তরফ রাজ্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সিলেট বিভাগের বর্তমান হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক তরফ রাজ্য সিলেট ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । গৌড়, লাউড় ও জয়ন্তীয়ার ন্যায় এটিও শ্রীহট্ট বা সিলেটের অন্যতম প্রচীন রাজ্য। মুসলিম বিজয়ের অনেক আগে থেকেই এটি ত্রিপুরার সামন্ত রাজ্য ছিল। এই রাজ্যের শেষ হিন্দু রাজার নাম ছিল আচাক নারায়ণ। শাহ জালাল কর্তৃক সিলেট বিজয়ের এক বছর পর (১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দ) শাহ জালালের সঙ্গী অনুসারী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন ১২ জন সঙ্গী সাথীদের নিয়ে তরফ অভিযানে যান। সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে এটি বিজিত হয়ে, তরফ ও বার আউলিয়ার মুলুক নামে পরিচিত হয়। সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্য ঐতিহাসিক গণ নিজ নিজ গ্রন্থে একটি প্রাচীন প্রবাদের সুত্রে লিখেনঃ একসময় তরফ ইসলামি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় ভূ-ভারতের এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে রেখেছিল। প্রবাদটি হল এই ; জায়গার নাম তরফ / ঘরে ঘরে হরফ[১][২][৩][৪]

ভৌগোলিক অবস্থান[সম্পাদনা]

প্রাচীন কালে উত্তরে বরাক নদী, দক্ষিণে পার্বত্য ত্রিপুরা ও বেজুরা পরগণা পুর্বে ভানুগাছের পাহাড় যা কমলগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার পূর্ব দিকে অবস্থিত এবং পশ্চিমে লাখাই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তরফ রাজ্য। অর্থাৎ বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার প্রায় অর্ধেক অংশ এর অন্তর্গত ছিল। শাহ জালালের সঙ্গী অনুসারী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন এর দ্বারা তরফ বিজিত হলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় । এ সময় এ রাজ্যের সীমা বর্ধিত হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল (সতরখণ্ডল) নেত্রকোনা জেলার জোয়ানশাহী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়[২][৩]

নামকরণ[সম্পাদনা]

অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে এ রাজ্যের পূর্ব নাম রাজপুর বলে উল্লেখ আছে। এটি ছিল ত্রিপুরার সামন্ত রাজ্য। তিপ্রা রাজা ত্রপিবিঞ্চু দ্বারা রাজপুর রাজ্য শাসিত হত। রাজা ত্রপিবিঞ্চুর হঠাৎ মৃত্যু ঘটে । রাজপুত্র তুঙ্গমাধব তখন শিশু ছিলেন । এ সময় এক রাজ কর্মচারী আচক নারায়ণ নামের যুবক রাজকন্যা লালসা দেবীকে বিবাহ করে রাজ্যধিকার লাভ করে । অচ্যুতচরণ চৌধুরী আচক নারায়ণকে ত্রিপুরার রাজ বংশের বলে ধারণা করেন এবং রাজ্যের নাম রাজপুর থেকে রাজপুত্র তুঙ্গমাধবের নামানুসারে 'তুঙ্গাচল' হলে ও হতে পারে বলে কেউ কেউ লিখেছেন [৩]। সৈয়দ নাসির উদ্দীন কর্তৃক তরফ বিজয়ের পর এ রাজ্যের নাম হয় তরফ । যা কোন দরবেশের দেয়া নাম থেকে অথবা আরবী শব্দ তরীগ থেকে তরফ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন[১][৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রাচীন তরফ বা তুঙ্গাচলকে দ্বাদশ শতাব্দীর রাজ্য বলে সৈয়দ মোস্তফা কামাল সহ অনেকে মনে করেন। যে স্থানে তুঙ্গাচলের রাজধানী ছিল এ স্থান রাজপুর নামে পরিচিত ছিল। যা বর্তমানে বিষগ্রাম বা বিষগাও বলে অভিহিত হচ্ছে। এ রাজ্যের তিপ্রা রাজা 'ত্রপিবিঞ্চু' কে প্রথম শাসক বলে উল্লেখ করা হয় । তবে ত্রপিবিঞ্চু কে? এবং তিনি কোথা থেকে এসেছেন তা কিছুই জানা যায় নি। ত্রপিবিঞ্চুর মৃত্যুর পর আচক নারায়ণ নামের যুবক রাজকন্যা লালসা দেবীকে বিবাহ করে রাজ্যধিকার লাভ করে । আচক নারায়ণের সময় কাজী নুরুদ্দীন নামের জনৈক মুসলমান স্বপরিবারে এ রাজ্যে বসবাস করতেন । তুঙ্গাচল বা তরফ রাজ্যের আচক নারয়ণ গো হত্যার দায়ে কাজী নুরুদ্দীনের শিশুকে হত্যা করে ছিল । এ সংবাদ শুনে ১৩০৪ সালে অত্যাচারী রাজাকে শায়েস্তা করতে সৈয়দ নাসির উদ্দীন ১২ জন দরবেশ সহ প্রেরিত হন। আচক নারায়ণ শাহ জালালের সিলেট আগমন ও গৌড় গোবিন্দের পরিণতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাই তিনি দরবেশদের আগমন বার্তা শুনে ভয়ে নিজ রাজ্য ছেড়ে ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নেন । সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিলেট থেকে যাত্রা শুরু করে ভাটি (জলাবদ্ধ নিম্ন ভাগ) অঞ্চল পার হয়ে প্রথমে উচাআইল নামক স্থান অবস্থান নেন। এখানে অবস্থান কালে তিনি আচক নারয়ণের পলায়ন বার্তা জানতে পারেন । পরে স্বসৈন্যে রাজপুরে প্রবেশ করে তুঙ্গাচল রাজ্যে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন [৩][৫]। আর এভাবে বার আউলিয়া দ্বারা এ রাজ্য বিজিত হয় বলে এটিকে বার আউলিয়ার মুলুক বলেও অভিহিত করা হতো। তরফ বিজয়ার্থী সৈয়দ নাসির উদ্দীনের সঙ্গী ১১ আউলিয়া ও দরবেশ কিছু দিন তরফে অবস্থান করার পর ইসলাম ধর্মের প্রচার কাজ অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে নিজ নিজ আস্তানা গড়ে সেখানেই জীবনাতিবাহিত করেন। উক্ত আউলিয়াগণের নাম ও বর্তমানে অবস্থিত মাজার :

এদিকে সৈয়দ নাসির উদ্দীনের তরফ বিজয় সংবাদ দিল্লীতে পৌছলে দিল্লীর সম্রাট সনদের মাধ্যমে সৈয়দ নাসির উদ্দীনকে রাজ্য পরিচালনার দায়ীত্ব প্রদান করেন। সৈয়দ নাসির উদ্দীন কোন এক অনিবার্য কারণে রাজপুর (আধুনা বিষগ্রাম) থেকে বিশ মাইল দূরবর্তী এক স্থানে রাজধানী স্থানান্তর করেন। স্থানান্তর কৃত রাজধানীর রাজ কর্মচারি, সৈন্য বা লস্কর প্রভৃতির অবস্থান উপলক্ষে এ স্থান লস্করপুর নামে খ্যাত হয়। যা অদ্যাবদি এ নাম (লস্করপুর) বলে অভিহিত হচ্ছে । সৈয়দ নাসির উদ্দীন পরলোক গমন করলে তার পুত্র সিরাজ উদ্দীন তরফের শাসনভার প্রাপ্ত হন। সৈয়দ সিরাজ উদ্দীন থেকে সৈয়দ নাসির উদ্দীনের বংশ বিস্তৃত হয় এবং পর্যায়ক্রমে তারাই তরফ রাজ্যের শাসন কার্যে নিয়োজিত হন। বংশীয় ধারাবাহিকতায় ১৫৮১ সালে সৈয়দ মুসার রাজত্ব কালে ত্রিপুরা রাজ্যের নৃপতি অমর মাণিক্যের সাথে এক যুদ্ধে সৈয়দ মুসা পরাজিত হয়ে তাদের আত্মীয় আরাকান পতির সহযোগিতায় রাজ্য ফেরত পান। এসময় সৈয়দ মুসার ভাই সৈয়দ মিনা ওরফে সৈয়দ সুলতান দিল্লীতে অবস্থান করছিলেন। সৈয়দ মিনা ওরফে সৈয়দ সুলতান দিল্লী থেকে ফিরে এলে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন কারণে মনোমালিন্য দেখা দেয় । সৈয়দ সুলতান লস্করপুর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে গিয়ে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে অবস্থান করেন। তখন তরফ দুই ভাগে বিভক্ত হয়। সৈয়দ মিনা ওরফে সৈয়দ সুলতান মধ্যযুগের একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন । নবনির্মিত সেই বাড়িতে থেকে সাহিত্য চর্চার মধ্যদিয়ে শেষ জীবন কাটিয়ে যান। সুলতান নামানুসারে আদ্যাবদি নবনির্মিত বাড়ি সুলতানশী হাবেলী নামে পরিচিত হচ্ছে [৩][৫]। সৈয়দ মুসা প্রায় ত্রিশ বছর কাল জীবিত থেকে রাজ্য পরিচালনা করেন। সৈয়দ মুসার পরে তার পুত্র সৈয়দ আদম তরফ রাজ্যের একাংশের এবং অপরাংশে সৈয়দ সুলতান পুত্র সৈয়দ ইউনুস শাসন কার্যে মনোনিত হন । এ সময় দিল্লীর সম্রাট কর্তৃক সৈয়দ আদমকে তরফের ফৌজদারী বিচার ভার ও সৈয়দ ইউনুসকে দেওয়ানী বিচার ভার প্রদত্ত করা হয়। সৈয়দ ইউনুস পরলোকগমন করলে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সৈয়দ ক্রিঞ্জিয়া 'সুলতানশী' রিয়াসতের উত্তরাধিকারী হন । সৈয়দ ক্রিঞ্জিয়া ও সৈয়দ আদমের অধঃস্থন বংশধরদের মধ্য থেকে খ্যাতনামা ব্যক্তিত্যের আবির্ভাব ঘটে। যারা রাজ্য পরিচালনার সাথে সাথে ধর্ম প্রচার সহ বাংলা সাহিত্যে উপরও বিভিন্ন ভাবে অবদান রেখেছেন। নবাবী আমলে তরফ রাজ্যকে ঢাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 'চাকলে জাহাঙ্গীর নগর' জেলা লস্করপুর বলে বিভিন্ন রেকট-পত্রে থেকে এর উল্লেখ করা হয়েছে । এরপর তালুক সৃষ্টির সময় এটিকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে কয়েকটি প্রধান পরগণা তরফ থেকে পৃথক করে দশসনা বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়।

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

যেহেতু সৈয়দ নাসির উদ্দীন একজন প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক ছিলেন। তাই বংশধর ও এখানকার ভক্ত মুরিদ গণ মানুষকে ভালবেসে ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি আহবান জানাতেন। যার ফলে মুরাড়বন্দ গরগাহ শরিফ নামে প্রখ্যাত দরবেশ সৈয়দ নাসির উদ্দীনের কবর বা মাজার ভক্ত অনুরক্তদের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে উঠে। পরবর্তিতে এ বংশ হতে অসংখ্য ওলী-আউলিয়া, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ সহ অনেক জ্ঞানী-গুণীর আবির্ভাব ঘটে। যাঁদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত দরবেশ ছিলেন সৈয়দ শাহ খোদাবন্দ, সৈয়দ ইব্রাহীম (দিল্লী থেকে সনদ প্রাপ্ত, মুলক-উল-উলামা), সৈয়দ ইলিয়াছ কুদ্দুছ (কুতুবুল আউলিয়া), সৈয়দ শাহ নুরী, (সাধক পীর) । এছাড়া অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে; আরাকান রাজ্যের উজির সৈয়দ মুসা, বিখ্যাত সাধক গদাহাসন, মধ্যযোগের মহাকবি সৈয়দ সুলতান, সৈয়দ গোয়াস উদ্দীন, ঐতিহাসিক সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ মুস্তফা আলী, সৈয়দ মুর্তাজা আলীসৈয়দ মোস্তফা কামাল সহ আরও অনেক মহা পুরুষগণ সৈয়দ নাসির উদ্দীনের বংশে জন্ম নিয়েছেন বলে শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত সহ বিভিন্ন গ্রন্থে রয়েছে[৩][৫]

তথ্য সুত্র[সম্পাদনা]

  1. সিলেট বিভাগের ভৌগোলিক ঐতিহাসিক রুপরেখা সৈয়দ মোস্তফা কামাল; প্রকাশক: শেখ ফারুক আহমদ, পলাশ সেবা ট্রাস্ট, সিলেট। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১১; পৃ. ৯২।
  2. সিলেট বিভাগের ইতিবৃত্ত: প্রধান রাজ্য সমুহ নিবন্ধ, মোহাম্মদ মুমিনুল হক, গ্রন্থ প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০০১; পৃষ্ঠা ৪০।
  3. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ, দ্বিতীয় ভাগ, প্রথম খণ্ড, প্রথম অধ্যায়, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি; প্রকাশক: মোস্তফা সেলিম; উৎস প্রকাশন, ২০০৪।
  4. Essays on north-east India: By V. Venkata Rao, North Eastern Hill University. Dept. of History, page 70- 75 "the pre-colonial political structure of barak valley ।
  5. তরফ বিজেতা সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন ও মুড়ারবন্দ দরগাহ শরিফ। সৈয়দ মোস্তফা কামাল। প্রকাশনায়-সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন স্মৃতি পরিষদ মুড়ারবন্দ দরগাহ শরিফ। প্রকাশ কাল জানুয়ারি ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ