রসুন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রসুন / Garlic
Allium sativum Woodwill 1793.jpg
Allium sativum, উইলিয়াম উডসভিলের Medical Botany, ১৭৯৩, বই থেকে নেয়া।
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণী: Liliopsida
বর্গ: Asparagales
পরিবার: Alliaceae
উপপরিবার: Allioideae
গোত্র: Allieae
গণ: Allium
প্রজাতি: A. sativum
দ্বিপদী নাম
Allium sativum
L.
গোটা রসুন ও কোয়া ছাড়ানো রসুন

রসুন হল পিঁয়াজ জাতীয় একটি ঝাঁঝালো সবজি যা রান্নার মশলা ও ভেষজ ওষুধ হিসাবে ব্যাবহৃত হয়।

রসুন গাছ একটি সপুষ্পক একবীজপত্রী লিলি শ্রেণীর বহুবর্ষজীবী গুল্ম

বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালিয়াম স্যাটিভাম (Allium sativum)।

পুষ্টিমূল্যঃ রসুনে আমিষ, প্রচুর ক্যালসিয়াম ও সামান্য ভিটামিন ‘সি’ থাকে। ভেষজ গুণঃ ১) কৃমি নাশক ২) শ্বাস কষ্ট কমায় ৩) হজমে সহায়তা করে ৪) প্রস্রাবের বেগ বাড়ায় ৫) শ্বাসনালীর মিউকাস বের করে দেয় ৬) এ্যাজমা রোগীর উপশম দেয় ৭) হাইপারটেনশন কমায় ৮) চুল পাকানো কমায় ৯) শরীরে কোলেস্টেরল লেভেল কমায়। ব্যবহারঃ মসলা হিসেবে রসুন ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন আচার ও মুখরোচক খাবার তৈরিতে রসুনের ব্যবহার রয়েছে।

উপযুক্ত জমি ও মাটিঃজৈব পদার্থ সমৃদ্ধ ও সহজেই গুড়া হয় এমন মাটি রসুনের উপযোগী।

জাত পরিচিতিঃ অনুমোদিত জাত নেই। স্থানীয় জাত চাষ করা হয়।

চারা তৈরিঃ বীজ বপনঃ শুকনো রসুনের বাহিরের সারির কোয়া লাগানো হয়। ১৫ সে.মি. দূরত্বে সারি করে ১০ সে.মি. দূরে ৩-৪ সে.মি. গভীরে রসুনের কোয়া লাগানো হয়। প্রতি হেক্টরে ৩০০-৩৫০ কেজি বীজ রসুনের প্রয়োজন হয়।

সার ব্যবস্থাপনাঃ রসুনে হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ হলো-গোবর ১০ টন, ইউরিয়া ২০০ কেজি, টিএসপি ১২৫ কেজি, এমওপি ১০০ কেজি, জিংক সালফেট ২০ কেজি, বোরাক্স ১০ কেজি ও জিপসাম ১০০ কেজি। জমি তৈরির সময় সমুদয় গোবর, টিএসপি, জিংক সালফেট, বোরাক্স ও জিপসাম মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। রসুন লাগানোর ৩০ দিন ও ৬০ দিন পর যথাক্রমে ১ম ও ২য় কিস্তির উপরি সার প্রয়োগ করা হয়। প্রতিবারে প্রতি হেক্টরে ১০০ কেজি ইউরিয়া ও ৫০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করা হয়।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ মাটিতে রসের অভার থাকলে মাঝে মাঝে সেচ দিতে হবে। প্রতিবার সেচ দেয়ার পর মাটি নিড়ানি দিয়ে কুপিয়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হবে। আগাছা দেখা দিলে তা পরিষ্কার করতে হবে।

পোকা পোকার নাম : থ্রিপস ভূমিকা : থ্রিপস ছোট আকারের পোকা বলে সহজে নজরে আসে না কিন্তু' পাতার রস চুষে খায় বলে অধিক আক্রমণে পাতা শুকিয়ে গাছ মরে যায় ও ফলন কম হয়।

পোকা চেনার উপায় : স্ত্রী পোকা সরম্ন, হলুদাভ। পুরম্নষ গাঢ় বাদামী । বাচ্চা পোকা হলুদ অথবা সাদা । এদের পিঠের উপর লম্বা দাগ দেখা যায়।

ক্ষতির নমুনা : রস চুষে খায় বলে পাতা রূপালী রং ধারণ করে অথবা ক্ষুদ্রাকৃতির বাদামী দাগ বা ফোটা দেখা যায়। আক্রমণ বেশী হলে পাতা শুকিয়ে মরে যায়। কন্দ আকারে ছোট ও বিকৃত হয়।

অনুকুল পরিবেশ : বিকল্প পোষকের উপস্তিতি।

জীবন চক্র : স্ত্রী পোকা পাতার কোষের মধ্যে ৪৫-৫০ টি ডিম পাড়ে।

৫-১০ দিনে ডিম হতে নিম্ফ (বাচ্চা) বের হয়। নিম্ফ ১৫-৩০ দিনে দুটি ধাপ অতিক্রম করে । প্রথম ধাপে খাদ্য গ্রহণ করে এবং দ্বিতীয় ধাপে খাদ্য গ্রহণ না করে মাটিতে থাকে । এরা বছরে ৮ বার বংশ বিস্তার করে এবং স্ত্রী পোকা পুরুষ পোকার সাথে মিলন ছাড়াই বাচ্চা দিতে সক্ষম ।

ব্যবস্থাপনা : সাদা রংয়ের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার ক্ষেতে মাকড়সার সংখ্যা বৃদ্ধি করে এ পোকা দমন করা যায়। অনুমোদিত কীটনাশক নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

রোগ ব্যবস্থাপনা রোগের নাম : পার্পল বস্নচ / বস্নাইট ভূমিকা : এ রোগ পেঁয়াজের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। যে কোন বয়সে গাছের পাতা ও কান্ড আক্রান্ত হয়। অধিক আক্রমনে পেঁয়াজে ফুল আসে না ও ফসল কম হয়। আক্রান্ত বীজ বেশিদিন গুদামে রাখা যায়না । বাজার মূল্য কমে যায়।

রোগের কারণ : অল্টারনারিয়া পোরি ও স্টেমফাইলিয়াম বট্রাইওসাম নামক ছত্রাকদ্বয় দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

ক্ষতির নমুনা : কান্ডে প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানি ভেজা হালকা বেগুনী রংয়ের দাগের সৃষ্টি হয়। দাগগুলি বৃদ্ধি পেয়ে বড় দাগে পরিণত হয় এবং আক্রান্ত স্থান খড়ের মত হয়ে শুকিয়ে যায়।

- আক্রান্ত পাতা ক্রমান্বয়ে উপরের দিক হতে মরতে শুরু করে। - পাতা বা কান্ডের গোড়ায় আক্রান্ত স্থানের দাগ বৃদ্ধি পেয়ে হঠাৎ পাতা বা বীজবাহী কান্ড ভেঙ্গে পড়ে এতে বীজ অপুষ্ট হয় ও ফলন কম হয়।

অনুকুল পরিবেশ : বৃষ্টিপাত হলে এ রোগ দ্রত বিস্তার লাভ করে।

বিস্তার : আক্রান্ত বীজ, গাছের পরিত্যাক্ত অংশ ও বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে।

ব্যবস্থাপনা : - রোগ প্রতিরোধী বা সহনশীল জাত ব্যবহার - রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার - ফসল পর্যায় অনুসরন করা অর্থ্যাৎ একই জমিতে পর পর কমপক্ষে ৪ বছর পেঁয়াজ না করা - পেঁয়াজ গাছের পরিত্যাক্ত অংশ, আগাছা ধ্বংশ করা - অনুমোদিত ছত্রাক নাশক নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ করা ।

কান্ড পঁচা রোগ রোগের নাম : কান্ড পঁচা রোগের কারণ : স্ক্লেরোসিয়াম রলফসি ও ফিউজারিয়াম নামক ছত্রাক দ্ধারা এ রোগ হয়। ভূমিকা : যে কোন বয়সে গাছ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কন্দ ও শিকড়ে এর আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত কন্দে পচন ধরে এবং আক্রান্ত কন্দ গুদামজাত করে বেশী দিন রাখা যায় না।

ক্ষতির নমুনা : আক্রান্ত গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় ও ঢলে পড়ে । - টান দিলে আক্রান্ত গাছ খুব সহজে মাটি থেকে কন্দসহ ( পেঁয়াজ) উঠে আসে। - আক্রানত স্থানে সাদা সাদা ছত্রাক এবং বাদামী বর্ণের গোলাকার ছত্রাক গুটিকা (স্ক্লেরোসিয়াম ) দেখা যায়।

অনুকুল পরিবেশ : অধিক তাপ ও আর্দ্রতা পূর্ণ মাটিতে এ রোগ দ্রত বিস্তার লাভ করে। ক্ষেতে সেচ দিলেও এ রোগ বৃদ্ধি পায়। বিস্তার : এ রোগের জীবাণু মাটিতে বসবাস করে বিধায় সেচের পানির মাধ্যমে ও মাটিতে আন্তঃ পরিচর্যার সময় কাজের হাতিয়ারের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার হয়।

ব্যবস্থাপনা : - আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংশ করতে হবে। - মাটি সব সময় স্যাঁত স্যাঁতে রাখা যাবে না। - আক্রান্ত জমিতে প্রতি বছর পেঁয়াজ /রসুন চাষ করা যাবে না। - অনুমোদিত ছত্রাক নাশক নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

ফসল সংগ্রহঃ রসুন গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামী রং ধারণ করলে ঢলে পড়ে তখন রসুন তোলার উপযোগী হয়। গাছসহ রসুন তোলা হয় এবং ঐ ভাবে ছায়াতে ভালভাবে শুকিয়ে মরা পাতা কেটে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতি হেক্টরে ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যায়।

রসুন গাছের বিটপের নিম্নাংশ পরিবর্তিত হয়ে বাল্ব জাতীয় সঞ্চয়ী অঙ্গ তৈরি করে যা মশলা হিসাবে রান্নায় ব্যাবহৃত হয়। পিয়াঁজের সঙ্গে প্রধান পার্থক্য হল সাদা রঙ এবং অনেক কোয়ার গুচ্ছ।

ভেষজ ব্যাবহার[সম্পাদনা]

রসুন বিশ্বে বাণিজ্যিক ভেষজ হিসাবে সফলতম। ২০০৪ সালে ২৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ভেষজ রসুনজাত ওষুধ বিক্রয় হয়[১]। রসুন নিম্নলিখিত উপকার করে বলে মনে করা হয়ঃ

  1. রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম করে (কিছু প্রমাণ আছে)। [১]
  2. রক্তচাপ কম করে (কিছু প্রমাণ আছে)[১]
  3. করনারি (হার্ট) ধমনী রোগে উপকারী (নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাব আছে)[১]

ক্রিয়া প্রণালী[সম্পাদনা]

দুর্গন্ধযুক্ত ভেষজ গুণবাহী যৌগ অ্যালিসিন

এর প্রধান সক্রিয় উপাদান অ্যালিসিন নামক সালফারযুক্ত জৈব যৌগ। অ্যালিসিন রসুনের কুখ্যাত গন্ধ ও বিখ্যাত ভেষজ গুণ দুইয়ের-ই প্রধাণ কারণ। অক্ষত রসুনে অ্যালিসিন থাকে না, থাকে অ্যালিইন - একটি অ্যামিনো অ্যাসিড যা প্রোটিন তৈরীতে অংশ গ্রহণ করে না (যা নিজে আরেক অ্যামিনো অ্যাসিড সিস্টিন থেকে তৈরি হয়) । রসুনকে কাটলে বা ক্ষত করলে অ্যালিনেজ নামে একটি উৎসেচক অ্যালিইন থেকে অ্যালিসিন তৈরি করে। অ্যালিসিন খুবই স্বল্পস্থায়ী। রান্না করলে বা অ্যাসিডের প্রভাবে অ্যালিনেজও নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই ভেষজ গুণের জন্য কাঁচা রসুন বেশী উপকারী। অ্যালিসিন দেহে কোলেস্টেরল তৈরির উৎসেচক এইচএমজিকোএ রিডাক্টেজ কে বাধা দেয় বলে জানা গেছে[১]। অনেকে বিশ্বাস করেন অণুচক্রিকার উপরে কাজ করে এটি রক্ততঞ্চনে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা হৃদোরোগে উপকারী। কিন্তু এর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি[১]

পুষ্টি মূল্য[সম্পাদনা]

রসুন, কাঁচা অবস্থায়
প্রতি ১০০ গ্রাম (৩.৫ আউন্স) পুষ্টিগত মান
শক্তি ৬২৩ কিজু (১৪৯ kcal)
33.06 g
চিনি 1 g
খাদ্যে ফাইবার 2.1 g
0.5 g
6.36 g
ভিটামিনসমূহ
থায়ামিন (বি)
(17%)
0.2 mg
রিবোফ্লাভিন (বি)
(9%)
0.11 mg
ন্যায়েসেন (বি)
(5%)
0.7 mg
(12%)
0.596 mg
ভিটামিন বি
(95%)
1.235 mg
ফোলেট (বি)
(1%)
3 μg
ভিটামিন সি
(38%)
31.2 mg
চিহ্ন ধাতুসমুহ
ক্যালসিয়াম
(18%)
181 mg
লোহা
(13%)
1.7 mg
ম্যাগনেসিয়াম
(7%)
25 mg
ম্যাঙ্গানিজ
(80%)
1.672 mg
ফসফরাস
(22%)
153 mg
পটাশিয়াম
(9%)
401 mg
সোডিয়াম
(1%)
17 mg
দস্তা
(12%)
1.16 mg
অন্যান্য উপাদানসমূহ
Selenium 14.2 μg

Percentages are roughly approximated using US recommendations for adults.
Source: USDA Nutrient Database

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ ১.৪ ১.৫ কারেন্ট মেডিকাল ডায়াগ্নসিস & ট্রিটমেন্ট ২০০৭