লংগদু উপজেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
লংগদু
উপজেলা
লংগদু বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
লংগদু
লংগদু
বাংলাদেশে লংগদু উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২২°৫৭′০০″উত্তর ৯২°০৯′০০″পূর্ব / ২২.৯৫০০° উত্তর ৯২.১৫০০° পূর্ব / 22.9500; 92.1500স্থানাঙ্ক: ২২°৫৭′০০″উত্তর ৯২°০৯′০০″পূর্ব / ২২.৯৫০০° উত্তর ৯২.১৫০০° পূর্ব / 22.9500; 92.1500
দেশ  বাংলাদেশ
বিভাগ চট্টগ্রাম বিভাগ
জেলা রাঙ্গামাটি জেলা
আয়তন
 • মোট ৩৮৮.৪৯ কিমি (১৫০�০০ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[১]
 • মোট ৮৪,৪৭৭
 • ঘনত্ব ২২০/কিমি (৫৬০/বর্গমাইল)
স্বাক্ষরতার হার
 • মোট ৪২.২%
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
ওয়েবসাইট langadu.rangamati.gov.bd

লংগদু উপজেলা বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা।

অবস্থান ও আয়তন[সম্পাদনা]

চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙামাটি পার্বত্য জেলার অন্তর্গত লংগদু উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান ২২°৪৮' হতে ২৩°০৬' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০৫' হতে ৯২°১৯' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। এটি রাঙ্গামাটি জেলা সদর হতে ৭৬ কি: মি: উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। এর উত্তরে বাঘাইছড়ি উপজেলাখাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা, দক্ষিণে রাঙ্গামাটি সদরবরকল উপজেলা, পূর্বে বরকল উপজেলা ও পশ্চিমে নানিয়ারচর উপজেলাখাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা অবস্থিত। লংগদু উপজেলার আয়তন ৩৮৯ বর্গ কিলোমিটার। লংগদু উপজেলার আয়তন ৩৮৯ বর্গ কিলোমিটার।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

লংগদু নামের উৎপত্তি সম্পর্কে কোন সুনিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায় না; তবে কয়েকটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। 'লংগদু' শব্দটির কোন আভিধানিক অর্থ নেই। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা প্রতিষ্ঠার পর ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি থানা গঠন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সদর দপ্তর তখন চন্দ্রঘোনায় স্হাপন করা হয়। জেলা সদর হতে নবগঠিত থানাটির দীর্ঘ দুরত্বের জন্য এটিকে ইংরেজী শব্দ লং (অর্থাৎ দীর্ঘ) দুর সংক্ষেপে লংদুর বা লংদু ডাকা হতো। 'লংদু' পরবর্তীতে লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে 'লংগদু' নামে অভিহিত হয় বলে অনেকেই ধারণা করেন। বর্তমানে লংগদু নামে একটি মৌজা এবং ইউনিয়ন আছে। মূলত: লংগদু থানা গঠন পরবর্তী সময়ে সমগ্র থানায় এ নামে একটিই ইউনিয়ন ছিল যা পরবর্তী কালে বিভাজিত হয়ে বর্তমানে ০৭ টি ইউনিয়নে বিভক্ত হয়েছে।

লংগদু নামকরণের বিষয়ে কিছু ঐতিহাসিক ধারণা প্রচলিত আছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে চাকমা নৃগোষ্ঠীর আধিক্য থাকলে এবং একসময়ে ত্রিপুরা এবং মারমা নৃগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। লংগদু নামকরণের ক্ষেত্রে ত্রিপুরা এবং মারমা নৃগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত দুটো ব্যাখ্যা রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী মারমাদের পূর্বপুরুষগণ মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের (সাবেক আরাকান) অধিবাসী ছিলেন। ১৭৮৪ সালে বর্মীরাজা বোদপায়া আরাকান জয় করেন। সৈন্যেরা আরাকান জয় করে আরাকানীদের উপর অত্যাচার শুরু করলে প্রাণরক্ষার্থে তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীকৃত চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় আরাকানীরা উদ্বাস্তু হিসাবে আশ্রয় গ্রহণ করে। একদল আরাকানী মগ পরিবার জনৈক ম্রে-চাই এর নেতৃত্বে পালংখাইং নদী অববাহিকা এলাকা হতে কর্ণফুলী নদীর উত্তরে বসতি গড়ে তোলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ম্রে-চাই কে মং রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী আরাকানী মগগণ নিজেদের নামের সাথে মারমা পদবী গ্রহণ করেন। মারমা সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার মিলে গংসা বা দল গঠিত হয়। গং অর্থ সর্দার এবং সা অর্থ লোক বা সন্তান উভয়ই বুঝায়। গংসা অর্থে কোন দলপতির লোক বুঝানো হতো। মারমাদের অনেকগুলো গংসার মধ্যে লংকাডু-সা উল্লেখযোগ্য। লংকাডু নামে কোন দলপতি বা সর্দারের নামানুসারে লংকাডু-সা নামক গংসা বা দলের উৎপত্তি হয়েছিল মর্মে প্রতীয়মান হয়। ব্যক্তি লংকাডু বা লংকাডু-সা দলের নামানুসারে লংকাডু > লংগাডু > লংগদু নামের উৎপত্তি হয়েছে।

লংগদু নামকরণের বিষয়ে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কিত একটি ধারণা প্রচলিত আছে। মধ্যযুগে ত্রিপুরায় একটি শক্তিশালী রাজবংশ ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে ত্রিপুরার রাজা, আরাকানের রাজা এবং বাংলার সুলতানের অনেক যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছিল। ত্রিপুরারাজ বিজয়মাণিক্য (১৫৩২-১৫৬৩ খ্রি.) চট্টগ্রাম জয় করে রামু পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ষোড়শ শতাব্দীতে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন পার্বত্য ত্রিপুরা হতে আরাকান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমানা চট্টগ্রাম হতে বরাক নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ত্রিপুরার রিয়াং সম্প্রদায়ের লোকজন পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাংশের মাইনী উপত্যকায় বসবাস শুরু করে। তারা মাইয়ুনী টাল্যাং থেকে এসেছিল বিধায় নদীর নাম মাইনী হয়েছে। ত্রিপুরা এবং রিয়াং ভাষায় মাই অর্থ ধান এবং ভাত দুটোই বুঝায়। মাইয়ুনী টাল্যাং শব্দের অর্থ ধান্য এলাকা বা পাহাড়। মাইনী নদী অববাহিকায় বসবাসকারী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দলপতির নাম ছিল লেংদু। সেই দলপতির নামে অত্র এলাকায় একটি খাল রয়েছে। খালটি লংগদুর পশ্চিমে বন্দুকভাঙ্গা পাহাড়শ্রেনী হতে উৎপন্ন হয়ে পূর্বে কাসালং নদীতে এসে মিশেছে। ধারণা করা যায় যে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের দলপতির নামানুসারে পরবর্তীতে এলাকার নাম লেংদু>লাংগাদু>লংগদু হয়েছে।

Langadu.GIF

প্রশাসনিক কাঠামো[সম্পাদনা]

১৮৬০ সনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা ঘোষনার পর পার্বত্য এলাকায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যে কয়টি থানা প্রথম গঠিত হয় তার মধ্যে লংগদু অন্যতম। লংগদু থানা সৃষ্টি হয় ১৮৬১ সালে। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর উপজেলায় মান উন্নীত হয়। লংগদু থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৫ সালে। ৭টি ইউনিয়ন ও ২৫ টি মৌজা নিয়ে এই উপজেলা গঠিত। ইউনিয়নগুলো হচ্ছেঃ

জনসংখ্যা উপাত্ত[সম্পাদনা]

২০১১ সালের আদমশুমারী অনুসারে এই উপজেলার লোকসংখ্যা ৮৪৬৭৭ জন; পুরুষের সংখ্যা ৪৩৮৪৬ জন এবং মহিলার সংখ্যা ৪০৮৩১ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ১.৮। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২১০ জন এবং প্রতি বর্গ মাইলে ৫৪৪ জন।

এ উপজেলায় শহর/ বাজার এলাকায় পরিবারের আকার ৪.৫৩ জন এবং গ্রাম এলাকায় পরিবারের আকার ৪.৪৮ জন। এ উপজেলায় নগরায়নের হার ১৩.৯৭%।

এ উপজেলায় প্রধানত বাঙালি ও চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে তবে অল্পসংখ্যক ত্রিপুরা ও পাংখোয়া জাতিসত্বার লোকজন রয়েছে।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

লংগদু উপজেলার গড় শিক্ষার হার ৪৪.২%; যার মধ্যে পুরূষ ৪৯.২ % এবং নারী ৩৮.৮%। এখানে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার শতকরা ৫০.৯ ভাগ; ছাত্রদের উপস্থিতির হার শতকরা ৫১.২ ভাগ এবং ছাত্রীদের উপস্থিতির হার শতকরা ৫০.৭ ভাগ।

লংগদু উপজেলায় ১টি সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি কলেজ, ৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ৬টি জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়, ৫৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি কিন্ডারগার্ডেন, ১টি আলিম মাদ্রাসা, ২টি দাখিল মাদ্রাসা, ৫টি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ও ২৫টি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা রয়েছে।

স্বাস্থ্য[সম্পাদনা]

  • সরকারী হাসপাতাল - ১টি;
  • স্বাস্থ্য কেন্দ্র - ৭টি।

কৃষি[সম্পাদনা]

  • প্রধান কৃষি ফসল - ধান, তামাক,তরমুজ, হলুদ, আদা, শাকসবজি।
  • প্রধান ফল-ফলাদি - কাঁঠাল, আম, লিচু, কলা, লেবু, নারিকেল, আখ, আনারস।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

লংগদু উপজেলার কৃষি, মত্স্য সম্পদ, বনজ সম্পদ এর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। লংগদু উপজেলার কাট্টলী বিলে প্রচুর পরিমাণে মিঠাপানির মাছ পাওয়া যায়।

  • প্রধান রপ্তানি দ্রব্য - তরমুজ, কলা, কাঁঠাল,হলুদ, আদা, মাছ।

যোগাযোগ[সম্পাদনা]

বিমান বা ট্রেনযোগে লংগদু যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বাস যোগে লংগদু যাওয়া যায়; এতে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘন্টা। আবার ঢাকা হতে খাগড়াছড়ি গিয়ে সেখান হতে বাসযোগে যাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি থেকে বাসে সময় লাগে প্রায় ৩ ঘন্টা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি বাসে লংগদু যাওয়া যায়; সময় লাগে প্রায় ৫ ঘন্টা। রাঙ্গামাটি হতে লঞ্চে লংগদু যেতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘন্টা।

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

দর্শনীয় স্থান[সম্পাদনা]

  • বনশ্রী রেস্ট হাউজ - মাইনীমুখ;
  • মাইনীমুখ বাজার মসজিদ;
  • তিনটিলা বন বিহার;
  • ডুলুছড়ি জেতবন বিহার;
  • বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স;
  • কাট্টলী বিল;
  • কাট্টলী বাজার;
  • গরুসটাং পাহাড়;
  • থলছাপ পাহাড়;
  • কাকপাড়ীয়া প্রাকৃতিক বনভূমি;
  • পাবলাখালী অভয়ারণ্য ও পাবলাখালী গেইম অভয়ারণ্য;
  • যমচুগ বন বিহার;
  • বনস্মৃতি রেস্ট-হাউস - পাবলাখালী ।

বিবিধ[সম্পাদনা]

  • ডাকঘর - ২টি;
  • নদ-নদী - ২টি;
  • হাটবাজার - ১২টি;
  • ব্যাংক - ২টি।

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "এক নজরে লংগদু উপজেলা"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। জুন, ২০১৪। সংগৃহীত : ৫ জুলাই ২০১৫ 
  • চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত, সুগত চাকমা।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]


রাঙ্গামাটি জেলা Flag of Bangladesh.svg
উপজেলা: কাউখালী · কাপ্তাই · জুরাছড়ি · নানিয়ারচর · বরকল · বাঘাইছড়ি · বিলাইছড়ি · রাঙ্গামাটি সদর · রাজস্থলী · লংগদু