তিমি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

তিমি
সময়গত পরিসীমা: ৫.০–০কোটি ইওসিন – বর্তমান
Eubalaena glacialis with calf.jpg
উত্তর আটলান্টিকের রাইট তিমি, মা ও বাচ্চা
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: Animalia
পর্ব: কর্ডাটা
শ্রেণী: Mammalia
উপশ্রেণী: Eutheria
বর্গ: Cetacea

তিমি সিটাসিয়া বর্গভুক্ত জলজ স্তন্যপায়ী যারা না ডলফিন (অর্থাৎ এরা ডেলফিনিডে বা প্লটানিস্টয়িডে কোনটিরই সদস্য নয়) না শুশুক। যদিও তিমিকে প্রায়ই তিমি মাছ বলা হয়, এরা কিন্তু মোটেও মাছ নয়, বরং মানুষের মতই স্তন্যপায়ী প্রাণী।তিমিকে আরেকটি কারণেও মাছ বলা যায় না। সেটি হল, মাছেদের শ্বাস নেওয়ার জন্য ফুলকা থাকে, কিন্তু তিমির শ্বাস নেওয়ার জন্য থাকে ফুসফুস।

তিমির বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমি, খুনে তিমি (killer whale), এবং পাইলট তিমি, যার নামের সাথে তিমি আছে বটে কিন্তু জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজনে তাদের ডলফিন হিসেবে গণ্য করা হয়। বহু শতাব্দী ধরে মানুষ মাংস, তেল ও অন্যান্য কাঁচামালের প্রয়োজনে তিমি শিকার করে চলেছে। বিংশ শতাব্দীর ব্যাপক নিধনযজ্ঞে তিমির বেশ কিছু প্রজাতি গভীরভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

আচরণ[সম্পাদনা]

তিমিকে মোটা দাগে শিকারী প্রাণীর কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে এর খাদ্য তালিকায় আণুবীক্ষনিক প্লাংকটন থেকে শুরু করে বড়সড় মাছ পর্যন্ত সবই আছে। এছাড়া তিমি দিনে প্রায় তিন থেকে চার হাজার কেজি ছোট চিংড়ি জাতীয় ক্রিল খায়।

স্তন্যপায়ী বিধায় তিমির নিঃশ্বাস নেবার জন্যে অক্সিজেনের দরকার পড়ে আর এ জন্যে তিমিকে পানির ওপর ভেসে উঠতে হয়। এ কাজটি তিমি তার সুবিশাল নাসারন্ধ্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করে। অনেক তিমি আবার পানির ওপর ভেসে উঠে জলক্রীড়া ও লেজ দিয়ে পানিতে আঘাত করার খেলায় মেতে ওঠে।

তাদের পরিপ্বার্শের কারণে তিমির শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া অনেক প্রাণীর থেকেই ভিন্ন: তিমি নিজেই ঠিক করে সে কখন শ্বাস গ্রহণ করবে। আর সব স্তন্যপায়ীর মত তিমিকেও ঘুমাতে হয়, তবে তারা খুব বেশি সময়ের জন্যে পরিপূর্ণ নিদ্রাসুখ উপভোগ করতে পারে না, কারণ তাদের শ্বাস নেবার জন্যে কিছু সময় পরপর পানির ওপর উঠতে হয়। ধারণা করা হয় তিমির মস্তিষ্কের অংশদুটি পালাক্রমে ঘুমায়, তাই তিমিরা কখনোই পুরোপুরি ঘুমন্ত থাকে না, তবে তিমি তার চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম গ্রহণ করে। তিমির এক চোখ খোলা রেখে ঘুমানোর কারণেই এমনটি মনে করা হয়।

তিমিরা পরষ্পরের সাথে এক ধরনের সুরেলা শব্দ করে যোগাযোগ করে, যা তিমির গান নামে পরিচিত। তিমির বিশালতা ও শক্তিমত্ততার মতোই এদের গানও অনেক জোরালো (প্রজাতিভেদে); স্পার্ম তিমির গান মৃদু গুঞ্জনের মতো শোনায়, আবার সব শিকারী দাঁতযুক্ত তিমি (অডোন্টোসেটি) শব্দযোগাযোগ ব্যবহার করে, যা বহু মাইল দূর থেকেও শুনতে পাওয়া যায়। জানা গেছে তিমি ১৬৩ ডেসিবেল শব্দ তীব্রতায় ২০,০০০ একুস্টিক ওয়াটে শব্দ তৈরি করে।[১]

স্ত্রী তিমি একটি করে বাচ্চার জন্ম দেয়। এর লালন-পালন করার সময়টি বেশ দীর্ঘ (অধিকাংশ প্রজাতিতেই এক বছরের বেশি), এ সময়টিতে মা ও শিশু তিমির মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধন গড়ে ওঠে। বেশিরভাগ তিমির প্রজনন উপযোগী হবার বয়স মোটামুটি দীর্ঘ, সাধারণত সাত থেকে দশ বছর। এমন প্রজনন ধারায় খুব অল্প সংখ্যক বংশধরই তৈরি হয়, তবে তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাও বেশি হয়।

তিমি সাধারণত প্রজননের সময় সুনির্দিষ্ট সঙ্গী বাছাই করে না: অনেক প্রজাতিতেই প্রতি মৌসুমে একটি স্ত্রী তিমির একাধিক সঙ্গী থাকে। জন্মের সময় নবজাতকেরা লেজ-প্রথম অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়, যার ফলে এর ডুবে যাবার ঝুঁকি কম হয়। জলজ পরিবেশে মা তিমি তার শিশুকে পেস্টের মত দলা পাকানো দুধ পান করায়।[২] এই দুধে প্রায় ৫০ শতাংশ ফ্যাট থাকে এবং শিশু তিমি প্রায় ৬ মাস বয়স পর্যন্ত এই দুধ পান করে।[৩]

বৃদ্ধি এবং প্রজনন[সম্পাদনা]

তিমি হাঙরের বৃদ্ধি, দীর্ঘায়ু এবং প্রজনন খুব কম বোঝা যায়। কশেরুকার বৃদ্ধির ব্যান্ড বার্ষিক বা দ্বিবার্ষিকভাবে গঠিত হয় কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, যা তিমি হাঙরের বয়স, বৃদ্ধি এবং দীর্ঘায়ু নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় ১৯৫০-৬০ এর দশকে তিমি হাঙ্গরের কশেরুকার গ্রোথ ব্যান্ডে পাওয়া কার্বন-14 আইসোটোপের অনুপাতের সাথে পারমাণবিক পরীক্ষার ইভেন্টের তুলনা করা হয়েছে, তারা দেখেছে যে বৃদ্ধির ব্যান্ডগুলি বার্ষিকভাবে স্থাপন করা হয়। গবেষণায় ১০ মিটার (৩৩ ফুট) মহিলার জন্য ৫০ বছর এবং ৯.৯ মিটার পুরুষের জন্য ৩৫ বছর বয়স পাওয়া গেছে। মেরুদণ্ডের বৃদ্ধির ব্যান্ড এবং বন্য তিমি হাঙ্গর পরিমাপের বিভিন্ন গবেষণায় তাদের জীবনকাল ~৮০ বছর এবং ~১৩০ বছর পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে।

প্রমাণ দেখায় যে জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে পুরুষরা মহিলাদের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছোট আকারে পৌঁছায়। তিমি হাঙ্গর দেরিতে যৌন পরিপক্কতা প্রদর্শন করে। মুক্ত-সাঁতার কাটা তিমি হাঙরের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি গবেষণায় পুরুষদের পরিপক্কতার বয়স অনুমান করা হয়েছে ~২৫ বছর।

তিমি হাঙ্গরের ছানা দেখা যায়নি, তবে সেন্ট হেলেনায় দুবার মিলন দেখা গেছে। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় বিমানের মাধ্যমে নিঙ্গালু রিফের কাছে তিমি হাঙরের মধ্যে এই প্রজাতির সঙ্গম প্রথমবারের মতো চিত্রায়িত হয়েছিল, যখন একটি বড় পুরুষ একটি ছোট, অপরিণত মহিলার সাথে সঙ্গম করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল।

১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে একটি ~১০.৬ মিটার (35 ft) মহিলার ক্যাপচার যা ~৩০০ টি বাচ্চার সাথে গর্ভবতী ছিল তা নির্দেশ করে যে তিমি হাঙ্গরগুলি ওভোভিভিপারাস। ডিমগুলি দেহে থাকে এবং স্ত্রীরা ৪০ থেকে ৬০ সেমি (১৬ থেকে ২৪ ইঞ্চি) লম্বা হয়। প্রমাণগুলি ইঙ্গিত দেয় যে হাঙ্গরছানাগুলি একবারে জন্মগ্রহণ করে না, বরং মহিলারা একটি মিলন থেকে শুক্রাণু ধরে রাখে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য হাঙ্গরছানাগুলোর একটি স্থির প্রবাহ তৈরি করে।

৭ মার্চ ২০০৯-এ, ফিলিপাইনের সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে তিমি হাঙরের সবচেয়ে ছোট জীবন্ত নমুনা বলে বিশ্বাস করা হয়।[৪] মাত্র ৩৮ সেন্টিমিটার (১৫ ইঞ্চি) পরিমাপের অল্প বয়স্ক হাঙ্গরটিকে ফিলিপাইনের পিলার, সোরসোগনের একটি সমুদ্র সৈকতে একটি বাঁকের সাথে লেজ বাঁধা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল এবং তাকে বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে, কিছু বিজ্ঞানী আর বিশ্বাস করেন না যে এই এলাকাটি শুধুমাত্র একটি খাদ্যের জায়গা; এই সাইট একটি জন্মভূমি হতে পারে, পাশাপাশি. তরুণ তিমি হাঙ্গর এবং গর্ভবতী মহিলা উভয়কেই দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনার জলে দেখা গেছে, যেখানে গ্রীষ্মকালে অসংখ্য তিমি হাঙর দেখা যায়।[৫]

গত আগস্ট ২০১৯ সালের র‍্যাপলারের একটি প্রতিবেদনে, বছরের প্রথমার্ধে WWF ফিলিপাইনের ফটো শনাক্তকরণ কার্যক্রমের সময় তিমি হাঙর দেখা গিয়েছিল। মোট ১৬৮ টি দেখা হয়েছে - এর মধ্যে ৬৪ টি "পুনরায় দেখা" বা পূর্বে রেকর্ড করা তিমি হাঙরের পুনরাবির্ভাব। WWF উল্লেখ করেছে যে ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে ১৬৮ জন ব্যক্তির মধ্যে "খুব অল্পবয়সী তিমি হাঙ্গর কিশোর" চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায় যে টিকাও পাস হতে পারে তিমি হাঙরের জন্য একটি পুপিং গ্রাউন্ড, যা এলাকার পরিবেশগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Table of sound decibel levels"। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৯-১৪ 
  2. "Milk"Modern Marvels। 14 মৌসুম। ২০০৮-০১-০৭। The History Channel 
  3. "whale." Encyclopædia Britannica. Encyclopædia Britannica Ultimate Reference Suite. Chicago: Encyclopædia Britannica, 2012.
  4. "Whale shark saved in Philippines, may be smallest"www.chinadaily.com.cn। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-২৭ 
  5. "Tiny whale shark gives clues to sea giant's behaviour"wwf.panda.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-২৭ 

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]