মারিদ

মারিদ (আরবি: مارد mārid) হল ইসলামি ঐতিহ্যে একটি ধরনের শয়তান বা অপদেবতা।[১] আরবি ভাষায় শব্দটির অর্থ “বিদ্রোহী” এবং এটি সাধারণত এমন অতিপ্রাকৃত সত্তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
হান্স ভেয়ার-এর আধুনিক লিখিত আরবি অভিধান-এ মারিদ শব্দকে “অপদেবতা” বা “দানব” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।[২] কুরআনে এই শব্দটি একবার উল্লেখিত হয়েছে—সূরা আস-সাফফাত-এ (৩৭:৭)।[৩] মারিদদের পারস্যের দেও নামক সত্তাদের সঙ্গেও তুলনা করা হয়ে থাকে।[৪]
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]মারিদ (আরবি: مارد) শব্দটি একটি ক্রিয়াবাচক বিশেষণ (active participle), যা আরবি ধাতু ম-র-দ (مرد) থেকে গঠিত। এই ধাতুর মূল অর্থ হল "অবাধ্য" বা "বিদ্রোহী"। ইবন মানজুর প্রণীত লিসান আল-আরব অভিধানে এই শব্দের শুধুমাত্র এই সাধারণ অর্থসম্পন্ন রূপগুলিরই উল্লেখ রয়েছে।[৫]
এই শব্দটি কুরআনের আস-সাফফাত সূরার (৩৭:৭) এক আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে “প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান” (আরবি: شيطان مارد) থেকে রক্ষার কথা বলা হয়েছে। এই আরবি ধাতু থেকে গঠিত সেমিটিক ভাষার সমজাতীয় শব্দের মধ্যে আছে হিব্রু ভাষায় “বিদ্রোহ” (হিব্রু ভাষায়: מרד) এবং “বিদ্রোহী” (হিব্রু ভাষায়: מוֹרֵד)।
A Dictionary of Modern Written Arabic গ্রন্থে মারিদ শব্দের গৌণ অর্থ হিসেবে “অপদেবতা” ও “দানব” (ফার্সি: دیو) উল্লেখ করা হয়েছে।[৬]
এডওয়ার্ড লেন-এর Arabic-English Lexicon-এ একটি প্রাচীন উৎসের বরাতে বলা হয়েছে, মারিদ শব্দটি “সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণির এক দুষ্ট জিন” বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।[৭] তবে এই ব্যাখ্যা সর্বজনস্বীকৃত নয়। যেমন, আলিফ লাইলাহ ওয়া লাইলাহ (One Thousand and One Nights) গ্রন্থের ম্যাকনটেন সংস্করণে মারিদ ও ইফরিত শব্দদুটি পরস্পর বিনিময়যোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন—The Story of the Fisherman গল্পে)।[৮]
ইতিহাসবিদ কনস্টান্টিন জিরেচেক একটি বিতর্কিত তত্ত্বে ধারণা দেন যে, মারিদ শব্দটি গ্রিক গ্রিক: Μαρδαϊται-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যা আরব–বাইজান্টাইন যুদ্ধের সময়কার লুটপাটকারী ভাড়াটে সৈন্যদের বোঝাতে ব্যবহৃত হত। তিনি বলেন, এদের নাম থেকেই আলবেনীয় মিরদিতা গোত্রের নামকরণ হয়েছে।[৯]
বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]আমিরা এল-জেইন মারিদকে এমন এক অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করে স্বর্গে উঠে ফেরেশতাদের কথোপকথনে গুপ্তচরবৃত্তি করে।[১০]:{{{১}}}
কুরআন-এ মারিদের উল্লেখ আছে আস-সাফফাত (৩৭:৭) সূরায়, যেখানে বলা হয়েছে যে, "প্রথম আকাশকে তারকারাজিতে সজ্জিত করা হয়েছে বিদ্রোহী শয়তানদের প্রতিরোধের জন্য" (আরবি: شَيْطَانٍ مَارِدٍ, রোমান: shayṭānin māridin)।[১০]:{{{১}}} আন-নিসা সূরার (৪:১১৭) একটি আয়াতেও বলা হয়েছে যে, তারা কেবল "বিদ্রোহী শয়তান"কেই ডাকে। ইসলামি ঐতিহ্যে, ইফরিত-এর মতোই, মারিদকে নিম্নজগতের এক বিশেষ শ্রেণির সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[১১]
আলী ইবন ইব্রাহিম আল-কুমি-র একটি বর্ণনায়, যা আলী-এর প্রতি সম্বন্ধিত, বলা হয়েছে—আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি মানবজাতির পূর্বসূরি নাসনাসদের (অর্ধ-গঠিত সত্তা) ধ্বংস করেন, মানব ও জিনদের মাঝে একটি পর্দা স্থাপন করেন, এবং "বিদ্রোহী দানবদের" (আরবি: مَارِدَة, রোমান: māridah) আকাশের স্তরে বন্দি করেন।[১২]
মালিকি ও আথারি মতাবলম্বী পণ্ডিত ইবন আবদুল বার তাঁর আত-তামহিদ গ্রন্থে লিখেছেন যে, মারিদ একধরনের অপদেবতা, যারা সাধারণ শয়তানদের চেয়ে অধিক দুর্বৃত্ত, কিন্তু ইফরিত-দের তুলনায় কম শক্তিশালী।[১৩]
প্রাক-ইসলামি মহাকাব্য সীরাত সাইফ ইবন যি ইয়াযান-এ মারিদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। সেই বর্ণনায় রাজা সাইফ ইবন যি ইয়াযান এক মারিদকে আদেশ দেন যেন সে তাঁকে নবী সোলায়মানের গুপ্তধনের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু নিজের বিদ্রোহী স্বভাব অনুযায়ী মারিদ সেই আদেশ অমান্য করে। পরে নবী খিজির রাজাকে জানান, মারিদকে বশ করতে হলে তাঁকে নিজের ইচ্ছার বিপরীত আদেশ দিতে হবে।[১৪]
মিসরে মুসলিম বিশ্বাস নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ঐতিহ্য অনুযায়ী মানবজাতির টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে অপদেবতাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার কারণে; কারণ মুক্ত হলে মারিদরা মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারত।[১৫]
যদিও মারিদ ও ইফরিত—দুজনই শক্তিশালী শয়তানরূপে গণ্য হয়, তবে তাদের স্বভাবগত পার্থক্য রয়েছে। ইফরিত সাধারণত চতুর, বিশ্বাসঘাতক এবং প্রতারক হিসেবে চিত্রিত হয়, কিন্তু মারিদ তুলনামূলকভাবে কম বুদ্ধিমান এবং মানুষ দ্বারা সহজে প্রভাবিত বা প্রতারিত হতে পারে।[১৬]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Nazari, Morad। "Jinn in Islamic texts and culture"। Academia.edu।
- ↑ Wehr, Hans (১৯৭৯)। A Dictionary of Modern Written Arabic (ইংরেজি ভাষায়)। Otto Harrassowitz Verlag। আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৪৪৭-০২০০২-২।
- ↑ "Surah As-Saffat - 7"। Quran.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ Corbin, H. (2014). Avicenna and the Visionary Recital. USA: Princeton University Press. p. 355
- ↑ Manzur, Ibn। "Lisan al-'arab (entry for m-r-d)"। পৃ. ৫৩৭৬।
- ↑ Wehr, Hans; Cowan, J.M.। A Dictionary of Modern Written Arabic (3rd সংস্করণ)। Ithaca, N.Y.: Spoken Language Services। পৃ. ৯০৩।
- ↑ Lane, Edward William। "An Arabic-English Lexicon: Derived from the best and the most copious Eastern sources"। ৮ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ Mac Naghten, Sir William Hay, সম্পাদক (১৮৩৯)। Alif Laila। খণ্ড ১। Calcutta: W. Thacker and Co। পৃ. ২০।
- ↑ Jireček, Konstantin (১৮৭৯), Die Handelsstrassen und Bergwerke von Serbien und Bosnien während des Mittelalters, পৃ. ১৬
- 1 2 el-Zein, Amira (২০০৯)। Islam, Arabs, and Intelligent World of the Jinn। Syracuse, NY: Syracuse University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৫৬-৫০৭০-৬।
- ↑ "mārid". In Encyclopaedia of Islam, Second Edition, Glossary and Index of Terms, (Brill, 2012) doi: https://doi.org/10.1163/1573-3912_ei2glos_SIM_gi_02894
- ↑ Ayoub, Mahmoud M. (১৯৮৪)। The Qur'an and Its Interpreters, Volume 1, Band 1। Albany, New York: SUNY Press। পৃ. ৮৬। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৯১-৪৯৫৪৬-৯।
- ↑ Humam Hasan Yusuf Shalom (২০২১)। Sulaiman : Raja Segala Makhluk (Bukel) (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। Pustaka Al Kautsar। পৃ. ১৩১। আইএসবিএন ৯৭৮৯৭৯৫৯২৯২৭৭। সংগ্রহের তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০২৩।
Marid." - Jika yang dimaksudkan adalah jin yang lebih kuat dan lebih dari itu, maka mereka berkata, "Ifrit."
- ↑ Tobias Nünlist Dämonenglaube im Islam Walter de Gruyter GmbH & Co KG, 2015 আইএসবিএন ৯৭৮-৩-১১০-৩৩১৬৮-৪ p. 100 (German)
- ↑ Sengers, Gerda. Women and Demons: Cultic Healing in Islamic Egypt. Vol. 86. Brill, 2003.
- ↑ Fartacek, G. (2010). Unheil durch Dämonen? Geschichten und Diskurse über das Wirken der Ǧinn; eine sozialanthropologische Spurensuche in Syrien. Österreich: Böhlau. p. 68