বিষয়বস্তুতে চলুন

নমরুদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চিত্রকর ডেভিড স্কটের অঙ্কনে নমরুদ গ্লাসগো জাদুঘরে সংরক্ষিত

নমরুদ (হিব্রু: נִמְרוֹדֿ, আধুনিক: Nimrod, টিবেরীয়: Nimrōḏ আরামীয়: ܢܡܪܘܕ আরবি: النمرود, an-Namrood), নমরুদ শব্দের অর্থ খোদাদ্রোহী। এর আর একটি অর্থ হলো বাঘিনী। আরব কিংবদন্তি অনুযায়ী নমরুদকে ছোটবেলায় এক বাঘিনী স্তন্যপান করিয়েছিল। কথিত আছে ইডিপাসের মতো নমরুদ তার পিতাকে হত্যা করে নিজ মাতাকে বিয়ে করে

ইসলামিক বিশ্বাস অনুসারে

[সম্পাদনা]

পবিত্র কুরআনে নমরুদের নাম উল্লেখ নেই। তবে সুরা বাকারার ২৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে

তুমি কি সেই ব্যক্তির কথা ভেবে দেখনি যে ইব্রাহীমের সঙ্গে তর্ক করেছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজ্য দিয়েছিলেন? ‘তখন সে বলল, আমার প্রতিপালক তিনি যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান, সে বলল, আমিও তো জীবন দান করি এবং ও মৃত্যু ঘটাই।[]

কোরআনের আয়াতে আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের ইমারত ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন। কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা বলেন, নমরুদ আকাশে ওঠার জন্য একটি ইমারত বানিয়েছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় তার বানানো ওই ইমারত ভেঙে পড়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,

তাদের পূর্বে যারা ছিল তারাও চক্রান্ত করেছিল। ফলে আল্লাহ তাদের ইমারতকে মূল থেকে উৎপাটিত করেছিলেন আর ওপর থেকে ছাদ তাদের ওপর ভেঙ্গে পড়ল, আর তাদের প্রতি শাস্তি পতিত হল এমন দিক থেকে যা তারা এতটুকু টের পায়নি। (সুরা নাহল: ২৬)

কুরআনের বর্ণনামতে, একটি মশা তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে তার মৃত্যু হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ইব্রাহিম এর জীবনীতে নমরুদ বাদশাহর উল্লেখ পাওয়া যায়। নমরুদ ষড়যন্ত্র করে নবীকে হত্যার উদ্দেশ্যে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। ইবরাহীম (আ.) এর সময়ে নমরুদ ছিল স্বেচ্ছাচারী এক শাসক। সে ইবরাহীমকে(আঃ) প্রতিমা ভেঙ্গে ফেলার অপরাধে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করেছিল।

অতঃপর ‘একটা ভিত নির্মাণ করা হ’ল এবং সেখানে বিরাট অগ্নিকুন্ড তৈরী করা হ’ল। তারপর সেখানে তাকে নিক্ষেপ করা হ’ল’ (ছাফফাত ৩৭/৯৭)।

তাফসীরে ইবনে কাসীর ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া তে বর্ণিত রয়েছে একমাস পর্যন্ত সমগ্র শহরবাসী জ্বালানী কাষ্ঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করে সাতদিন পর্যন্ত প্রজ্বলিত করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অগ্নিশিখা আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। তখন তারা ইবরাহীম (আ)-কে এই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করল। অগ্নির অসহ্য তাপের কারণে তার ধারে-কাছে যাওয়ার সাধ্য কারও ছিল না। পারস্যের কুর্দিস্তানের একজন বেদুইনের (হায়যান) পরামর্শক্রমে একটি লোহার দোলনা (মিনজানিক) তৈরী করা হয় এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, তাঁকে ওটায় বসিয়ে অগ্নি কুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে।[][] মিনজানিক যন্ত্র হায়যানই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করে । বর্ণিত আছে যে, ঐলোকটিকে তৎক্ষণাৎ আল্লাহ যমীনে ধ্বসিয়ে দেন।[][]

মিনজানিক

পাকিস্তানি ইসলামী পণ্ডিত মুফতি মুহাম্মদ শফি (১৮৯৭–১৯৭৬) রচিত তফসীরে মাআরিফুল কুরআন এ বর্ণিত রয়েছে, শয়তান ইবরাহীম (আ)-কে 'মিন্‌ঞ্জানিকে' (এক প্রকার নিক্ষেপণ যন্ত্র) রেখে নিক্ষেপ করার পদ্ধতি বাতলে দেন। []

কিন্তু আল্লাহর কৃপায় হযরত ইবরাহীম(আঃ)নিরাপদে অগ্নিকুন্ড থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ইবরাহীম নিরাপদে অগ্নিকুন্ড থেকে বের হয়ে আসাতে নমরুদ প্রচন্ডভাবে ক্ষিপ্ত হয়। সে ইবরাহীমকে বলে,

তোমার ঈশ্বরের (আল্লাহ) যদি যথার্থই অস্তিত্ব থাকে, তবে তাকে আমার সাথে যুদ্ধ করার জন্য ডেকে আনো। আমি তোমার আল্লাহর ‍বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

আল্লাহর সাথে লড়াই করার জন্য নমরুদ এক বিশাল বাহিনী গঠন করলো। এই বাহিনী নিয়ে সে ইবরাহীমের কাছে গিয়ে আল্লাহকে তার সাথে লড়াই করার জন্য আহবান জানায়। সে আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করে এবং বলতে থাকে,

কোথায় তুমি হে ইবরাহীমের ঈশ্বর? এসো আমার সাথে যুদ্ধ করো।

আল্লাহ নমরুদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য এক ঝাঁক "মশা" প্রেরণ করলেন। ক্ষুদ্র এই মশা বাহিনীর আক্রমণে নমরুদের বিশাল বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। নমরুদও এই মশাবাহিনীর আক্রমণে ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায়। কিন্তু ঘটনাক্রমে একটি মশা তার নাক দিয়ে ঢুকে তার মস্তিষ্কতে গিয়ে অবস্থান নেয়। আল্লাহ তার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে মশাটিকে জীবিত রাখেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

মস্তিষ্কের ভিতরে অবস্থান নিয়ে মশাটি নমরুদকে সবসময় কামড়াতে থাকে। মস্তিষ্কে মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে নমরুদ নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করতে থাকে। কিন্তু যতই সে আঘাত করুক, মশা ততই তাকে কামড়াতে থাকে। নিজেকে নিজে আঘাত করতে করতে নমরুদ ক্লান্ত হয়ে পড়লো।

তাই সে তার একজন সৈনিককে ডেকে তাকে তার মাথায় আঘাত করতে বললো। কিন্তু মশার কামড় তাতে কোনো ক্রমেই কমে না। শেষে সৈনিকটি নমরুরদের মাথায় মুগুর দিয়ে আঘাত করলে মশা কিছু সময়ের জন্য কামড়ানো বন্ধ করলো। একদিন নমরুদের মাথায় মুগুর দ্বারা আঘাত করতে করতে সৈনিকটি নমরুদকে এত প্রচন্ডভাবে আঘাত করলো যে, তাতে নমরুদের মাথা ফেটে যায়। মাথা ফেটে গিয়ে নমরুদ মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

বাইবেল অনুসারে

[সম্পাদনা]

বাইবেলে নমরুদকে নূহ নবির প্রপৌত্র কুশের পুত্র বলা হয়েছে।

নিম্রোদ নামেও কুশের এক পুত্র ছিল। কালক্রমে নিম্রোদ দারুন শক্তিমান পুরুষে পরিণত হয়। প্রভুর সম্মুখে নিম্রোদ একজন বড় শিকারী হয়ে উঠল। সেজন্য তার সঙ্গে অন্যান্য লোকদের তুলনা করে সকলে বলতো, “ঐ মানুষটি নিম্রোদের মত, এমন কি প্রভুর সামনেও দারুণ শিকারী। নিম্রোদের রাজত্ব বাবিল থেকে শিনিযর দেশে এরক অক্কদ এবং কল্নী পর্য্ন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। নিম্রোদ অশূরেও গিয়েছিল। নিম্রোদ অশূর দেশে নীনবী, রহোবোত্‌-পুরী, কেলহ এবং রেষণ (নীনবী এবং কেলহের মধ্যবর্তী ভুভাগে রেষণ মহানগরের পত্তন হয়। - আদিপুস্তক ১০/৮-১২[]

পবিত্র বাইবেলে আব্রাহাম (নবী ইব্রাহীম) ও নমরুদের সাথে সাক্ষাতের ঘটনার বর্ণনা নেই। টাওয়ার অব বাবেলের বর্ণনা রয়েছে।

তারা বলল, “এস আমরা আমাদের জন্যে এক বড় শহর বানাই।আর এমন একটি উঁচু স্তম্ভ বানাই যা আকাশ স্পর্শ করবে। তাহলে আমরা বিখ্যাত হব এবং এটা আমাদের এক সঙ্গে ধরে রাখবে। সারা পৃথিবীতে আমরা ছড়িয়ে থাকব না।”সেই শহর আর সেই আকাশস্পর্শী স্তম্ভ দেখতে প্রভু পৃথিবীতে নেমে এলেন। মানুষ কি কি তৈরী করেছে সেসব প্রভু দেখলেন। প্রভু বললেন, “সব মানুষ একই ভাষাতে কথা বলছে। আর দেখতে পাচ্ছি য়ে এসব কাজ করার জন্যে তারা ঐক্যবদ্ধ।তারা কি করতে পারে এ তো সবে তার শুরু।শীঘ্রই তারা যা চায় তাই করতে পারবে। তাহলে এস আমরা নীচে গিয়ে ওদের এক ভাষাকে নানারকম ভাষা করে দিই।তাহলে তারা পরস্পরকে বুঝতে পারবে না।”সুতরাং প্রভু সমস্ত লোকেদের সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিলেন। ফলে মানুষ আর সেই শহর তৈরির কাজ শেষ করতে পারল না। এই সেই স্থান যেখানে প্রভু সমস্ত পৃথিবীর এক ভাষাকে অনেক ভাষাতে বিভ্রান্ত করলেন। তাই এই স্থানটির নাম হলো বাবিল। এইভাবে প্রভু তাঁদের সেই স্থান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিলেন -আদিপুস্তক ১১/৪-৯ []

আদি পুস্তকের বর্ণনা অনুযায়ী সিনারের রাজা। গণনাপুস্তক অনুযায়ী নূহ নবি প্রপৌত্র কুশের পুত্র। বাইবেল অনুসারে নমরুদ ছিল ”এক মহাশক্তিধর ব্যক্তি যে ঈশ্বরকে শিকার করতে চেয়েছিল।”[] টাওয়ার অব বাবেলের বর্ণনা অনুসারে নমরুদ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল।


কিছু ইহুদী ও মুসলিম ঐতিহ্য অনুসারে তাদের মধ্যে বিরোধ সংগঠিত হয়েছিল বলে বলা হয়েছে। কিছু গল্পে দুইজন চরম সংঘাতে রত হয়েছিল বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব কাহিনিতে ইব্রাহীম একাত্মবাদের মহিমা বর্ণনাকারী এবং নমরুদ তার বিরোধীতাকারী এবং নিজেকে স্বয়ং ঈশ্বর বলে দাবী করে। একই রকম বর্ণনা মধ্যযুগের ইহুদী ধর্মগুরুদের লেখা কাহিনিতে পাওয়া যায়।[১০]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. যার যার ধর্ম লেখক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান পৃষ্ঠা ২১৩ আইএসবিএন ৯৭৮ ৯৮৪ ৮৭৬৫ ৮০ ৭
  2. তাফসীরে ইবনে কাছীর -১৪ খন্ড। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। পৃ. ৩৫১।
  3. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১ম খন্ড। আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) ,ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। পৃ. ৩৩৬।
  4. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১ম খন্ড। আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) ,ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। পৃ. ৩৩৬।
  5. কাসাসুল আম্বিয়া। ইবনে কাসীর রহ। পৃ. ১৮৭।
  6. তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন -৬ষ্ঠ.খন্ড। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। পৃ. ২১০।
  7. আদিপুস্তক ১০/৮-১২
  8. আদিপুস্তক ১১/৪-৯
  9. "BibleGateway"
  10. টেমপ্লেট:Daat enc