আর্দ্রতা ওপরে। যে মধুতে পানি বেশি সেটা কম ঘন। যে মধুতে পানি কম সেটা অনেক ঘন। মরু এলাকার ফুলের মধু আর বাওড় এলাকার ফুলের মধুতে অনেক তফাত থাকে। সুন্দরবনের একদম খাঁটি মধু অনেক পাতলা হয়, আবার সরিষা ফুলের সাথে অনেক ভেজাল মেশানোর পরেও সেটাকে বেশ ঘন মনে হবে।

মধুতে সামান্য মোম মিশিয়ে দিলেই মধুটা সটান পানির তলায় চলে যাবে, জমে থাকবে। আগুন ধরিয়ে দিলে আগুন জ্বলবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই মোমটা যদি মধুতে না মিশিয়ে চিনির শিরাতে মিশিয়ে দেন, একই ফল পাবেন। আমরা অফিসে চিনির শিরা ঘন করে বানিয়ে পরীক্ষা করে দেখিয়েছি চিনির শিরা বেশি ঘন হলে সোজা তলে চলে যায়, দ্রবীভূত হয় না।

সত্যি কথা বলতে কী, খাঁটি মধু বানানোর চাপে অনেক ভালো মধু উত্পাদকরাও মধুকে প্রক্রিয়াজাত করতে বাধ্য হন। প্রক্রিয়াজাত মানে মৌমাছির তৈরি মধুকে উত্তপ্ত করে পানির পরিমাণ কমিয়ে ফেলা। দুঃখজনক হলেও, এ কাজটা করতে গিয়ে মধুর বেশকিছু পুষ্টিমান হারিয়ে যেতে পারে। এজন্য আমরা চেষ্টা করছি মানুষের মাঝে একটা সচেতনতাবোধ তৈরি করতে যে মৌমাছিদের থেকে সরাসরি পাওয়া প্রাকৃতিক মধুই সবচেয়ে ভালো, হোক সেটার দাম বেশি, হোক সেটা একটু কম ঘন।

শুরুর প্রশ্নে ফিরে যাই – ঘরে বসে খাঁটি মধু চিনব কীভাবে? কোনো উপায় নেই। শুধু আমাদের কাছে না, পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীদের কাছেও নেই। অনলাইন হাতুড়েরা যেসব দেখাচ্ছে সেগুলো বাকওয়াজ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Crane E (১৯৯০)। "Honey from honeybees and other insects"। Ethology Ecology & Evolution3 (sup1): 100–105। doi:10.1080/03949370.1991.10721919 
  2. Crane, E., Walker, P., & Day, R. (১৯৮৪)। Directory of important world honey sources। International Bee Research Association। আইএসবিএন 086098141X 
  3. Geiling, Natasha (২২ আগস্ট ২০১৩)। "The Science Behind Honey's Eternal Shelf Life"Smithsonian। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০১-২৮ 
  4. Prescott, Lansing; Harley, John P.; Klein, Donald A. (১৯৯৯)। Microbiology। Boston: WCB/McGraw-Hill। আইএসবিএন 0-697-35439-3 
  5. "জাতীয় মধু বোর্ড, ২০০৩" 
  6. "মানুকা মধু বিষয়ক তথ্যতীর্থ" 
  7. National Honey Board. "Carbohydrates and the Sweetness of Honey". Last accessed 1 June 2012.
  8. Oregon State University "What is the relative sweetness of different sugars and sugar substitutes?". Retrieved 1 June 2012.
  9. "Spoonful of honey boosts energy - The Times of India"। ১৫ জুলাই ২০১২। ১৫ জুলাই ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  10. "Kitchen honey better at healing burns than standard NHS treatments, say scientists" 
  11. "খাঁটি মধু বুঝব কীভাবে – Shorobor" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-১৫ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]