লামা উপজেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
লামা
উপজেলা
লামা বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
লামা
লামা
বাংলাদেশে লামা উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২১°৪৬′৩০″ উত্তর ৯২°১২′০″ পূর্ব / ২১.৭৭৫০০° উত্তর ৯২.২০০০০° পূর্ব / 21.77500; 92.20000স্থানাঙ্ক: ২১°৪৬′৩০″ উত্তর ৯২°১২′০″ পূর্ব / ২১.৭৭৫০০° উত্তর ৯২.২০০০০° পূর্ব / 21.77500; 92.20000 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ  বাংলাদেশ
বিভাগ চট্টগ্রাম বিভাগ
জেলা বান্দরবান জেলা
আয়তন
 • মোট ৬৭১.৮৪ কিমি (২৫৯.৪০ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[১]
 • মোট ১,১৩,৪১৩
 • ঘনত্ব ১৭০/কিমি (৪৪০/বর্গমাইল)
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
ওয়েবসাইট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

লামা উপজেলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা

নামকরণ[সম্পাদনা]

মূলত আহলামা বোয়া (পাড়া) হতে লামা নামের উৎপত্তি। মাতামুহুরী নদী বিধৌত অঞ্চলে অবস্থিত লামা এর নামকরণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারো কারো মতে লামা শব্দটির অর্থ নিচের দিক বা ভাটি এলাকা। এটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দ। পার্বত্য অঞ্চলে মাতামুহুরী নদীর ভাটি এলাকায় অবস্থিত বলেই এ অঞ্চলের নাম লামা। আবার উপজাতীদের কিংবদন্তী অনুসারে জানা যায়, বর্তমানে লামামুখ এলাকায় আহলামা নামক (যার অর্থ পরমা সুন্দরী) এক সভ্রান্ত মার্মা উপজাতি বসবাস করত। ঐ সময়ে তার আর্থিক স্বচ্ছলতার ও প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে আহলামা রোয়া বা পাড়া নামকরণ করা হয়। পরবর্তীকালে লামা খাল, লামা বাজার, মৌজা ইত্যাদি তার নামে নামকরণ করা হয়। ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নামে কক্সবাজার যেমন নামকরণ করা হয় ঠিক তেমনি ব্যক্তি আহ্লামা এর নামে পরবর্তীকালে বাংলার উচ্চারণ ও বানানের অপভ্রংশ হয়ে লামা নামকরণ করা হয়। লামায় অবস্থানরত সকল উপজাতি ও অউপজাতির বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেরা শেষোক্ত মতটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।

অবস্থান[সম্পাদনা]

বান্দরবান পার্বত্য জেলাধীন লামা উপজেলার অবস্থান। পূর্বে চিম্বুক পাহাড়, দক্ষিণে আলীকদম উপজেলা ও মিরিঞ্জাপাহাড়, পশ্চিমে মিরিঞ্জা পাহাড়, উত্তরে বান্দরবান সদর।

আয়তন[সম্পাদনা]

৬৭১.৮৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে নদী এলাকা ৭৮.১৭৩ বর্গকিলোমিটার, সংরক্ষিত বনভূমি ৩৩২.৮২৭ বর্গকিলোমিটার ও চাষাবাদযোগ্য ভূমির আয়তন ২৬০.৮৪৫ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে যার অধিকাংশই আবাদ করে গড়ে উঠেছে বসতি। উপজেলাটি ২১.৩৬ হতে ২১.৫৯ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২.০৪ হতে ৯২.২৩ পূর্বদ্রাঘিমাংশ ও সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ২৯.৮৭ মিটার উপরে অবস্থিত।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বান্দরবান পার্বত্য জেলার অন্যতম উপজেলা লামা। জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেক বাস করে এ উপজেলায়। সুউচ্চ পর্বতমালার চারদিকে নয়নাভিরাম সবুজ শ্যামলিয়া আর নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির সম্মেলনে এ উপজেলাকে দান করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। তবে লামার ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা জানা যায় না। ধারণা করা হয়, ইন্দো মঙ্গোঁলীয় মানব শাখার বংশোদ্ভুত নৃগোষ্ঠিগুলি আমাদের প্রতিবেশী আরকান বা রাখাইন (বর্তমানে মায়ানমারের একটি প্রদেশ) এবং ত্রিপুরা রাজ্য (বর্তমান ভারতের একটি প্রদেশ) হতে এ পার্বত্য অঞ্চলে সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করে। এ পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে কোন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল না। চাকমা উপজাতীয় লোকজন আরাকানের মারমা জাতীগোষ্ঠী দ্বারা বিতাড়িত হয়ে তাদের রাজাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস শুরু করে। বার্মিজ রাজা বদোপায়া কর্তৃক ১৭৮২ সালে আরাকান আক্রমন হলে মারমারা আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে পালোংক্ষিসহ বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। তাদের পূর্ণবাসনের জন্য ব্রিটিশ সরকার ক্যাপ্টিন হিরাম কক্সকে পারোংক্সিতে পাঠান। এ দুটি দেশ নবম শতাব্দী হতে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। এদের অনেকে বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। এরাই বর্তমানে চাকমামার্মা সম্প্রদায় হিসাবে পরিচিত। প্রকৃতি পূজারী এরা পেশায় সবাই পাহাড়ের গাত্রে/ঢালে চাষাবাদে অভ্যস্ত কৃষক। এ চাষাবাদ পদ্ধতিকে বলা হয় জুম চাষ। এতে সুবিধা অনেক। পাহাড়ের ঢালের চাষাবাদে একসাথে বেশ কয়েকটি ফসলের চাষ করা হয়ে থাকে। যেমন: ধান, তুলা, ঘষ্য, মার্ফা (এক ধরণের শশা) আদা, হলুদ আরও কত কি শাকসবজি। এ পেশার লোককে বলা হয় জুমিয়া। প্রকৃতি পূজারীদের অনেকেই ইদানিংকালে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এদের মধ্যে টিপরারা অগ্রগামী। এ নৃগোষ্ঠিগুলি কখন কিভাবে লামায় পদার্পণ করেছিল সঠিক করে বলা দুরূহ। ধারণা করা যেতে পারে, ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরার রাজা ধন মানিক্য চট্টগ্রাম দখল পূর্বক চকরিয়া পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেন। রাজা ধন মানিক্যের নামে কাকারা ইউনিয়নের একটি এলাকার নামকরণ করা হয় মানিকপুর। কালের বিবর্তনে মানিকপুরের অবস্থানরত ত্রিপুরা সম্প্রদায় ক্রমাগতভাবে মাতামুহুরী অববাহিকায় উজান বেয়ে লামা অঞ্চলে প্রবেশ করে স্থায়ী বসবাস আরম্ভ করে। এছাড়া অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী আরকান আলীকদমের সাথে সীমান্ত যুক্ত, সেদিক হতে জুম চাষ উপযোগী উর্বর পাহাড়ী ভূমির সন্ধানে আলীকদম হয়ে লামায় প্রবেশ করে বসতী স্থাপন করে। এভাবে লামায় বিভিন্ন জাতি সত্ত্বার সম্মিলন ঘটে। এর পাশাপাশি এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনে বাঙ্গালীরাও পিছিয়ে ছিল না। মাতামুহুরীর নদী পথে ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার কারণে পার্শ্ববর্তী চকরিয়া লোহাগড়া ও সাতকানিয়া এলাকা হতে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেন। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের নদীভাঙ্গন কবলিত বিভিন্ন এলাকা হতে ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে এনে পার্বত্য এলাকার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় লামায় ও পূণর্বাসন প্রক্রিয়া চালান। ফলে লামা বান্দরবান পার্বত্য জেলার একটি অন্যতম জনবহুল এলাকাতে পরিণত হয়। জানা যায়, ১৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান ‘‘বোমাং’’ রাজার পূর্ব বংশধরের এক নৃপতি আরকান রাজা কর্তৃক চট্টগ্রাম গর্ভণর নিযু্ক্ত হন। ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের কতৃত্বস্বরূপ আরকান রাজা তাঁকে বোমাং উপাধিতে ভূষিত করেন। বোমাং অর্থ সেনাপতি বা সেনানায়ক। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খাঁন ও তার পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ এর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দখল করে নিলে বোমাং এবং তার অনুসারীরা আরকানে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৭৭৪ সালে আরকান রাজা কর্তৃক অত্যাচারিত ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে নালিশ জানায় ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে। তখন কোম্পানী পর্যায়ক্রমে তাদের সাম্রাজ্যের বিস্তার করে। যথাক্রমে রামু, ঈদগাহ, চকরিয়া মাতামুহুরী নদীর তীর, মহেশখালী (১৮০৪খ্রি.) পর্যন্ত। অপরদিকে বোমাং রাজার বংশধরেরা আরও উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বান্দরবানে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এ সময়ে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ৫১০০বর্গমাইল অঞ্চলকে তিনটি সার্কেলে (মহকুমায়) বিভক্ত করে যথাক্রমে চাকমা, মং ও বোমাং সার্কেল নামকরণ করেন। বর্তমানে বান্দরবান সদর হচ্ছে বোমাং সার্কেল চীফ এর সদর দপ্তর। এ সার্কেলের আয়তন ১৬৬৫ বর্গমাইল এলাকা। বোমাং রাজার নিযুক্ত মৌজার হেডম্যান ও পাড়ার কারবারীর মাধ্যমে ভূমি রাজস্ব আদায় ও জনসাধারণের বিচার আচার সম্পন্ন এবং শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখা হতো। হেডম্যান কারবারীর ক্ষমতা সীমিত করা হলেও অদ্যাবধি সরকারী প্রশাসনের পাশাপাশি এ প্রথা বিরাজমান ছিল। [২]

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

লামা উপজেলা ৭টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত। সেগুলোর নাম হল - আজিজনগর ইউনিয়ন, গজালিয়া ইউনিয়ন, ফাষিয়াখালী ইউনিয়ন, রূপসীপাড়া ইউনিয়ন, লামা ইউনিয়ন, সরই ইউনিয়ন ও ফাইতং ইউনিয়ন।

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

এই উপজেলার জনসংখ্যা সর্বমোট ২০১১ সালের আদমশুমারীর তথ্যমতে, ১,১৩,৪১৩ জন। তম্মধ্যে পুরুষ ৫৮,৯০৪ জন, মহিলা ৫৪,৫০৯ জন। পার্বত্যাঞ্চলে ১৩টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতিয় জনগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও এ উপজেলায় এদের মধ্যে ৬ টি জনগোষ্ঠীর বাস। এদের মধ্যে ১৪,৪৮৫ জন মার্মা, ৫,১৯২ জন ত্রিপুরা, ৮,৭৭০ জন মুরুং, ৭৮ জন চাকমা, ১২৯ জন তংচংগ্যা ও ২২১ জন খেয়াং সম্প্রদায় বসবাস করেন।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

এই উপজেলার শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৩০.৪%; পুরুষ ৩৬.৪%, মহিলা ২৩.৫%।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

  • প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭৪টি,
  • মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৬টি,
  • মাদ্রাসা ৪টি,
  • কলেজ ১টি,
  • কমিউনিটি বিদ্যালয় ৫টি।

চিকিৎসা ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

  • উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ১টি,
  • স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ৩টি,
  • পশু চিকিৎসা কেন্দ্র ১টি।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

কৃষি ও ব্যবসা।

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

বিবিধ[সম্পাদনা]

দর্শনীয় স্থান[সম্পাদনা]

  • মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্স,
  • ভিউ পয়েন্ট অফ লামা উপজেলা,
  • সাবেক বিলছড়ি বৌদ্ধ বিহার,
  • নুনারবিলপাড়া পালিটুল বৌদ্ধ বিহার,
  • মাতামুহুরী নদী ও ব্রীজ পরিদর্শন,
  • শিলেরতুয়া স্থিত চংবট ম্রো পাড়া ও পাহাড় আরোহন কোয়ান্টাম শিশু কানন, সরই,
  • মাতামুহুরী নদীর দুপারের সৌন্দর্য্য,
  • সুখের-দু:খের পাহাড় আরোহন ও কূলবর্তী জনজীবনযাপন,
  • সরই স্থিত বিভিন্ন ফলদ ও বনজ বাগান পরিদর্শন (এক্সিম গ্রুপ ও মোস্তফা গ্রুপ),
  • ফাসিঁয়াখালী রাবার বাগান ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "জনসংখ্যা"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ৭ এপ্রিল, ২০১৫ 
  2. লামা উপজেলা তথ্য বাতায়ন

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]