জাতীয় শোক দিবস (বাংলাদেশ)
| জাতীয় শোক দিবস | |
|---|---|
| আনুষ্ঠানিক নাম | জাতীয় শোক দিবস |
| তাৎপর্য | শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার স্মরণ |
| তারিখ | ১৫ আগস্ট |
| সর্বপ্রথম | ১৯৭৬ (বেসরকারিভাবে) ১৯৯৬ (সরকারিভাবে) |
জাতীয় শোক দিবস বাংলাদেশে পালিত একটি দিবস।[১] ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যাকাণ্ড স্মরণে শোক দিবস পালন করা হয়। এটি ১৯৭৬ সাল থেকে পালন শুরু হয়।[২] বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এ দিন সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।[৩] জাতীয় শোক দিবস উদ্যাপনে সারা দেশে কালো পতাকা উত্তোলন ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হতো।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার এই দিনের সাধারণ ছুটি বাতিল ঘোষণা করে ও এর সরকারি স্বীকৃতি বাতিল করে।[৪][৫][৬]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]


১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসায় সেনাবাহিনীর কতিপয় সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন। সেদিন তিনি ছাড়াও নিহত হন তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। এছাড়াও তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনসহ নিহত হন আরো ১৬ জন। ১৫ আগস্ট নিহত হন মুজিব পরিবারের সদস্যবৃন্দ হলেন: ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু পুত্র শেখ রাসেল; পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল; ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি। মুজিবের জীবন বাঁচাতে ছুটে আসেন কর্নেল জামিলউদ্দীন আহমেদ, তিনিও তখন নিহত হন। দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার ছোটবোন শেখ রেহানা।
দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার গায়েবানা জানাজা পরবর্তী বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশে প্রথমবারের মতো 'জাতীয় শোক দিবস' পালনের ঘোষণা দেয়া হয়।[২] ১৯৭৬ সালের ৫ আগস্ট জারি করা বিশেষ সামরিক ফরমান উপেক্ষা করে ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে মিলাদ অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নেন ছাত্রনেতারা।[২][৭] ছাত্রদের ব্যাপক উপস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে মিলাদ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত পরিচালিত হয়।[২] তবে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে প্রবেশ করতে গেলে পুলিশ বাধা প্রদান করে। এতে ছাত্ররা সড়ক সংলগ্ন ধানমন্ডি লেকের পানিতে ফুল ছুড়ে বা ভাসিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু ভবনের উদ্দেশ্যে।[২] একইদিনে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের হাজী আসমত কলেজের শহীদ আশুরঞ্জন ছাত্রাবাসে মিলাদ মাহফিল, কোরআন খতম, দোয়া-মোনাজাত এবং যশোরের টাউন হলে দোয়া মাহফিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।[৮][৯] কিশোরগঞ্জের মিলাদ মাহফিলে পুলিশ বাধা প্রদান করে। সামরিক ফরমান 'অমান্য' করায় ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা সকলেই ১ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে মুক্তি পান।[৮] ১৯৯৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেন। অধ্যাদেশটি পরে সংসদে একটি বিলের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন চার দলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় এলে তারা বিলটি পরিবর্তন করে ও শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে।[১০] সেই সময় সরকারি স্বীকৃতি না থাকলেও স্হানীয় ভাবে দিবসটির পালন অব্যাহত থাকে। ছয় বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী হাইকোর্ট ১৫ই অগাস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পুনর্বহাল করে।[১১] যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরায় দিনটিতে ছুটি চালু করে।[১০] সমাজবিজ্ঞানী হাসানুজ্জামান চৌধুরী এক লেখায় লিখেন যে, বিএনপি নেত্রী ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগকে অবজ্ঞা করতে এবং দিবসটিকে উপহাস করতে তার জন্মদিন পরিবর্তন করে ১৫ই আগস্ট করেছিলেন।[১২]
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর, প্রতি বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসকে সরকারি ভাবে পালন করা হত।
২০২৪ সালের ১৩ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এই দিনের সাধারণ ছুটি বাতিল ঘোষণা করে।[১৩][১৪] এরপর ১৬ অক্টোবর ২০২৪ তারিখ সরকার এই দিবসটি জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে পরিপত্র জারি করে।[১৫]
কর্মসূচি
[সম্পাদনা]| ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিরে আয়োজিত বিশেষ প্রার্থনা | |
সরকারিভাবে পালনকালে এই দিন সকালে প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। এরপর বনানীতে ১৫ আগস্ট নিহত শহিদদের কবরে শ্রদ্ধা জানানো হতো। টুঙ্গিপাড়ায় সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হতো। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদানসহ বিশেষ মুনাজাত ও দোয়া মাহফিল হতো। বাদ জোহর সারা দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মুনাজাত ও প্রার্থনা করা হতো। বেতার ও টেলিভিশন শোক দিবসের অনুষ্ঠানমালা সরাসরি সম্প্রচার করত। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করত। সারাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো।[১৬]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "৮ জাতীয় দিবস বাতিল করে আদেশ জারি"। দৈনিক কালের কণ্ঠ। ১৬ অক্টোবর ২০২৪।
- 1 2 3 4 5 বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলন। চ্যানেল আই অনলাইন (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৫ আগস্ট ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "জাতীয় শোক দিবস আজ"। বাংলা ট্রিবিউন। ১৫ আগস্ট ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২১।
- ↑ "জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ঘোষিত ১৫ আগস্টের ছুটি বাতিল"। প্রথম আলো। ১৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ আগস্ট ২০২৪।
- ↑ "১৫ আগস্টের সাধারণ ছুটি বাতিল"। কালের কণ্ঠ। ১৬ আগস্ট ২০২৪।
- ↑ "৮ জাতীয় দিবস বাতিল, আদেশ জারি"। দৈনিক জনকণ্ঠ। ১৬ অক্টোবর ২০২৪।
- ↑ Com, Jagonews24। শোকাবহ আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ। Jago News 24। ১৯ আগস্ট ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১৯।
{{সংবাদ উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: সাংখ্যিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক) - 1 2 বঙ্গবন্ধুর প্রথম শাহাদাত বার্ষিকী পালন করায় কারাভোগ, আজ অবহেলিত। NTV। ১৫ আগস্ট ২০১৮।
- ↑ গায়েবানা জানাজার কারণে নির্যাতন চলে যশোরে। Kaler Kantho। আগস্ট ২০১৭। ১০ মে ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০১৭।
- 1 2 "১৫ই অগাস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন"। বিবিসি বাংলা। ১৫ অগাস্ট ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৪।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}:|তারিখ=এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ "১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি যেভাবে শুরু হয়েছিল"। কালের কণ্ঠ। আগস্ট ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৪।
- ↑ চৌধুরী, হাসানুজ্জামান (সেপ্টেম্বর ২০১১)। "Revisiting Globalisation: Perspective Bangladesh" [বিশ্বায়নের পুনর্বিবেচনা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ]। ইন্ডিয়া কোয়ার্টারলি। ৬৭ (৩): ২৫৩। ডিওআই:10.1177/097492841106700304। এস২সিআইডি 156640928।
- ↑ "১৫ আগস্টের ছুটি বাতিল"। বাংলা ট্রিবিউন। ১৩ অগাস্ট ২০২৪। ১৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ অক্টোবর ২০২৪।
{{সংবাদ উদ্ধৃতি}}:|তারিখ=এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: বট: মূল ইউআরএলের অবস্থা অজানা (লিঙ্ক) - ↑ "বাতিল হলো ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি"। ঢাকা ট্রিবিউন। ১৩ অগাস্ট ২০২৪।
{{সংবাদ উদ্ধৃতি}}:|তারিখ=এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ "৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিল করে আদেশ জারি"। দৈনিক প্রথম আলো। ১৬ অক্টোবর ২০২৪।
- ↑ "আজ জাতীয় শোক দিবস"। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ১৫ আগস্ট ২০২১। ১৫ আগস্ট ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২১।